Link copied.
জাপানের দুই স্বাধীন হাতঘড়ি নির্মাতার রোমাঞ্চকর গল্প
writer
অনুসরণকারী
cover
ঘড়ি মানব সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার। সময়কে পরিমাপ করার এই যন্ত্রটি কয়েক’শ বছর ধরে বিকশিত হয়ে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছে। সূর্যঘড়ি, বালু ঘড়ি থেকে হাত ঘড়ি হয়ে যাওয়ার এই রোমাঞ্চকর যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রেখেছে জাপান। বর্তমান বিশ্বখ্যাত অনেক গুলো ঘড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান যেমন, সেইকো, ওরিয়েন্ট, সিটিজেন সবগুলোই জাপানের। প্রাচীনকালে পুরো ঘড়িটাই হাতে বানানো হতো, যেকোন সূক্ষ্ণ কাজে জাপানের মানুষ সব সময়ই পারদর্শী ছিলো। প্রযুক্তি এগিয়ে যাওয়ার পরে সেই হাতের কাজের জায়গায় সার্কিট এসেছে, রোবট এসেছে। কিন্তু এখনো জাপানের কিছু জায়গায় সেই পুরোনো ঐতিহ্য মেনে কিছু মানুষ হাতে ঘড়ি বানানোর শিল্প টিকিয়ে রেখেছে।

আজকে আমরা জানবো দুইজন লোকের কথা, যারা শুধু মাত্র নিজের শখের বসে, একটি ঘড়ির বক্স থেকে শুরু করে, সম্পুর্ণ অংশ নিজ হাতে তৈরী করে। তাদেরকে বলা হয়ে থাকে “ইন্ডিপেন্ডেন্ট ওয়াচমেকার” তথা স্বাধীন ঘড়ি নির্মাতা। চলুন তার আগে ছোট করে একটু ঘড়ির বিবর্তনের ইতিহাস জানলে ত মন্দ হয় না।
খ্রিষ্টীয় ১৩ শতকে প্রথম মেকানিক্যাল ঘড়ি তৈরি শুরু হয়। মজার ব্যাপার হলো, এই ঘড়ির কোনো আগা মাথা ছিলো না। বিশাল যন্ত্রের এই ঘড়িগুলো শুধুমাত্র প্রতি ঘন্টায় বাজাতো। এই ঘড়ি বানিয়েছিলো ইংল্যান্ড। তারপর ইতালিতে ১৩’শ শতকের শুরুর দিকে এই রকমের আরো কয়েকটি ঘড়ি বানানো হয়। সেই ঘড়ি ছোট হয়ে আসতে আসতে দুই শতক লেগে যায়। ১৫৪০ সালে সুইস ঘড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি হয় এবং তারাই সর্বপ্রথম পকেট ওয়াচ তৈরী শুরু করে। প্রথম দিককার ঘড়িগুলোতে শুধু ঘন্টা দেখাতো।

১৬৮০ সালে সেখানে মিনিটের কাটা সংযোজিত হয়। তারপর বহন করার সুবাদে পকেট ওয়াচ থেকে রিস্ট ওয়াচে চলে আসে। ঘড়ির এই বিকাশ প্রায় পুরোটাই ইউরোপে হয়। ইউরোপের সাথে জাপানের বাণিজ্যিক সু সম্পর্ক থাকার কারণে জাপানে যখন ঘড়ি আসে। তারাও নিজেদের মতো সেই ঘড়ির প্রভূত উন্নয়সাধন করে। এজন্য আধুনিক ঘড়ি শিল্পে জাপানের অবস্থান অনেক উঁচুতে। 
cover
মাসাহিরো কিকুনো
১৯৮৩ সালের ৮ ই ফেব্রুয়ারী জাপানের হোক্যাইডো শহরে জন্মগ্রহণ করেন মাসাহিরো কিকুনো। ১৮ বছর বয়সে তিনি জাপানের মিলিটারি স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে ক্ষুদ্র অস্ত্র ডিজাইনের প্রশিক্ষণ পান, সেখানে তিনি একজন সিনিয়র অফিসারের সাথে পরিচিত হন যার ঘড়ি নিয়ে অনেক জানাশোনা ছিলো। মূলত সেখান থেকেই তিনি ঘড়ি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ পেয়ে যান। মিলিটারি কলেজ শেষে তিনি “হিকুনো মিযুনো কলেজ অফ জুয়েলারি” থেকে চার বছরের কোর্স সম্পন্ন করেন। কলেজটি জাপানে ফ্যাশন ডিজাইনের জন্য খ্যাত। কলেজে তিনি শিখেন কিভাবে ঘড়ি মেরামত করতে হয়। কিন্তু ঘড়ি নিজ হাতে বানানোর প্রক্রিয়াটা তিনি নিজে নিজেই শিখেন। এরপর তার প্রথম হাতে বানানো ঘড়িটা বানিয়ে ফেলেন।
