Link copied.
বিটকয়েন মাইনিং করতে এতো অধিক বৈদ্যুতিক ক্ষমতার প্রয়োজন হয় কেনো?
writer
১০ অনুসরণকারী
cover
ক্রিপ্টকারেন্সি সম্পর্কে আমরা সবাই শুনেছি। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে বিটকয়েন এবং ইথার এর দাম অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে প্রতিদিন বেড়েই যাচ্ছে। ক্রিপ্টকারেন্সির এই হঠাৎ মুল্য বৃদ্ধির একটি কারণ হল ইদানিং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ফিনান্সিয়াল এজেন্সির মধ্যে ক্রিপ্টকারেন্সির গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি টেসলা ও স্পেসএক্স কোম্পানির সি.ই.ও ইলন মাস্ক টুইটারে তার নিজ কোম্পানির ক্রিপ্টোকারেন্সির গ্রহণযোগ্যতা এবং বিনিয়োগের কথা ঘোষণা করলে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রিপ্টোকারেন্সির দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায় এবং সেই সাথে লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে এর জনপ্রিয়তাও আকাশচুম্বী হয়। শুরুতে ক্রিপটকারেন্সি নিয়ে দ্বিধা থাকলেও এখন পৃথিবীর সব নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলোই বিটকয়েনসহ অন্যান্য হাই-ভ্যালু ক্রিপ্টকারেন্সি মাইনিং এর প্রতি ঝুঁকছে।

বর্তমানে বাজারে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ টি আলাদা ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রচলিত আছে। কিন্তু তাদের মধ্যে সব থেকে বেশি জনপ্রিয় ক্রিপ্তকারেন্সিটি হচ্ছে বিটকয়েন। এটিই পৃথিবীর প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি। মাত্র ১২ বছর আগে ২০০৯ এর ৯ জানুয়ারিতে এটি প্রথমবারের জন্য প্রকাশিত হয়। এর সাপ্লাই লিমিট হল ২ কোটি ১০ লাখ ইউনিট। বর্তমানে এর ১ কোটি ৮৬ লাখ ৬০ হাজার ইউনিট সার্কুলেশনে আছে। সীমিত পরিমাণ যোগান থাকায় যতই এর মাইনিংয়ের পরিমাণ বাড়বে ততই এর দাম বৃদ্ধি পেতে থাকবে। ২০০৯ সালে যখন যাত্রা শুরু করে তখন ১০০০ ইউনিট বিটকয়েনের দাম ছিল ১ ডলারের ও কম। ২০২১ সালে প্রিতিটি বিটকয়েন এর মুল্য দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ডলারের উপর! এবং তা প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে।  
cover
আপাতদৃষ্টিতে বিটকয়েন মাইনিং অনেকটা প্রাকৃতিক গ্যাস আহরণের মতই মনে হয়। তবে প্রাকৃতিক গ্যাস কেউ উৎপাদন করে না শুধু আহরণ করে থাকে কিন্তু বিটকয়েন মাইনিং এর সময় মাইনাররা প্রতিটি বিটকয়েন একটি একটি করে সংগ্রহ করে থাকে এবং মাইনিং সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত অনুৎপাদিত বিটকয়েনের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। আবার বিটকয়েন মাইনিং এর পরিমাণ ২ কোটি ১০ লাখ ইউনিটে আবদ্ধ। তাই এর বেশি মাইনিং করা সম্ভব না। বিটকয়েন যত বেশি মাইনিং করা হয় ততই প্রক্রিয়াটি কঠিন হতে থাকে।  যার কারণে পূর্বের তুলনায় এখন বিটকয়েন মাইনিং করতে বেশি শক্তিশালী কম্পিউটার এবং সময় এর প্রয়োজন হয়।

বিটকয়েন নিয়ে সবার কিছুটা ধারণা হলেও আমরা অনেকেই জানি না আসলে বিটকয়েন নেটওয়ার্ক চালাতে কি পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়। এই সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দিতে আমরা কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির “Bitcoin Electricity Consumption Index (CBECI)” এর ডাটা ব্যবহার করেছি। এখানে আমরা বিটকয়েন মাইনিং এর জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুতের সাথে বিভিন্ন দেশ ও কম্পানির বিদ্যুতের ব্যয় তুলনা করেছি যাতে আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারি বিটকয়েনের পিছনে আসলে কি পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। 
cover
বিটকয়েন মাইনিং করতে এত শক্তির প্রয়োজন হয় কেনো?
বিটকয়েন মাইনিং পরিচালনা করা অনেক প্রতিযোগিতামূলক একটি কাজ। সব বড় বড় মাইনিং কোম্পানিগুলো মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে থাকে শুধু তাদের শক্তির চাহিদা নিশ্চিত করার জন্য। সাধারণত বড় স্কেলের মাইনিং অপারেশনগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয় নিকটবর্তী কোন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের আশেপাশে। আর যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে কোম্পানিগুলো নিজেদের উদ্যোগেই শক্তির উৎপাদন ও বিতরণ নিশ্চিত করে। যেমনটি করেছে নিউ ইয়র্কের “Greenidge Generation” কোম্পানি। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে বিটকয়েন মাইনিং এর জন্য এত বিদ্যুৎ খরচ কেনো হয়।

