Link copied.
দক্ষ জনবলের অভাবে বছরে ৪-৫ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে বিদেশি কর্মীরা
writer
অনুসরণকারী
cover
খেয়াল করে দেখুন জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী এই সব কিছুই খুব ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এই ভারতীয় উপমহাদেশে। প্রশ্ন হচ্ছে, ধ্বংসযজ্ঞে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এই অঞ্চলে এতো বেশী হয় কেনো? তার অনেকগুলো উত্তরের মধ্যে একটি উত্তর হচ্ছে এই অঞ্চলে মানুষের সংখ্যা অনেক বেশী। ১০০ কোটি জনসংখ্যা নিয়ে ভারত, তার পাশে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের দেশে ১৬ কোটি জনসংখ্যা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। এই অঞ্চলের যেকোন সমস্যার একদম গোড়ায় গেলে সেখানে এতো জনসংখ্যার যে চাপ সেটি টের পাওয়া যায়। এতো মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকার গুলোকে, তার উপর ধনী গরীব বৈষম্যে নিচু শ্রেণীর লোক আরো গরীব হচ্ছে। সেই সব সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে কতৃপক্ষ নিত্য নতুন উপায় বের করছে।

বর্তমানে সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে এতো এতো মানুষকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা। বিশ্বের অনেক দেশেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিম্নগামী। সেই দেশগুলো অন্য দেশ থেকে জনসংখ্যা নিতে আগ্রহী, কর্মী নিতে আগ্রহী। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে জনশক্তি রপ্তানীও শুরু করেছে এই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। ভারত স্বভাবতই সে জায়গায় এগিয়ে আছে, বাংলাদেশ ও তবে পিছিয়ে নেই। আজকে আমরা বাংলাদেশ এর জনশক্তির কি অবস্থা সেটা জানার চেষ্টা করবো।
cover
বাংলাদেশের জনশক্তি
বাংলাদেশের জনসংখ্যা কত? এই আলাপটা অনেক পুরোনো, আমরা সবাই জানি এই উত্তর গুলো। তাও একটু করা দরকার, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৯ তথ্যবই অনুসারে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৬ লক্ষ। জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ১.৩৭। এর মধ্যে ১৫ বয়সের অধিকদের বিবেচনা করে কর্মজীবি মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ২০ লাখ। বেকার বসে আছে ২০ লক্ষ মানুষ। বেকারত্বের হার ৪.২। দারিদ্রের হার ২৩.২!

অর্থাৎ এখানে শুধু ১৫ বছরের অধিকদের হিসাবে নেয়া হয়েছে। আমাদের জনসংখ্যার বিশাল এক অংশ তাহলে এখনো প্রাপ্ত বয়স্ক হয় নি। তারা যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হবে, তখনকার চিত্রটা কিন্তু বেশ ভয়াবহ। স্বাধীনতার পর পরেই এই জনসংখ্যা সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিলো। দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকা দেশ, নিজের জনসংখ্যাকে খাওয়াতে পড়াতেই হিমশিম খাচ্ছিলো। ১৯৭৬ সালে সেই সমস্যার সমাধান হিসেবে সর্বপ্রথম জনসংখ্যা রপ্তানী করার চিন্তা করে সরকার। কিন্তু জনসংখ্যা রপ্তানী আবার কী? 
cover
সরকার চিন্তা করে এই জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা দরকার। দেশীয় কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে যদি শ্রমিক হিসেবে বিদেশে রপ্তানী করা যায়, সেটি অর্থনীতিতে রেমিটেন্স এর দুয়ার খুলে দিবে। সেটারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৬ সালে সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, লিবিয়াতে ৬ হাজার শ্রমিক পাঠানো হয়, যারা দেশে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা রেমিটেন্স পাঠায়। তারপরের রেখাটা উর্ধমুখী, ১০ বছরের মাথায় ১৯৮৬ সালে আমাদের বাইরে কর্মরত প্রবাসীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৮ হাজারে, যারা দেশে প্রায় ১৭৫২ কোটি টাকা পাঠায়। ২০০৬ সালে প্রবাসীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লক্ষ ৮১ হাজারে, যার রেমিটেন্স গিয়ে দাঁড়ায়, ৩৮ হাজার কোটি টাকায়! ২০১৬ সালে গিয়ে রেমিটেন্স গিয়ে দাঁড়ায় ১০৭,২৯৪ কোটি টাকায়, যার পেছনে সাড়ে সাত লক্ষ প্রবাসীর অবদান রয়েছে।

