প্রযুক্তি
‘ব্ল্যাক’ নামের জন্যই কি ব্ল্যাকবেরি ফোনের বিদায়?
মুঠোফোনের বাজারে একসময় রাজত্ব করেছে ব্ল্যাকবেরি ব্র্যান্ড। দেশে দেশে এই ফোনের চাহিদাও ছিল আকাশচুম্বী। তবে দিন যত গিয়েছে, প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলা এবং বাজারের প্রতিযোগিতায় পিছিয়েছে ব্ল্যাকবেরি। সাম্প্রতিক সময়ের এক ঘোষণার পর গেল ০৪ জানুয়ারি থেকে কানাডার ওয়াটারলুভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানের অপারেটিং সিস্টেমচালিত ফোনগুলো আর ঠিকমতো কাজ করছে না। এ অপারেটিং সিস্টেমের জন্য সব ধরনের সেবাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কেন এমন করতে হলো ব্ল্যাকবেরিকে? কেন-ই বা প্রতিযোগিতার বাজারে টিকতে পারলো না প্রতিষ্ঠানটি? 


ব্ল্যাকবেরির পথচলা
মাইক লাজার্ডিস ও ডগলাস ফ্রেজিনের হাত ধরে ১৯৮৪ সালে যখন যাত্রা শুরু করে ব্ল্যাকবেরি, তখন প্রতিষ্ঠানটি পরিচিত ছিল রিসার্চ ইন মোশন (রিম) নামে। সে সময় তারা দুজনই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের নামডাক ছিল মূলত তারবিহীন টেকনোলজি ডেভেলপার হিসেবে। দুই বন্ধুর এগিয়ে যাওয়ার গল্পে মাইলফলক ছিল ফোন বাজারে আনার উদ্যোগ। এই উদ্যোগ প্রথম সফলতা দেখে ১৯৯৯ সালে। সে বছরই প্রথম মোবাইলের বাজারে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় ব্ল্যাকবেরি। বাজারে আসে ৮৫০ ও ৮৫৭ নামের দুই মডেলের সিরিজ। সেগুলো ছিল শুধু পেজার ডিভাইস,যা ডাটাটেক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতো। এটি একটি অতি পুরনো নেটওয়ার্কিং সিস্টেম যা আজকাল ব্যবহার হয় না বললেই চলে। 

 রঙের জন্য "ব্ল্যাক” শব্দটি ছিল উপযুক্ত। কিন্তু ডিভাইসের একটি আকর্ষণীয় নামের প্রয়োজন ছিল। তাদের মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান 'লেক্সিকন ব্র্যান্ডিং' ব্ল্যাকবেরি নামটি পছন্দ করে। কারণ এর ছোট কীবোর্ডের কীগুলো দেখতে ছোট ব্ল্যাকবেরি ফলের গায়ের খোসার মতো – আর এভাবেই জন্ম নিলো “ব্ল্যাকবেরি”। আজকের আধুনিক ডিভাইসের পূর্বসূরি একইসাথে নানা রকম পরিষেবা এবং নেটওয়ার্ক কম্প্যাটিবিলিটি নিয়ে ব্ল্যাকবেরি ফোন প্রথম বাজারে আসে ২০০৩ সালে। এটি ওয়্যারলেস বাজারে ঝড় তোলে। ব্ল্যাকবেরি ফোনের জনপ্রিয় ব্যবহারগুলোর মধ্যে ছিল ই-মেইল চেক করা, ইন্টারনেট ব্রাউজ করা, ইন্সট্যান্ট ম্যাসেজ পাঠানো, ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফ্যাক্স পাঠানো, পার্সোনাল প্ল্যানার, অ্যালার্ম ঘড়ি হিসেবে ব্যবহার এবং একটি টেলিফোন হিসেবে এর ব্যবহার। এখনকার দিনে এসব খুব মামুলি ব্যাপার হলেও সে সময় গ্রাহকদের কাছে ব্যাপারগুলো একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরা দিয়েছিল। তবে সেই অভিজ্ঞতার স্বাদ দিয়েই বসে থাকেন নি নির্মাতারা। ব্ল্যাকবেরিকে আরও সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় করে তোলার প্রয়াস ছিল তাদের নিত্যদিনের ভাবনায়। 

