Link copied.
রবিন রাফ্যেল: ধুরন্ধর কূটনীতিক থেকে এক তথ্য পাচারকারীর গল্প!
writer
অনুসরণকারী
cover
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি হচ্ছে কূটনীতি নির্ভর রাজনীতি। সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে, নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি এবং স্বার্থ হাসিল করার জন্য যেই নীতি সেটাই কূটনীতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মূলত এই ডিপ্লোমেটিক যুগের শুরু হয়, স্নায়ু যুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ার পরিচালিতই হয়েছিলো কূটনীতিকদের মাধ্যমে। তো এই ডিপ্লোমেসির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং তাদেরকে কিভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটি বিশ্বকে সবচেয়ে ভালোভাবে দেখিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিংশ শতাব্দিতে এসে একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া দেশটি তাদের যুদ্ধগুলোকে সঠিক প্রমাণের জন্য বারবার ব্যবহার করেছে তাদের কূটনীতিকদের। তাদের সেই কূটনীতিকরা তাদের সর্বোচ্চ সেবা করেছে। খেয়াল করে দেখবেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা মাঝে মাঝে বেফাঁস মন্তব্য করে ফেলেন, এই জায়গায় যুক্ত্ররাষ্ট্রের কূটনীতিকরা খুবই সফল। তাদের সাবধানী বাচনভঙ্গীর জন্য তারা বিশ্বে সমাদৃত। তো আজকের আয়োজন সেরকমই এক ধুরন্ধর মার্কিন ধুরন্ধর কূটনীতিক রবিন রাফ্যেলকে নিয়ে, যিনি সাম্প্রতিককালে আবার তথ্য পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। চলুন দেরী না করে শুরু করা যাক।  
প্রথম জীবন
রবিনের জন্ম ১৯৪৭ সালে আমেরিকার ভ্যাঙ্কুবার অঙ্গরাজ্যের ওয়াশিংটনে। তার পুরো নাম রবিন লীন জনসন। তার বাবার নাম ভেরা এবং ডনাল্ড জনসন।
তার শিক্ষা জীবন বিশাল, ১৯৬৫ সালে তিনি লংভিউ থেকে হাই স্কুল গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন, সেখান থেকে তারপর ১৯৬৭ সালে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস এবং অর্থনীতি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে। এরপর তিনি পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। সেখানে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে ইতিহাসের উপর স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন, সেখান থেকে আবার ক্যাম্ব্রিজে যান আরো পড়াশোনা করতে।
cover
ওই সময়েই তার সাথে অক্সফোর্ড শিক্ষার্থী ফ্র্যাংক এলার এর সাথে প্রেম হয়। ফ্র্যাঙ্ক ও একজন ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এলামনাই ছিলো। ফ্র্যাংক খুব গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিলো, কারণ তিনি ছিলেন বিল ক্লিনটন এর কাছের বন্ধুদের মধ্যে একজন। তার মাধ্যমেই রবিনের সাথে বিল ক্লিনটনের পরিচয় হয়, এবং ক্লিনটনের মাধ্যমেই রবিনের উত্থান ঘটে, সে বিষয়ে পড়ে আসছি, তার আগে রবিনের পড়াশোনার গল্প শেষ করি। রবিনের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পর শিক্ষকতায় যোগ দেন। ১৯৭০ সালে তিনি ইরানের দাম্ভান্দ কলেজে ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে দুই বছর চাকরী করেন। সেখানেই তার সাথে আর্নল্ড লুইস র‍্যাফেল এর সাথে পরিচয় ঘটে। যিনি তখন ছিলেন একজন ইউএস এম্বাসির পলিটিক্যাল অফিসার, পরবর্তীতে একজন গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতিক হিসেবে স্বীকৃতি পান। তার সাথে পরিণয় হওয়ার পাশাপাশি, রবিন আবার ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডে ভর্তি হন এবং অর্থনীতির উপর তার স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এই বিশাল শিক্ষাজীবনের সর্বোচ্চ ব্যবহার তিনি করেছেন, ফ্রেঞ্চ এবং উর্দুতেও তিনি মারাত্নক দক্ষ ছিলেন, যদিও তার ব্যক্তিগত জীবন তেমন সুখের ছিলো না।  
