টেম্পেস্ট জেট: ভবিষ্যতের আকাশযুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য যে যুদ্ধবিমান!
প্রযুক্তি
টেম্পেস্ট জেট: ভবিষ্যতের আকাশযুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য যে যুদ্ধবিমান!
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, স্পিটফায়ার পাইলটরা তাদের বিমানকে এত প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন যে, শরীরের প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ বিমানের অবস্থান পরিবর্তন হতো। 
ছবি: টেলিগ্রাফ
ছবি: টেলিগ্রাফ
কিন্তু যুদ্ধবিমান শিল্পের নির্মাতারা আশা করছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে পাইলটরা তাদের ফাইটার জেটের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে পারবে। অর্থাৎ শরীরের নড়াচড়ার সাথে সাথে বিমানের উপর যে প্রভাব পড়ে তা আরও কমাতে কাজ করছেন নির্মাতারা। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে অত্যাধুনিক টেম্পেস্ট জেট তৈরি করা হচ্ছে। ব্রিটিশ মাল্টিন্যাশনাল আর্মস, রোলস-রয়েস, ইউরোপীয় মিসাইল গ্রুপ, এমডিবিএ এবং ইতালির লিওনার্দো সমন্বয়ের মাধ্যমে এটি নির্মাণ করছে। নতুন এই যুদ্ধবিমানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সরঞ্জাম থাকবে যা মানব পাইলটকে যখন তারা কোনো অনুভূতি হয় বা চরম চাপের মধ্যে থাকে তখন তাদের সহায়তা করে। 
বিমানটি বিভিন্ন ডিজিটাল সক্ষমতার জন্য একটি পরীক্ষাগার হিসেবে বিবেচিত হবে যা ৬০টি ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্পের আলোকে কার্য পরিচালনা করবে।
ছবি: বিবিসি
ছবি: বিবিসি
টেম্পেস্ট যুদ্ধবিমানের পাইলটের হেলমেটে থাকা সেন্সরগুলো মস্তিষ্কের সংকেত এবং অন্যান্য মেডিকেল ডেটা নিরীক্ষণ করে। সুতরাং, পরপর কয়েকটি ফ্লাইটে এআই একটি বিশাল বায়োমেট্রিক এবং সাইকোমেট্রিক তথ্য ডাটাবেস সংগ্রহ করবে। মূলত পাইলটের জন্য নিরাপত্তা ও আরও সুবিধাজনক দিক নিয়ে কাজ করছে তারা। উচ্চ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে পাইলট চেতনা হারিয়ে ফেললে AI তখন পাইলটকে ভালো অনুভূতি দিবে। ফার্নবোরো এয়ার শোতে ব্রিটিশ মাল্টিন্যাশনাল আর্মস সিস্টেমস বলেছে যে, ২০২৭ সালের মধ্যে এটি ল্যাঙ্কাশায়ারের ওয়ারটন প্ল্যান্ট থেকে একটি ডেমোনস্ট্রেটর জেট উড্ডয়ন করবে যা উপরে উল্লিখিত প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা চালাবে। এই বিমানটি বিভিন্ন ডিজিটাল সক্ষমতার জন্য একটি পরীক্ষাগার হিসেবে বিবেচিত হবে যা ৬০টি ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্পের আলোকে কার্য পরিচালনা করবে।
ছবি: বিবিসি
ছবি: বিবিসি
আমাদের প্রযুক্তির পরিবর্তনের গতির সাথে মোকাবিলা করতে হবে। অতীতে, প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায়শই অগ্রগতি নিয়েছিল, বাণিজ্যিক প্রযুক্তি পরে ধরা পড়ে। এখন, বাণিজ্যিক প্রযুক্তিগুলো প্রায়শই আরও উন্নত।
২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো টেম্পেস্ট বিমানের ছবি প্রকাশিত হয়। তখন দেখা যায় এটি ওজনে বেশ হালকা এবং গঠন পাল্টে গেছে। যখন এটি অবশেষে আকাশে উড়ানো হয় তখন টেম্পেস্ট সম্ভবত নিয়মিতভাবে আন-ক্রুড কমব্যাট ড্রোন দ্বারা যুক্ত হবে। এটিকে টেম্পেস্ট কনসোর্টিয়ামের পক্ষ থেকে 'অ্যাডজান্টস' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই ধরনের অগ্রগতির জন্য স্ক্র্যাচ থেকে তৈরি করা পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তি প্রয়োজন হবে। টেম্পেস্টের উন্নয়ন পরিচালক জন স্টকার বলেছেন, 'আমাদের প্রযুক্তির পরিবর্তনের গতির সাথে মোকাবিলা করতে হবে। অতীতে, প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায়শই অগ্রগতি নিয়েছিল, বাণিজ্যিক প্রযুক্তি পরে ধরা পড়ে। এখন, বাণিজ্যিক প্রযুক্তিগুলো প্রায়শই আরও উন্নত।' মূলত স্টকার এমন কিছু প্রযুক্তির সাথে নতুন ফাইটার তৈরি করার পরিকল্পনা করেছেন যা স্মার্টফোনে একটি অ্যাপ ডাউনলোড করার মতো সহজে আপগ্রেড করা যায়!
