আবুধাবি: মরু শহরটি যেভাবে বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ ‘সাইক্লিং সিটি’
আন্তর্জাতিক
আবুধাবি: মরু শহরটি যেভাবে বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ ‘সাইক্লিং সিটি’
সাইকেল চালানোর স্থানগুলো কল্পনা করলে সাধারণত ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে প্যাডেলিংয়ের চিত্র মনে ভেসে ওঠে। অথবা সাইকেল চলাচলের উপযোগী করে গড়া কোপেনহেগেন বা আমস্টারডামের মতো শহরগুলোর বিশেষ রাস্তা কল্পনায় আসে। তবে আরব মরুভূমির কোনো দৃশ্য মাথায় আসে না সাধারণত। যেখানে গ্রীষ্মের কড়া তাপমাত্রা এবং মধ্যাহ্নে সূর্যের তাপ বাইকের টায়ার বিস্ফোরণ ঘটাতে যথেষ্ট গরম। তবে শিগগিরই এটি পরিবর্তন হতে পারে।
ছবি: সিএনএন
ছবি: সিএনএন
আবুধাবিতে এখন দুই চাকার সাইকেলের একটি বিপ্লব সংঘটিত হতে শুরু করেছে। বিশাল বিনিয়োগের সাথে সাথে শহরের বাসিন্দা এবং পর্যটক সবাই সাইক্লিংয়ের অভিজ্ঞতার অর্জনের জন্য আগ্রহী হয়ে আছে যা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায়নি। গত বছর শহরটিকে ‘বাইক সিটি’ ঘোষণা দিয়েছে স্পোর্টস সাইক্লিংয়ের গভর্নিং বডি ‘ইউনিয়ন সাইক্লিস্ট ইন্টারন্যাশনাল’ বা ইউসিআই। মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার মধ্যে প্রথম এই তকমা পেলো শহরটি। এই ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে এটি আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণতম সাইক্লিং শহর হতে পারে। তেল সম্পদ ব্যবহারে সমৃদ্ধ সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী শহর এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে দামি গাড়ি আর বিভিন্ন যানবাহনই বেশি। গ্যাসের সস্তা দাম, প্রশস্ত রাস্তা, শহুরে এলাকার বাইরে গতির সীমাও অনেক বেশি- এমন একটি দেশে আবুধাবির সাইকেলমুখী হওয়ার প্রবণতা আপাতদৃষ্টিতে বোঝা কঠিন। তবে গভীরভাবে তাকালে একটি ভিন্ন গল্প চোখে পড়বে। গত কয়েক বছর ধরে নতুন মহাসড়কের পাশে সাইকেলের জন্য মাইলের পর মাইল বিশেষভাবে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। আবুধাবিতে সাইক্লিংয়ের বসন্ত দেখা যাচ্ছে, কারণ দেশটি ধীরে ধীরে নিজেকে সাইক্লিংয়ের দরজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। আরব আমিরাত আন্তর্জাতিক সাইক্লিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে এবং স্বদেশী প্রতিভার পৃষ্ঠপোষকতাও করছে।  
প্রতিকূল অবস্থা
ছবি: সিএনএন
ছবি: সিএনএন
যদিও আবুধাবিতে সাইক্লিইংয়ে অংশ নেয়ার জন্য কিছু প্রতিকূল সময় ও পরিস্থিতি রয়েছে। শীতকালের মৃদু আবহাওয়া দিনব্যাপী সাইকেল চালানোর জন্য উপযুক্ত। তবে মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাপমাত্রা কখনও কখনও ৪৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের (১১৮ ফারেনহাইট) কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন সাইকেল চালানোর জন্য সর্বোত্তম সময় হচ্ছে সূর্যোদয়ের আগে বা সূর্যাস্তের পরে। এ কারণেই দুই বন্ধু অ্যান্ডি কোলম্যান এবং ড্যান বালট্রুসাইটিস শনিবার সকাল ৬ টার কিছু পরে আল হুদাইরিয়াতের একটি পার্কিং লটে তাদের সাইকেলে চড়ে বসেন। এটি শহরের দক্ষিণে একটি দ্বীপ যেখানে সমুদ্র সৈকত ও হোটেল আছে এবং সাইকেল ট্র্যাকের জন্য একটি সুন্দর স্থান নির্মাণ করা হয়েছে। ‘কেন আমি এটি করি, আমি জানি না’ কোলম্যান হাসতে হাসতে তাদের সকালের সেশন শুরু করার জন্য মসৃণ রাস্তায় চলে যান। ভোরের দিকে হলেও তারা একা নন। কয়েক ডজন অন্যান্য সাইক্লিস্ট নেটওয়ার্কের সদস্যরা চারপাশে জড়ো হয়েছেন। তারা তিন থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এবং পানির পাশের রাস্তা দিয়ে আনন্দদায়ক যাত্রা করবেন। এটি বেশিরভাগই সমতল, তবে কিছু কিছু জায়গা বেশ বিপদজনক। রিকি বাউটিস্তা বলেন, ‘এটি একটি দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা।’
ছবি: সিএনএন
ছবি: সিএনএন
