Link copied.
স্কোয়াড্রন লিডার ‘আর্মিনিয়াস’ এর হাত ধরে যেভাবে এলো জার্মানদের স্বাধীনতা
writer
১৬ অনুসরণকারী
cover
পৃথিবীর অন্যান্য জাতির ন্যায় জার্মানদেরও রয়েছে রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। জামার্নির ইতিহাসের বিবরণ প্রথম পাওয়া যায় রোমান অধিপতি জুলিয়াস সিজার কর্তৃক অনধিকৃত রাইন নদী পূর্ববর্তী অঞ্চল জের্মানিয়া হিসেবে। সিজার মধ্য ইউরোপের গল (বর্তমান ফ্রান্স) অঞ্চল অধিকৃত করলেও এই অঞ্চলটি দখল করতে পারেননি। ৯ খ্রিস্টাব্দে টিউটোবার্গ জঙ্গলের যুদ্ধে জার্মান গোত্রের বিজয়ের ফলে এই অঞ্চলটি রোমান সাম্রাজ্যে সংযুক্ত হয়নি; তবে রাইন নদীর পাশে জের্মানিয়া সুপিরিয়র ও জের্মানিয়া ইনফেরিয়র নামে দুটি রোমান প্রদেশ গঠিত হয়েছিল। টিউটোবার্গ জঙ্গলের যুদ্ধের পথ ধরেই এক কালের বিশ্বজয়ী রোমানদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড সম্মুখ যুদ্ধে জার্মান দেশপ্রেমীদের রক্তের বিসর্জনে জন্ম হয়েছে জার্মানির।
cover
টিউটোবার্গ জঙ্গলটি ঠিক কোথায় বা জার্মানদের সাথে রোমানরা ঠিক কোন জায়গায় যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল সেটা নিয়ে বিতর্ক বেশ পুরনো। তবে যুদ্ধস্থানটি নিয়ে বছর ছয়েক আগে প্রথম সুনির্দিষ্ট তথ্য ও তার স্বপক্ষে প্রমাণ মেলে। 

২০১৬ সালে জার্মানীর ওশনাব্রাক বিশ্ববিদ্যালয় ও কালক্রিস বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল পুরাতত্ত্ববিদ ঐতিহাসিক তথ্যসূত্রের উপর ভিত্তি করে অনুসন্ধানে নামেন। ফোর্বস ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে , দলটি বর্তমান জার্মানির লোয়ার স্যাক্সোনি অঞ্চলের ওশনাব্রাক জেলার কালক্রিসে প্রায় দেড় মাস ধরে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। সেখানে এক বনের মধ্যে মাটি খুঁড়ে বিভিন্ন যুদ্ধ-সামগ্রী, সৈনিকদের ব্যবহৃত অস্ত্র, লৌহবর্ম এবং আটটি স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কার করা হয়। স্বর্ণমুদ্রাগুলোর নাম অরোই (aurei)। রোমান এই স্বর্ণমুদ্রাগুলো বেশ দামিই ছিল সে সময়। এক অরোই দিয়েই পুরো মাস চলে যেত একটি পরিবারের। 

পরবর্তীতে ওশনাব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ সেগুলো পরীক্ষা করেন। নিশ্চিত হন, ওশনাব্রাক জেলার কালক্রিস অঞ্চলের এই বনেই জার্মানরা মুখোমুখি হয় রোমানদের। ধারণা করা হয়, উচু পদের কোনো রোমান সৈন্যের কাছে ছিল এই স্বর্ণমুদ্রাগুলো। টিউটোবার্গ জঙ্গলের যুদ্ধটি ইতিহাসে ব্যাটল' অফ ভারাস' নামেও পরিচিত।

cover
রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার কে চেনেন তো? সিজার শাসনামলে রোমের সাম্রাজ্য রাইন নদীর উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫ সালে তিনি রাইন নদীর উপর সেতু নির্মাণ করেন। এর মাধ্যমে রোমানরা রাইন নদীর তীরবর্তী জার্মান সীমান্তে আক্রমণ করতে সক্ষম হয়। আক্রমণ আর দখলের এই ধারা অব্যাহত থাকে পরবর্তী ৬০ বছর।