ব্যক্তিগত এবং কর্মজীবন
কাজের প্রতি খুব সংবেদনশীল রবিনের ব্যক্তিগত জীবন এবং কর্মজীবন খুব আলাদা না। তার ব্যক্তিজীবনের সম্পর্কগুলোই তার কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তার প্রথম সম্পর্ক ফ্র্যাংক এলার যে কিনা বিল ক্লিনটনের বন্ধু ছিলো, সেই পরিচয়ের সুবাদেই, ক্লিনটনের প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার সুযোগ পান রবিন। যদিও এলার এর সাথে রবিনের সম্পর্ক পরিণয় পর্যন্ত যায় নাই।এলার পরবর্তীতে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেন এবং বাধ্যতামূলক যুদ্ধে অংশ গ্রহণের বিরোধিতা করেন। সেই সব নিয়ে হতাশা এবং বিষণ্ণ এলার ১৯৭০ সালে নিজের শটগান দিয়ে সুইসাইড করেন। সেই আত্নহত্যা ঐ সময়ে ব্যাপক আলোচোনার জন্ম দিয়েছিলো। 
cover
রবিন জনসন থেকে রবিন রাফ্যেল হন আর্নি র‍্যাফেলের সাথে পরিণয়ের মাধ্যমে। ১৯৭২ সালে সিআইএ তে বিশ্লেষক হিসেবে রবিন যোগ দেন। সেখান থেকে ১৯৭৫ সালে ইসলামাবাদে তাকে ফরেন সার্ভিস বিভাগে কাজ করার জন্য পাঠানো হয়। আর্নিও তখন ইসলামাবাদে একজন পলিটিক্যাল অফিসার হিসেবে কর্মরত। ১৯৭৮ সাল পর্যিন্ত তারা পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন, এরপর তারা আবার তেহরানে ফিরে যান এবং তখনই বিয়ে করেন। চাকরীক্ষেত্রে রবিন তার দক্ষতা দেখাতে থাকেন, ওয়াশিংটন ফিরে গিয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্টে তার বদলি হয়, সেখানে তিনি সহকারী পরিচালক হিসবে দক্ষিণ এশিয়া এবং প্রাচ্য সামলানোর দায়িত্ব পান।
cover
এদিকে তার স্বামী তখনো ইরানে, ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব ঘটে ইরানে যেটি পরবর্তীতে আমেরিকান জিম্মি সংকট সৃষ্টি করে। ফারসীতে পারদর্শী আর্নি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যার ফলাফল হিসেবে রোনাল্ড রিগ্যান প্রশাসন তাকে ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানে রাষ্ট্রদূত করে পাঠায়। সেখানেই ১৯৮৮ সালে রহস্যময় বিমান দুর্ঘটনায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের সাথে তার মৃত্যু হয়। তবে ১৯৮০ সালেই রবিন এবং আর্নির বিচ্ছেদ ঘটে। বিচ্ছেদে বিপর্যস্ত হয়ে যান রবিন, এরপর তিনি লন্ডনে পোস্টিং নিয়ে চলে যান। সেখান থেকে তাকে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ভারতে পাঠানো হয়।
আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান অধ্যায়
১৯৯৩ সালে ক্লিনটন ক্ষমতায় আসলে তাকে অনেক নিচ থেকে উপরে উঠিয়ে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক পরিচালক বানিয়ে দেন। উর্দুতে দক্ষ এই কূটনীতিক এরপর নিজের সেরাটা দেন, চার বছরের সেই কর্ম ক্ষেত্রে নিজের জাত চেনান, বিশেষ করে পাকিস্তানের সাথে একদম মিশে যেতে পেরেছিলেন তিনি। তিনি যখন দায়িত্ব নেন, তখন ভারত, পাকিস্তান উত্তাপ চরমে, সেই সময় তিনি পাকিস্তানের পক্ষ হয়ে কথা বলেছেন। বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যুতে তিনি প্রকাশ্যে পাকিস্তানের হয়ে কথা বলেছেন। তখন পাকিস্তানে সামরিক সাহায্য পাঠানোর জন্য এবং দুই দেশের সামরিক সমঝোতা প্রক্রিয়ায় মুখ্য ভুমিকা পালন করেন রবিন। পাকিস্তানে যে এফ-সিক্সটিন যুদ্ধবিমান কিনেছিলো ওই সময় সেটা রবিনের কারণেই সম্ভব হয়েছিলো।

এছাড়াও আফগানিস্তানে তখন সোভিয়েত আগ্রাসন চলছিলো। আমেরিকা, পাকিস্তান গোয়েন্দাদের সহযোগিতায় আফগান মুজাহিদদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলো যেখানে তিনি একদম মাঠে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, এছাড়া তালেবান গোষ্ঠির সাথে বেশ কয়েকবার বৈঠক করেছিলেন বলে জানা যায়। তাদের সম্পর্কে রবিনের উক্তি ছিলো, “তারা অনেক ভদ্র”। অথচ এই আমেরিকাই পরবর্তীতে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে আফগানিস্তানে ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সূচনা করে।
