Link copied.
সমুদ্রের নতুন দুর্যোগ 'কোভিড বর্জ্য': ২০২০ সালে সমুদ্রে ফেলা হয়েছে ১৬০ কোটি পূনঃব্যবহারহীন মাস্ক
writer
অনুসরণকারী
cover
২০১৯ সালের শেষদিকে চীনের উহানে যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয় তখন থেকেই ফেস মাস্কের ব্যাপক প্রচলন শুরু ঘটে। তবে ইনফ্লুয়েঞ্জা জনিত রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে মাস্কের প্রচলন শুরু হয় ১৯১৮ সালের দিকে। সে সময় পৃথিবীজুড়ে তাণ্ডবলীলা চালিয়েছিল স্প্যানিশ ফ্লু। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ ইউরোপের দেশ সমূহে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্কের ব্যবহার নিশ্চিত করে সরকার। গবেষকরা মনে করতেন এই ধরণের ভাইরাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে মানবদেহে প্রবেশ করে ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। করোনাভাইরাস সরাসরি ইনফ্লুয়েঞ্জা না হলেও এর পরিবর্তিত রূপ। যার কারণে গবেষণায় দেখা গেছে এটিও সরাসরি নিঃশ্বাসের সঙ্গে মানবেদেহে প্রবেশ করে। 
cover
এই শতাব্দীতে সংগঠিত বার্ড ফ্লু এবং সার্স ভাইরাসের তাণ্ডব থামানো গেলেও কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ থামাতে পারছে না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটির দাবি, করোনাভাইরাসের উৎস খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এটি নিয়ে বিস্তর গবেষণার সুযোগ নেই। তবুও প্রথম থেকেই বিশ্ববাসীকে মাস্ক ব্যবহারে উৎসাহিত করে আসছে ডব্লিউএইচও। ফলশ্রুতিতে মাস্কের উৎপাদন বেড়েছে কয়েকশো গুণ বেশি। কিন্তু ব্যবহৃত এই মাস্ক সমূহ কোথায় পতিত হচ্ছে তা নিয়েও নতুন করে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। কারণ সকল মাস্ক পচনশীল নয় কিংবা পচলেও যে সময় লাগে তাতে পরিবেশ দূষণের বড়সড় সম্ভাবনা রয়েছে। আবার প্রতিদিন ব্যবহৃত মাস্কের একটি বড় অংশ ফেলা হয় সমুদ্রে যা নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে পরিবেশবিদদের। আজ আমরা মাস্ক কিভাবে পরিবেশের দূষণ করছে এবং এই বিষয়ে করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। 
ডিসপোজেবল ফেস মাস্কের আকাশচুম্বি চাহিদা

