Link copied.
ভয়ঙ্কর মাদক ‘এল এস ডি’ যেভাবে তরুণদের গ্রাস করে নেয়?
writer
অনুসরণকারী
cover
মাদক, তথা নেশা দ্রব্য মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই ব্যবহার করে আসছে। যুগ যত আধুনিক হয়েছে নেশা দ্রব্যও তত আধুনিক হচ্ছে। আগে আফিম দিয়ে মানুষ নেশা করতো, এখন সেই পপি ফুলের রস থেকে তৈরী হচ্ছে হেরোইন, প্যথেড্রিন। গত কয়েকদিন আগে দেশে এল এস ডি নামের মাদক প্রথম ধরা পড়েছে। যারা নার্কোটিকস সম্পর্কে একটু ধারণা রাখে তারা এই ড্রাগস সম্পর্কে জানা শোনা থাকার কথা। এই ড্রাগসের আবিষ্কার হয়েছে ত্রিশের দশকে, যা পরিচিতি লাভ করে আরো পরে, কিভাবে কোত্থেকে এই দ্রব্যের উৎপত্তি, কিভাবে ব্যবহার হয় এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী সেটাই জানাবো আজকে পাঠকদের । চলুন জেনে আসা যাক।
cover
গবেষকরা নেশা জাতীয় দ্রব্যগুলো মানুষের উপর কী ধরণের প্রভাব ফেলে সে অনুসারে সাতটি ভাগে ভাগ করেছে নিচে সেগুলো উদাহরণ সহ দেয়া হলো-
  • Central nervous system (CNS) Depressants: এন্টি ডিপ্রেসেন্ট ওষুধগুলো, জ্যানাক্স
  • CNS stimulates: কোকেন,আম্পিট্যামিন
  • hallucinogens: এল এস ডি, পিয়ট
  • Dissociative Anesthetics: ডেক্সট্রোমেথোরাফেন
  • Narcotic Analgesics: হেরোইন, মরফিন
  • Inhalants: প্লাস্টিক পেইন্ট, গ্যাসোলিন, গ্রীজ।
  • Cannabies: গাঁজা

দেখতেই পাচ্ছেন আজকে আমরা যেই এল এস ডি তথা lysergic acid diethylamide (লাইসেরজিক এসিড ডাইথেলামাইড) নিয়ে কথা বলবো সেটা হ্যালোসিনোজেন্স বিভাগের একটা ড্রাগস। এবার এর গোড়ার দিকে যাওয়া যাক। এজন্য পিছিয়ে যেতে হবে সেই ১৯৩৮ সালে। 
cover
সুইস কেমিক্যাল কোম্পানী “সান্ডোজ ল্যাবরেটরিজ” এ কাজ করতেন বিজ্ঞানী আলবার্ট হফম্যান। তিনি জুরিখ ইউনিভার্সিটি থেকে মেডিসিন্যাল ক্যামিস্ট্রি থেকে পি এইচ ডি সম্পন্ন করেন। সান্ডোজে তার কাজ ছিলো মেডিসিন্যাল উদ্ভিদ থেকে কিভাবে ঔষধি উপাদান বিশ্লেষণ করতে হয় সেই পদ্ধতি তৈরী করা। তিনি একদিন ergot নামের একটি চত্রাক নিয়ে কাজ করছিলেন, সেখান থেকে তিনি প্রথম এল এস ডি তৈরী করেন যেটার নাম দেন LSD-25। তিনি তখনো জানতেন না এর প্রভাব কি হতে পারে। তিনি নিয়মিত বিরতি দিয়ে সেটি সেবন করতে থাকেন এবং আস্তে আস্তে মাত্রা বাড়াতে থাকেন।

