Link copied.
কখন বুঝবেন আপনি ভয়ঙ্কর ‘বাইপোলার ডিসঅর্ডার’ রোগে আক্রান্ত?
writer
অনুসরণকারী
cover
২০১৩ সালের ১৩ জানুয়ারীতে মার্কিন যুক্ত্ররাষ্ট্রের লস এঞ্জেলেসের হোটেল থেকে হারিয়ে যায় চাইনিজ বংশদ্ভুত কানাডিয়ান নাগরিক এলিসা ল্যাম। সেটার প্রায় ১৯ দিন পর তার লাশ সেই হোটেলের টাংকি থেকে পাওয়া যায়। পুলিশ সূত্র হিসেবে সিসি ক্যামেরায় তার অদ্ভুত আচরণ সংবলিত একটি ভিডিও পায় যেখানে দেখা যায় সে কারো থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রথমে এটাকে হত্যাকান্ড মনে করা হলেও, ময়নাতদন্তে শুধুমাত্র দুর্ঘটনাবশত পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে মৃত্যু হয় বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে জানা যায় তিনি বাইপোলার ডিসঅর্ডার এ আক্রান্ত ছিলেন, এবং বেড়ানোর সময় ওষুধ নেয়া বন্ধ করেছিলেন, যার কারণে তার হ্যালুসিনেশন তথা মতিভ্রম হয়। এই কারণে সে এমন কিছু কল্পনা করে, যেগুলোর কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। এবং সে নিজেই পানিতে ঝাপ দেয় এবং আটকে পড়ে মারা যায়। আজকের এই আয়োজন এই বাই পোলার ডিসঅর্ডার নিয়ে। এর তীব্রতা কতটা মারাত্নক হতে পারে সেগুলোই জানবো আজকে।
cover
বাইপোলার ডিসঅর্ডার কী?
বাইপোলার মানে হচ্ছে দুটো ধাপ, অর্থাৎ আপনার মনস্ততাত্ত্বিক চিন্তা চেতনা দুটো মেরুতে থাকতে পারে, হয় খুব উচু বা খুব নিচুতে। যখন একটি মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রম, চিন্তা চেতনায়, প্রতিনিয়ত একরকম নাটকীয় উত্থান পতন চলতে থাকে। অর্থাৎ মুড সুয়িং টা খুব বেশি হয়ে যায়। তখন সেই সমস্যাটাকে মনোবিজ্ঞানীরা বাইপোলার ডিসঅর্ডার বলে চিহ্নিত করেন। এই রোগকে আগে ম্যানিক ডিপ্রশন বলে অভিহিত করা হতো। পরবর্তীতে রোগটির ব্যাপকতা এবং তীব্রতা বিশ্লেষণ করে এই নাম দেয়া হয়। এই রোগটি ভালোভাবে বুঝতে গেলে আমাদের বেশ কয়েকটি বিষয় বেশ ভালোভাবে বুঝতে হবে। 
cover
ইউনিপোলার ডিপ্রেশন:

মুড সুয়িং যদি খুব বেশী সময় ধরে নিচের দিকে থাকে, অর্থাৎ একটি মানুষ যদি আশাহত এবং যেকোন কাজের জন্য নিরুৎসাহিত বোধ করে , খাওয়াদাওয়ায় অনীহা বা ঘুমের অভাবে থাকে, তাহলে সেটা ইউনিপোলার ডিপ্রেশন বলে, এই ডিপ্রেশন এক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত থাকতে পারে। William R Marchand তার “Mind fulness for Bipolar Disorder” বইটিতে এই ব্যাপারের কয়েকটি লক্ষণ সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন। সেগুলো হলো,
  •  বিষন্ন মন,
  • যে কোন কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
  • ওজন বেড়ে যাওয়া অথবা কমে যাওয়া।
  • ঘুম বেড়ে যাওয়া অথবা ইন্সোমেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়া
  • নিজেকে মূল্যহীন মনে করা অথবা অযথা অপরাধবোধে ভোগা।
  • যেকোন একটি বিষয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা। সিদ্ধ্বান্তহীনতায় ভোগা।
  • আত্নহত্যা প্রবণ চিন্তা ভাবনা করা।

