সেন্ট অ্যাংলো: রক্তক্ষয়ী যে দুর্গের অবরোধে থেমে যায় অটোমানরা
আন্তর্জাতিক
সেন্ট অ্যাংলো: রক্তক্ষয়ী যে দুর্গের অবরোধে থেমে যায় অটোমানরা
অটোমান সাম্রাজ্য বা উসমানীয় খেলাফতের সবচেয়ে প্রভাবশালী শাসক ছিলেন সুলতান সুলেমান। ইতিহাসে তাকে সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট নামেও উল্লেখ করা হয়। তার আমলেই সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী ছিল উসমানী খেলাফত। তবে তাকে নিয়েও আলোচনা-সমালোচনার কমতি নেই। অসংখ্য যুদ্ধ ও এলাকা জয় যেমন তাকে খ্যাতি এনে দিয়েছে, তেমনি বিদ্রোহ দমনে তার কঠোরতা তার হাতকে রক্তাক্ত করেছে। এক্ষেত্রে বাদ পড়েনি তার নিজের সন্তানও। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে লেখা আছে মাল্টা অবরোধ। রক্তাক্ত সেই অবরোধে ব্যর্থ হয়ে অসংখ্য সেনা হারিয়ে বাড়ি ফেরে সুলেমানের বাহিনী। ইতিহাসের সেই রক্তাক্ত অধ্যায় নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন। ১৫৬৫ সালে বিশাল নৌবহর নিয়ে মাল্টা দ্বীপ দখলে এগিয়ে যায়। দ্বীপটির দায়িত্বে ছিল ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের বিশেষ বাহিনী ‘নাইট হসপিটালার’। নাইটরা রোড আইল্যান্ডে অটোমানদের হাতে পরাজিত হয়ে এখানে নিজেদের হেডকোয়ার্টার বসায়। ১৮ মে থেকে ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ পর্যন্ত প্রায় চার মাস অবরোধ চলে। ১৫৫১ সালে অটোমানরা প্রথম মাল্টা দখলে নেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। এরপর ৯১৬৫ সালে সুলতান সুলেমান ফের মাল্টা দখলে নেয়ার চেষ্টা চালান। প্রায় ৪০ হাজার সেনা ও ৩০০ জাহাজ নিয়ে মাল্টা অবরোধ করেন সুলতান সুলেমান। কিন্তু মাত্র ৭০০ নাইট ও ৮ হাজার স্থানীয় সেনাদের হাতে শোচনীয় পরাজয় ঘটে অটোমানদের। 
মানচিত্রে মাল্টা ও তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্য, ছবি: বিবিসি
মানচিত্রে মাল্টা ও তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্য, ছবি: বিবিসি
নাইটদের এই বিজয় ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপের সবচেয়ে আলোচিত সামরিক ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি হয়ে উঠেছিল। ফ্রেঞ্চ সাহিত্যিক ভলতেয়ারের বলেছেন, ‘মাল্টা অবরোধের চেয়ে অতি পরিচিত আর কিছুই জানা নেই।’ এটা ছিল তৎকালীন দুই পরাশক্তির শক্তি পরীক্ষার লড়াই। একদিকে ছিল সম্মিলিত খ্রিস্টান বাহিনী অপরদিকে অপরাজেয় ওসমানী বাহিনী। তবে এই যুদ্ধের পর ইউরোপে অটোমানদের অপরাজেয় ধারণাটি ভেঙে পড়ে।  
রক্তাক্ত অবরোধ শুরু
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
১৫৬৫ সালের ১৮ মে ভোরবেলা আক্রমণ শুরু হয়। যা মাল্টা অবরোধ নামে পরিচিত হয়, যখন অটোমান জাহাজের বহর মারসাক্সলোক বন্দর অবরোধ করে। অটোমান সাম্রাজ্যের হাত থেকে দ্বীপটিকে রক্ষার জন্য জিন প্যারিসোট ডি ভ্যালেটের নেতৃত্বে মাল্টার নাইটরা প্রতিরোধ করছিল। আক্রমণের প্রথম স্থানটি ছিল ফোর্ট সেন্ট এমলো দ্বীপ, যেটিকে একটি সহজ লক্ষ্য বলে মনে করে তুর্কিরা আক্রমণ করেছিল। এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুব কম থাকা সত্ত্বেও, দুর্গটি দখল করতে প্রায় চার সপ্তাহের বেশি সময় লেগেছিল এবং এতে প্রায় আট হাজার তুর্কি সৈন্য নিহত হয়েছিল। হতাশ হয়ে অটোমানরা বিরগু এবং ইসলা দ্বীপ আক্রমণ শুরু করে – কিন্তু প্রতিবারই তারা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রার প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। শেষ পর্যন্ত অটোমান সাম্রাজ্য পরাজিত হয়েছিল এবং মাল্টা বিজয়ী হয়েছিল। সেন্ট এলমো দ্বীপ দখলে নেয়ার সময় তুর্কি কমান্ডার তুরগুত মারাত্মকভাবে আহত হন। তার সহ-অধিনায়ক, মোস্তফা পাশার অধীনে অটোমান সেনারা প্রাণপণে লড়তে থাকেন। 