উৎপাদন
ছবি: বিবিসি
ছবি: বিবিসি
বিবিসিরকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে পরিচালক জন স্টকার জানিয়েছে, এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের উৎপাদন ব্যাপকভাবে শুরু করা হবে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় রোবট ব্যবহার করা হবে প্রকৌশলীদের কাজে সাহায্য করার জন্য। এতে করে এই যুদ্ধবিমানের অংশগুলো দ্রুত প্রোডাকশন লাইনে প্রেরণ করা যাবে। এই প্রকল্পে ব্রিটিশ মাল্টিন্যাশনাল আর্মস এবং লিওনার্দোকে কারিগরি সাহায্য দেবে জাপানের মিতসুবিশি। কারণ মিতসুবিশির নিজস্ব পরবর্তী প্রজন্মের ফাইটার প্রকল্পের সাথে টেম্পেস্টের অনেক মিল রয়েছে। আর ঠিক এই জায়গায় সমন্বয় করতে চায় টেম্পেস্টের নির্মাতারা। গবেষকদের মতে, যুদ্ধবিমানের অত্যাধুনিক এই প্রকল্পটি ইউরোপীয় মহাকাশ ব্যবসার জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা বয়ে আনবে। তবে জাপানের সাথে বৃহত্তর সহযোগিতা সম্ভব হয়েছে কারণ প্রকল্পগুলো অনেকাংশে ডিজিটাল প্রযুক্তির উপর নির্ভশীল। আর এই কাজে জাপানই পারে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সহায়তা দিতে। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
ডিজিটাল কাজের পরিবেশে আপনি এই জিনিসগুলো অনেক দ্রুত করতে পারেন, সহযোগিতা অনেক সহজ। আমরা টোকিও এবং ওয়ার্টনের মধ্যে ডলারের ব্রিফকেস বহন করছি না।
এই প্রসঙ্গে স্টকার বলেন, 'ডিজিটাল কাজের পরিবেশে আপনি এই জিনিসগুলো অনেক দ্রুত করতে পারেন, সহযোগিতা অনেক সহজ। আমরা টোকিও এবং ওয়ার্টনের মধ্যে ডলারের ব্রিফকেস বহন করছি না।' দোভাষী এবং প্রযুক্তি কর্মীদের একটি দল যারা গভীরভাবে প্রযুক্তিগত বিষয়ে ইংরেজি এবং জাপানি উভয় ভাষায় সাবলীলভাবে যোগাযোগ করতে পারে তারা মিতসুবিশির এফএক্স ফাইটার টিমের সাথে মিত্রতা বজায় রাখে। লিওনার্দোর এডিনবার্গ ভিত্তিক রাডার আর্মটিও মিতসুবিশির সাথে কাজ করছে। একটি ঘূর্ণায়মান থালার মতো দেখতে রাডারের জনপ্রিয় ধারণা, সামনে স্ক্যান করা এবং নিকটবর্তি শত্রুর বিমান বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক বিমানের সংকেত নির্ণয় করতে পারে। মূলত সেন্সর ডেটার ডিজিটাল পরীক্ষা এই কাজগুলকে আরও সহজ করে দিয়েছে।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
জানা গেছে, ওই বিমানের সেন্সরগুলো মানুষের মস্তিষ্কের মূল্যায়নের জন্য অনেক বেশি বিশদ সংগ্রহ করে, যে কারণে AI ডেটার টরেন্ট বিশ্লেষণ এবং প্রক্রিয়াকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। টেম্পেস্টে, আশা করা হচ্ছে এআই এখানে এক ধরনের নজরাদিতে কাজ করবে, যা পাইলটকে আগত বুদ্ধিমত্তা দ্বারা অভিভূত হতে বাধা দেবে। পুরো প্রকল্পটি অস্ত্র প্রস্তুতকারক এমবিডিএ-এর সাথে সমন্বয় করে তৈরি করা হচ্ছে। একটি টেম্পেস্ট যুদ্ধ বিমান থেকে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উৎক্ষেপণ করা যায়। তবে একবার লক্ষ্যে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র জরুরি লক্ষ্যে পুনঃনির্দেশের জন্য এতে একটি রোবট রয়েছে।