যখন কেউ বিটকয়েন মাইনিং করে তখন তারা আসলে বিটকয়েনের লেনদেনের হিসাব আপডেট করে। এটি ব্লকচেইন নামেও পরিচিত। এই পদ্ধতিতে মাইনারদের সংখ্যামূলক পাজল সমাধান করতে হয় যা একটি 64-digit হেক্সাডেসিমেল সূচক যা “Hash” নামে পরিচিত। মাইনাররা তখনই বিটকয়েন পাবে যখন তারা অন্যদের থেকে আগে পাজল সমাধান করতে পারবে। এই পাজল বা গাণিতিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে অনেক কম্পিউটেশনাল ক্ষমতার দরকার হয়। যার জন্য দরকার অনেক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার। এই কম্পিউটারগুলোর উচ্চ ক্ষমতার জন্য অনেক বৈদ্যুতিক ক্ষমতার প্রয়োজন। অনেক প্রতিযোগিতা থাকায় বিটকয়েন মাইনিং ফেসিলিটিগুলো তাই কম্পিউটারে ভর্তি থাকে। এসব কম্পিউটার দিনরাত লাগাতার চলতেই থাকে। এই ফেসিলিটিগুলো মাইনারদের “Hashrate” কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে যা তাদের বিটকয়েন পাওয়ার সম্ভাব্যতা বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ “Hashrate” এর জন্য অনেক বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা লাগে যার জন্য আবার অনেক বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ শক্তির প্রয়োজন হয় যা মাঝে মধ্যে স্থানীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রে অভারলোডের সৃষ্টি করে। আর এই মাইনিং প্রক্রিয়াটি সবসময় সচল রাখতে হয় তা না হলে বিশাল অঙ্কের লোকসান গুনতে হয় মাইনিং কোম্পানিগুলোকে। এ কারণে মাইনিং ফেসিলিটিগুলোকে আলাদা করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পাওয়ার লাইন দিয়ে থাকে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো। স্থানীয় সরকারের পক্ষ থেকেও দেয়া হয় স্পেশাল এটেনশন যাতে করে তাদের মাইনিং অপারেশনে কোনো প্রকার ব্যাঘাত না সৃষ্টি হয়।

বিটকয়েন যদি একটি দেশ হত তাহলে এটি বিদ্যুৎ ব্যয়ের দিক থেকে ২৯ তম দেশ হত। নরওয়ের বাৎসরিক বিদ্যুৎ খরচের পরিমাণও বিটকয়েন নেটওয়ার্কের থেকে কম। অন্যান্য বড় হেভি ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজড দেশের থেকে যদিও এর বিদ্যুতের ব্যয় অনেক কম। কিন্তু বাংলাদেশের মত এত ঘনবসতিপূর্ণ দেশও বিদ্যুতের খরচের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে মাত্র ৭০ টেরা-ওয়াট চাহিদা নিয়ে। শুধু তাই না, বিটকয়েন গুগলের থেকে ১,৭০৮% বেশি বিদ্যুৎ ব্যয় করে। ২০২১ সালের মার্চের ১৮ তারিখ বিটকয়েন নেটওয়ার্কের বাৎসরিক বিদ্যুৎ ব্যয় অনুমান করা হয় প্রতি ঘণ্টায় ১২৯ টেরা-ওয়াট (TWh)। নিচে কিছু দেশের এবং কোম্পানির বাৎসরিক বিদ্যুৎ ব্যায়ের সাথে বিটকয়েনের বিদ্যুৎ খরচ তুলনা করে দেখানো হল। 
cover
বিটকয়েনের বিদ্যুতের উৎস
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী গবেষকরা মনে করেন ৭৬ শতাংশ ক্রিপ্টোমাইনাররা তাদের অপারেশন চালানোর জন্য নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার করে থাকেন। নবায়নযোগ্য শক্তি বলতে ওই সব শক্তি বোঝায় যার উৎস কখনও শেষ হয় না। যেমনঃ সৌর শক্তি এবং বায়ু শক্তি। যদিও পরিবেশগত দিক থেকে এটি অনেক নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব একটি অপশন, আর্থিক দিক থেকে আবার এটি বেশ খরচ সাপেক্ষ ব্যাপার। যার কারনেই মাইনাররা চাইলেও তাদের সম্পূর্ণ অপারেশন নবায়নযোগ্য শক্তির ধারা পরিচালনা করতে পারছেন না। ক্রিপ্টোমাইনিং পরিচালনার জন্য সমগ্র শক্তির মাত্র ৩৯ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস থেকে। বাকি শক্তি সেই সনাতন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকেই আসে যা সাধারণত জৈব জ্বালানী ব্যবহার করে থাকে।
কেমব্রিজের দেওয়া তথ্যমতে বিশ্বের ৬০ শতাংশ ক্রিপ্টোমাইনাররাই জলবিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহার করে থাকে। জলবিদ্যুৎ সাধারণত প্রাকৃতিক ঝর্না অথবা মানবসৃষ্ট বাধ থেকে উৎপাদিত হয়। অন্যান্য পরিষ্কারর শক্তির উৎস যেমন বায়ু এবং সৌর শক্তির ব্যবহার অনেক কম।