অপ্রতিরোধ্য সেন্ট অ্যাংলো দুর্গ
সেন্ট অ্যাংলো দুর্গের বর্তমান অবস্থা, ছবি: ইন্টারনেট
সেন্ট অ্যাংলো দুর্গের বর্তমান অবস্থা, ছবি: ইন্টারনেট
১৫৫১ সালে প্রথম অটোমানদের প্রথম মাল্টা আক্রমণের পরের বছরই আরেকটি হামলার আশঙ্কায় ছিল খ্রিস্টান সাম্রাজ্য। ভূমধ্যসাগরে নাইটদের ঘুম হারাম করে দেয়া অটোমান এডমিরাল তুরগুত এবং এডমিরাল সিনার মাল্টা দ্বীপ দ্রুত দখলে নিতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছর অটোমানরা আর এদিকে আক্রমণ চালাতে আসেনি বিধায় সেন্ট অ্যাংলো দূর্গের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার সুযোগ পায় নাইটরা। ওদিকে দ্রুত আক্রমণ চালানোর পরিবর্তে বিশাল বাহিনী গড়ার দিকে মনোযোগ দেয়া সুলতান সুলেমান প্রায় পাঁচ বছর পর শক্তিশালী নৌবহর প্রেরণ করেন। তবে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
নাইটরা অপ্রতিরোধ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে সেন্ট অ্যাংলো দুর্গে। যেই দেয়ালে মাথা ঠুকে ফিরে যেতে হয়েছে অটোমানদের। সেন্ট অ্যাংলো দূর্গের দেয়ালে ছিল অসংখ্য গোপন কামান। আর তাই সেখনে অবস্থান নেয়ার পূর্বেই অটোমান সেনাদের উপর হামলা চালাতে শুরু করে নাইটরা। এছাড়া দূর্গকে শীতল রাখতে ও আগুন নেভাতে বিশেষ ব্যবস্থা ছিল সেখানে। কামান স্থানান্তরের জন্যও দূর্গের অভ্যন্তরে গোপন পথ ছিল। ফলে, তুর্কিদের আক্রমণ তেমন কোনো ক্ষতিই করতে পারেনি সেন্ট অ্যাংলো দুর্গের। বরং, নাইটদের সুনির্দিষ্ট আঘাতে একের পর এক অটোমান জাহাজের সলিল সমাধি হয় ভূমধ্যসাগরে। 
যুদ্ধের ফলাফল ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব
দুর্গের গোপন কামানের আঘাতে ধ্বংস অটোমানদের ওয়াচটাওয়ার, ছবি: ইন্টারনেট
দুর্গের গোপন কামানের আঘাতে ধ্বংস অটোমানদের ওয়াচটাওয়ার, ছবি: ইন্টারনেট
এই যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। কারও মতে ৩৫ হাজার তুর্কি সেনার মৃত্যু হয়। কারও মতে, ৩০ হাজার এবং অন্যান্য বেশ কিছু সূত্র প্রায় ২৫ হাজার অটোমান সেনার মৃত্যুর খবর দিয়েছে। নাইটরা তাদের সংখ্যার এক তৃতীয়াংশ হারিয়েছে এবং মাল্টার অধিকাংশ সেনা নিহত হয়। গ্রীষ্মে চার মাসের তীব্র গরম আর অবরোধ সহ্য করে সফলভাবে অটোমানদের আটকে রাখতে সক্ষম হয় সম্মিলিত খ্রিস্টান বাহিনী। এই যুদ্ধে অটোমানদের পরাজয় ইউরোপে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। এরপর মাত্র ছয় বছরের মধ্যে লেপান্তোর যুদ্ধে অটোমানদের হারিয়ে পুরো ভূমধ্যসাগরের নিয়ন্ত্রণ নেয় নাইটরা।  
সূত্র: 
https://www.bbc.com/reel/video/p0c40rwc/the-fortress-at-the-heart-of-bloodiest-siege-in-history-
https://www.visitmalta.com/en/a/great-siege-1565/
https://www.historyhit.com/a-turning-point-for-europe-the-siege-of-malta-1565/
আন্তর্জাতিকতুরস্ক
আরো পড়ুন