করোনাভাইরাসের প্রথম ঢেউ শুরু হওয়ার পর মানুষের মাঝে অসচেতনতা দেখে ডব্লিউএইচও রাষ্টপ্রধানদের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে তৎপরতা দেখায়। প্রায় প্রতিটি উন্নত, অনুন্নত এবং মধ্যম আয়ের দেশই মাস্ক ক্রয়ের হিড়িক পড়ে যায়। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় আমাদের দেশেও মাস্কের অভাব দেখা দিয়েছিল। চীন থেকে আমদানিকৃত KN95 ডিসপোজেবল মাস্ক সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে উধাও হয়ে যায়। চীন রপ্তানি বন্ধ করার পর দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে নতুন করে মাস্ক উৎপাদন শুরু হয়। শুধুমাত্র আমাদের দেশেই নয়, ইউরোপের অনেক দেশেই মাস্কের স্বল্পতা দেখা দেয়ায় করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হয়। 
cover
ন্যাশনাল জিওগ্রাফির তথ্যানুযায়ী প্রতিমাসে বিশ্বজুড়ে ১২৯ বিলিয়ন মাস্ক ব্যবহৃত হয়। আর প্রতি মিনিটের হিসেবে ৩ মিলিয়ন! এর মধ্যে KN95 এবং সার্জিকাল মাস্কও ছিল। যদিও অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উৎপাদিত মাস্কও বাজারে প্রবেশ করে যার হিসেব নেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে। ডব্লিউএইচও'র হিসেব অনুযায়ী ২০২০ সালে শুধুমাত্র ব্রিটেনে মাস্কের চাহিদা ছিল ২৪.৩৭ বিলিয়ন। ২০২০ সালের শুরুতে এক সমীক্ষায় সংস্থাটির দাবি ছিল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৮৯ মিলিয়ন মাস্কের প্রয়োজন হতে পারে। বাস্তবিক অর্থে এই সংখ্যা মিলিয়ন থেকে বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। উৎপাদন এবং ব্যবহারে আরো এগিয়ে রয়েছে চীন এবং জাপান। চীন জানিয়েছে তারা প্রতিদিন স্বাভাবিকের চেয়েও ১৫ মিলিয়ন মাস্ক বেশি উৎপাদন শুরু করেছে। আবার জাপান ২০২০ সালের এপ্রিলে প্রতি মাসে ৬০০ মিলিয়ন মাস্ক উৎপাদন করেছিল। 
এইতো গেলো শুধুমাত্র কয়েকটি দেশের মাস্ক উৎপাদনের হিসেবনিকেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী পৃথিবীতে প্রায় ৪৩ মিলিয়ন স্বাস্থ্য কর্মী প্রতিদিন কাজ করছেন। অফিশিয়াল হিসেবে বাদ দিলেও আরো কয়েক মিলিয়ন মানুষ রয়েছেন যারা কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সেবা প্রদান করেন, কেউ বা স্বেচ্ছাসবেক হিসেবে কাজ করছেন। করোনা মোকাবেলায় প্রথম সারির এসকল করোনা যোদ্ধাদের প্রতিটি মাস্ক ৪ ঘন্টা পরেই বদলানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কারণ সম্মুখ সাড়ির এসকল কর্মীরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজটিই করছেন। তাই তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৮ কর্ম ঘণ্টা হিসেবে প্রত্যেক স্বাস্থ্য কর্মী যদি প্রতিদিন ২টি করে মাস্ক ব্যবহার করেন তাহলে সারাবিশ্বে শুধুমাত্র কর্মীদের জন্যই ২৮ মিলিয়ন সার্জিকাল মাস্কের প্রয়োজন হয়। যদিও সাম্প্রতিকালে এক গবেষণায় দেখা গেছে অতিরিক্ত রোগী সামাল দিতে গিয়ে স্বাস্থ্য খাতে প্রতিদিন অতিরিক্ত আরো ১২ মিলিয়ন মাস্ক বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। 
cover
মাস্কের এত এত চাহিদা সামাল দিতে বেশ হিমশিম খাচ্ছে বিভিন্ন দেশ। ফলশ্রুতিতে স্বাস্থ্যখাতে ব্যবহারযোগ্য মাস্কের উৎপাদন এবং আমদানির জন্য চেয়ে থাকতে হচ্ছে। মাস্ক উৎপাদন এবং রপ্তানিতে সবচেয়ে এগিয়ে চীন। তবুও ২০২০ সালের জানুয়ারিতে করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার কারণে রপ্তানি বন্ধ করে দেয় দেশটির সরকার। যদিও পরবর্তীতে এটিকে লাভজনক বুঝতে পেরে ফেব্রুয়ারি মাসে আবারও রপ্তানি শুরু করে দেশটি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের অক্টোবর অবধি বাংলাদেশের বাজারেও চীনের N95 সার্জিকাল মাস্কের ব্যাপক সংকট দেখা গিয়েছে। তখন দেশীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উৎপাদিত নিম্নমানের নকল মাস্কে বাজার সয়লাব হয়। 
cover
চীনের মাস্ক রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার পূর্বে প্রথম দেশ হিসেবে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চায়নিজ তাইপে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন গতবছরের মার্চের মাঝামাঝি নাগাদ এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও ইউনিয়নের দেশ সমূহের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের নির্দেশনা দেয়া হয়। পরবর্তীতে অবশ্য বাণিজ্যিক দিক বিবেচনায় এনে মাস্ক রপ্তানি শুরু করে দেশগুলো। মাস্ক বাণিজ্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ। যদিও চীনের কল্যাণে দক্ষিণ, পূর্ব এশিয়ার ভোগান্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এই কারণে চীন অবশ্যই ধন্যবাদের দাবি রাখে। গতবছর মাস্ক রপ্তানিতে সবথেকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। জাতীয় জরুরী অবস্থার মাঝে এপ্রিল থেকে জুলাই মাস অবধি রপ্তানি বন্ধ রাখে তারা। যদিও বাণিজ্যিক চুক্তির অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোকে ঠিকি সরবরাহ করেছিল তারা। 
সমুদ্রে মহামারীর প্রভাব

