Link copied.
আফ্রিকা যেভাবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠতে পারে
writer
অনুসরণকারী
cover
অভিযাত্রী হেনরী এম স্ট্যানলি আফ্রিকাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ বলে অভিহিত করেছিলেন। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বার্টন, লিভিংস্টোন, স্ট্যানলির মতো অভিযাত্রীরা আফ্রিকার পূর্ণ রূপ পরিচয় করে দেন পৃথিবীকে। আমাদের সামনে আফ্রিকার কথা বললেই মাথায় আসে, এর বিস্তীর্ণ সাভানা অঞ্চল যা পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় জীব বৈচিত্রে ভরপুর, মাসাই, বুশম্যান সহ বিভিন্ন উপজাতিদের কথা। সুদান, নাইজেরিয়া, কঙ্গো সহ কয়েকটি দেশ যারা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে রক্তপাত সংঘাতে জর্জরিত হয়ে আছে সব সময়। মোদ্দা কথা, আফ্রিকা মহাদেশ বর্তমান পৃথিবীর পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর বিশাল এক আবাস ক্ষেত্র। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে। বিশ্বায়নে এই যুগে ইউরোপ এশিয়া যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে , আফ্রিকাও কিন্তু এগোচ্ছে।

বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির অঞ্চল হচ্ছে এই দক্ষিণ এশিয়া। বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, কাছাকাছি থাকা ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড তরতরীয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। গবেষকরা বেশ কয়েকবছর ধরেই বলে আসছেন যে, এই দক্ষিণ এশিয়ার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরী করবে আফ্রিকার দেশ গুলো। সম্প্রতি আফ্রিকার দেশ গুলোর রাষ্ট্রীয় নেতারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদলে একটি অর্থনোইতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন, যেখানে তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে পারস্পারিক বাণিজ্যের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করা। এই আফ্রিকার বর্তমান, ভবিষ্যতের অর্থিনীতি নিয়েই আজকের আয়োজন। প্রযুক্তি গত উন্নতি এবং উদ্যোক্তাদের অবস্থা কেমন সেটাই জানাবো আজকে।
অর্থনীতিতে কোনো দেশের উন্নতি মাপার জন্য জিডিপি ব্যবহার করা হয়। জিডিপি আসলে দেখায় যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে সে দেশের দেশজ উৎপাদন ঠিক কতটা। আফ্রিকায় পৃথিবীর প্রায় ১৭% মানুষ থাকে কিন্তু বৈশ্বিক জিডিপিতে তাদের অবদান মাত্র ৩%। এ থেকে বোঝা যায়, বাকি মহাদেশ থেকে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা কতটা পিছিয়ে রয়েছে। এতো কম হওয়ার পেছনে দায়ী মূলত তাদের প্রাকৃতিক অবস্থা, দুর্নীতি, সংঘাত, ঔপনিবেশিক চিহ্ন বা ক্ষত যা তারা আজও বয়ে বেড়াচ্ছে। আফ্রিকায় পৃথিবীর ৬০% উর্বর অনাবাদী জমি রয়েছে। এতো মানুষের বসবাস হয়েও সেগুলো কাজে না লাগাতে না পারা একটি বিস্ময়কর অবস্থা। তবে অবস্থা পরিবর্তন হচ্ছে। একবিংশ শতাব্দির প্রযুক্তির ছোয়া জীবনমান উন্নতি করছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম বলছে যে আফ্রিকা যদি তাদের টেকসই অবকাঠামোগত পরিবর্তন গুলো ধরে রাখতে পারে তাহলে ৫০ বছরের মধ্যে তারা চীনের প্রবৃদ্ধিকে ছুতে পারবে। আরেকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে ২০২৫ সালের মধ্যে তাদের বাণিজ্য ৫.৬ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
  