রাইন এবং ওয়েসার নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে রোমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জার্মান গোত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু যুদ্ধবাজ রোমানদের সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে সেই প্রতিরোধ। রাইন, ওয়েসার নদীবিধৌত অঞ্চল ছাড়িয়ে এলবি নদীর তীর পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়।  

cover
জুলিয়াস সিজার পরবর্তী টিবেরিয়াসের শাসনামলে রোমানরা বার্কহউসেনের পোর্টা ওয়েস্টফালিকা অঞ্চলে একটি দুর্গ নির্মাণ করে। আশেপাশের এলাকায় কলোনীও গড়ে উঠতে শুরু করে সে সময়। রোমান সম্রাট অগাস্টাস সিজার সিনেটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পাবলিয়াস কুইন্টিলিয়াস ভারাসকে সাত খ্রিস্টাব্দে জার্মান অঞ্চলের দায়িত্ব প্রদান করেন। ভারাস তার শাসনামলের শুরুতে বেশ কিছু অঞ্চল রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে আনতে সক্ষম হন। ফলে সিনেটের সবাই তার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। তখন মাত্র তিন লিজিয়ন সৈন্য ছিল ভারাসের।  

সাফল্যের আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে থাকা ভারাসের পতনের শুরু হয় বছর দুয়েক পরই, ৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তখন রোমানদের গ্রীষ্মকালীন মহড়া চলছিল। গুরুত্বপূর্ণ সিনেট সদস্যদের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত সেই মহড়া বাদ দিয়ে ভারাস তার বাহিনী নিয়ে মেইঞ্জ শহরের পানে রওয়ানা হন। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, মেইঞ্জ শহর নয়, ভারাস গিয়েছিলেন জান্থিন বলে এক শহরে। 

ইতিহাস বলছে, আর্মিনিয়াস নামক ভারাসের এক সেনা কর্মকর্তা ভারাসকে জানান, রাইন নদীর পূর্বাঞ্চলে জার্মান বিদ্রোহীরা আস্তানা গড়ে তুলেছে। খুব শীঘ্রই তারা ভারাসকে আক্রমণ করতে যাচ্ছে। এই সংবাদ লাভের পর ভারাস অস্থির হয়ে যান। তিনি দ্রুত মেইঞ্জ অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে বিদ্রোহ দমন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। 

cover
ভারাসের অধীনে একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আর্মিনিয়াসের জন্ম সম্ভ্রান্ত এক জার্মান পরিবারে। শিশু বয়সেই রোমানরা তাকে অপহরণ করে। আর্মিনিয়াস বড় হয়েছেন সেনাবাহিনীর ব্যারাকে, পেয়েছেন রোমান নাগরিকত্ব। ছোটবেলা থেকেই তিনি বেশ মেধাবী এবং চঞ্চল ছিলেন। তাই খুব দ্রুত রোমান সেনাবাহিনীতে নিজের নাম লেখাতে সক্ষম হন তিনি। ভারাসের সেনাদলে স্কোয়াড্রন লিডার হিসেবে ছিলেন আর্মিনিয়াস।  

ভারাসের বাহিনীতে দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে আর্মিনিয়াস জার্মানদের সাথে রোমানদের যোগসূত্র স্থাপনের কাজ করতেন। কিন্তু বাইরে রোমানদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেও আর্মিনিয়াসের মনে ছিল জার্মানদের প্রতি আনুগত্য। রোমানরা ঘুণাক্ষরেও ভাবে নি, আর্মিনিয়াসের মনে জমে ছিল রোমানদের মনে ছিল রোমানদের প্রতি তীব্র ঘৃণা। রোমানদের হাতে নিজের শৈশবের মৃত্যুকে কখনোই ভুলতে পারেননি তিনি। তাই গুপ্তচরবৃত্তির নামে তিনি রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। 

