Link copied.
প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর হয়েও বিশ্বের সর্বোচ্চ দারিদ্র্যের তালিকায় রয়েছে যেসব দেশ
writer
অনুসরণকারী
cover
পৃথিবীতে দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা হিসেবের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে তার ‘জিডিপি’ বা ‘গ্রস ডমেস্টিক প্রোডাক্ট’, বাংলায় যা দাঁড়ায় ‘মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন’। জিডিপি কি আসলে একটি দেশের উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে পারে কিনা সেই নিয়ে আছে লম্বা বিতর্ক। তবে জিডিপিকে প্রতিস্থাপন করার মতো সহসাই অর্থনীতিবিদদের হাতে তেমন কোনো সূচক নেই। তাই এটিই ব্যবহৃত হয়ে আসছে একটি দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা থেকে শুরু করে তার দারিদ্র্য নির্ধারণের সূচক হিসেবে। বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ প্রতিবছর বিভিন্ন দেশের জিডিপি, তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, আন্তর্জাতিক বাজার আর বাণিজ্যের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে দারিদ্র্যের সূচক প্রকাশ করে। আজকের লেখা পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র দশটি দেশকে নিয়ে, তাদের দরিদ্র হয়ে থাকার কারণ নিয়েও থাকছে অনুসন্ধান। 
cover
দরিদ্র দেশ বলতে সবার আগে আমাদের সামনে সবার আগে ভেসে উঠে আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোর কথা, বিশেষ করে সাহারা মরুভূমির আশেপাশের এলাকাগুলোতে দারিদ্র্যের হার আকাশচুম্বী। ইউরোপীয় উপনিবেশের অধীনে থাকার সময় থেকেই এই এলাকাগুলোকে শোষণ করা হয়েছে, এখানের সম্পদ পাচার হয়েছে ইউরোপের নানা দেশে। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ছিটেফোঁটাও নেই, উল্টো এখানে জাতিগত বিবাদ তুঙ্গে। এই জাতিগত বিবাদ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে আফ্রিকার বেশীরভাগ দেশেই খণ্ড খণ্ড গৃহযুদ্ধ চলছেই। গৃহযুদ্ধের পীড়নের পাশাপাশি আছে মহামারি আর খাদ্য সংকট। এক এইডসের ছোবলে আফ্রিকার লক্ষ মানুষ জীবন হারিয়েছে। সাহারার আশেপাশে থাকা দেশগুলোতে চাষযোগ্য জমি এবং পানির উৎস সংকটের কারণে কৃষিকাজের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে অনেকাংশে। এর ফলে খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে।
জিডিপির হিসেবে পৃথিবীর বুকে গরীবতম দেশ বুরুন্ডি। জিডিপি আর আন্তঃর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্যে বিশ্বব্যাংক আর আইএমএফের হিসাবের খাতায় বুরুন্ডি পরিচিত পৃথিবীর বুকে অন্যতম দরিদ্র হিসেবে, বুরুন্ডির মানুষের মাত্র ১৩.৪ ভাগ শহরাঞ্চলে থাকে। বেশীরভাগ মানুষই গোত্রবদ্ধ হয়ে গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে বেলজিয়ামের উপনিবেশিক শাসনের নাগপাশ ছেড়ে বের হয় বুরুন্ডি। এরপর দেশটিতে গৃহযুদ্ধ আর গণহত্যা দেখা গিয়েছে। দেশটির মাথাপিছু আয় বর্তমানে ২৬৪ মার্কিন ডলার।  
cover
দক্ষিণ সুদান পৃথিবীর অন্যতম নবীনতম দেশ, রিপাবলিক অফ সুদান থেকে ২০১১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে দেশটি। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটিতে চলছে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যা রূপ নিয়েছে গৃহযুদ্ধে। তাই অবকাঠামো এবং অর্থনীতি কোনটিই ভালো নেই। মাথাপিছু আয় বুরুন্ডির চেয়ে খানিকটা বেশি, মার্কিন ডলারে মাথাপিছু তা দাঁড়িয়েছে ৩০৩ ডলার। 
