ভাসু বিহার: অযত্ন-অবহেলায় ভ্রমণে আগ্রহ হারাচ্ছেন পর্যটকরা
জাতীয়
ভাসু বিহার: অযত্ন-অবহেলায় ভ্রমণে আগ্রহ হারাচ্ছেন পর্যটকরা
ভাসু বিহার। দেশের অন্যতম প্রাচীন এক প্রত্ন নিদর্শন। প্রায় ২ হাজার বছর আগের দুটি বৌদ্ধ বিহার এবং একটি মন্দির নিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই বিহার। প্রাচীন বাংলার রাজধানী পুন্ড্রনগর খ্যাত বগুড়ার মহাস্থান গড়ের পার্শ্ববর্তী শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার এলাকায় এটির অবস্থান । নানা ঐতিহাসিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলেও অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে অনেকটাই অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে প্রাচীন এ পুরাকীর্তি। 
প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন ভাসু বিহার; ছবি: রিদ্মিক নিউজ
প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন ভাসু বিহার; ছবি: রিদ্মিক নিউজ
সোমবার (৩০ মে) সরেজমিনে এই প্রত্নস্থানটিতে গিয়ে দেখা যায়, অনেকটাই অযত্ন-অবহেলায় সুনশান নিরব হয়ে পড়ে আছে ভাসুবিহার। স্থানীয় কয়েকজন রাখাল গরু ও ছাগল চড়াচ্ছেন এখানে। চারপাশ ঘুরে কোনো সীমানা প্রাচীরের দেখা মেলেনি স্থানটিতে। দর্শনার্থীদের বসার মতো কোনো বেঞ্চের ব্যবস্থা নেই। কাঁচা ঘাসের উপরই বসতে হয় এখানে বেড়াতে আসা মানুষদের। ঝড় বৃষ্টির সময় আশ্রয় নেয়ার মতো কোনো ছাউনিও নির্মাণ করা হয়নি। নির্মিত হয়নি কোনো শৌচাগারও। এ ছাড়া এখানে কোনো চা নাস্তা করার জন্য কোন দোকানঘরও নেই। স্থানীয়রা বলছেন, প্রায়ই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে ঘুরতে আসে পর্যটকরা। কিন্তু সুযোগ-সুবিধা ও পরিবেশ খারাপ হওয়ায় ভাসুবিহার ভ্রমণে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা। 
ঝড় বৃষ্টির সময় আশ্রয় নেয়ার মতো কোনো ছাউনিও নির্মাণ করা হয়নি। নির্মিত হয়নি কোনো শৌচাগারও। এ ছাড়া এখানে কোনো চা নাস্তা করার জন্য কোন দোকানঘরও নেই। স্থানীয়রা বলছেন, প্রায়ই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে ঘুরতে আসে পর্যটকরা। কিন্তু সুযোগ-সুবিধা ও পরিবেশ খারাপ হওয়ায় ভাসুবিহার ভ্রমণে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা।
প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন ভাসু বিহার; ছবি: রিদ্মিক নিউজ
প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন ভাসু বিহার; ছবি: রিদ্মিক নিউজ
বগুড়ার মহাস্থানগড় থেকে প্রায় চার মাইল উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত ভাসুবিহার স্থানীয়দের কাছে নরপতির ধাপ নামে পরিচিত। ইংরেজি ৬৩৮ সালে সম্রাট হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে এই বিহার পরিদর্শনে আসেন চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং। পরিদর্শনে এসে এই বিহারের প্রেমে পড়ে যান তিনি। একটানা তিন মাস অবস্থান করেন। এখানে ভাসুবিহারে একটি সুউচ্চ চার তলা বিশিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। যেখানে সাত শতাধিক বৌদ্ধ পণ্ডিত শিক্ষা গ্রহণ করতেন। ১৮৭৯-৮০ সালে ভাসুবিহার পরিদর্শন করেন স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম। এখানে এসে তিনি এই বিহারকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং বর্ণিত স্থান হিসেবে শনাক্ত করেন। এগারো শতকের দিকে শৈবধর্মীদের উত্থান ও বৌদ্ধদের প্রতি তাদের ঘৃণা, অবজ্ঞা ও শত্রুতায় অনেকটা ধর্মহীন সমাজে পরিণত হয় বৌদ্ধরা। ফলে ভাসুবিহারের এই সুউচ্চ প্রাসাদটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। এরপর পাল রাজাদের অনেকেই রাজত্ব ছেড়ে শেষ জীবনে সেবক হিসেবে বাস করতেন এখানে। আর একারনেই এই বিহারের নাম পরিচিতি পায় নরপতির ধাপ হিসাবে। পরে, পাল বংশের অবসান ঘটলে পতিত অবস্থায় বিহারটি ধীরে ধীরে ধবংসপ্রাপ্ত হয়। ১৯৭৩-১৯৭৪ সালে প্রথমবারের মতো খনন করা হয় ভাসু বিহার। খননের পর এখানে দশ শতকের দুটি মন্দিরের ভিত্তিমূল ও দুটি আয়তাকার প্রাসাদ দেবালয়ের ভিত্তিমূল আবিষ্কৃত হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে ভাসু বিহার ধাপ খনন করে সাত শতাধিক প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেছে। 
প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন ভাসু বিহার; ছবি: রিদ্মিক নিউজ
প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন ভাসু বিহার; ছবি: রিদ্মিক নিউজ