 
cover
জনসংখ্যা রপ্তানী করা দেশগুলোর মধ্যে সবার আগে এগিয়ে ছিলো সৌদি আরব। তবে ২০১৫ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ শ্রমিক গিয়েছে ওমানে, দ্বিতীয় স্থানে কাতার। পুরুষ শ্রমিক নেয়া বন্ধ করে দেয়ায় সৌদি তিনে নেমে গেছে। ১৯৯১ সাল থেকে নারী শ্রমিক বিদেশে পাঠানো শুরু হয়। সেখান থেকে ২০২১ পর্যন্ত ৯ লক্ষ ৫৩ হাজার নারি শ্রমিক বাইরে পাঠানো হয়েছে। 
cover
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা
শুরুতেই বলেছি সরকারী হিসাবে দেশে বেকার আছে ২০ লক্ষ। যার মধ্যে আবার কর্মক্ষম বেকার তরুণ এর সংখ্যা কত সেটার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে প্রতি বছর যে পরিমাণ তরুণ উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে বের হচ্ছে তাদের এক অসম চাকরীযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হচ্ছে। আবার দেশে বিশাল এক শ্রমবাজার গড়ে উঠেছে, যাদের জন্য গার্মেন্টস শিল্প বিকাশ করেছে খুব দ্রুত। এখন যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে দেশের মানুষকে কারিগরী শিক্ষায় শিক্ষিত গড়ে তোলা। গত কয়েক দশকে সেই দিক থেকে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। উন্নত দেশ গুলোর সহায়তায় আমাদের দেশে “টেকনিক্যাল” স্কুল তৈরি হয়েছে, যারা দক্ষ শ্রমিক তৈরীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

‘দক্ষ’ বলে এ দেশে কাজ করছে ভারত, চীন, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির নাগরিকরা কিন্তু আমাদের দেশের বড়বড় প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট অথবা আইটি বিভাগ, ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নীতি নির্ধারক জায়গায় ভারতীয়, শ্রীলংকান নাগরিকদের অধিক্য বেশী। সেই বাজারে অবস্থা কেমন একটু জেনে আসা যাক।  
,” প্রতিবছর আমাদের দেশ থেকে চার-পাঁচ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর এবার আমাদের রেমিট্যান্সের টার্গেট ২০ বিলিয়ন ডলার। তাহলে আমরা যা আনতে পারি তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ আবার বিদেশি কর্মীদের দিয়ে দিতে হয়। এ থেকে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিদের সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়।
অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০০৯ সালে অন্তত ৫ লাখ ভারতীয় নাগরিক বিনা কাগজপত্র বা অবৈধভাবে বাংলাদেশে বাস করছিলেন। এনজিও, গার্মেন্টস, বস্ত্র, তথ্য প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন খাতে ভারতীয় নাগরিকদের সংখ্যা এখন আরো বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা হুন্ডির মাধ্যমে তাদের আয়ের এক বিরাট অংশ ভারতে পাঠাচ্ছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে অবৈধভাবে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছেছে। টি আই বি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর পাওয়া তথ্য থেকে এর উপর অনুসন্ধান করে জানায় যে, দেশে বৈধভাবে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কাজ করে মাত্র ৯০ হাজার। বাকি যারা অবৈধ আছেন, তারা বছরে ২৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে।