পাঁচ বছর পর ১৯৪৩ সালে তিনি দুর্ঘটনাবশত একটু বেশী পরিমাণ এল এস ডি নিয়ে ফেলেন এবং সর্বপ্রথম এর হ্যালুসিনেশন তথা মতিভ্রমের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। এর তিনদিন পর ১৯শে মে তিনি ইচ্ছা করেই একটু বেশি পরিমাণ এল এস ডি সেবন করেন। তুখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, এজন্য গাড়িঘোড়া চালানো সীমাবদ্ধ ছিলো। এজন্য তিনি সাইকেলে করে তার কর্মস্থল থেকে বাসার উদ্দেশ্য রওনা দেন। সেটাই সর্বপ্রথম “এসিড ট্রিপ”(এই ট্রিপ জিনিসটা কি সেটা পরে বলছি) হয়। এজন্য ১৯ শে মে কে এল এস ডি সেবন কারীরা “বাইসাইকেল ডে” বলে অভিহিত করে। তিনি মনে করছিলেন যে এই দ্রব্যটি মানসিক রোগ বিশেষ করে সিজনোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের সাহায্য করবে। কিন্তু পরবর্তীতে এর অনিয়ন্ত্রিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্য এটাকে আর স্বীকৃতি দেয়া হয় নি। হফম্যান যদিও তার যুক্তির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকেন, তার সেই সকল ব্যাখ্যা নিয়ে LSD – My Problem Child নামের একটি বই ও প্রকাশ করেন। 
cover
এল এস ডি’র প্রভাব
এবার চলুন যাওয়া যাক এল এস ডি এর প্রভাব কি সেটা সম্পর্কে। শুরুতেই এল এস ডি হ্যালোসিনোজেন্স ড্রাগস বলেছি, এইধরণের ড্রাগ যে সেবন করে সে মতিভ্রমের স্বীকার হয়। অর্থাৎ আশপাশে সে যা দেখছে অথবা শুনছে অথবা অনুভব করছে সেগুলো সব তার কল্পনায় তৈরী করা। এল এস ডি সেবন কারীরা এই মতিভ্রমকে “ট্রিপ” বলে ডাকে। এল এস ডি নাক দিয়ে অথবা পুশ করে অথবা জিহবার নিচে দিয়ে সেবন করা যায়। মুখ দিয়ে সেবন করার ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে এর প্রভাব ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পর শুরু হয়, নেশার সর্বোচ্চ মাত্রায় উঠতে সময় লাগে দুই থেকে চার ঘন্টা।

নেশার তীব্রতা থাকে ১২ ঘন্টা পর্যন্ত। এই সময়ে ঘুমালে সেবন কারীরা লুসিড ড্রিমের অভিজ্ঞতা লাভ করে। লুসিড ড্রিম এর অর্থ হচ্ছে, আপনি ঘুমানোর সময় যদি স্বপন দেখেন এবং সেই স্বপ্নের ঘটনা প্রবাহ আপনি নিয়ন্ত্রণ করে পারেন। অর্থাৎ স্বপ্নে যা ঘটছে সব আপনি নিজে ঘটাচ্ছেন। এছাড়াও সেবনকারীরা যেইসব অভিজ্ঞতার স্বীকার হন সেগুলো হলো বিভিন্ন অবাস্তব আকার আকৃতির জিনিস দেখে, যেমন তারা আতশ বাজির মতো ফুটছে।

  • বিকৃত শব্দ শুনেন, যেগুলোর অস্তিস্ত্ব নেই।
  • উত্তেজনা (anxity) এবং হতাশা।
  • মাসখানেক পরে গিয়ে হঠাৎ করে “ট্রিপ” এর কথা ফ্ল্যাশব্যাকে চলে আসে।
  • উচ্চ রক্ত চাপ, খুব দ্রুত হৃদস্পন্দন , চোখ বড় বড় হয়ে যাওয়া। 

