Link copied.
ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মৃত্যুকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব কিনা?
writer
অনুসরণকারী
cover
ইউভাল নোয়াহ হারারী
ব্যাটার ফ্লাই ইফেক্ট থেকে আমরা জানি যে, পৃথিবীর কোনো বস্তুর ভবিষ্যৎ বলে দেয়া সম্ভব না। আমরা যেটা করতে পারি সেটা হচ্ছে অনেক গুলো সম্ভাবনা জানাতে পারি, যেগুলো ঘটার সম্ভাবনা প্রবল। ইউভাল নোয়াহ হারারী একজন ইতিহাসবিদ, যিনি মানুষ জাতির বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে কাজ করছেন, তার বই Sapiens: A Brief History of Humankind এ তিনি মানবজাতির বিভিন্ন ধাপের প্রেক্ষিতে একবিংশ শতাব্দির এজেন্ডা ঠিক কী হবে সেটা জানানোর চেষ্টা করেছেন। ড্যানিয়াল কাহেনম্যান যিনি অর্থনীতিতে একজন নোবেল ল্যরিয়েট। তারা দুইজন সেই বইটা নিয়ে একটি চমৎকার আলোচনায় বসেন। সেই আলোচোনায় পৃথিবীর ভবিষ্যৎ দর্শন, আর্থ সামাজিক অবস্থা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেন। আলোচনার চুম্বক অংশ নিয়েই আজকের আয়োজন। চলুন শুরু করা যাক।
ভবিষ্যতে ঠিক কী ঘটবে সেটা নির্ধারণ করা বা বলে দেয়া সম্ভব না। কিন্তু সম্ভাব্য কী কী ঘটতে পারে, সেটা বলে দেয়া যায়। ইতিহাসবিদ হ্যারারী সেটাই বলছেন যে আমরা আসলে সম্ভাব্য জিনিস গুলো একসাথে করে সেটাকে যদি আরো ছোট করে ফেলি, সেখান থেকে আমরা খুব ভালোভাবে অনুমান করতে পারি যে ভবিষ্যৎ কী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। তিনি বলেন যে, যদি আপনি মনে করেন যে দুই দিন বৃষ্টি হয়েছে, তাহলে পরের দিন ও বৃষ্টি হবে, সেটা ঝুম বৃষ্টি, না ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি সেটা জানেন না, কিন্তু বৃষ্টি হতে পারে, সেরকম ভাবেও আপনি, অর্থনীতি, চিকিৎসা খাত, সামরিক বাহিনীর অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করে, সম্ভাব্য কারণ গুলো বের করতে পারেন।
কাহেনম্যান তার কাছে প্রশ্ন রাখেন যে, “এই সম্ভাব্য ঘটনা গুলো কিভাবে মানুষের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই বিষয়ে আপনার কোনো বিশ্লেষণ আছে?”

হ্যারেরী এই প্রশ্নের একটি চমৎকার উত্তর দিয়েছেন, তিনি মেডিসিন তথা চিকিৎসা সেবার উদাহরণ টেনে বলেব, ১৮ শতকে বা ১৯ শতকের চিকিৎসা সেবা ছিলো, অসুস্থকে সেবা দিয়ে সাধারণ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। বিংশ শতাব্দিতে এসে মেডিসিনের এখন লক্ষ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে এই “সাধারণ” অবস্থাকে কিভাবে আরো উপরে নিয়ে যাওয়া যায় সেটা নিয়ে কাজ করা। দুটো লক্ষ্য কিন্তু একদম আলাদা। এই ভিন্নতার ফলে যেটা তৈরী হবে, সেটা হচ্ছে ধনী এবং গরীবের মধ্যে আরো বিশাল বৈষম্য।

তিনি বলেন যতদিন যাচ্ছে চিকিৎসা সেবার মূল্য বাড়ছে, যতোই আপনি টিকা কার্যক্রম চালান, যতই আপনি স্বাস্থ্য সুরক্ষা সবার অধিকার বলে বেড়ান, একবিংশ শতাব্দির শেষের দিকে, ধনী গরীবের এই বায়োলজিক্যাল গ্যাপ আরো বাড়বে। তিনি মনে করেন দুইশ বছর আগে মানুষ সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতিতে যেই ভূমিকা রাখতে পারতো, একবিংশ শতাব্দিতে এসে তার সেই মূল্যটা অনেক কমে গেছে, যার জন্য এলিট শ্রেণি আরো এলিট হচ্ছে আর গরীবরা গরীব হচ্ছে।
cover
ড্যানিয়েল কাহেনম্যান
“আপনি যেটার কথা বলছেন সেটা এখন দৃশ্যমান। আপনি কি তাহলে এটা বলতে চাচ্ছেন যে এই লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্য হচ্ছে মৃত্যুকে যথা সম্ভব পার করে যাওয়া?” প্রশ্ন রেখেছিলেন কাহেনম্যান