ব্ল্যাকবেরি পার্ল সিরিজ বাজারে আসে ২০০৬ সালে। আমেরিকায় টি-মোবাইল সর্বপ্রথম ক্যারিয়ার ফোন হিসেবে এটিকে বাজারে আনে। এই সিরিজের স্মার্টফোনের উন্নত সংস্করণের মধ্যে ভাল ক্যামেরা এবং মিডিয়া প্লেয়ার ছিল। কাজেই এটি তাঁর গ্রাহকদের শুধু টেলিফোনে কথা বলাই নয়,বরং ভাল মানের ছবি তোলা এবং কাজ বা হাটা বা অন্য যে কোনো সময় গান শোনার সুযোগ করে দিয়েছিল। ব্ল্যাকবেরি কার্ভ ছিল ব্ল্যাকবেরির একটি উন্নত মডেল। ২০০৬ সালে আসা পার্লের নানা ফিচার সহ বাজারে এসে কার্ভ ৮৩০০ সিরিজ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পায়। ৮৩০০ সিরিজে যা ছিল না,তা হল ওয়াই-ফাই এবং 3G প্রযুক্তি,যা অন্যান্য মোবাইলের ভিড়ে এটিকে প্রায় বিলুপ্ত করে দেয়। টাচ স্ক্রিন ফিচার সাপোর্টের জন্য সর্বপ্রথম “রিসার্চ ইন মোশন” প্রযুক্তি আবিস্কার করে বাজারে নিয়ে আসে ব্ল্যাকবেরি স্টোর্ম সিরিজ। কিছু কিছু ব্ল্যাকবেরি টাচস্ক্রিন সেটে কিবোর্ডও ছিল,কিন্তু ৯৫০০ সিরিজ ছিল পুরোপুরি টাচ স্ক্রিন।

এটি বাজারে আসার পর ব্ল্যাকবেরি বাজারে আবার শীর্ষস্থান ফিরে পায় কেবল তার সহজ প্ল্যাটফর্ম, কম দাম এবং সাধারণ মানুষের কাছে এর সহজ লভ্যতার জন্য। বিশেষ করে যারা ব্যাবসা করত,তারা ব্ল্যাকবেরির অনেক ফিচারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। দৈনন্দিন নানান কাজ সম্ভব হয়ে উঠেছিল তাদের হাতের সমান ছোট এই ডিভাইসটি দিয়ে।  ব্ল্যাকবেরির নতুন ডিভাইসগুলোতে উন্নত প্রযুক্তি, কিবোর্ড এবং ডিজাইন নিয়ে আসা হয়, যা দেখতে বেশ আকর্ষণীয় ছিল এবং পাশাপাশি এমন সব ফিচার নিয়ে আসা হয় যা তার কার্যকারিতার চাইতে দেখতে বেশ আকর্ষণীয় ছিল। যেমন, নতুন মডেলগুলোতে এমন কিবোর্ড নিয়ে আসা হয় যা “থাম্বিং” সাপোর্ট করে- অর্থাৎ দশটি আঙুল ব্যবহার না করে শুধু বুড়ো আঙুল ব্যবহার করলেই চলে,যেটি বেশ সুবিধাজনক। অন্যান্য মডেলে পুশ-টু-টক ,স্ক্রলিং এবং এরকম আরও অনেক ফিচার সম্বলিত মোবাইল ডিভাইস বাজারে আনে।

রঙের জন্য "ব্ল্যাক” শব্দটি ছিল উপযুক্ত। কিন্তু ডিভাইসের একটি আকর্ষণীয় নামের প্রয়োজন ছিল। তাদের মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান 'লেক্সিকন ব্র্যান্ডিং' ব্ল্যাকবেরি নামটি পছন্দ করে। কারণ এর ছোট কীবোর্ডের কীগুলো দেখতে ছোট ব্ল্যাকবেরি ফলের গায়ের খোসার মতো – আর এভাবেই জন্ম নিলো “ব্ল্যাকবেরি।
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা
কানাডার ওয়াটারলুভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি বাজার ধরার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই প্রচেষ্টা চালায়। ২০১৩ সালে পুরোনো ব্ল্যাকবেরি অপারেটিং সিস্টেম বাদ দিয়ে ব্ল্যাকবেরি ১০ বাজারে আনে। তারা অ্যাপলের আইওএস ও অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের টানতে নানা ফিচার যুক্ত করেছিল। কিন্তু গ্রাহককে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ব্ল্যাকবেরির এতসব বিবর্তন এবং উন্নয়নের পরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ অর্থনৈতিক বাজারে তার অবস্থান হারাতে থাকে এবং তাদের নীতি নির্ধারকদের কিছু কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হয়। ২০১৩ সালের আগস্টে ব্ল্যাকবেরি ঘোষণা দেয় যে তারা প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দেবে। ব্যাপক চেষ্টা ও মার্কেটিং কৌশল অবলম্বন সত্ত্বেও ব্ল্যাকবেরি, অ্যাপল ও নোকিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে নি।