cover
ম্যানিক এপিসোড

সেই মানুষই আবার হুট করে এমন অবস্থায় যায়, যখন সে প্রচন্ড প্রাণবন্ত হয়ে যায়, প্রচুর কথা বার্তা বলে। আপাতদৃষ্টিতে জিনিসগুলো ভালো মনে হলেও ব্যাপারটা মোটেও ভালো না। এই আপাত অবস্থাকে হাইপোম্যানিক অবস্থা বলা হয়ে থাকে। এরপরেই ম্যানিক স্টেজ শুরু হয় তখন এই ধরণের মানুষকে কিছু বোঝানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে, তাদের খামখেয়ালী আচরণে যেকোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে কয়েকটি লক্ষণ হচ্ছে, 
  • আত্নসম্মানবোধ বেড়ে যাওয়া, উৎসাহ বেড়ে যাওয়া।
  • ঘুমের প্রয়োজনীয়তা অনুভব কমে যায়।
  • প্রচুর কথা বলা,
  • চিন্তা ভাবনা করার গতি বেড়ে যাওয়া, স্বাভাবিক এর চেয়ে খুব দ্রুত চিন্তা করা শুরু করা
  • যে বিষয়ে চিন্তা করছে, সেখান থেকে খুব দ্রুতই সরে যাওয়া, অর্থাৎ কোনো চিন্তায় স্থির না থাকা,
  • হুট করে কোনো কাজ করবে বলে ঠিক করলে, সেটাই করা।
  • মাদকের প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত হয়ে যাওয়া। 
প্রকারভেদ
এটা তো গেলো বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মানসিক দুটি ধাপ, এবার জানবো এর সাব-টাইপ বা প্রকারভেদগুলো নিয়ে। এই মুড সুইংগুলো ঠিক কত সময় স্থায়ী থাকে বা এর প্রকোপ এর তীব্রতা ঠিক কতটা বেশী সেগুলো নিয়ে এই টাইপ গুলো ঠিক করা হয়।  
cover
বাইপোলার ১: 
যদি কোনো ব্যাক্তি ইউনিপোলার ডিপ্রেশন ধাপে দুই সপ্তাহ বা তার বেশী সময় থাকে, এবং তারপর ম্যানিক এপিসোডে কমপক্ষে এক সপ্তাহ থাকে তাহলে সেটাকে বাইপোলার ১ বলে চিহ্নিত করা হয়। এই ম্যানিক এপিসোড ৩ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত থাকতে পারে।

বাইপোলার ২: 
ইউনিপোলার ডিপ্রেশন যদি কমপক্ষে দুই সপ্তাহ বা তার বেশী সময় থাকে এবং তার পর যদি সেটা হাইপো ম্যানিক এপিসোডে চলে যায়। তাহলে সেটা বাইপোলার ২ টাইপে চিহ্নিত করা হয়। এই হাইপো ম্যানিক এপিসোডে কমপক্ষে চারদিন থাকতে হবে। হাইপোম্যানিক থেকে ম্যানিক এপিসোডে চলে গেলে সেটা আবার বাইপোলার ১ টাইপে চলে যাবে।

সাইক্লোথাইমিয়া: 
এই ধাপে একজন ব্যাক্তি মৃদু ইউনিপোলার ডিপ্রেশন এবং মৃদু হাইপো ম্যানিক এপিসোডের ভিতর ওঠা নামা করতে থাকে। অর্থাৎ তার মানসিক অবস্থা একবার নিচু আরেকবার উচু এমন অবস্থায় প্রায় দুই বছর থাকলে সেটাকে সাইক্লোথাইমিক ডিস অর্ডার বলে চিহ্নিত করা হয়।