নতুন ইঞ্জিন
যদিও এই যুদ্ধবিমানের ক্রিয়া সম্পূর্ণ নতুন ইঞ্জিনের উপর নির্ভর করবে। আর তাই টেম্পেস্টের ইঞ্জিন জনিত কাজে সাহায্য করতেই এখানে যুক্ত রয়েছে রোলস রয়েস। ব্রিটিশ গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ জটিল এবং ডিজিটাল সিস্টেমকে গতিশীল করবে। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, আকাশে উড়ার সময় ডেটা ক্রাঞ্চিং প্লেনটিকে অতিরিক্ত বোঝা ল্যাপটপের মতো গরম করতে পারে। টেম্পেস্টের ডিজিটাল গ্যাজেটসমূহ বাহিনীর স্কোয়াড্রনকে গুনগুনিয়ে রাখার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি উৎপন্ন করার সময় রোলস-রয়েসের প্রকৌশলীরা কীভাবে ওই অতিরিক্ত তাপ বন্ধ করা যায় তা পরিকল্পনা করছেন।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
রোলস-রয়েসের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জন ওয়ার্ডেল বলেছেন, আমরা সিস্টেমের প্রতিটি দিককে শক্তিশালী করতে চাই। যুক্তরাজ্য সরকার ইতোমধ্যেই টেম্পেস্ট প্রকল্পের জন্য ২ বিলিয়ন পাউন্ড অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাণিজ্যিক যুদ্ধবিমান পরিষেবাতে প্রবেশের আগে অবশ্য অর্থের অঙ্কটি বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবুও, একটি সুস্পষ্ট প্রশ্ন থেকেই যায়। কেন বিদ্যমান ইউরোফাইটার টাইফুন আর নির্মাণ করবেন না? এর উত্তর পাওয়া যায় ব্রিটিশ মাল্টিন্যাশনাল আর্মসের এক বিবৃতিতে। তারা আশঙ্কা করছে ২০৪০ সালের মধ্যে, যুক্তরাজ্য এবং তার মিত্ররা নতুন হুমকির মুখোমুখি হবে। আর এই হুমকির জন্য আগাম প্রস্তুতির জন্য আরও অত্যাধুনিক অস্ত্রের দরকার হবে। তাই বলা যায় টেম্পেস্ট যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিরপত্তার কথা ভেবে হাতে নেয়া প্রযুক্তিগুলোর একটি।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
টাইফুনের রফতানি সাফল্য টেম্পেস্টের প্রতি যুক্তরাজ্য সরকারের উৎসাহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোফাইটার টাইফুন যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে ২১ বিলিয়ন পাউন্ড অবদান রেখেছে এবং ২ লাখের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। তবে এই বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, ইউরোফাইটার কনসোর্টিয়াম এবং যুক্তরাজ্য সরকার উভয়ই পরবর্তী প্রজন্মের ফাইটার জেট থেকে একই ধরনের লাভবান পেতে আগ্রহী হবে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, মাইকেল ডেম্পসি
প্রযুক্তি
আরো পড়ুন