সাংবাদিক শিরিন আবু আকলা: যুদ্ধ ও শান্তির সুপরিচিত এক কণ্ঠস্বর
আন্তর্জাতিক
সাংবাদিক শিরিন আবু আকলা: যুদ্ধ ও শান্তির সুপরিচিত এক কণ্ঠস্বর
শিরিন আবু আকলা, ছবি: বিবিসি
শিরিন আবু আকলা, ছবি: বিবিসি
ইসরাইলি পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন সাংবাদিক শিরিন আবু আকলা আরব বিশ্বের এক সুপরিচিত নাম। ওই অঞ্চল এবং পৃথিবীর অন্যত্রও তার শান্ত ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্বকে সবাই সমীহ করতো। ১৯৯৭ সালে তিনি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরায় যোগ দেন প্রতিষ্ঠানটি চালু হওয়ার এক বছর পরই। ঘর-বাড়ি, মাঠ-ঘাট, ফিলিস্তিনিদের উদ্বাস্তু ক্যাম্পগুলোতে তার উপস্থিতি নতুন সংবাদ সংস্থা আল-জাজিরা নেটওয়ার্ককে ২৪ ঘণ্টার আরবি ভাষায় প্রচারিত চ্যানেলে রুপান্তরিত করে। আরব বিশ্বের বর্তমান প্রজন্মের যে নারীরা সাংবাদিকতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন তাদের প্রেরণার বাতিঘর ছিলেন শিরিন আবু আকলা। তিনিই আরব বিশ্বের প্রথম নারী প্রতিনিধি- যাকে সরাসরি টেলিভিশনে দেখা গেছে।
শোকাচ্ছন্ন সহকর্মীদের অনুভূতি
বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট গায়ে শিরিন, ছবি: ইন্টারনেট
বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট গায়ে শিরিন, ছবি: ইন্টারনেট
তার সহকর্মী ও বন্ধু ডালিয়া হাতুকা বলেন, আহ! কী মর্মান্তিক সংবাদ! আমি এবং কোটি কোটি মানুষ বছরের পর বছর ধরে শিরিনের রিপোর্টিং দেখেছি। অনেক আরব মেয়েরাই বেড়ে উঠেছে আয়নার সামনে চিরুনি ধরে শিরিনের মতো রিপোর্টিং করার অভিনয় করতে করতে। আল-জাজিরায় শিরিন আবু আকলার আরেক সহকর্মী লিনাহ আল সাফফিন বলেন, আবু আকলা তার সাংবাদিকতা দিয়ে ইসরাইলি বাহিনীর উপরও চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। ইসরাইলি সৈন্যরা তার প্রতিবেদনের সময় হ্যান্ড মাইকে চিৎকার করতো, ভেংচি কাটতো, টিভির মাইক ছিনিয়ে নিতো। ২০ বছর আগে ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিন রিফিউজি ক্যাম্পে ইসরাইলি বাহিনীর আক্রমণের সংবাদ প্রচার করে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন। আজ সেই একই শহরে ইসরাইলিদের হামলার সংবাদ প্রচার করতে গিয়ে তিনি নিজেই হয়ে গেলেন সবচেয়ে বড় সংবাদ। 
শিরিনের কফিনের পাশে শোকাহত সহকর্মীরা, ছবি: ইন্টারনেট
শিরিনের কফিনের পাশে শোকাহত সহকর্মীরা, ছবি: ইন্টারনেট
তার নিথর দেহে তখনও সাদা অক্ষরে ‘প্রেস’ বা সাংবাদিক লেখা নীল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটটি জড়ানো, হাসপাতালের স্ট্রেচারে তার চারপাশে জড়ো হওয়া বেদনায় জর্জরিত সহকর্মীদের ছবিগুলো দেখে বিশ্বব্যাপী নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কেউ যেন এই সংবাদ বিশ্বাসই করতে পারছে না। তার কাঠের কফিনটি স্বরণ করিয়ে দিচ্ছে, ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলি হামলার সংবাদ প্রচার করতে গিয়ে কত সাংবাদিকের রক্ত ঝরেছে, কত সাংবাদিক জীবন দিয়েছে।
শহীদ শিরিন আবু আকলা
শিরিনের ছবি হাতে বিক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনিরা, ছবি: ইন্টারনেট
শিরিনের ছবি হাতে বিক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনিরা, ছবি: ইন্টারনেট
সদা হাস্যজ্জ্বল শিরিন আবু আকলাকে নিয়ে আরবের বিখ্যাত সাংবাদিক এবং লেখক মারওয়ান বিশারা বলেছেন, তিনি এমন মানুষ ছিলেন যিনি সবচেয়ে কঠিন এবং রক্তাক্ত পরিস্থিতিতেও শান্ত ও স্বাভাবিক থেকে সংবাদ সংগ্রহ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি আর নেই, এই কথাটাই আমি ভাবতে পারছি না। যখনই কোনো ঘটনা ঘটতো সাথে সাথে তিনি সেখানে পৌঁছে যেতেন। এখন আর তিনি আসবেন না। বিশ্বস্ততার সাথে তিনি যে সংবাদগুলো প্রচার করেছিলেন সেগুলো চিরদিন থেকে যাবে। সংবাদ মাধ্যমে তার অনুপস্থিতি মানুষকে ব্যথিত করবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ও মুক্ত-স্বাধীন মানুষরা তাকে একজন ‘শহীদ’ উপাধি দিয়েছেন। পশ্চিম তীরের রামাল্লায় ইতোমধ্যে তার ছবি সম্বলিত একটি বিলবোর্ড টানানো হয়েছে। তবে সারা জীবন তিনি কেবল একটি উপাধিই পেয়েছেন, আর তা হচ্ছে ‘সাংবাদিক’। এদিকে  শিরিন আবু আকলার শাহাদাতের ঘটনায় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা গেছে। তার ছবি হাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু হয়েছে ফিলিস্তিনে। 
সূত্র: বিবিসি
আন্তর্জাতিকবিশেষ প্রতিবেদনইসরাইলফিলিস্তিন
আরো পড়ুন