৩৩৫ বছরব্যাপী পৃথিবীর দীর্ঘতম যুদ্ধ: যে যুদ্ধে আহত হয়নি একজনও!
আন্তর্জাতিক
৩৩৫ বছরব্যাপী পৃথিবীর দীর্ঘতম যুদ্ধ: যে যুদ্ধে আহত হয়নি একজনও!
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
যুদ্ধ চলে একটানা ৩৩৫ বছর। গুলি ছোড়া হয়নি একটিও। আহত বা নিহত হয়নি একজনও। ৩৩৫ বছরের এ যুদ্ধটি হয়েছিল সংযুক্ত নেদারল্যান্ডস ও সিসিলি দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে। উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ সময় শান্তি চুক্তি না হওয়ায় এই যুদ্ধটি বছরের পর বছর ধরে চলছিল। যদিও উভয় পক্ষ থেকে একটি গুলিও ছোঁড়া হয়নি ও একজন মানুষও হতাহত হয়নি। এজন্য এই যুদ্ধকে রক্তপাতহীন যুদ্ধ ও পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের একটি হিসেবে অবহিত করা হয়। অবশেষে ১৬৫১ সালে শুরু হওয়া এ যুদ্ধ ১৯৮৬ সালে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসান হয়।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
ইতিহাস
১৬৪২ থেকে ১৬৫২ সাল পর্যন্ত চলা দ্বিতীয় ব্রিটিশ গৃহযুদ্ধের সময় সিলি দ্বীপপুঞ্জ থেকে রাজা চার্লসের অনুগত রয়ালিস্টিক বাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হয় এবং এই দ্বীপে পার্লামেন্টারিয়ানদের আধিপত্য বিস্তার হয়। এদিকে পার্লামেন্টারিয়াদের দ্বারা সিলি দ্বীপপুঞ্জে সংযুক্ত নেদারল্যান্ডসের একটি নৌজাহাজ আক্রান্ত হয়। ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে ডাচরা নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করে। 
যুদ্ধে এক সময় পার্লামেন্টারিয়ানদের আধিপত্য বিস্তার হতে থাকে। রাজা চার্লসের অনুগত বাহিনী পিছু হঁটতে থাকে। হাতছাড়া হতে থাকে একের পর এক শহর। পার্লামেন্টারিয়ানদের জয় নিশ্চিত দেখে ডাচরা পার্লামেন্টারিয়ানদের সমর্থন দেয়। পার্লামেন্টারিয়ান বাহিনীর দাপটে রাজকীয় বাহিনী বলতে গেলে ইংল্যান্ড ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
ইতিহাসবিদ রয় ডানকান এর মতে
লন্ডনে অবস্থিত নেদারল্যান্ডস দূতাবাস অদ্ভুত একটি চিঠি পায়। চিঠিটি লেখেছেন ইংল্যান্ডের স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রদেশ সিসিলি দ্বীপপুঞ্জের কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় ইতিহাসবিদ রয় ডানকান। তিনি জানান, অনেক অনেক বছর আগে ডাচরা সিসিলিবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং কাগজে-কলমে যুদ্ধটা এখনও চলছে। ডালকান জানান, এর পুরো রহস্য উন্মোচনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের প্রতি আহ্বান জানান। ডাচ দূতাবাস খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারে ঘটনা সত্য। ঘটনাটি ঘটে ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের (১৬৪২-১৬৫১) সময়। রাণী প্রথম এলিজাবেথ যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন ডাচরা ইংল্যান্ডের কাছ থেকে অনেক সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছিল। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ, নেদারল্যান্ডস ছিল ইংল্যান্ডের বন্ধু রাষ্ট্র। ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে ডাচরা নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করে। রয়ালিস্টিক বাহিনী বা পার্লামেন্টারিয়ান বাহিনী কোন পক্ষকেই সেই সময় তারা সমর্থন দেয় নি। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
ডাচদের সমর্থন
যুদ্ধে একসময় পার্লামেন্টারিয়ানদের আধিপত্য বিস্তার হতে থাকে। রাজা চার্লসের অনুগত রয়ালিস্টিক বাহিনী পিছু হটতে থাকে, হাতছাড়া হতে থাকে একের পর এক শহর। পার্লামেন্টারিয়ানদের জয় নিশ্চিত দেখে ডাচরা পার্লামেন্টারিয়ানদের সমর্থন দেয়। রাজা ও রাজপরিবারের অনুগত রয়ালিস্টিক বাহিনী এই সিদ্ধান্তকে বিবেচনা করে নিখাদ বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে। পার্লামেন্টারিয়ান বাহিনীর দাপটে রয়ালিস্টিক বাহিনী বলতে গেলে ইংল্যান্ড ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। রয়ালিস্টদের সর্বশেষ শক্ত ঘাঁটি ছিল ইংল্যান্ডের সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা কর্নওয়াল ( Cornwall) থেকে ৪৫ কি.মি. পশ্চিমে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জ সিসিলি। গৃহযুদ্ধের শেষ বছর (১৬৫১) সিসিলিতে অবস্থানরত রয়ালিস্টদের যুদ্ধজাহাজের আক্রমণে ডাচ নেভির একটি জাহাজ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনার পর ডাচ অ্যাডমিরাল মার্টেন হারপারর্টজোন ট্রুম্প ৩০ মার্চ, ১৬৫১ সালে সিসিলিতে আসেন এবং রয়ালিস্টদের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