    এই সাময়িক সময়ের অভিজ্ঞতা সবসময় সুখকর হয় না। কারণ এই সময়ের যে মুড সুইং হয় সেটা অনেক সময় হীতে বিপরীত হয়ে যায়। যার কারণে প্যানিক এটাক হয়ে গেলে, সেখান থেক মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনাও হতে পারে। সেবনকারীরা সেসব ট্রিপ কে ব্যাড ট্রিপ বলে থাকে। অর্থাৎ এল এস ডি এমন এক নেশা যেটা আপনার নিয়ন্ত্রণ আপনার কাছে আর থাকবে না। এছাড়াও মানসিক স্বাস্থের উপর প্রভাব খুব ভয়ঙ্কর হতে পারে। একজন সেবনকারী যদি একটি ব্যাড ট্রিপে যায়, সেটার ফ্ল্যাশব্যাকের কারণে তার হতাশা বাড়তে পারে, এখন ডিপ্রশনই সকল মানসিক রোগের প্রথম ধাপ।
cover
এল এস ড ‘র ব্যবহার
শুরুর দিকেই বলেছি, এই দ্রব্য মেডিসিন হিসেবে স্বীকৃত হয় নি। তবে গবেষোণার জন্য এই দ্রব্য অনেক জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে। সবগুলোই যে আইন মেনে করা হয়েছে এমন না। যেমন ৬০ এর দশকে আমেরিকার সি আই এ একটি প্রজেক্ট চালায় যার নাম Project Mk Ultra যেটিতে গোপনে অনেকের উপর এল এস ডি প্রয়োগ করা হয়। তারা মনে করেছিলো এল এস ডি কোল্ড ওয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হতে পারে। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো এটি দিয়ে কিভাবে মাইন্ড কন্ট্রোল করা যায় সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া। ৭০ সালে এই ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর ব্যপক তোলপাড় হয়।

বিশ্বখ্যাত উপন্যাস “One Flew Over the Cuckoo’s Nest” এর লেখক কেন কেসি একজন এল এস ডি সেবনকারী ছিলেন। তিনি এর প্রচারণার জন্য একটি গ্রুপ খোলেন যার নাম Kesey and merry pranksters. তারা নিয়মিত “এসিড টেস্টঃ” আয়োজন করতো। এছাড়াও ৬০ এর দশক পর্যন্ত হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এল এস ডি নিয়ে গবেষণা হয়। গবেষোনার জন্য স্বেচ্ছাসেবক ও থাকতো। ১৯৬৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এল এস ডি ব্যবহার একদম নিষিদ্ধ করে দেয়া হয় । তবুও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১২ বছরের উপরের প্রায় ৫৬ লক্ষ মানুষ হ্যালোসিনোজিক ড্রাগ গ্রহণ করেছে বলে ধারণা করা হয়। যেটা পুরো জনসংখ্যার প্রায় ২%। 
cover
প্রতিকারের উপায়?
এখনকার আধুনিক সমাজে ড্রাগস নেয়াটা শৌর্যবীর্যের প্রতীক হয়ে দাড়িয়েছে। নেশা শুধুমাত্র একটি বিনোদনের মাধ্যম হয়ে দাড়িয়েছে। এই বিনোদন থেকে সরানোর লোকও পাওয়া যায় না, কারণ তার আশ পাশের বেশীরভাগ মানুষ সেই নেশায় আক্রান্ত। হ্যালোসিনোজেনিউক ড্রাগস এর ইফেক্ট গুলো খুবই ভয়ঙ্কর। এর থেকে বের হয়ে আসার একমাত্র উপায় হচ্ছে তীব্র ইচ্ছা থাকতে হবে। সেজন্য অবশ্যই সাইকোলজিস্ট এর কাছে যেতে হবে। কাউন্সিলিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ এগুলোর চিকিৎসার জন্য। এছাড়া সেবনকারীদের যদি হতাশা অথবা ইনসোমেনিয়া থাকে সেগুলোর চিকিৎসা খুব দ্রুত শুরু করা। নাহলে যেকোন দিন তার একটি “গুড ট্রিপ” হয়তো “ব্যাড ট্রিপ” হয়ে যেতে পারে।
তথ্যসূত্র

  • https://www.history.com/topics/crime/history-of-lsd
  • https://www.britannica.com/biography/Albert-Hofmann
  • https://www.drugs.com/illicit/lsd.html
  • https://www.theiacp.org/7-drug-categories#:~:text=DREs%20classify%20drugs%20in%20one,analgesics%2C%20inhalants%2C%20and%20cannabis.
  • https://www.webmd.com/sleep-disorders/lucid-dreams-overview

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021