আর্মিনিয়াস সবসময়ই ভাবতেন, জার্মানদের কীভাবে শিক্ষা দেয়া যায়। তিনি বেশ কিছু পদক্ষেপও নেন, কিন্তু সে সব আলোর মুখ দেখে নি। পরবর্তীতে আর্মিনিয়াস কয়েকজন সর্দার এবং দেশপ্রেমী জার্মানদের নিয়ে একটি সৈন্য দল গড়ে তোলেন।  মহড়া চলাকালীন তিনি ভারাসের কানে জার্মান বিদ্রোহীদের মিথ্যা বার্তা প্রেরণ করেন। বোকা ভারাস তার গুপ্তচরের কথা বিশ্বাস করে মেইঞ্জের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। মনে মনে যুদ্ধের ছক কষতে থাকেন ভারাস। আর্মিনিয়াস ঠিক কীভাবে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে চেয়েছিলেন তা স্পষ্ট নয়। তবে তিনি যে এই ব্যাপারে বেশ কৌশলী মনোভাব পোষণ করতেন সেটা এক প্রকার স্পষ্টই ছিল। কারণ, আর্মিনিয়াসের সৈন্যবল রোমানদের প্রায় অর্ধেক ছিল। তার প্রশিক্ষিত দলটি সমর কায়দায়ও তেমন একটা পারদর্শী ছিল না। তাই যুদ্ধের ময়দানে এগিয়ে থাকতে যথেষ্ট বুদ্ধি খাটাতে হয়েছিল এই জার্মানকে।
cover
প্রথমদিকে আর্মিনিয়াস ভারাসের সেনাবহরের সাথেই ছিলেন। এই স্কোয়াড্রন লিডার পরে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে পালিয়ে তার জার্মান সৈন্য দলের সাথে যোগ দেন। তখন পর্যন্ত কারো নজরে পড়ে নি এই ব্যাপার। এমনকি ভারাসও এসবের কিছুই টের পাননি। কারণ, আর্মিনিয়াসই ভারাসকে জানিয়েছিলেন, জার্মান বিদ্রোহীদের অবস্থান টিউটোবার্গ থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে ছিল। তাই রোমান বাহিনী তখন যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল না। 

২৫ বছর বয়সী আর্মিনিয়াস ঠিক এই সুযোগটাই কাজে লাগান, ঝাঁপিয়ে পড়েন রোমানদের উপর। তিনদিন ধরে (কোনো কোনো বর্ণনায় চারদিনের কথাও এসেছে) এই যুদ্ধ চলতে থাকে। আর্মিনিয়াসের সৈন্যদলে আকস্মিক এই লড়াই শুরুর ঘটনায় হতচকিত হয়ে পড়ে ভারাসের দল। প্রায় অর্ধেক রোমান সেনাই কোনোমতে সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে। কিন্তু আর্মিনিয়াস পালাতে দিলে তো! নানান কায়দায় তাদের ঘিরে ফেলে জার্মানরা। আক্রমণে একের পর এক রোমান সৈন্য মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকে। মৃত্যু হয় রোমান সৈন্য দলের প্রধান ভারাসও। 

জার্মানদের আক্রমণের চাপে পড়ে নিজের তরবারির ঘায়েই নিহত হন ভারাস। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, ভারাস সম্ভবত আত্মহত্যা করেছিলেন! রোমানদের মধ্যে যারা আত্মসমর্পণ করেছিল তাদেরও শেষরক্ষা হয়নি। অধিকাংশ সৈনিককে দেবতার প্রতি উৎসর্গ করে বলিদান করা হয়। সব মিলিয়ে এই যুদ্ধে নিহত রোমান সৈন্যদের সংখ্যা ১৬ থেকে ২০ হাজারের মতো বলে ধারণা করা হয়।
   
নিহত হয়েছিলেন আর্মিনিয়াসও। অবশ্য রোমানদের হাতে নয়, অভ্যন্তরীণ কলহের জেরে নিকটবর্তী ব্যক্তির দ্বারাই তার মৃত্যু হয়। টিউটোবার্গের যুদ্ধ পুরো ইউরোপের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিয়েছিলো। এই যুদ্ধের কারণে রোমানরা রাইন উপকূল থেকে পিছু হটে যায়। ফলে এই অঞ্চলে রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তার বন্ধ হয়ে যায়। জার্মানরা তাদের সংগ্রামের প্রতিদান হিসেবে অর্জন করে আরাধ্য স্বাধীনতা। পরবর্তীতে জার্মানি কখনোই রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। 


Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021