cover
চলুন তাদের শহরকেন্দ্রিক জীবন ব্যবস্থা, কৃষিক্ষেত্র, প্রাকৃতিক সম্পদের অবস্থা কেমন একটু জেনে আসা যাক। আফ্রিকা বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধমান শহরকেন্দ্রিক জীবন ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। Mickensey And company বলছে যে, ২০১৫ থেকে ২০৪৫ এর মধ্যে প্রায় ২৪ মিলিয়ন মানুষ শহরে চলে আসবে। যেটা ভারত এবং চীনের তুলনায় বেশী। আফ্রিকা যে দারিদ্র পীড়িত অঞ্চল হিসেবে গত শতাব্দিতেও পরিচিত ছিলো তারা সেটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, ২০১৯ সালের ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এর রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে আফ্রিকার দরিদ্রতার সীমা ৫৪% থেকে ৪১ % এ নেমে এসেছে, যেটা প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মানুষকে দারিদ্র সীমার উপরে নিয়ে এসেছে। এরকম অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে সেটা ২৩% এ নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শহরকেন্দ্রিক মানুষের জীবন ব্যবস্থা এবং দারিদ্রসীমার উপরে চলে আসা মানে হচ্ছে তাদের ক্রয় ক্ষমতা বেড়ে গেছে।

২০২৫ সালের মধ্যে তাদের ভোগপণ্য ব্যয় পরিমাণ ৩.৮ % বেড়ে ২.১ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। আর ব্যবসার পরিমাণ ২.৬ ট্রিলিয়ন থেকে ৩.৫ ট্রিলিয়নে যাবে। যেটা বেশ আশাব্যাঞ্জক। আফ্রিকায় প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর ১০% তেল, ৪০% সোনা, ৮০% লিথিয়াম। তবে এতো কিছুর পরেও জিডিপিতে এই সম্পদের অবদান ৩০% এর বেশী না। এছাড়া তাদের যে পরিমাণ অনাবাদী জমি রয়েছে, সেটা দিয়ে তারা ২-৩ গুণ ফসল উৎপাদনে সক্ষম।  
cover
উপরের তথ্যগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, তাদের এই শহরমুখি জীবন ধারার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে শিল্পায়ন বিশেষ করে প্রচুর পরিমাণ টাকার বিনিয়োগ যেগুলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এর পরিধি বাড়াচ্ছে। সেই বিনিয়োগ এর অবস্থা কিরকম সেটা একটু বোঝার চেষ্টা করা যাক। গত শতাব্দির শেষ দিক থেকেই আফ্রিকায় বিভিন্ন উদ্যোক্তার উদ্যোগে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিস্তৃত শুরু হয়েছে। সেই উদোক্তারা কোনো সম্পদের পিছনে দৌড়াননি, তারা মানুষের সমস্যার পিছনে দৌড়াচ্ছে, সেখান থেকে তারা নিজেদের লাভ ও বের করে নিচ্ছে তার সাথে মানুষের সাথে সমস্যাও সমাধান করছে। এই ধরণের উদ্যোক্তাদের ইংরেজীতে বলা হয় Impact entrepreneurship. একটা জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ দেই-

ঘানায় বর্তমানে ব্যাটারিচালিত যানবাহন যেটাকে আমাদের দেশে ইজিবাইক, টমটম অনেক নামে ডাকা হয় সেটি অনেক জনপ্রিয়। চাইনিজ এই প্রযুক্তিটি তাদের জীবন ব্যবস্থার ধরণই পালটে দিয়েছে। নারীরা স্কুলে যেতে পারছে, গ্রামের মানুষরা চিকিৎসাসেবা নিতে পারছে। আরো অনেক ধরণের সুবিধা পাচ্ছে। সেখানকার বিশাল অংশের মানুষ সেই যানের বিক্রয় রক্ষণাবেক্ষণ এর সাথে জড়িয়ে পড়ছে। অর্থাৎ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এভাবে মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারছে।