বাউটিস্তারা ইউনিফর্ম পরিহিত সাইক্লিস্টদের একটি দল যারা দিনের আলোর প্রথম ঝলকানিতে প্যাডেলিং করছেন। বাউটিস্টার দলের সবাই দুবাইয়ের একটি সাইকেলের দোকানে কাজ করে এবং আল হুদাইরিয়াতে বিনামূল্যে যে সুবিধাগুলো দেয়া হচ্ছে তা পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘আমি একজন শিক্ষানবিস, কিন্তু আমার সমস্ত সহকর্মীরা সাইক্লিস্ট’ তারা আমাকে বলেছিল, ‘এটি চেষ্টা করুন, আপনি মজা পাবেন।’ বাতাসের কারণে আজ সাইকেল চালানো সত্যিই বেশ চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু আপনি যখন দিক পরিবর্তন করবেন এবং আপনার মনে হবে আপনি উড়ছেন এবং এটি আরও বেশি উপভোগ্য। আরও অনেক ক্লাবও সাইকেলে একে অপরের চাকার পিছনে ছুটছেন। সব বয়সের নারী-পুরষ শহরের আকাশচুম্বী বিল্ডিংগুলোর পাশ দিয়ে ছুটে চলেছেন। কেউ কেউ গাড়িতে করে আসেন আবার কেউ বাড়ি থেকেই সাইকেলে চড়ে আসেন। এমনকি বাইকের জন্যও বিশেষ বাসও রয়েছে।
সব বয়সের নারী-পুরষ শহরের আকাশচুম্বী বিল্ডিংগুলোর পাশ দিয়ে ছুটে চলেছেন। কেউ কেউ গাড়িতে করে আসেন আবার কেউ বাড়ি থেকেই সাইকেলে চড়ে আসে। এমনকি বাইকের জন্যও বিশেষ বাস রয়েছে।
ছবি: সিএনএন
ছবি: সিএনএন
দর্শনার্থীদের জন্য একটি সাইকেলের দোকানও রয়েছে। 'ইয়াস মেনা সাইকেলস' নামের এ দোকানটি ২০ ডলার প্রতি ঘণ্টায় সাইকেলের বহর ভাড়া দেয়ার জন্য ভোর সকালে দ্রুত খোলা হয়। এমিরেটস চেইন ওল্ফির নিকটবর্তী একটি শাখাও সাইকেল ভাড়া দেয়। পাশাপাশি ১৬ হাজার ডলার পর্যন্ত বা তারচেয়েও বেশি মূল্যের সাইকেল বিক্রি করে। দোকানটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের মালিকানাধীন ইতালীয় বাইক প্রস্তুতকারক কোলাগনোর জন্য একটি সফল কেন্দ্র। এখানে ফ্রান্সের তৈরি সব সাইকেল ও পর্যটকদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন মেশিনরিজ পাওয়া যায়। 
স্বাস্থ্যকর জীবনধারা
ছবি: সিএনএন
ছবি: সিএনএন
আবুধাবি সাইক্লিং ক্লাব (এডিসিসি) আবুধাবিতে বাইক-সম্পর্কিত কাজকর্মের সমন্বয় সাধন করে। যে কেউ এই গ্রুপের সদস্য হতে পারে। এছাড়া আমিরাতের সরকারি এবং স্পোর্টস সাইক্লিং ইভেন্টগুলোর সমন্বয় করে সংগঠনটি। সাইক্লিং সংশ্লিষ্ট কার্যকলাপে অংশগ্রহণ এবং সরাসরি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য সরকারের সাথে কাজ করে আবুধাবি সাইক্লিং ক্লাব। এডিসিসি ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্লাবটি জানিয়েছে, নির্মাণাধীন ৪৪৫ কিলোমিটার (২৭৭ মাইল) সাইকেল ট্র্যাকের জন্য প্রায় ১.৭ বিলিয়ন দিরহাম (৪৬০ মিলিয়ন ডলার) ব্যয় হয়েছে। পথে একটি নতুন ইনডোর ভেলোড্রোম আছে যেখানে সাইকেলের বিভিন্ন খেলাধুলার প্রশিক্ষণ নেয়া যায় এবং একটি সাইকেলের পথ নির্মাণ হয়েছে যা দুবাইয়ের সাথে আবুধাবিকে সংযুক্ত করবে। এর উদ্দেশ্য হলো স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে সাইক্লিংয়ের সাথে যতটা সম্ভব স্থানীয় লোকদেরকে জড়ানো। তবে পর্যটকদের আকর্ষণ করাও এর লক্ষ্য। 
ছবি: সিএনএন
ছবি: সিএনএন
এডিসিসির নির্বাহী পরিচালক আল নুখাইরা অলখিলি বার্তাসংস্থা সিএনএনকে বলেছেন, আমাদের প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে আবুধাবিতে আরও বেশি পর্যটকদের নিয়ে আসা এবং সাইকেলে চড়ে সময় কাটানো উপভোগ করা। আলখিলি নিজেও একজন আগ্রহী সাইক্লিস্ট যাকে প্রায়ই আবুধাবির সবচেয়ে বড় সাইক্লিং স্পট ইয়াস মেরিনা সার্কিটের পাশে প্রশিক্ষণ দিতে দেখা যায়। ফর্মুলা ওয়ান ইভেন্টগুলো আয়োজন করা এই রেস ট্র্যাকটি নিয়মিতভাবে সকাল-সন্ধ্যায় জনসাধারণের সাইক্লিংয়ের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। দর্শনার্থীরা ট্র্যাকে বিনামূল্যে নিজেদেরকে তৈরি করতে পারেন। হেলমেট এবং হাইব্রিড বাইকগুলো বিনা ভাড়ায় চালাতে দেয়া হয়। সেখানে কাপড় পরিবর্তনের রুম আছে, কিন্তু কোনো বৃষ্টি নেই। এখানে সারা বছরই সাইক্লিংয়ের অভিজ্ঞতা নেয়া যায়। ইউরোপে বৃষ্টি ও তুষারপাত হয়। তবে আবুধাবিতে আপনি বছরের ৩৬৫ দিনই সাইক্লিংয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।  

সূত্র: সিএনএন
আন্তর্জাতিকআরব আমিরাত
আরো পড়ুন