এশিয়া-পেসিফিক অঞ্চলে আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা শক্তির ব্যবহার অনেক বেশি জনপ্রিয়। বিশেষ করে চায়না বিদ্যুৎ উৎপাদনে পৃথিবীতে সবথেকে বেশি কয়লা ব্যবহার করে থাকে। শুধু তাই না, শক্তিতে স্বনির্ভর হতে চায়না সরকার কয়লা এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে পূর্বের তুলনায় বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি করেছে। ফলে বিদ্যুতের অভারসাপ্লাই দেখা দেয় যা ওই অঞ্চলের বিদ্যুতের দাম অনেক কমিয়ে আনে। এ কারণে এশিয়া-পেসিফিক অঞ্চলের মাইনারদের কয়লা শক্তির ব্যবহারের প্রবণতা অন্যান্য অঞ্চলের থেকে অনেক বেশি।

নিচে ক্রিপ্টোমাইনারদের শক্তির বিভিন্ন উৎস এবং তাদের বৈশ্বিক বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদার কিছু তথ্য দেওয়া হল।  
cover
ক্রিপ্টোকারেন্সি যত মূলধারায় চলে আসবে ততই সরকার এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রকরা এই ইন্ডাস্ট্রির কার্বন ফুটপ্রিন্টের দিকে নজর দিবে। যেহেতু এর শক্তির চাহিদা অনেক বেশি সেহেতু নিয়ন্ত্রক অর্গানাইজেশনগুলোও চাইবে যাতে ক্রিপ্টোমাইনিং পরিবেশের উপর বিরূপ কোনো প্রভাব না ফেলতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ক্রিপ্টোমাইনিং বৈশ্বিকভাবে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে স্থানান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য শক্তির একটি বড় সমস্যা হল বিদ্যুতের অভারসাপ্লাই, যা কিনা সঞ্চয়কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি চাপ প্রয়োগ করতে পারে। এই বাড়তি চাপ থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে রক্ষা করতে বিশেষজ্ঞরা ক্রিপ্টোমাইনিং ফেসিলিটিগুলো নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের আশেপাশে গুচ্ছ আকারে স্থাপন করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এতে করে বিদ্যুতের ওভারসাপ্লাইয়ের সমস্যা অনেকাংশেই দূর করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন।

চায়নাতে এরকম চিন্তাধারার প্রয়োগ এখনই বড় স্কেলে দেখতে পাওয়া যায়। ২০২০ সালের এপ্রিলে চায়নার সিচুয়ান প্রদেশের ইয়ান সিটিতে জননির্দেশনা প্রণয়কে করা হয় যেখানে ব্লচকচেইন ফার্মগুলোকে অতিরিক্ত উৎপাদিত জলবিদ্যুতের সুবিধা গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এথেক এটি স্পষ্ট যে ক্রিপ্টোমাইনিংয়ে বড় বড় সকল ইন্ডাস্ট্রিয়াল দেশগুলোই বিনিয়োগে উৎসাহী এবং তাদের শক্তির চাহিদা এবং যোগান নিশ্চিত করতেও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রজেক্ট গ্রহণে বদ্ধপরিকর।

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021