cover
ঘড়িবিদ্যায় খুব “টার্বোবিলন” প্রযুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি আবিষ্কার ছিলো। ফ্রেঞ্চ ঘড়ি নির্মাতা আব্রাহাম লুইস এই প্রযুক্তিটা আবিষ্কার করেন। এই প্রযুক্তিটা হলো ঘড়ির পেন্ডুলাম এবং ব্যালেন্স অব হুইলের দক্ষতা ঠিক রাখা এবং অভিকর্ষজ বলের প্রভাবকে কমিয়ে দেয়া, যাতে ঘড়ি ঠিক সময় দেখায়। ম্যাসাহিরো কিকুনো সেই টার্বোবিলন প্রযুক্তি নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেন, এবং ২০১০ সালে তিনি তার প্রথম টার্বোবিলন ঘড়ি তৈরী করেন। প্রতিবছরে একটি করে ঘড়ি তিনি উৎপাদন করেন। সবচেয়ে কমবয়সে তিনি স্বাধীন ঘড়ি নির্মাতাদের সংগঠন Académie Horlogère Des Créateurs Indépendants এ যোগ দেয়ার গৌরব অর্জন করেন।

cover
cover
স্বভাবতই পাঠকদের মনে প্রশ্ন আসে ঘড়িগুলোর দাম তাহলে কত হতে পারে? চক্ষু চড়ক গাছে ওঠার মতোই দাম আছে ঘড়ি গুলোর। তার সাধারণ ঘড়ি গুলোর দাম তৈরী হয় ৫ মিলিয়ন ইয়েন দিয়ে। সেখানে তার টার্বোবিলন প্রযুক্তির ঘড়িটির দাম প্রায় ১০ মিলিয়ন ইয়েন। সম্প্রতি তার তৈরী স্যাকুব্যু ঘড়িটির দাম উঠেছে প্রেয় ১৮ মিলিয়ন ইয়েন।
cover
cover
হাজিমি আসাওকা
cover
হাজিমি আসাওকার জন্ম ১৯৬৫ সালে জাপানের কাগওয়া নামক জায়গায়। ১৯৯০ সালে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিজাইনের উপর গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। প্রোডাক্ট ডিজাইনার হিসেবে তিনি কখনোই চাইতেন না একটা কর্পোরেট মেশিন হয়ে যেতে। একজন্য ১৯৯২ সালে তিনি নিজের নামে একটা ফার্ম দেন। তিনি মুলত ফার্নিচার এবং ইলেক্ট্রিক এপ্লায়েন্সগুলো ডিজাইন করতেন। বিভিন্ন বিলাসদ্রব্যর খুটিনাটি নিয়ে আগ্রহ ছিলো তার। সেখান থেকেই তিনি ঘড়ি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ পান। কিন্তু কে শিখাবে তাকে? জর্জ ড্যানিয়েলের বই “ওয়াচমেকিং” থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা নেন। এই বই থেকে উপরের কিকুনো সাহেবও তার প্রাথমিক শিক্ষা সারেন। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে তিনি তার প্রথম ঘড়ি তৈরী করেন।
cover
cover
২০০৭ সালে তিনি তার প্রথম টার্বোবিলন ঘড়ি তৈরীর কাজ শুরু করেন, যেটা শেষ হয় ২০১১ সালে। এরপর তিনি তার দ্বিতীয় টার্ববিলন ঘড়ির কাজে হাত দেন, যেখানে তিনি ডুরালুমিন ব্যবহার করেন যাতে ঘড়ি অনেক হালকা থাকে। তার তৃটীয় টার্বোবিলনে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র বল্ বেয়ারিং ব্যবহার করেন। তার এই টার্বোবিলন ঘড়ি গুলোর দাম প্রায় ২ লাখ ইয়েন থেকে শুরু হয়। তার তৈরী বর্তমান ক্রোনোগ্রাফ ঘড়ি গুলোর দাম শুরু হয় ৪ লাখ ইয়েন থেকে অর্থাৎ প্রায় ৪ হাজার মার্কিন ডলার!। তিনিও প্রথিতযশা সংগঠন AHCI এর একজন সদস্য।