স্বাভাবিকভাবেই রয়ালিস্টরা সে দাবী প্রত্যাখ্যান করে। ক্ষুব্ধ ডাচ অ্যাডমিরাল সিসিলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। যদিও সিসিলি ছিল ইংল্যান্ডের অধীন, কিন্তু অ্যাডমিরাল ট্রুম্প ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা না করে শুধু সিসিলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কারণ, সিসিলি বাদে ইংল্যান্ডের অন্যান্য অংশ তখন পার্লামেন্টারিয়ানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যাদেরকে ডাচরা সমর্থন দিয়েছিল। যুদ্ধ ঘোষণা করে অ্যাডমিরাল ট্রুম্প একটিও গুলি বা গোলা না ছুড়ে জাহাজ নিয়ে দেশে ফিরে যান। সে বছরই, রয়ালিস্টদের হটিয়ে পার্লামেন্টারিয়ানরা সিসিলিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ফলে, রয়ালিস্টদের সাথে আর ডাচদের যুদ্ধ করার সুযোগ হয় না। একসময় ডাচরা তাদের এই যুদ্ধের কথা ভুলেই যায়। লোকগল্প হিসেবে এই যুদ্ধের কথা সিসিলিবাসীর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। কেটে যায় প্রায় তিনশ বছর।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
শান্তিচুক্তি
নেদারল্যান্ডসের লন্ডন দূতাবাস আনুষ্ঠানিকভাবে এই যুদ্ধের কথা স্বীকার করে নিলে রয় ডানকান লন্ডনে অবস্থিত ডাচ কূটনীতিককে সিসিলিতে আমন্ত্রণ জানান শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করার জন্য। সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ১৯৮৬ সালের ১৭ এপ্রিল ডাচ রাষ্ট্রদূত রেইন হাইডিকপার হেলিকপ্টারে করে লন্ডন থেকে সিসিলি আসেন এবং শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অবসান হয় একটি রক্তপাতহীন যুদ্ধের, রচিত হয় নতুন একটি ইতিহাসের। এ যুদ্ধই পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। যুদ্ধ চলে একটানা ৩৩৫ বছর। গুলি বা গোলা ছোড়া হয় নি একটিও। আহত বা নিহত হয় নি একজনও।
গত ৩৩৫ বছর যাবৎ সিসিলিয়ানরা আতঙ্কে থাকত কখন জানি নেদারল্যান্ডস সিসিলি আক্রমণ করে বসে!
ডাচ রাষ্ট্রদূত
চুক্তি স্বাক্ষর করতে গিয়ে ডাচ রাষ্ট্র দূত হেসে মজা করে বলেন, গত ৩৩৫ বছর যাবত সিসিলিয়ানরা আতঙ্কে থাকত কখন জানি নেদারল্যান্ডস সিসিলি আক্রমণ করে বসে! এই চুক্তি স্বাক্ষরের বিরুদ্ধে অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, এই চুক্তিস্বাক্ষরের কোন প্রয়োজন ছিল না। একটি দেশ কখনও আরেকটি দেশের একটি অংশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে না। তাছাড়া অ্যাডমিরাল ট্রুম্প সিসিলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য নেদারল্যান্ডসের উচ্চপর্যায় থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত ছিলেন না। তাই রাগের মাথাতেই হোক বা রয়ালিস্টদের ভয় দেখানোর জন্যই হোক, অ্যাডমিরাল ট্রুম্পের এই যুদ্ধ ঘোষণা আইনত কার্যকর হয় নি। আর আইনত যুদ্ধ যদি শুরু হয়েও থাকে তবু এটা ১৬৫৪ সালে অবসান হয়ে যাবার কথা। কারণ, ইংল্যান্ড-হল্যান্ড যুদ্ধের পর ১৬৫৪ সালে ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের মাঝে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। সিসিলি যেহেতু ইংল্যান্ডের অধীন তাই সিসিলির ক্ষেত্রেও শান্তিচুক্তিটি কার্যকর হবে। তবে এই চুক্তি স্বাক্ষরের কারণে একটি ইতিহাস নতুন করে জানার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সিসিলিয়ানদের মাঝে রং-চং মিশিয়ে যে গুজব আর লোকগল্প চালু ছিল তার অবসান হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের দিন সিসিলির কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রয় ডালকান বলেন, গত কয়েক শতক ধরে সিসিলিয়ানদের মাঝে একটা হাস্যকর গুজব চালু ছিল, এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে তার অবসান হল।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
অ্যাডমিরাল ট্রুম্পের, সরকারের পক্ষ থেকে যুদ্ধ ঘোষণার কোন অনুমতিই ছিল না। কিন্তু তিনি মনে হয় তার বাহিনীর ক্ষমতা প্রদর্শন, হুমকি অথবা বির্শঙ্খলা সৃষ্টি করে তাদের একটি বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। যদিও এটা কখোনই সম্ভব নয়। এই ধরনের যে কোন কাজ কমনওয়েল্থ দ্বারা প্রতিহত করা হত। যদি যুদ্ধটি ১৬৫১ সালে শুরু হয়েও থাকে তাহলে তা ১৬৫৪ সালে সমাধান হয়ে যাওয়ার কথা করাণ প্রথম ডাচ যুদ্ধের পর যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত নেদারল্যান্ডসের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল।
বোউলি (২০০১) এক বিতর্কে বলেন
আন্তর্জাতিক
আরো পড়ুন