যেসব কারণে বারবার বন্যা হচ্ছে সিলেট ও সুনামগঞ্জে
জাতীয়
যেসব কারণে বারবার বন্যা হচ্ছে সিলেট ও সুনামগঞ্জে
মাসখানেক আগেই সিলেটসহ এর আশপাশের হাওড় এলাকায় দেখা দিয়েছিল মাঝারি ধরনের বন্যা। কিন্তু মাস পেরুতেই এবার যা দেখা দিল, তা দেশের ইতিহাসেই দুর্লভ। এবারের ভয়ংকর বন্যায় তলিয়ে গেছে পুরো সিলেট অঞ্চলের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ অঞ্চল। সুনামগঞ্জেরও বেশির ভাগ এলাকা হয়েছে জলমগ্ন। ফলে গত দুই মাসের মধ্যে তিন দফা বন্যার কবলে পড়েছে সিলেট এবং সুনামগঞ্জ।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বারবার কেন সিলেটে বন্যা হচ্ছে? বন্যা কেন এত তীব্র আকার ধারণ করছে? বাংলাদেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কুড়িগ্রামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোয় হঠাৎ এমন বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পেছনে অতি বৃষ্টিসহ আরও কয়েকটি কারণ দেখছেন গবেষকরা। নদী গবেষকরা বলছেন, এবারের এমন আকস্মিক বন্যার পেছনে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে অতি বৃষ্টি একটি বড় কারণ এবং এর বাইরের আরও কিছু কারণ উল্লেখ করেছেন তারা।
মেঘালয়ে অতিবৃষ্টি
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে ভারতের চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয়বাষ্প মেঘালয়ের পাহাড়ের সাথে ধাক্কা লেগে উপরে উঠে যায়। পরে সেখানে ভারী হয়ে বৃষ্টি আকারে পড়তে শুরু করে। আর অতিবৃষ্টির কারণে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ বন্যা। আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, সিলেটে এবার যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, গত ২০ বছরের মধ্যে এতো বৃষ্টিপাতের মুখ দেখেনি সিলেটবাসী।
বুয়েটের পানি ও ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, 'গেল কয়েকদিন ধরে চেরাপুঞ্জিতে অনবরত বৃষ্টিপাত দেখা দিয়েছে। ১৮ জুন পর্যন্ত যে তিন দিনের বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, তার আগে ১৯৯৫ সালে এরকম ধারাবাহিক বৃষ্টিপাত দেখা দিয়েছিল এবং তার আগে ১৯৭৪ সালে এধরনের বৃষ্টিপাত দেখা যায়।'
চেরাপুঞ্জিতে যখন বৃষ্টি হয়, তখন তা ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার ভেতরে তাহেরপুরে চলে আসে। কিন্তু তাহেরপুরে এসে পানি আর দ্রুত নিচের দিকে নামতে পারে না। ফলে সেই পানি আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে বন্যা তৈরি করছে
অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম
সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্ত থেকেই ভারতের চেরাপুঞ্জি এলাকা শুরু হয়েছে। ফলে সেখানকার পানি সরাসরি বাংলাদেশের হাওড়ে এসে মিশে। পরে ভৈরব বা মেঘনা নদী হয়ে সাগরে চলে যায়। কিন্তু অতীতের বৃষ্টিপাতের প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান সময়ের নদীগুলোর অবস্থার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় বলে মনে করছেন নদী গবেষকরা। তাই বিশ্লেষকরা এই ভয়ানক বন্যার পেছনে চেরাপুঞ্জির অতিবৃষ্টিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
পরিচালক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, 'বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে আবহাওয়া জলবায়ু বা বৃষ্টির ধরণ বদলে গেছে। এখন বৃষ্টি হলে তা অনেক বেশি গভীর হয়। প্যাসিফিকেও একটা লা নিনো আছে, সেটাও অতিবৃষ্টির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।' তিনি আরও বলেন, 'চেরাপুঞ্জিতে যখন বৃষ্টি হয়, তখন তা ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার ভেতরে তাহেরপুরে চলে আসে। কিন্তু তাহেরপুরে এসে পানি আর দ্রুত নিচের দিকে নামতে পারে না। ফলে সেই পানি আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে বন্যা তৈরি করছে।' এদিকে, গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, চেরাপুঞ্জিতে আরও ২/৩ দিন বৃষ্টিপাত হলে বন্যার ধকল সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। অতিবৃষ্টির কারণে ভারতের আসামেও বন্যা ও ভুমিধস দেখা দিয়েছে। 