শুরুর দিকে মনে হয়েছিল বৈশ্বিক মহামারী পরিবেশের উপর এক রূপালী আস্তরণ হিসেবে কাজ করবে। সামাজিক দূরত্ব মানুষকে রাস্তা থেকে দূরে এবং আকাশের বাইরে রাখার কারণে, বিশ্বজুড়ে বাতাসের গুণগত মানের ব্যাপক উন্নতি দেখা দিয়েছিল। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে কার্বন নিঃসরণ প্রায় ৪ শতাংশ কমে যায়। চীনে ব্যাপক হারে কারখানা বন্ধ থাকার কারণে অস্থায়ীভাবে দেশের কুখ্যাত ধোঁয়াশা দূর হয় এবং দূষণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। করোনাভাইরাসের আরও একটি দীর্ঘস্থায়ী ফলাফল হলো এশিয়ায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রচেষ্টা। যাইহোক, আমাদের মহাসাগরগুলির জন্য মহারমারির প্রভাব হিসেবে একই কথা বলা যাচ্ছে না, যা সাম্প্রতিক মাসগুলিতে আরো কঠিন রূপ লাভ করেছে। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজ্ঞানীদের ধারণা গত বছর প্রায় ১৫০ কোটি মাস্ক সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। এসব মাস্কে থাকা বিভিন্ন উপাদান পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যেগুলো সাগরে বাস করা প্রাণীদের জন্যও বিপজ্জনক।

জার্মানির একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংস্থার কর্মকর্তা ব্যার্নহার্ড শোড্রোভস্কি বলেন, উচ্চমানের হোক বা সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক সবই ময়লার পাত্রে ফেলার কথা। এগুলো রিসাইকেলের উপযোগী নয়। মেডিকেল বর্জ্য হওয়ায় সেগুলো পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু সব মাস্ক পোড়ানো হচ্ছে না। একটা বিশাল অংশ সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে। করোনাভাইরাস মহামারী শুধু মানুষের জীবন, অর্থনীতিকেই তোলপাড় করে দেয়নি, মারাত্মক ক্ষতির দিকে নিয়ে চলেছে সামুদ্রিক পরিবেশকেও - সম্প্রতি ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে ভূ-মধ্যসাগরীয় উপকূল কোট দাজুর বা ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরায় পর্যবেক্ষণ করে এমন তথ্য প্রকাশ করে ফরাসী অলাভজনক সংগঠন 'অপেরেশন মের প্রপ্রের'। এই সংগঠনটি মূলত সমুদ্রের পাড় ও তলা থেকে বর্জ্য কুড়িয়ে পরিষ্কার করে।

জার্মানির একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংস্থার কর্মকর্তা ব্যার্নহার্ড শোড্রোভস্কি বলেন, উচ্চমানের হোক বা সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক সবই ময়লার পাত্রে ফেলার কথা। এগুলো রিসাইকেলের উপযোগী নয়। মেডিকেল বর্জ্য হওয়ায় সেগুলো পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু সব মাস্ক পোড়ানো হচ্ছে না। একটা বিশাল অংশ সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে। করোনাভাইরাস মহামারী শুধু মানুষের জীবন, অর্থনীতিকেই তোলপাড় করে দেয়নি, মারাত্মক ক্ষতির দিকে নিয়ে চলেছে সামুদ্রিক পরিবেশকেও - সম্প্রতি ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে ভূ-মধ্যসাগরীয় উপকূল কোট দাজুর বা ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরায় পর্যবেক্ষণ করে এমন তথ্য প্রকাশ করে ফরাসী অলাভজনক সংগঠন 'অপেরেশন মের প্রপ্রের'। এই সংগঠনটি মূলত সমুদ্রের পাড় ও তলা থেকে বর্জ্য কুড়িয়ে পরিষ্কার করে।

মহামারীর শুরুর পর গত এপ্রিল থেকে পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সংগঠনটির সদস্যরা দেখলেন, অসংখ্য মাস্ক ভাসছে সমুদ্রে আর রাবারের অসংখ্য গ্লাভস জলাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে উপকূলের সর্বত্র। শুধু তাই নয়, প্লাস্টিকের কাপ আর অ্যালুমিনিয়ামের কৌটার জঞ্জালের সঙ্গে এসব মাস্ক, গ্লাভস ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের প্লাস্টিকের বোতল জমা পড়ছে ভূমধ্যসাগরের তলায়। এই বর্জ্যগুলোকে মূলত 'কোভিড বর্জ্য' হিসেবে উল্লেখ করেন সংগঠনটির সদস্য জোফ্রি পেল্টিয়া।
cover
মাস্কের কারণে সৃষ্ট দূষণ