cover
দক্ষিণের সুদানের পরেই আছে মালাওয়ি। মালাওয়ি আফ্রিকার একটি স্থলবেষ্টিত দেশ, দেশটির কোনো সমুদ্রবন্দর নেই। আমদানি রপ্তানী বাণিজ্যে দেশটি পিছিয়ে আছে খানিকটা। মালাওয়িতে এইডস মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, মালাওয়ির মানুষের গড় আয় প্রায় ৫৮ বছরের কাছাকাছি। এছাড়া লেগে আছে সংঘাত আর বিবাদ। আফ্রিকার অন্য দেশের মতো এখানেও প্রশাসনিক দুর্বলতা একটি সাধারণ ব্যাপার। মাথাপিছু জিডিপি ৩৯৯ মার্কিন ডলার।  
cover
মোজাম্বিকের প্রাকৃতিক সম্পদ অঢেল, তাও দারিদ্র্য পিছু ছাড়ছে না। মোজাম্বিকেও আফ্রিকার অনেক দেশের মতোই দীর্ঘ সময় ধরেছে গৃহযুদ্ধ, ১৯৭৭ সাল থেকে শুরু হয়ে তা চলে ১৯৯২ পর্যন্ত। দীর্ঘ এই যুদ্ধে মোজাম্বিকের অবকাঠামো থেকে শুরু করে সবই ভেঙে পড়েছে। আছে দূর্নীতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা। মোজাম্বিকের অর্থনীতি আস্তে আস্তে ঘুরে দাড়াচ্ছে, তাও এর জিডিপি এখনো অনেক কম, মাথাপিছু ৪৫৫ মার্কিন ডলার। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো, আফ্রিকার অন্যতম বৃহত্তম দেশ। প্রাকৃতিক সম্পদ আর মানবসম্পদের আধার। এখানেও দীর্ঘকাল ধরে চলছে ক্ষমতার সংঘাত। তাই মানব উন্নয়ন সূচক থেকে শুরু করে সব জায়গাতেই এর অবস্থান অনেক নীচে। মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ প্রায় ৪৫৭ মার্কিন ডলার।

কঙ্গোর পরেই আছে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক এর জিডিপি ৪৮০ মার্কিন ডলার। আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে এবার এশিয়ায়, আফগানিস্তানের দীর্ঘদিন ধরেই চলছে সংঘাত। অর্থনীতি এবং অবকাঠামোর অবস্থা গুরুতর। তাদের মাথাপিছু জিডিপি ৪৯৯ মার্কিন ডলার।
cover
আফগানিস্তানের পরেই আছে মাদাগাস্কার। ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপটি মূলত আফ্রিকা মহাদেশের অংশ। পূর্ব আফ্রিকার উপকূল থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪০০ কিলোমিটার। মাদাগাস্কারকে বলা হয়ে থাকে ‘প্রাণ প্রকৃতির হটস্পট’, এখানে দেখা মেলে এমন ৯০ শতাংশ প্রজাতি পৃথিবীর কোথাও দেখা যায় না। তবে এখানেও আছে জাতিগত বিভেদ, দীর্ঘসময় মাদাগাস্কার দ্বীপ বিভিন্ন উপনিবেশিক শক্তির দখলে ছিলো। তবে এখানে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি, বরং এই দ্বীপে সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘মালাগাসি’ জনগণ বিভিন্ন সময়ে হেন্সথার শিকার হয়েছেন। মাথাপিছু জিডিপি ৫১৪ মার্কিন ডলার। মাদাগাস্কারের পর আছে সিয়েরা লিওন, এটি আফ্রিকার অন্যতম আরেকটি সম্পদশালী দেশ। সিয়েরা লিওনে হীরা, সোনা, বক্সাইট, এলুমিনিয়াম, কপারের খনি আছে। দীর্ঘকালের শোষণ নিপীড়নের পর ১৯৬০ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে দেশটি, তবে দীর্ঘকালের বিভেদ আর জাতিগত বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে সেখানে।

