Link copied.
রোগ নিয়ে অহেতুক আতঙ্ক: এক মানসিক ব্যাধি
writer
৩১ অনুসরণকারী
cover
আমরা মাঝে মাঝে আমাদের আশেপাশে পরিচিতদের মাঝে অনেককে দেখি যারা প্রায়শই তাদের শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন থাকেন এবং একটু কোন অসুবিধা দেখা দিলেই তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং ডাক্তারের কাছে ছুটাছুটি শুরু করে দেন। এই অবস্থার ক্রমাগত বৃদ্ধি হতে থাকলে বুঝে নিতে হবে যে তার এক প্রকার মানসিক সমস্যার উৎপত্তি হচ্ছে। এই অহেতুক ভয় যে এক ধরণের মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ তা নিয়েই আজকের এই লেখা। 

রোগভীতি,
যেটা আগে হাইপোকন্ড্রিয়াসিস নামে পরিচিত ছিলো, এটা এমন একটা মানসিক ব্যাধি যেখানে ব্যাক্তি নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে সবসময় উদ্বিগ্ন থাকে এবং অতিশয় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকে। এটা ভেবে যে হয়তো তার খুব বড় অসুখ হয়েছে কিংবা হবে। দেখা যায় যে, তার শরীরে হয়তো রোগের কোন লক্ষণই নেই। তারপরও সে সাধারণ বাহ্যিক সংবেদন যেমন পেশী টান, ঘেমে যাওয়া, ত্বকে কোন দাগ পড়া বা অবসাদগ্রস্ত হওয়া কিংবা খুব হালকা কোন অসুবিধাগুলোকে মনে করছে বড় কোন রোগের পূর্বলক্ষণ। মেডিক্যাল পরীক্ষায় যদি সে জানতে পারে যে কোন জটিল সমস্যাই তার নেই তাও ভয়ে থাকে অসুস্থ হয়ে পড়ার কিংবা আচ্ছন্ন হয়ে থাকে নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়ে। মূলত, তার শারীরিক অসুবিধার চেয়ে মানসিক দুশ্চিন্তাই প্রকট, যার ফলাফল ঐ ব্যাক্তির জীবনকে করে তোলে চরম দুর্দশাগ্রস্ত। 
cover
এই ভীতির পূর্ব নাম “হাইপোকন্ড্রিয়াসিস” থেকে পরিবর্তিত হয়ে “সোমাটিক সিম্পটমস” নামে অভিহিত হয়েছে এখন। কারণ হাইপোকন্ড্রিয়াসিস শব্দটির মাধ্যমে এই রোগটির সঠিক মানে প্রকাশ হয় না। হাইপোকন্ড্রিয়াসিসে ভোগা ব্যাক্তিকে বলে হাইপোকন্ড্রিয়াক, যার মানে হলো স্নায়বিক রোগী বা বিষণ্ণপ্রকৃতির কিন্তু উক্ত মানসিক রোগটি কিন্তু ওই ব্যাক্তির তার দৈহিক অবস্থা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে তাই এর নামকরণে এসেছে সোমাটিক বা দেহসংক্রান্ত শব্দটি।

অসুস্থতা নিয়ে ভয় এত প্রবল যে আশ্বাস দেয়াটা ক্ষণিকের জন্য মাত্র কার্যকরী হয়। রোগী হয়ত মেনেও নিবে যে সম্ভবত তার ভয় টা অতিরঞ্জিত, তারপরও এটা মেনে নিতে পারে না যখন বলা হয় যে “সমস্যা কিছুই নেই”। 

রোগ নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত রোগীদের অধিকাংশই ২ টি প্রকারভেদের যেকোনটিতে পড়ে: 
  1. একদল যারা যত্ন, শুশ্রূষা পেতে চায়ঃ অসুস্থতা তীব্র মাত্রা ধারণ করলে তারা একজন ডাক্তার দেখিয়েই সন্তুষ্ট হয় না, একের পর এক ডাক্তার দেখায় যাতে একজন হলেও তাকে নিশ্চয়তা দেয় যে তার জটিল কোন রোগ হয়েছে। এবং নানাবিধ ইনভেস্টিগেশন করাতে চায় এবং চিকিৎসা নিতে চায়।
  2. আরেকদল যারা এসব বিমুখঃ তারা চিকিৎসা সেবা এড়িয়ে চলে। তাদের মধ্যে গুরুতর উদ্বেগ কাজ করে এই বিশ্বাসে যে যদি তারা কোন পর্যবেক্ষণ করায় তাহলে হয়তো কোন প্রাণঘাতী অসুস্থতা বেড়িয়ে আসবে ( যেমনঃ ক্যান্সার)  
cover
কী কারণে এরকম হয়?:

রোগ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার এই যে মানসিক ব্যাধি, এর জন্ম ঠিক কীভাবে হয় সেটা সুস্পষ্ট না হলেও কিছু বিষয় চিহ্নিত হয়েছে যেগুলো এর পেছনে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারনা করা হয়:
  • কারো ছোটবেলায় হয়তো এমন কোন গুরুতর অসুস্থতায় কেটেছে যার প্রভাব পরবর্তীতে তার মানসিক স্বাস্থ্যে প্রবলভাবে পড়েছে যাতে যেকোন শারীরিক অসুবিধা ভীতিকর মনে হতে শুরু করে। সাধারণত এই ব্যাধিটি অল্প বয়স থেকে শুরু হয় এবং কয়েক বছর স্থায়ি হয় তবে যেকোন বয়সেই এটা হতে পারে। এই অবস্থা তীব্র মাত্রা ধারণ করতে পারে কোন অতিরিক্ত মানসিক চাপযুক্ত ঘটনার পর যেমন প্রিয় বা আপন কারো মৃত্যু।
  • শৈশবে পরিবারের কারো যেমন বাবা-মা কিংবা ভাইবোনকে কোন গুরুতর অসুস্থতায় ভুগতে দেখলে পরবর্তীতে এই অসুস্থতা বিকশিত হতে পারে।
  • কোন ব্যাক্তি তার এমন পরিবারে বেড়ে উঠলে যেখানে সবসময় বিভিন্ন অসুস্থতা নিয়ে আলোচনা হয় ঘন ঘন কিংবা বাবা-মা তাদের নিজেদের অসুস্থতা বা তাদের সন্তানের অসুস্থতা নিয়ে খুব বেশী চিন্তিত থাকেন, তখন ঐ ব্যাক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এর প্রভাব পড়ে।
  • এমন ব্যাক্তি যে কোন অস্বস্তিকর সাধারণ কোন শারীরবৃত্তীয় ঘটনা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং মনে করেন এটা কোন রোগের কারণে হচ্ছে এবং এটা নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করেন, অত্যাধিক সময় ক্ষেপণ করেন ইন্টারনেটে এই সাময়িক অসুবিধার কারণ খুঁজতে, এদের ক্ষেত্রে এই ব্যাধি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা খুব বেশী।

cover
লক্ষণসমূহ:
  • আচ্ছন্ন হয়ে থাকা বড় ধরণের কোন রোগ কিংবা স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে।
  • চিন্তিত হয়ে পড়া কোন সাধারণ শারীরিক অসুবিধা দেখা দিলেই জটিল কোন রোগ ভেবে।
  • সহজেই শঙ্কিত হয়ে পড়া স্বাস্থ্যের অবস্থার যেকোন পরিবর্তনে।
  • কোন ভরসা না পাওয়া অনেক ডাক্তার দেখানো হলেও আর নেগেটিভ রিপোর্ট পাওয়ার পরেও।
  • নিজেকে নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তায় পড়ে যাওয়া কোন নির্দিস্ট মেডিক্যাল কন্ডিশন নিয়ে যখন এটা পরিবারের কারোর দেখা দেয়।
  • সম্ভাব্য রোগ নিয়ে এত বেশী পীড়িত হওয়া যে সঠিকভাবে নিত্যদিনের কাজ করতে না পারা।
  • নিয়মিত নিজের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যাতে কোন রোগের লক্ষণ চোখে পড়ে।
  • ঘন ঘন ডক্তারের শরণাপন্ন হওয়া আশ্বাস পেতে কিংবা অপরক্ষেত্রে ডাক্তার বা মেডিক্যাল চেকাপ এড়িয়ে চলা এই ভয়ে যে পাছে কোন বড় রোগ ধরা পড়ে।
  • স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা চিন্তা করে অন্যান্য মানুষ, জায়গা কিংবা কাজ এড়িয়ে চলা।
  • সবসময় নিজের স্বাস্থ্য কিংবা সম্ভাব্য রোগ নিয়ে কথাবার্তা বলা।
  • প্রায়শই ইন্টারনেটে সম্ভাব্য রোগ, রোগের লক্ষণ আর কারণ নিয়ে ঘাটাঘাটি করা। 
cover
ঝুঁকি ও জটিলতা:
যেকোন বয়সেই শুরু হতে পারে এই অসুস্থতা, অনেক্সময় বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর মাত্রা বাড়তে থাকে। এতে করে কিছু ঝুঁকির সৃষ্টি হয় যেমন তেমনি বাড়ে অনেক জটিলতাও। সেগুলোর মধ্যে:

  • অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা সাধারণ জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। মানসিক প্রশান্তি কমে যায় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে।
  • নিত্যদিনের সাধারণ কাজকর্মে ব্যঘাত ঘটে।
  • যেহেতু এটা একটা দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি তাই এর ফলে নিজেকে অনুপ্রাণিত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
  • পরিবারের অনেকের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে কারণ এই অতিরিক্ত রোগভীতি অনেককেই হতাশ করে তোলে।
  • কর্মক্ষেত্রে অনেক অনুপস্থিতির জন্য অসুবিধার সৃষ্টি হয়।
  • আর্থিক সমস্যার সৃষ্টি হয় ঘন ঘন ডাক্তার দেখানোর আর চিকিৎসার বিল পরিশোধ করতে গিয়ে।
  • অন্যান্য আরও নানাধরণের মানসিক জটিলতার উৎপত্তি ঘটে, যেমন ডিপ্রেশন, পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার।
cover
রোগ-নির্ণয়:
এই সমস্যার রোগীরা সাধারণত কোন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে চান না কিংবা নিজেদের এই রোগ যে শুধুই মানসিক সেটা মানতে চান না তাই তারা সাধারণভাবে ডাক্তারদের শরণাপন্ন হোন। প্রাথমিক চিকিৎসকের কাছেই ধরা পড়ে তাদের মানসিক এই অবস্থা। রোগীর অভিযোগ ও অতীত ইতিহাস শুনে এবং কিছু ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে জানা যায় এই অবস্থা। তবে চিকিৎসককে রোগীর সার্বিক অবস্থাও দেখতে হয় যেমন রোগী অন্য কোন মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন কিনা যেমন নানাবিধ ডিপ্রেশন, সিজোফ্রেনিয়া কিংবা সোমাটাইজেশন ডিসঅর্ডারে।   
চিকিৎসা:
 কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা কার্যকরী হয়েছে, কারো ক্ষেত্রে সাইকোথেরাপির মাধ্যমে, আবার কোন ক্ষেত্রে দুটোর প্রয়োগেই। ওষুধের ক্ষেত্রে এন্টিডিপ্রেসেন্টস যেমন  selective serotonin reuptake inhibitors (SSRIs) এটা কার্যকরী। আবার, অনেক ধরণের থেরাপি আছে এর নিরাময়ে যেমনঃ কোগনিটিভ থেরাপি, বিহেভিয়ার থেরাপি, কোগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট। থেরাপিস্টরা রিলাক্সেশন এবং ডিস্ট্রাকশনের কিছু ট্যাকনিক শেখান যা রোগীকে তাদের রোগ সম্বন্ধে চিন্তা থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে এবং এর পরিবর্তে  অনেকসময় ঐ অযাচিত চিন্তা, স্ট্রেস কীভাবে শারীরিক ক্ষতিসাধন করে তা নিয়ে আলোকপাত করে। তবে কিছু ডাক্তার বলেন, এসবের ক্ষতিকর দিক জানাতে গিয়ে উল্টোটা ঘটে যায়। অতিরিক্ত পড়াশোনা ঐ বিষয়ে এবং নিজের সাথে মিলিয়ে নেয়া পরবর্তীতে রোগীর অবস্থা এবং তাদের লক্ষণগুলো আরও খারাপ করে দেয়।

  • চিকিৎসকের আশ্বাস অনেকসময় কার্যকরী হয়। চিকিৎসক যদি রোগীর অভিযোগকৃত শারীরিক বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেন, রোগীকে ধৈর্যসহকারে সময় দেন এবং সঠিকভাবে যত্ন নেন, দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রেই খুব কার্যকরী হয় চিকিৎসা। 
  • কিন্তু চিকিৎসক যদি রোগীকে সময় কম দেন কিংবা রোগীকে ধৈর্য নিয়ে সঠিকভাবে পরিচর্যা না করেন, সেক্ষেত্রে দেখা যায় রোগির পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়।
  • ঐ রোগীর অন্যান্য কোন মানসিক অসুস্থতা থাকলে এই রোগভীতি মানসিক ব্যাধিটি প্রকট আকার ধারণ করতে পারে সঠিক পরিচর্যার অভাবে, তাই চিকিৎসকদের এইসব বিষয়ও বিবেচনায় রেখে তাদের চিকিৎসা দেখভাল করতে হয়।

cover
নিবারণের উপায়:
এই ব্যাধি প্রতিরোধের নির্দিষ্ট কোন পন্থা এখনো জানা যায় নি, তবে বিশেষজ্ঞরা কিছু উপদেশ দিয়ে থাকেন:
  • যখন থেকে অতিরিক্ত উদ্বেগ অনুভব করা শুরু হবে এবং এটা বুঝতে পারবে যে শরীরে কোন লক্ষণ প্রকাশ না পাওয়া সত্বেও দুশ্চিন্তা আসছে, তখন থেকেই যোগ্য পরামর্শকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত যা এই লক্ষণগুলোকে বাড়তে বাঁধা দিতে পারে।
  • নিজেকে বুঝতে হবে যে কখন নিজে বেশী চাপের মধ্যে আছে এবং এই অতিরিক্ত চাপ নেয়া শরীর স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর সেটা চিন্তা করে নিয়মিত সঠিকভাবে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট এবং রিলাক্সেশন ট্যাকনিক অনুশীলন করতে হবে। 

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021