কোভিড-১৯ মোকাবেলা করতে গিয়ে পৃথিবীর মানুষ যে যুদ্ধে নেমেছিল তাতে ব্যবহৃত জীবন রক্ষাকারী সার্জিকাল মাস্কের একটি বিশাল একটি অংশ পতিত হয়েছে সমুদ্রে। গবেষকদের মতে শুধুমাত্র ২০২০ সালের হিসেবে এর সংখ্যা ১.৬ বিলিয়ন যা ৫,৫০০ টন প্লাস্টিকের সমপরিমাণ। ডিসপোজেবল বলা হলেও এসকল সার্জিকাল মাস্ক খুব কম সময়ে পরিবেশের সাথে মিশতে পারে না। বিজ্ঞানীদের হিসেবে ডিসপোজেবল মাস্ক একেবারে নিষ্পত্তি হতে ৪৫০ বছর সময় লাগবে যা মানুষরে জন্য সহ্যকর হলেও মহাসমুদ্রের জীবজগতের জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে। এমনিতেই অতিরিক্ত প্লাস্টিকের ব্যবহার এবং সমুদ্রে ফেলার কারণে ইতোমধ্যেই সামুদ্রিক খাদ্যভাণ্ডার যে কতটুক ঝুঁকির মাঝে আছে তা বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময় জানিয়ে আসছেন।

ওশেন এশিয়ার ২০২০ সালের প্রতিবেদনে, মাস্ক অন বিচ, গবেষকরা পরিবেশে প্রবেশযোগ্য ডিসপোজেবল মাস্কের সংখ্যার যুক্তিসঙ্গত অনুমান প্রদানের জন্য একটি সূত্র তৈরি করেছেন। তারই অংশ হিসেবে তারা বার্ষিক ৫২ বিলিয়ন ডিসপোজেবল মাস্ক এবং জল ব্যবস্থাপনার বাইরে বেরিয়ে আসা ৩ শতাংশ মাস্ক এর তথ্য প্রদান করেন। দলটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, ২০২০ সালে আমাদের মহাসাগরে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ফেস মাস্ক ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। যেটা প্রায় ৫,৫০০ টন প্লাস্টিক দূষণের সমান। ওশান্স এশিয়ার অপারেশন্স ডিরেক্টর গ্যারি স্টোকস বলেন, 'এখন আমাদের মাস্কের সঙ্গেও লড়তে হচ্ছে ৷ সেগুলো সৈকতে ভেসে আসছে। এসব দেখে মনে প্রশ্ন জাগে কেন এত মাস্ক স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নষ্ট না হয়ে সমুদ্রে এসে পড়ছে? এগুলো ধ্বংস করার সঠিক উপায় কী?'

একবার ব্যবহারযোগ্য হলেও ডিসপোজেবল মাস্ক সমুদ্রে থাকা অবস্থায় পচে যেতে চার শতাব্দীরও বেশি সময় লাগবে । সাধারণত পলিপ্রোপিলিন দিয়ে তৈরি এই মাস্কগুলো সহজেই মাইক্রোপ্লাস্টিক্সে বিভক্ত হয়ে যায়। যদিও মানুষের স্বাস্থ্যের উপর মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব এখনও নির্ধারিত হয়নি, এই টুকরাগুলি আমাদের জল সরবরাহে সাধারণ অংশে পরিণত হয়েছে, যা মোটেই কাম্য নয়। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যের ৯৪% ট্যাপের পানি দূষিত বলে মনে করা হয়।
cover
সার্জিকাল মাস্ক তৈরি হয় পলিপ্রোপিলিন দিয়ে যা এক সময় মাইক্রোপ্লাস্টিকে রূপান্তরিত হয়। এখন অবধি বিজ্ঞান মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক বা মানবেদেহে এর প্রভাব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পারেনি। কিন্তু ঠিকি তা ভূগর্ভস্থ পানির মান দিন দিন খারাপ করে তুলেছে। মূলত মাইক্রোপ্লাস্টিকের আধিক্যের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৯৪ শতাংশ ট্যাপের পানি অনিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর আমরা ইতোমধ্যেই জানি অনিরাপদ খাবার পানি কলেরার মতো রোগ ছড়াতে পারে। তথ্যানুযায়ী প্লাস্টিকের বোতল পঁচতে যত বছর সময় লাগে ঠিক গতবছর সময় লাগে ডিসপোজেবল মাস্কের ক্ষেত্রেও! সে হিসেবে সমুদ্রে পতিত ১.৬ বিলিয়ন মাস্ক যে সেখানকার অফুরন্ত খাদ্যভাণ্ডারের ক্ষতি করবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। 
cover
গতবছর ফ্রান্স ২ বিলিয়ন মাস্ক আমদানির অনুমোদন দেয়ার পর অপারেশন মের প্রোপারের লওরেন্ট লমবার্ড বলেন 'ইউরোপিয়ানরা যে হারে মাস্ক ভূমধ্যসাগরে ফেলছে তাতে মাস্কের সংখ্যা সাগরে থাকা জেলিফিশের চেয়েও বেড়ে যেতে পারে।' এছাড়াও এশিয়ান একটি পত্রিকা দাবি করে হংকংয়ের প্রতি ১০০ মিটার সমুদ্রসৈকতে ৭০টি ব্যবহৃত মাস্ক পেয়েছে স্বেচ্ছাসবেকেরা। মূলত সাগরে ফেলা এসব মাস্ক ঢেউয়ার সাথে পুনরায় তীরে এসে আবর্জনা হিসেবে জমা হয়েছে। ব্যবহৃত এসব মাস্কের কারণে বিশ্ব পরিবেশের প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ক্ষতিসাধন হয়েছে বলে মনে করে জাতিসংঘ। আর এই ক্ষতিসাধন এখনো চলমান রয়েছে। 
পরিবেশ দূষণ রোধের উপায়