নদীর ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়া
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
প্রতিবছর উজান থেকে পানির সাথে পলি ও পাথর নেমে আসে। সেটা এসে বাংলাদেশের অংশে নদীর তলদেশ ভরে ফেলে। ফলে নদীর পানি বহনের ক্ষমতা কমে যায়। তখন সেই নদীতে বেশি পানি আসলে, সেটা উপচে আশেপাশের এলাকা ভাসিয়ে ফেলে।
মমিনুল হক সরকার, নদী গবেষক
মেঘালয় বা আসাম থেকে আসা বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি নদীপথে হাওড় থেকে বের হয়ে মেঘনা বা যমুনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে চলে যায়। কিন্তু এবার হঠাৎ উজান থেকে আসা অতিরিক্ত পানি বের হতে না পারায় এমন ভয়াবহ বন্যার দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। আর এজন্য তারা নদীর নাব্যতা কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন। নদী গবেষক মমিনুল হক সরকার গণমাধ্যমে বলেন, 'প্রতিবছর উজান থেকে পানির সাথে পলি ও পাথর নেমে আসে। সেটা এসে বাংলাদেশের অংশে নদীর তলদেশ ভরে ফেলে। ফলে নদীর পানি বহনের ক্ষমতা কমে যায়। তখন সেই নদীতে বেশি পানি আসলে, সেটা উপচে আশেপাশের এলাকা ভাসিয়ে ফেলে।' 
ছবি: আল-জাজিরা
ছবি: আল-জাজিরা
নদীর নাব্যতা নষ্টের জন্য ভারত অংশে অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলনকে দায়ী করছেন গবেষকরা। এ বিষয়ে বুয়েটের পানি ও ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইফুল বলেন, 'ভারতের উজানের পাথর উত্তোলনের ফলে মাটি আলগা হয়ে নদীতে চলে আসে। ফলে নদীর তলদেশ ভরে যায়। সেখানে নাব্যতার সংকট তৈরি করা হচ্ছে এবং গাছও কাটা হচ্ছে।' এছাড়া নদীগুলো ঠিকমতো ড্রেজিং না হওয়া, ময়লা-আবর্জনায় নদীর তলদেশ ভরে যাওয়া, ঘরবাড়ি বা নগরায়নের ফলে জলাভূমি ভরাট যাওয়াও অন্যতম কারণ। এসব কারণে মেঘালয় বা আসামে বেশি বৃষ্টিপাত হলেই সিলেট বা কুড়িগ্রাম এলাকায় বন্যা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। 
অপরিকল্পিত উন্নয়ন
এবারের ভয়াবহ বন্যার পেছনে মানুষের তৈরি কতগুলো কারণকেও চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। এরমধ্যে প্রধান হলো, অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাট বা স্থাপনা তৈরি করা। এই বিষয়ে বুয়েট অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, 'সিলেট বা সুনামগঞ্জ এলাকায় আগে ভূমি যেরকম ছিল, নদীতে নাব্যতা ছিল, এতো রাস্তাঘাট ছিল না, স্থাপনাও তৈরি হয়নি। কিন্তু এখন সেখানে চিত্র ভিন্ন। ফলে বন্যার পানি এখন নেমে যেতেও সময় লাগে।' এদিকে গবেষকরা জানান, হাওড়ের বিভিন্ন জায়গায় এখন পকেট রোড তৈরি করা হয়েছে, ফলে পানি প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। শহর এলাকায় বাড়িঘর তৈরির ফলে পানি গ্রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এসব কারণেই আগাম বন্যার দেখা মিলছে। 
হাওড়ে যেসব রাস্তা পূর্ব-পশ্চিমে তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোই হাওড়ের পানি চলাচলে মূল বাধার সৃষ্টি করছে। এরকম অনেক রাস্তা কোনোরকম পরিকল্পনা ছাড়াই তৈরি করা হয়েছে।
মমিনুল হক সরকার, নদী গবেষক
নদী গবেষক মমিনুল সরকার বলেন, হাওড়ে যেসব রাস্তা পূর্ব-পশ্চিমে তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোই হাওড়ের পানি চলাচলে মূল বাধার সৃষ্টি করছে। এরকম অনেক রাস্তা কোনোরকম পরিকল্পনা ছাড়াই তৈরি করা হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরবর্তী সময় থেকে হাওড়ে এলিভেটেড বা উড়াল সড়ক করার নির্দেশ দেন। কিন্তু শুধু সুনামগঞ্জ জেলার হাওড় এলাকায় যেসব সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে তার বেশিরভাগই এখনও সাবমারসিবল সড়ক (বর্ষায় তলিয়ে যাবে)।