বিআইডিএসের অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ জানান, “প্রতিবছর আমাদের দেশ থেকে চার-পাঁচ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর এবার আমাদের রেমিট্যান্সের টার্গেট ২০ বিলিয়ন ডলার। তাহলে আমরা যা আনতে পারি তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ আবার বিদেশি কর্মীদের দিয়ে দিতে হয়। এ থেকে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিদের সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়।”
ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে?
শ্রমবাজার অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। সুলভ এবং দক্ষ শ্রমিকগোষ্ঠী যদি তৈরি করা যায়, সেই দেশের উৎপাদন ক্ষমতা তত বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজার বর্তমানে বড় হচ্ছে। একের পর এক অর্থনৈতিক কেন্দ্র  বাস্তবায়ন হচ্ছে, যেখানে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রচুর হচ্ছে। সেই বিনিয়োগ করার একটি প্রধান কারণ দেশীয় শ্রমিকের একটি বিশাল যোগান রয়েছে। তবে সেই শ্রমিকদের দক্ষতা নিয়ে এখনো কাজ করার জায়গা আছে। সাম্প্রতিক সময় ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলো। সেই কারণে এখন ট্রেড ইউনিয়ন তৈরি হচ্ছে। আবার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আমরা যেই সব দেশে জনশক্তি রপ্তানী করছি, সেখানে শ্রমিক সরবরাহ কমে আসছে। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২০ সালে এসে শ্রমিক রপ্তানী প্রায় ৩১ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ সরকারের জনশক্তি রপ্তানী থেকে যে রেমিটেন্সের উপর নির্ভরশীলতা রয়েছে, সেটার উপর থেকে চাপ কমানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এছাড়াও যেসব দেশে আমরা শ্রমিক পাঠাচ্ছি সেখানকার কর্ম পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সৌদি আরবে নারী কর্মীদের যৌন দাসী হিসেবে বিক্রি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। কাতার বিশ্বকাপ সামনে রেখে স্টেডিয়াম নির্মাণ হচ্ছে, সেখানে অমানবিক পরিশ্রম করার কারণে শ্রমিক মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

আমাদের দেশের অভ্যন্তরীন বাজারে বিদেশি যারা কাজ করছে, সেটা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে ,আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে ঘাটতি রয়েছে। আমাদের যেই বিশাল এক তরুণ শিক্ষিত বেকার বের হচ্ছে, তাদের যোগ্যতা এবং গুণগত মানের উন্নয়নে কাজ করতে পারলে , বিদেশীদের দখল করা চাকরীর বাজার দেশীয়দের দিয়ে সামাল দেয়া সম্ভব।    
তথ্যসূত্রঃ
  • https://bbs.portal.gov.bd/sites/default/files/files/bbs.portal.gov.bd/page/http://www.old.bmet.gov.bd/BMET/stattisticalDataAction
  • https://www.ittefaq.com.bd/opinion-/217299/জনশক্তি-রপ্তানিতে-আমাদের-অবস্থান-ও-করণীয়
  • https://www.prothomalo.com/bangladesh/টানা-দুই-বছর-কমছে-জনশক্তি-রপ্তানি
  • https://bn.quora.com/কত-পরিমাণ-ভারতীয়-বর্তমানে
  • https://www.dailyinqilab.com/article/266651/বাংলাদেশে-অবৈধভাবে-কাজ-করছে-সাড়ে-৪-লাখ-ভারতীয়
  • http://www.bangladesh.gov.bd/site/page/0c88552f-d7fa-4e4a-938b-044af121f349/বাংলাদেশের-অর্জন
  • https://www.dw.com/bn/বাংলাদেশের-শ্রমশক্তি-রপ্তানির-নতুন-বাজার-দরকার/a-19230974
  • https://www.macrotrends.net/countries/BGD/bangladesh/unemployment-rate

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021