মুদি দোকানের পার্কিং লট থেকে শুরু করে সমুদ্রসৈকতে পৌঁছে গেছে ব্যবহৃত মাস্ক। চলার পথে আমরা প্রতিদিনই এমন মাস্ক পড়ে থাকতে দেখি। কিন্তু কোনো ব্যক্তির ব্যবহৃত বিধায় কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আমরা সেটা আশেপাশের ডাস্টবিনে ফেলি না। এভাবে এই হালকার মাস্ক পদতলে পিষ্ট হয়ে, বাতাসে উঁড়ে এক জায়গা থেকে প্রতিনিয়ত অন্য জায়গায় যাচ্ছে। যদি ৪৫০ বছর এটি কেউ ছুঁয়ে না দেখে তবে ততদিন এটি নানান রূপে পরিবেশে ঘুরতে থাকবে। কখনো মাটি, কখনো পানি আর কখনো বাতাস দূষণ করবে এই ব্যবহৃত ডিসপোজেবল মাস্ক।
cover
এক বছর আগেও শত বিলিয়ন মাস্ক উৎপাদনের সময় কারোরই মাথায় ছিল না এগুলো পরিবেশের কতটুক ক্ষতি করবে। মোটামুটি সবাই ব্যস্ত ছিল কোভিড-১৯ থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে।
ইউনিসফের দাবি ২০১৯ সালে পুরো পৃথিবীতে ৮০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের মাস্ক উৎপাদিত হয়েছিল। অথচ ২০২০ সালে উৎপাদিত মাস্কের বাজারমূল্য ১৬৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। বর্তমানে ভ্যাকসিনের আওতায় এনে মানুষকে নিরাপত্তা প্রদান করা হলেও দেড় বছর ধরে পৃথিবীতে জমা হওয়া এসব ব্যবহৃত মাস্ক, পিপিই, হ্যান্ডগ্লাবসের বর্জ্য কয়েকমাস যাবত সবাই কমবেশি চিন্তায় ফেলেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারপ্রধান সবাই ভাবছে ডিসপোজেবল মাস্কের কারণে সমুদ্রের পরিবেশের ক্ষতির বিষয়ে।
cover
ডিসপোজেবল মাস্ক যাতে পরিবেশের ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন মার্কিন পরিবেশবিদরা। যেহেতু সরকার বা মিউনিসিপাল কর্তৃপক্ষ চাইলেই যত্রতত্র পড়ে থাকা মাস্ক সংগ্রহ করে ডাস্টবিনে জমা দিতে পারছে না সেক্ষেত্রে ব্যক্তি উদ্যোগেই এই কাজগুলো করার অনুরোধ করেছেন তারা। এছাড়াও অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্যের চেয়ে পরিমাণে কম ভেবে এগুলো সমুদ্রে নিক্ষেপ করা যাবে না। এতে করে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। দেখা দিতে পারে সামুদ্রিক প্রাণীদেহে নানারকম রোগ। করোনাভাইরাস এখনো পৃৃথিবী থেকে নির্মূল হয়নি। সে হিসেবে বলা যায় মাস্কের ব্যবহার ঠিক আগের মতোই আছে। আমরা যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে নিজের ব্যবহৃত মাস্কগুলো সঠিক জায়গায় না ফেলি তাহলে এর ভুক্তভোগী একদিন আমরা নিজেরাই হবো। 

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021