এলিভেটেড বা উড়াল সড়ক
এলিভেটেড বা উড়াল সড়ক
বাঁধ না থাকা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ বা নেত্রকোনা হাওড় এলাকার বেশিরভাগ জনপদেই শহর রক্ষায় বাঁধ নেই। ফলে কোনো কারণে নদীতে বা হাওড়ে পানি বাড়তে শুরু করলে তা খুব দ্রুত শহরে বা আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করে। গবেষকদের মতে, হাওড়ে শহর রক্ষা বাঁধ না থাকায় সেখানে বাড়িঘর উঁচু করে তৈরি করতে হবে, আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। কিন্তু সেসব অঞ্চলে এর কোনটাই নাই। তাই যখন আকস্মিক বন্যা দেখা দিচ্ছে, তখন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেশি দেখা দিচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
চীনসহ অনেক দেশেই স্পঞ্জ সিটি তৈরি করা হচ্ছে। এসব শহরে বন্যা হলে সেসব পানি শহরের ভেতরেই জমিয়ে রেখে কাজে লাগানোর পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
এসব থেকে বাঁচতে চীনসহ অনেক দেশেই স্পঞ্জ সিটি তৈরি করা হচ্ছে। এসব শহরে বন্যা হলে সেসব পানি শহরের ভেতরেই জমিয়ে রেখে কাজে লাগানোর পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু এবার সিলেট বা সুনামগঞ্জে আকস্মিক যে বন্যা দেখা দিয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে বন্যা মোকাবিলা করা খুব কঠিন বলেই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 
নগরের জলাশয় ভরাট ও দখল
সিলেট নগরীতে গত ৩০ বছরে ভরাট হয়ে গেছে নগরীর অর্ধশতাধিক দিঘি। অনেক জলাশয় ভরাট করে সরকারি প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। এছাড়া সিলেটের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ছোট-বড় প্রায় ২৫টি প্রাকৃতিক খাল। যা ‘ছড়া’ নামে পরিচিত। পাহাড় বা টিলার পাদদেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে ছড়াগুলো গিয়ে মিশেছে সুরমা নদীতে। এসব ছড়া দিয়েই বর্ষায় পানি নিষ্কাশন হতো। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো না। এখন অনেক স্থানে এসব ছড়ার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। ছড়াগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই নগর জুড়ে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
সিলেট সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা দেশের একটি জাতীয় দৈনিককে জানান, নগরীর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৩টি বড় ছড়ার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৩ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরেই এসব ছড়ার দুপাশ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছে অবৈধ দখলদাররা। এ ছাড়া নগরের উপশহর এলাকার হাওর ভরাট করে গড়ে উঠেছে আবাসিক এলাকা। বাঘা এলাকার হাওর ভরাট করে হয়েছে ক্যান্টনমেন্ট। জলাধারগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় নগরের পানি ধারণের ক্ষমতা কমে গেছে জানিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এখন বৃষ্টি হলেই নগরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। আর ঢল নামলে বন্যা হয়ে যায়।’ সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা প্রায় ৩০ কিলোমিটার ছড়া উদ্ধার করেছি। এতে নগরীতে আগের মতো আর জলাবদ্ধতা হয় না। বেশি বৃষ্টিতে নগরীর কিছু এলাকায় পানি জমলেও অল্প সময়ের মধ্যে তা নেমে যায়। আর কোনো জলাশয় ভরাট করতে দেয়া হচ্ছে না।’
জাতীয়বিশেষ প্রতিবেদনআবহাওয়াসিলেটসুনামগঞ্জসিলেট বন্যা
আরো পড়ুন