cover
বাইপোলার ডিপ্রেসন কেনো হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর একদম সঠিক করে নির্ধারণ করতে পারেনি মনোবিজ্ঞানীরা। জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এটা হইতে পারে বলে মনে করলেও তার কোনো প্রমাণ পায় নি। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেখা গিয়েছে পরিবারের কোনো একজনের বাইপোলার ডিসঅর্ডার থাকলে বাকিদের সে রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ১০ গুণ বেড়ে যায়। অতিরিক্ত মাদক নেয়ার কারণেও বাইপোলার ডিসঅর্ডার হতে পারে। তবে সকল ধরণের মনোরোগের সূচনাই হয় হতাশা থেকে। বাইপোলার এ রোগীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা Anxity Disorder, Substances Abuse Disorder, ADHD সহ আরো কয়েকটি রোগে একই সাথে ভোগে। 
cover
উত্তরণের উপায়!
বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসা বেশ লম্বা সময়ের জন্য, অনেকে বলে থাকেন এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া সম্ভব না। নিজের মুড এর সাথে মানিয়ে চলা নীতির মাধ্যমেই মুক্তি হয়তো সম্ভব। চিকিৎসার একদম শুরুর দিকে কিছু ঔষধ ব্যবহার করে থাকেন মনোবিজ্ঞানীরা। যেগুলো বেশীর ভাগই মুড স্ট্যাবিলাইজার অর্থাৎ মস্তিষ্ককে শান্ত করে রাখা হয়। তিনধরণের মুড স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার করা হতে পারে যেগুলো হচ্ছে এন্টিকনভালস্যান্ট, এন্টিসাইকোটিকস এবং লিথিয়াম সল্ট। এন্টিকনভালস্যান্ট এর ওষুধ গুলোর মধ্যে ভ্যালপোরেট এবং ক্যারবামাজেপিইন ম্যানিক এপিসোড এর জন্য ব্যবহার করা হয়।

এন্টিসাইকোটিক্স এর সেকেন্ড জেনারেশন এর ঔষধ গুলো হ্যালুসিনেশনের জন্য ব্যবহার করা হয়। খুব বেশী ম্যানিক এপিসোড এর লক্ষণ থাকলে লিথিয়াম সল্ট ব্যবহার করা হয়। এটা তো গেলো ম্যানিক এপিসোডের জন্য, ইউনিপোলার ডিপ্রেশন এর সময় বিভিন্ন ধরণের এন্টি ডিপ্রেসেন্ট ব্যবহার করা হয়। তবে এখানে জেনে থাকে উচিত, দুটি এপিসোডের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা ঔষধে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে।


cover
ডিপ্রেশন পিরিয়ডের ক্ষেত্রে সাইকো থেরাপী যেমন কথা বলা, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট এর অনুশীলন, পরিবারের সাথে সময় কাটানো গুলো কাজে দিলেও, ম্যানিক এপিসোডে ঔষধ ব্যবহার করতেই হয়। তবে চিকিৎসকরা ঔষধ ব্যবহার ব্যতীত সাইকো থেরাপীর উপর জোর দেন সবসময়েই। মুড সুইং এবং হতাশা আমাদের সবার জীবনেই আছে। মুড সুইং হয় সাধারণত হরমোনাল কারণে, সেটার একটা বিশাল বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা আছে। হতাশা জীবনে আসে, না পাওয়ার আক্ষেপ থেকে। হতে পারে সেটা জীবনে অর্থ সম্পদ না পাওয়া, প্রেম ভালোবাসা না পাওয়া।

তবে বর্তমান সমাজে আমরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সবাই খুব সচেতন তারপরেও এই হতাশার প্রকোপ বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? খেয়াল করে দেখবেন এই প্রযুক্তি, প্রতিযোগিতার যুগে আমরা সব কিছু নিয়ে প্রতিযোগীতায় ব্যস্ত। এমনকি কে কার চেয়ে বড় হতাশ সেটা নিয়েও প্রতিযোগীতা চলছে। এই অসুস্থ প্রতিযোগীতার কারণেই হয়তো একটি মানুষ তার সহজ জীবনকে জটিল করে তুলছে। সেই জটিলতা থেকে বের হতে না পেরেই হয়তো এই সকল মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের সবারই আশপাশ এর সবার খেয়াল রাখা উচিত, বাইপোলার ডিসঅর্ডার কঠিন একটি রোগ, আপনার যদি মনে হয় আপনার চারপাশে কারো মাঝে উপরোক্ত লক্ষণ গুলো দেখা যাচ্ছে, দেরী না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। 
তথ্যসূত্র:
আরো বিস্তারিত জানতে এই বই দুটি পড়তে পারেন:
  • Manic-Depressive Illness_ Bipolar Disorders and Recurrent Depression- Frederick K. Goodwin, M.D. Kay Redfield Jamison, Ph.D.
Mind fulness for Bipolar Disorder-William R Marchand

এছাড়াও বাকি তথ্যগুলোর সূত্র
  • https://www.bbc.com/news/newsbeat-55994935
  • https://www.webmd.com/bipolar-disorder/mental-health-bipolar-disorder
  • https://www.youtube.com/results?search_query=bipolar+disorder
  • https://www.nimh.nih.gov/health/topics/bipolar-disorder/index.shtml

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021