বিনোদন
'স্পাইডার–ম্যান' চরিত্রের সৃষ্টি ও স্ট্যান লি
তিরিশের দশকের একদম শেষ লগ্ন। বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে হবে। নিউইয়র্কে বসে যখন নতুন সুপারহিরো তৈরির কথা ভাবছিলেন স্ট্যান লি, তখন তার বয়স ১৭ বছর। ছোট কাঁধে সে বয়সেই পড়েছিল পরিবার চালানোর দায়িত্ব। পরিবারসহ জীবন চালাতে মাত্র ১৭ বছর বয়সেই চাকরি করেছিলেন একটি ম্যাগাজিনের কমিকস বিভাগে। বাজারে তখন ডিসি কমিকসের রমরমা ব্যবসা। সবার মুখে মুখে সুপারম্যান, ব্যাটম্যান। নতুন সুপারহিরো আনার জন্য বারবার চাপ দিচ্ছিলেন প্রকাশক। চাকরি টেকাতে তাই কিছু একটা করতেই হতো। স্ট্যান লি চেয়েছিলেন ব্যতিক্রমী হতে। তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল অন্যদের চেয়ে আলাদা। তাই ভাবছিলেন, কী রকম হবে তার নতুন সুপারহিরো? প্রথমে দরকার ক্ষমতা। এটাই তো কাউকে আলাদা করে তোলে। ভাবতে ভাবতে স্ট্যানের দেয়ালে চোখ আটকে যায়। একটা মাছি দেয়াল বেয়ে উঠছে। ফ্লাই ম্যান? মস্কিউটো ম্যান? কোনো নামই নাটকীয় শোনাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মাথায় এল সেই মোক্ষম নাম—'স্পাইডার–ম্যান'।
শুধু স্পাইডার-ম্যান নয়, আয়রন ম্যান, হাল্ক, থর, ব্ল্যাক প্যান্থার, এক্স-মেন সিরিজের মতো চরিত্রদেরও জন্মদাতা ও স্রষ্টা স্ট্যান লি। তবে প্রথম কাজেই ব্যর্থমনোরথ হতে হয়েছে তাকে। কিন্তু কেন প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছিল স্ট্যান লি-কে? যেদিন 'স্পাইডার–ম্যান' নামটি নিজের মনের মধ্যে বানিয়েফেলেন, সেদিন থেকেই কল্পনায় নিজের মধ্যেই যেন স্পাইডার-ম্যানকে খুঁজেছিলেন স্ট্যান লি। একজন কিশোরের মধ্যেই সুপারহিরোর চরিত্রাঙ্কন করলেন স্ট্যান। পিটার পার্কার— সেই কমিক্সের সুপারহিরো একজন স্কুলের ছাত্র। স্ট্যানের মতো তার জীবনও নানান সমস্যায় জর্জরিত। গোটা গল্পটা ফেঁদে ফেলার পর সম্পাদকের কাছে জমা দিলেন গল্পের নীল-নকশা। অবশ্য তার আগেই সহকর্মী তথা বন্ধু স্টিভ ডিটকোকে দিয়ে ছবিও আঁকিয়ে ফেললেন স্ট্যান। কিন্তু কেই বা তখন জানত, পত্রপাঠ বাতিল হয়ে যাবে এই সুপারহিরোর পরিকল্পনা! কিন্তু এত দিন পর আমরা জানি, ওই রাতে সফল হয়েছিলেন স্ট্যান। পরবর্তী সময় কমিকসের পৃষ্ঠা এবং টেলিভিশন ও সিনেমার পর্দায় দেখা স্পাইডার–ম্যানকে সবাই আপন করে নিয়েছে। সবাই বুঝতে পেরেছে, মুখোশের আড়ালে থাকা কিশোর পিটার পার্কার অর্থাৎ স্পাইডার–ম্যান অন্য কোনো গ্রহের নয়, আমাদের আশপাশেই সে থাকে।
কিন্তু যেদিন স্ট্যান ‘স্পাইডার-ম্যান’ নামটি নিয়ে সম্পাদকের কাছে ছুটে যান, সেদিন প্রথম আপত্তি তুলেছিলেন সেই সম্পাদক। মাকড়সা দেখলে গা শিরশির করে ওঠে, এমন লোকের সংখ্যা প্রচুর। ভয়ের থেকেও বড়ো কথা, আটপেয়ে এই জীবটিকে মানুষ দেখে ঘেন্নার চোখে। সেখানে দাঁড়িয়ে স্পাইডার-ম্যানের কমিক্স ডাহা ফেল করবে। এমনটাই যুক্তি দিলেন সম্পাদক। তার ওপর এই চরিত্র আবার টিনেজার। তার ব্যক্তিগত জীবনেও এত সমস্যা। এসব নিয়ে কি সুপারহিরো হওয়া যায়? খানিক বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন স্ট্যান। টাইমলিতে ছাড়পত্র পেল না স্পাইডার-ম্যান। কিন্তু স্পাইডার-ম্যানের ভূত নামল না স্ট্যান লি'র ঘাড় থেকে।