পাশাপাশি পশ্চিমা শক্তির ইন্ধনে সেখানে চলতে থাকে অস্ত্রের জোগান, গৃহযুদ্ধের খরচা জোগাতে গেরিলারা নিজেদের মতো করে প্রাকৃতিক সম্পদের খনির দখল নেয়। কম দামে হীরা, সোনা, বক্সাইট চালান হতে থাকে ইউরোপ আমেরিকায়। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সেখানে চলে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী বাহিনী সিয়েরা লিওনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই কাজ তারা স্মরণ রাখতে বাংলাকে সেখানে একটি অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে সম্মান দেওয়া হয়েছে সিয়েরা লিওনে। পাশাপাশি বাংলাদেশের নামে নামকরণ করা হয়েছে একটি রাস্তার। তবে এখনো তাদের অর্থনীতি বেশ নাজুক, মাথাপিছু আয় ৫১৮ মার্কিন ডলার।  
cover
সিয়েরা লিওনের পরেই আছে নাইজার, নাইজারও আফ্রিকার একটি স্থলবেষ্টিত দেশ। নিজেদের সমুদ্র সংযোগ নেই। নাইজারও প্রাকৃতিক সমদের আধার। তাই তার দিকে দৃষ্টি ছিল সব পশ্চিমাদের। দীর্ঘদিন ফ্রান্সের উপনিবেশ হিসেবে ছিলো নাইজার। ১৯৬০ সালে স্বাধীনতার পর নাইজারের গল্পটা অন্য সব আফ্রিকান দেশের মতোই। জাতিগত সংঘাত, সামরিক শাসন, সেনাবাহিনীর নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, জাতিগত এবং গোত্রগত বিদ্বেষ। এবং পশ্চিমা শাসকেরা সেই বিদ্বেষে নাক গলিয়ে সেখান থেকে কাঁচামালের জোগান অব্যাহত রাখে। ২০১০ সালে নতুন সংবিধান করে নাইজার আবার চেষ্টা করছে নিজের মতো করে ঘুরে দাঁড়াতে, তবে সময়ই হয়তো বলে দিবে কতোটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে তারা। বর্তমানে তাদের মাথাপিছু আয় ৫৩৫ মার্কিন ডলার। 
cover
জিডিপির হিসেবে আফ্রিকা দেশগুলো গরীব হতে পারে কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে নয়। সেখানে জনসংখ্যা আছে, তাদেরকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা যাচ্ছে না কারণ সেখানে অবকাঠামো দুর্বল, শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়নি। বরং উপনিবেশ থাকার সময়ে তাদের শাসন করার সুবিধার্থে তাদের জাতিগত পরিচয়কে উসকে দিয়েছে পশ্চিমারা, উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর দেশের ক্ষমতা কাদের হাতে যাবে এই নিয়ে তৈরি হয়েছে বরাবরই সংঘাত। এই বিশাল সম্পদের ব্যবস্থাপনা করে উঠতে পারছে না বেশীরভাগ আফ্রিকান দেশই। পাশাপাশি নামে বেনামে এখানে ঢুকছে পশ্চিমা অস্ত্র কারণ এখানে সংঘাত চলমান থাকলে এর বাজার নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা চলে যায় পশ্চিমাদের হাতে। কম দামে কাঁচামালের জোগানদাতা হয়েই থাকবে আফ্রিকা, নিজেদের শিল্প গড়ে উঠবে না এখানে। অথচ আফ্রিকায় থাকা সম্পদ দিয়ে নিজেরা কফি, চকলেট, তুলা, চা ইত্যাদির বিশাল শিল্প গড়ে তুলতে পারতো তারা।

এখন যেন নিজেদের সম্পদে নিজেরাই হয়ে আছে অবাঞ্ছিত। অনেক আফ্রিকার দেশই জাতিগত বিবাদ পেছনে রেখে এগিয়ে চলছে সামনের দিকে, রুয়ান্ডা একটি উদাহরণ, শিক্ষা দিয়ে প্রথমে জনশক্তি তৈরি করছে তারা। ফলে বিদেশী বিনিয়োগ আসছে সেখানে, বিশ্বের শ্রমঘন শিল্পের বাজার আগামীতে সরে যাবে আফ্রিকাতে, কারণ এখানের মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে দক্ষ করে গড়ে তোলা যাবে। আগামী শতাব্দীর আফ্রিকা হয়তো নিজের নামের পাশ থেকে দরিদ্র মহাদেশ লেখাটি তুলে ফেলবে। 

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021