cover
যাইহোক রবিন তার কর্মের পুরস্কার খুব তাড়াতাড়ি পেয়ে যান, তাকে তিউনিসিয়ায় আমেরিকার রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়। ব্যক্তিজীবন এবং পেশাগত জীবন কোনোটিতেই ধাতস্থ হতে পারেননি তিনি। তার বিয়ে করা এবং ভাঙা চলতেই থাকে। ১৯৯০ সালে তিনি লিওনার্ড আর্থার এশটন নামের একজন দক্ষিণ আফ্রিকান সাংবাদিককে বিয়ে করেন। সেটি ভেঙে যায় ২০০০ সালে। সেখানে তাদের একটি মেয়ে জন্ম হয়। এরপর তিনি আবার বিয়ে করেন রবার্ট পিয়ার্স নামের একজন ব্রিটিশ কূটনীতিককে। সেই বিয়ে ভেঙে যায় ২০০৪ সালে।

রবিন সবসময়েই “কনফ্লিক্ট জোন” গুলোয় কাজ করতে পছন্দ করতেন। ২০০৩ সালে তিনি ইরাকে যান। ইরাক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, আমেরিকা ইরাক “পুনর্গঠন” প্রক্রিয়া হাতে নেয়। রবিন সেই প্রজেক্টে ডেপুটি মহাপরিদর্শক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে ইউএস এইডের আওতায় প্রায় ৬১ বিলিয়ন ডলার খরচ করে। ২০০৭ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর যোগ দেন একটি লবিং ফার্মে। যেখানে তার ক্লায়েন্ট ছিলো পাকিস্তান সরকার। এরপর বারাক ওবামা প্রশাসন ক্ষমতায় আসে, সেখানে ওবামা রিচার্ড হলব্রুক নামের আরেকজন ঝানু কূটনীতিককে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করেন। রিচার্ড হলব্রুক দায়িত্ব নিয়েই নিজের বিশ্বাসী রবিনকে আবার স্টেট ডিপার্টমেন্টে ফিরিয়ে আনেন। আফগান পাকিস্তান টাস্কফোর্সের আওতায় রবিন এবং তার দল পাকিস্তানে প্রতিবছর প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলার সাহয্য পাঠায়। 
এফবিআই এর তদন্ত
রবিনের এই পাকিস্তান প্রীতি নিজ দেশেই তাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে। ৭ নভেম্বর ২০১৪ সালে এফ বি আই তাকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এবং গোপনীয় তথ্য পাচার করার অভিযোগ আনে। তার বাসায় এবং অফিসে বেশ কয়েকবার অভিযান চালানো হয় তবে শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালে তার বিরুদ্ধে করা তদন্ত স্থগিত করা হয়। তার নামে কোনো অভিযোগ আনা হয় নি। 
রবিন বর্তমানে তার দুই মেয়ে আলেক্সজান্ড্রা এবং আন্নার সাথে নীরবে নিভৃতে জীবন যাপন করছে। এই ঝানু কূটনীতিক কে নিয়ে তার সহকর্মীরা সবাই একমত যে, আমেরিকার জন্য সর্বোচ্চ যতটুক করা দরকার তিনি সেটা করেছেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ যেহেতু প্রমাণিত হয় নি সুতরাং তাকে অভিযুক্ত করাটা ঠিক নয়। তবে এটা সত্যি যে কাজ থেকে তার চলে যাওয়া পাকিস্তানের জন্য একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি থাকলে হয়তো আমেরিকা যে সাহয্য দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে পাকিস্তানে সেটা আর হতো না।   
তথ্যসূত্র
  • https://www.washingtonpost.com/lifestyle/style/who-is-robin-raphel-the-state-department-veteran-caught-up-in-pakistan-intrigue/2014/12/16/cfa4179e-8240-11e4-8882-03cf08410beb_story.html?fbclid=IwAR3BnTjywD2TCyHJxJboWr7PbaPDvkwN1QCwG9D_ohVZNYxlG0c7jpBAXQU
  • https://www.telegraph.co.uk/news/worldnews/northamerica/11217802/FBI-searches-home-of-former-envoy-labelled-Lady-Taliban.html?fbclid
  • https://1997-2001.state.gov/about_state/biography/raphel_tunisia.html
  • https://peoplepill.com/people/robin-raphel
  • https://www.csis.org/people/robin-l-raphel
  • https://www.nytimes.com/1992/11/22/magazine/most-likely-to-succeed.html

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021