স্ট্যান লি সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রকাশিত হোক ছাই না হোক এই কমিক্স তৈরি তিনি করবেনই। উৎসাহী বন্ধু ডিটকোও সঙ্গ দিলেন তার। শেষ পর্যন্ত, পত্রিকার এক বাতিল হয়ে যাওয়া সংখ্যার শেষে কোনোক্রম গুঁজে দেওয়া গেল স্পাইডিকে। নেহাত মাকড়সা-ভূত মাথা থেকে নামাতেই এই লেখা। আর সেখানেই যেন এক ম্যাজিক। এক কথায় গোটা মার্কিন মুলুক যেন গোগ্রাসে গিলল স্পাইডার-ম্যানের কমিক্স। আর সেই সম্পাদক? হ্যাঁ, গল্প হিট করার পরে স্ট্যানের কাছে ছুটে এসেছিলেন তিনি। দাবি, এই চরিত্র নিয়ে সিরিজ নামাতে হবে তাকে।
সম্পাদকের এমন দাবি শুনে আবারও বন্ধু স্টিভ ডিটকোকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করলেন কমিকসের কাজ। বেরোতে শুরু করলো একের পর এক স্পাইডার–ম্যানের পর্ব। সেগুলো প্রকাশিত হতে লাগল প্রকাশনা সংস্থা মার্ভেল কমিকস থেকে। স্পাইডার–ম্যানের সঙ্গে সঙ্গে মার্ভেল কমিকসও হয়ে উঠল তুমুল জনপ্রিয়। স্ট্যান লি'র একটা বিশ্বাস তখন পাকাপোক্ত, ‘যদি কখনো নিজের কোনো আইডিয়াকে ভালোবাসো, বিশ্বাস করো সেটা ভালো, তাহলে কখনো কারও কথায় ওই আইডিয়া ছুড়ে ফেলো না।’ এই বিশ্বাসে ভর করেই স্ট্যান লিখে গেছেন স্পাইডার–ম্যান। সৃষ্টি করেছেন এক্স–মেন, আয়রন ম্যান, থর, হাল্ক, অ্যান্ট–ম্যান, ফ্যান্টাস্টিক ফোর, ব্ল্যাক উইডো ও ডক্টর স্ট্রেঞ্জের মতো জনপ্রিয় সব চরিত্র। এই সুপারহিরোদের দিয়ে কমিকসের জগৎটাই বদলে দিয়েছেন স্ট্যান লি। তাঁর চরিত্রগুলো আমাদের আনন্দ দেয়, অনুপ্রেরণা জোগায়, কল্পনা করতে শেখায়। স্ট্যান লি প্রায়ই একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতেন, ‘স্পাইডার–ম্যানই কেন সবার এত কাছের?’ স্ট্যান লি মুচকি হাসতেন, বলতেন, ‘স্পাইডার–ম্যানের পুরো শরীর ঢাকা। কেন জানেন? যাতে পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ ওই মুখোশের পেছনে নিজেকে কল্পনা করতে পারে। এই ব্যাপারটাই স্পাইডার–ম্যানকে অনন্য করে।’ 
আসলেই তা–ই। খেয়াল করে দেখো, আমরা অনেকেই নিজেকে স্পাইডার–ম্যান ভাবতে পছন্দ করি। কয়েক প্রজন্ম ধরে স্পাইডার–ম্যানের জনপ্রিয়তা দেখে গেছেন স্ট্যান লি। ২০১৫ সালে বিবিসি রেডিওর এক সাক্ষাৎকারে কৈশোরের এই ঘটনা সামনে আনেন স্ট্যান লি। স্ট্যানের নিজের জীবনের এই গল্প, লড়াই, জয় রূপকথার থেকেই বা কম কি? সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে স্পাইডার ম্যানের আরেকটি সিনেমা 'স্পাইডার–ম্যান: নো ওয়ে হোম'। এই সিনেমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ পুরো বিশ্ব। ৯৫ বছর বয়সে চিরবিদায় নেয়া স্ট্যান লি বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই লাখো মানুষের সঙ্গে তিনিও আনন্দে ভাসতেন এই সিনেমার সাফল্যে।
বিনোদনএক্সক্লুসিভ
আরো পড়ুন