cover
এতো গেলো দুইজন স্বাধীন ঘড়ি নির্মাতার গল্প, জাপানে এরকম আরো কয়েকটি বিশেষায়িত ঘড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তারমধ্যে মিনেজ নামে একটি ব্রান্ড রয়েছে। এই মিনেজ আসলে একটি গ্রামের নাম, যেটি উত্তর জাপানের আকিতা অঞ্চলে অবস্থিত। 
cover
দুর্গম এই গ্রামের লোকেরা বিভিন্ন সূক্ষ্ণ যন্ত্রপাতির কাজের জন্য প্রসিদ্ধ অনেক আগে থেকেই। সেই গ্রামের নামেই কোম্পানী মিনেজ, ২০০৫ সালে তারা ঘড়ি উৎপাদনে যায়। তারা এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০০ ঘড়ি তৈরী করেছে। প্রত্যেকটা ঘড়িইই হাতে বানানো এবং সেগুলো পেছনে ৭০ জোন মানুষের পরিশ্রম রয়েছে। মিনেজ তার প্রতিটি ঘড়ির পলিশিং এবং ফিনিশিং এর জন্য বিখ্যাত। এজন্য তারা “সালাজ” নামের টেকনিক ব্যাবহার করে, যেটি সুইস ঘড়িগুলাতে পাওয়া যায় না।
cover
অর্থনীতিতে দ্রব্যকে বেশ কয়েকটা ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যেমন প্রয়োজনীয় দ্রব্য, বিলাসদ্রব্য। ঘড়ি আমাদের কাছে কোন ধরণের দ্রব্য তাহলে!? বর্তমানে মোবাইলের যুগে হাত ঘড়ির পড়ার চল অনেকটা কমে গেছে। তবে মানুষ শখের বসে অনেকেই পড়ে। দেড়শ টাকার ঘড়ি থেকে দেড় লক্ষ টাকার ঘড়ি পুরোটাই মানুষের সামর্থ্য এবং শখের উপর নির্ভরশীল। জাপানের সেই ঘড়ি নির্মাতারা সেই সৌখিনতার মূল্যই নিচ্ছেন। একটা ঘড়ি সম্পূর্ণ হাতে বানানো চাট্টিখানী কথা না। সুতরাং সেই ঘড়ির দাম লাখ খানেক টাকা হওয়া মোটেও অবাককরা বিষয় নয়। এখন মনে হতে পারে যে, যাদের ঘড়ির শখ আছে কিন্তু সামর্থ্য নেই, তারা কি করবেন! তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, ঘড়ি যেমনই হোক, আপনার সামর্থ্যে যে ধরণের ঘড়ি পোষায় সেগুলোই কিনুন, দেখবেন আস্তে আস্তে সকল শখ পূরণ হবে।
তথ্যসূত্র
  • https://watchesbysjx.com/2017/05/portrait-masahiro-kikuno-japanese-watchmaker.html
  • https://www.europastar.com/the-watch-files/watchmaking-in-japan/1004089726-what-about-japanese-independents.html
  • https://www.chrono24.com/magazine/faces-of-the-industry-hajime-asaoka-p_49225/#:~:text=
  • https://kuronotokyo.com/pages/kurono-chronograph-1
  • https://www.nytimes.com/2015/11/12/fashion/japanese-watchmaker-adapts-traditional-timepiece.html
  • https://cnaluxury.channelnewsasia.com/remarkableliving/japanese-watchmaker-masahiro-kikuno-


Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021