হ্যারেরী বলেন যে পূর্বের মানুষ মনে করতো যে, মৃত্যুর দেবতা আসতো তাদের জান নেয়ার জন্য, তারা সেরকম ভাবেই প্রস্তুতি নিতো। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে আমরা দেখি যে বুড়ো বয়সে অথবা বিভিন্ন রোগ শোকে যে মানুষ মারা যাচ্ছে, সেগুলো আসলে “টেকনিক্যাল প্রবলেম”। আমি মনে করি এই টেকনিক্যাল প্রবলেম গুলোর একটি টেকনিক্যাল সলিউশন আছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান সেই সলিউশনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। যখন তারা সেই সমাধান গুলো পেয়ে যাবে, তারা মৃত্যুকে অমোঘ নিয়ম থেকে হয়তো বের করে আনতে পারবে। 
কাহেনম্যান: Death is optional.

হ্যারেরী: “হ্যাঁ মৃত্যু অনিবার্য নয়। আপনি যদি গরীবের দিক থেকে দেখেন, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কারণ ইতিহাস দেখায় যে মৃত্য সবসময়েই একটি বড় ভারসাম্য তৈরী করে এসেছে। দরিদ্র শ্রেণী মনে করতো, যে বড়লোকরা যতই টাকা কামাক না কেনো, দিন শেষে তারাও মারা যাবে, আমরাও মারা যাবো। কিন্তু আজ থেকে ৫০-১০০ বছর পর আপনি এমন একটা পৃথিবীর কথা চিন্তা করুন যেখানে, দরিদ্ররা মারা যাচ্ছে, কিন্তু ধনী শ্রেণীরা টাকা জোরে, নিজের মৃত্যুকে বারবার ফাঁকি দিচ্ছে। এই বিষয়টা কিন্তু সেই পৃথিবীতে বিশাল ক্রোধের উদ্রেক করবে।“
cover
“আপনি যে তখন বললেন, “মানুষের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন কমছে” সেই বিষয়টা একটু বিস্তারিত বললে ভালো হয়। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কথা যদি ধরি, কম্পিউটার কি মানুষের জায়গা কখনো নিতে পারবে?”
কাহেনম্যান প্রশ্ন রাখেন। 

প্রযুক্তি এবং মানুষের মধ্যকার প্রধান পার্থক্য হলো মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা আছে, যেটা প্রযুক্তির নেই। সেজন্য তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি এখনো মানুষের জায়গা থেকে অনেক পিছনে রয়েছে। তবে সমস্যা টা অন্য জায়গায়, রাজনীতি, অর্থনীতি, সামরিক কাঠামো গুলোতে, চিন্তা চেতনার চেয়ে বুদ্ধিভিত্তিক প্রখরতা বেশী প্রয়োজন। এজন্য সেসকল জায়গায় প্রযুক্তি খুব দ্রুত জায়গা নিচ্ছে মানুষের। মানুষ এখন প্রত্যেক নির্দিষ্ট কাজের জন্য নির্দিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এজন্য সকল কাজে মানুষের প্রয়োজনীয়তা কমে যাচ্ছে। 
এতক্ষণের আলাপচারিতা পড়ে পাঠকদের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন আসবে যে, তাহলে এতো অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত মানুষ গুলোর কী হবে। হ্যারারী যে পৃথিবীর ধারণা দিচ্ছেন সেখানে মৃত্যুকে পরাস্ত করতে পারবে মানুষ, একই সাথে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ভাবে মূল্যহীন হয়ে যাবে। সে পৃথিবীটায় আসলে কি হবে তখন। হারারী বলছেন যে তখনকার সামাজিক অবস্থাটা খুব বেশী অস্থির হবে, শিল্প বিপ্লব হওয়ার পর পৃথিবীতে যে শান্তির অবস্থা শুরু হয়েছে, ধর্ম জাতিগত বিদ্বেষ এর প্রভাব কমতে শুরু করেছে। একবিংশ শতাব্দিতে সেই বিদ্বেষ গুলো আবার বাড়তে শুরু করবে।

হ্যারেরী মনে করেন যে, খাবার নিয়ে হয়তো খুব বেশী সমস্যা হবে না। তখন প্রযুক্তি এতোটাই এগিয়ে থাকবে যে সেদিক দিয়ে সমস্যা হবে না। সমস্যা হবে মানুষের একাকিত্ব নিয়ে, মানুষ বিষণ্ণ হয়ে পড়বে। এই একাকিত্ব কাটানোর জন্য মানুষ হয়তো মাদকের আশ্রয় নিতে পারে, সেটা হতে পারে কম্পিউটার গেমস অথবা বৈধ অবৈধ মাদকদ্রব্য নিয়ে।