এই বড় জনসংখ্যার কথা মাথায় রেখে বড় বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো টাকা নিয়ে ছুটছে আফ্রিকায়। কেবল মাত্র ২০২০ এই প্রায় ৩৪৭ টি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩৫৯ টি চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এরই ফলশ্রুতিতে ২০১৫ সালে যেখানে আফ্রিকার বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিলো ৪০০ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০১৯ এ সেটা ২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি চলে গিয়েছে। করোনা মহামারীর কারণে গতি একটু কমে গিয়েছে তা না হলে সেটা আরোও বাড়তো।
আফ্রিকার ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডিং থেকে দেখা যায়, সেখানকার তিনটি সেক্টরে বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশী হচ্ছে , সেগুলো হচ্ছে Fintech( অর্থখাতের আধুনিকায়ন) health tech(স্বাস্থ্যখাতের আধুনিকায়ন) clean tech(পরিবেশের ক্ষতি কমানো)।

এরমধ্যে Fintech ফান্ডিং এর প্রায় ৩১% দখল করে আছে। এরপর clean tech এবং health tech। অর্থিনীতি যদি সুসংহত করতে হয় তবে যত দ্রুত সম্ভব মানুষকে ব্যাংকিং চ্যানেল অথবা একটি ভালো ফাইনান্সিয়াল কাঠামোর ভিতরে আনতে হবে, এতে দেশের জনগণের কোথায় কি সমস্যা সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। আফ্রিকার দেশগুলো সে দিকেই এগোচ্ছে।  
cover
সবচেয়ে বেশী বিনিয়োগ হচ্ছে ইন্টারনেটভিত্তিক বাজার সম্প্রসারণের জন্য। আফ্রিকায় মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাত্র ৩৯% যেখানে নাকি বিশ্বের সংখ্যা প্রায় ৬২ শতাংশ। সুতরাং যদি একটি বড় অংশ ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় আনা যায় সেক্ষেত্রে অর্থনীতি বড় করার সুযোগ তৈরী হবে দেশগুলোর। World mobile নামের একটি বহুজাতিক মোবাইল নেটওয়ার্ক কোম্পানী আফ্রিকার বিভিন্নদেশ যেমন তাঞ্জানিয়ায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ করছে। এটার সুফল তারা পেতে শুরু করেছে ।

তবে কিছু কিন্তু আছে, এতো উন্নতি কিন্তু আফ্রিকার সব দেশগুলো হচ্ছে না। আফ্রিকার সবচেয়ে বড় তিনটি অর্থনীতির দেশ হচ্ছে মিশর, নাইজেরিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। এরা আগে থেকেই ব্যবসা বাণিজ্যে সফল বাকি দেশ গুলোর তুলনায়। মধ্য আফ্রিকার দেশ গুলো এখনো ব্যবসা বাণিজ্যে এখনো পিছিয়ে রয়েছে। ৩০ মে ২০১৯ সালে আফ্রিকার ২৪ টি দেশ The African Continental Free Trade Area (AfCFTA) চুক্তি সাক্ষর করেছে। তারা ২০৬৩ সালের মধ্যে একটি নিজেদের মধ্যে  ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারিত করে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদলে গড়ে ওঠা এই সংস্থাটির সচিবলায় ঘানায়।

বিশ্লেষকরা আশা করছেন আফ্রিকা যদি দুর্নীতি, জটিল ট্যাক্স কাঠামো, হিংসা হানা হানি সব পাশ কাটিয়ে এহিয়ে যেতে পারে, তাহলে দারিদ্রের বোঝা কাটিয়ে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর একটি অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠবে। তখন দেখা যাবে যে আপনি এখন যেই শহরগুলোকে অর্থনীতির মাইটোকন্ড্রিয়া ভাবছেন, সেগুলো তখন আফ্রিকার কয়েকটি শহর হয়ে যাবে। 
তথ্যসূত্র
  • https://www.entrepreneur.com/article/368132?fbclid=IwAR0P3gBoutj2M9Br832wUPsOV5SSseymVG4-Y3Fvf_ToBbHiBqbs8fGctkA
  • https://techcrunch.com/2021/02/11/how-african-startups-raised-investments-in-2020/
  • https://partechpartners.com/2020-africa-tech-venture-capital-report/
  • https://www.weforum.org/agenda/2020/02/africa-global-growth-economics-worldwide-gdp/
  • https://www.tralac.org/resources/our-resources/6730-continental-free-trade-area-cfta.html

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021