ভাসুবিহারে হোটেল-রেস্টুরেন্ট স্থাপন, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা, সৌন্দর্যবর্ধন, পিকনিক শেড, রেস্ট হাউজ, শৌচাগার ও পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হলে এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন অনেকগুণ বেড়ে যাবে। সেই সাথে টিকিট সিস্টেম চালু করা হলে সরকারের রাজস্ব আহরণের সুযোগও সৃষ্টি হবে বলে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
সচেতন মহলের দাবি সার্বিক উন্নয়ন সাধিত হলে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে বগুড়ার এই ভাসুবিহার। তারা বলেন, ঐতিহাসিকভাবে ভাসু বিহার গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় দেশের অন্যান্য পর্যটন এলাকার মতো এর তেমন পরিচিতি নেই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমে এর পরিচিতি বাড়লে চীন, জাপানসহ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা এখানে আসবেন। ভাসুবিহারে হোটেল-রেস্টুরেন্ট স্থাপন, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা, সৌন্দর্যবর্ধন, পিকনিক শেড, রেস্ট হাউজ, শৌচাগার ও পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হলে এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন অনেকগুণ বেড়ে যাবে। সেই সাথে টিকিট সিস্টেম চালু করা হলে সরকারের রাজস্ব আহরণের সুযোগও সৃষ্টি হবে বলে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। ভাসুবিহারের কেয়ারটেকারের দায়িত্বে থাকা এনামুল হক জানান, মাঝে মাঝেই মানুষ এখানে বেড়াতে আসেন। খাওয়া ও শৌচাগারের অভাবে ঘুরতে আসা লোকজন প্রায়ই বিড়ম্বনার শিকার হন। বিহার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিদুল ইসলাম বলেন, ভাসু বিহার ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্ন স্থান। অথচ এটি আজ একেবারেই অবহেলিত। পর্যটকদের জন্য শিক্ষণীয় এই বিহারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হলে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে বলে মনে করি। বগুড়া-২ শিবগঞ্জ আসনের সাংসদ শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ্ বলেন, মহাস্থান গড়ের যাদুঘর, বেহুলা লক্ষীন্দরের বাসরঘর, গোবিন্দ ভিটা ইত্যাদি স্থানে টিকিট ও গাড়ী পার্কিং বাবদ বড় অঙ্কের টাকা প্রতিবছর প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরে জমা হয়। ইচ্ছা করলে সেখান থেকেই ভাসুবিহারের উন্নয়ন কাজ করা সম্ভব। কিন্তু প্রত্ন অধিদফতর তা করছে না।
বগুড়া-২ শিবগঞ্জ আসনের সাংসদ শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ্ বলেন, মহাস্থান গড়ের যাদুঘর, বেহুলা লক্ষীন্দরের বাসরঘর, গোবিন্দ ভিটা ইত্যাদি স্থানে টিকিট ও গাড়ী পার্কিং বাবদ বড় অঙ্কের টাকা প্রতিবছর প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরে জমা হয়। ইচ্ছা করলে সেখান থেকেই ভাসুবিহারের উন্নয়ন কাজ করা সম্ভব। কিন্তু প্রত্ন অধিদফতর তা করছে না।
প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন ভাসু বিহার; ছবি: রিদ্মিক নিউজ
প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন ভাসু বিহার; ছবি: রিদ্মিক নিউজ
বগুড়ার জেলা প্রশাসক জিয়াউল হক জানান, ভাসুবিহারের উন্নয়নে প্রত্ন অধিদফতর ও জেলা প্রশাসনের আলাদাভাবে উন্নয়ন কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি আমি প্রত্ন অধিদফতরকে অবহিত করবো।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা জানান, বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের বাজেটের প্রয়োজন। আমাদের সীমিত বাজেটের কারণে রুটিন মেরামত ছাড়া বেশি কিছু করা সম্ভব হয় না। বগুড়ার জেলা প্রশাসক জিয়াউল হক জানান, ভাসুবিহারের উন্নয়নে প্রত্ন অধিদফতর ও জেলা প্রশাসনের আলাদাভাবে উন্নয়ন কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি আমি প্রত্ন অধিদফতরকে অবহিত করবো। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যৌথ আয়োজনে ভাসুবিহারে দুই দিনব্যাপী ‘প্রত্ননাটক’ মঞ্চস্থ হয়। সেই প্রত্ননাটক মিডিয়ায় প্রচার হওয়ায় দেশে বিদেশে অনেকটাই পরিচিতি পায় ভাসুবিহার। বর্তমানে অবহেলিত ভাসুবিহারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হলে এটি দেশের অন্যতম পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে উঠবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
রিপোর্টার: খালিদ হাসান, বগুড়া
জাতীয়বিশেষ প্রতিবেদনবগুড়া
আরো পড়ুন