তিনি আশংকা করেন যে, ঐ পৃথিবীর সামাজিক অবস্থা শিল্প বিপ্লবের ঠিক আগমুহুর্তের সামাজিক অবস্থার মতো হতে পারে। শিল্প বিপ্লব যখন শুরু হয়, তখন সমাজে একটি Urban Proletariat শ্রেণি গড়ে ওঠে, যারা বেশ সমস্যার সৃষ্টি করে পরবর্তীতে। সমাজের গঠনগত এই পরিবর্তন বা সমস্যা গুলোর উত্তর খোঁজার জন্য মানুষ ধর্মীয় গ্রন্থ গুলোর কাছে ফিরে গিয়েছিল। তাদের বিশ্বাস ছিলো সেখানে তারা এই সমস্যা গুলোর উত্তর পাবে। সারা পৃথিবীতে ধর্মীয় মূল্যবোধের উত্থান ঘটেছিলো তখন। উদাহরন স্বরূপ তিনি সুদানের ঘটনা বলেন যেখানে ১৮৮৪ সালে মুহম্মদ আহমদ নামের একজন ধর্মীয় নেতা নিজেকে ইমাম মাহাদী বলে দাবী করেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। তিনি অটোমান মিশরীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, এবং খার্তুম শহর দখল করেন। তিনি ব্রিটিশ  মেজর জেনারেল চার্লস গর্ডনকে পরাস্ত করে হত্যা করেন, সাধারণ জনগণের উপরেও দমন পীড়ন চালান। বর্তমান বিশ্বে আই এস যেরকম ইসলামী খেলাফত দাবী করে সাধারণ মুসলিমদের হত্যা করেছে। আসল কথা হচ্ছে এই আই এস বা সেই কথিত ইমাম মাহাদীকে কেউ মনে রাখে নাই এবং রাখবে না, কারণ তারা ধর্মীয় যেই অপব্যাখ্যা গুলো দিয়ে স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিলো, সেগুলো কাজ করে নাই।  
cover
হারারী চিনার “তাইপিং বিদ্রোহ” নিয়েও আলোকপাত করেন। এই বিদ্রোহ উনিশ শতকের চীনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ছিলো। হং উই কুয়ান নামের এক দার্শনিক নিজেকে যীশু খ্রীস্টের ছোট ভাই হিসেবে নিজেকে দাবী করেন। তিনি বলেছিলেন যে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে পৃথিবীতে স্বর্গ প্রতিষ্ঠা করা। তিনি সেই স্বর্গ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন তো নাই, তার উপর প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষ তার এই উদ্দেশ্যর জন্য প্রাণ হারায়। 
cover
এতো গেলো শিল্প বিপ্লব কালীন পৃথিবীর অবস্থা, একবিংশ শতাব্দির পৃথিবীতেও কী ধর্ম সেভাবে প্রভাব রাখতে পারবে!! হ্যারেরী বলছেন যে, ধর্ম ঠিক সেরকম প্রভাব না রাখতে পারলেও তখন প্রভাব রাখবে প্রযুক্তি। শিল্প বিপ্লবের মত আমরা প্রযুক্তি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছি। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন সিলিকন ভ্যালী সেই গুরুত্ব পাবে। সেই পৃথিবীর সিলিকন ভ্যালীর পেছনের লোকগুলো নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করবে। বিশ্ব সেগুলো নিয়েই উন্মাদ হয়ে থাকবে। তিনি বলেন,
সিলিকন ভ্যালি থেকে আসা মতবাদ গুলো পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করবে। সিরিয়া ,ইরাক, নাইজেরিয়া থেকে আসা বিশ্বাস গুলো না।
আলোচকঃ
ইউভাল নোয়াহ হ্যারেরী,
প্রভাষক,ইতিহাস বিভাগ,
হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়, জেরুজালেম

ড্যানিয়েল ক্যাহেনম্যান
এমিরেটাস অধ্যাপক , মনোবিজ্ঞান,
নোবেল বিজয়াই অর্থনীতিবিদ।
পুরো সাক্ষাৎকারের লিংক
https://www.edge.org/conversation/yuval_noah_harari-daniel_kahneman-death-is-optional?fbclid=IwAR0agogOWFvA61Ud4Sllude6jF_e40LY_c1f0T8KBuXs25JBW9MLtrepz70

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021