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে একটি প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকবেরির ১০ শতাংশ মালিকানা কেনার প্রস্তাব দেয়। ব্ল্যাকবেরি সাময়িকভাবে প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং অন্য উপায় খোঁজার জন্য নভেম্বর পর্যন্ত সময় নেয়। এরপরই ব্ল্যাকবেরি নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে জন এস.চেন'কে নিয়োগ দেয়। নতুন ব্যবস্থাপনা সিদ্ধান্ত নেয় তারা প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করবে না এবং তারা তাদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। পরের বছরই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে ব্ল্যাকবেরি। তারা তাদের হারানো গৌরব ফিরে পায় কেবল তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল হওয়ার কারণে নয় বরং তাদের হ্রাসকৃত মূল্যের কারণে। এরপর ব্ল্যাকবেরি বাজারে নিয়ে আসে “পাসপোর্ট” মডেল সিরিজ। এই হ্যান্ডসেটটি সাড়ে চার ইঞ্চি বর্গাকার সম্পূর্ণ এইচ ডি রেজ্যুলেশন স্ক্রিন সম্বলিত। এর আকার শুধুমাত্র সেই গুণগতমান ও প্রযুক্তিই ধারণ করে না বরং এটি আপনার মানিব্যাগেও জায়গা করে নিতে পারতো। 

ছন্দপতন যেভাবে
২০১৫ সালে ব্ল্যাকবেরি অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্মে চলে যায়। পরের বছরের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল ব্ল্যাকবেরি। ওই সময় ব্ল্যাকবেরি মোবাইল ফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে সরে গিয়ে নিরাপত্তা সফটওয়্যার উন্নয়নকারী ও সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সে সময় টিসিএল ও কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে ব্ল্যাকবেরি। টিসিএলের সঙ্গে ব্ল্যাকবেরি ফোন উৎপাদন ও  বিক্রির বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হয়  টিসিএলের পাশাপাশি ভারতের দিল্লিকেন্দ্রিক অপ্টিমাস নামে একটি চুক্তিভিত্তিক ডিভাইস নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সফটওয়্যার লাইসেন্স, সেবা, অ্যান্ড্রয়েডচালিত ফোন তৈরির জন্য পৃথক আরেকটি চুক্তি করেছিল ব্ল্যাকবেরি। ভারতে অপ্টিমাস ব্ল্যাকবেরি ফোন উৎপাদন এবং বিক্রি অব্যাহত রাখছিলতবে অপ্টিমাস বাংলাদেশ ও ভারতসহ কয়েকটি বাজারে ব্ল্যাকবেরির ব্র্যান্ড লাইসেন্স ব্যবহারের সুবিধা পেলেও টিসিএল বৈশ্বিক বাজারের জন্য ব্ল্যাকবেরির ব্র্যান্ড লাইসেন্স 
ব্যবহার ও ব্র্যান্ডটির ফোন সরবরাহে অনুমোদিত ছিল। ২০২০ সালে টিসিএল ব্ল্যাকবেরি ফোন তৈরি করা বন্ধ করে দেয়। ব্ল্যাকবেরির কাছ থেকে ব্র্যান্ড লাইসেন্স কেনা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও ২০১৮ সালের অক্টোবরের পর এ ব্র্যান্ডের কোনো ফোন আনেনি। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসভিত্তিক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান অনওয়ার্ড মবিলিটি জানায়, তারা ২০২১ সালে ৫জি সুবিধার ব্ল্যাকবেরি ফোন আনবে। কিন্তু তা আলোর মুখ দেখেনি।

কফিনে শেষ পেরেক
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ব্ল্যাকবেরি কর্তৃপক্ষ অপারেটিং সিস্টেম থেকে তাদের সব ধরনের সমর্থন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। কিন্তু ব্ল্যাকবেরি ভক্ত গ্রাহক ও সহযোগীদের ধন্যবাদ জানানোর সুযোগ হিসেবে আরও কিছুদিন সফটওয়্যার হালনাগাদ করার সুবিধা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। সেই সুবিধা ৪ জানুয়ারি থেকে বন্ধ হয়ে গেছে। অবশ্য ব্ল্যাকবেরি ব্র্যান্ডের যেসব ফোনে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম চলছে, সেগুলো ঠিকঠাকমতোই চলবে। কেবল ব্ল্যাকবেরি ওএসচালিত ফোন ব্যবহারকারী সমস্যায় পড়তে যাচ্ছেন। ব্ল্যাকবেরি তাদের ওয়েবসাইটে ঘোষণা দিয়ে বলেছে, ৪ জানুয়ারি থেকে ব্ল্যাকবেরি ৭.১ ওএস বা এর আগের সংস্করণ, ব্ল্যাকবেরি ১০ সফটওয়্যার, ব্ল্যাকবেরি প্লেবুক ওএস ২.১ বা তার আগের সংস্করণ আর ঠিকমতো কাজ করবে না। এর অর্থ হচ্ছে ব্ল্যাকবেরি ফোনে আর ইন্টারনেট ব্যবহার করা যাবে না। এ ছাড়া ফোন করা, বার্তা পাঠানো বা জরুরি প্রয়োজনীয় নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করার সুবিধা থাকবে না। এর অর্থ পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়বে ব্ল্যাকবেরি ফোন।

প্রযুক্তি
আরো পড়ুন