মিশরীয় সভ্যতা: দক্ষতা আর আবিষ্কারে উৎকর্ষতার শীর্ষে ।। পর্ব-২
আন্তর্জাতিক
মিশরীয় সভ্যতা: দক্ষতা আর আবিষ্কারে উৎকর্ষতার শীর্ষে ।। পর্ব-২
Feature Image
Feature Image
সভ্যতার উৎকর্ষের পরিমাপ করা হয় তাদের দক্ষতার ভিত্তিতে। দক্ষতা আর আবিষ্কারের কথা চিন্তা করলে বাকি সভ্যতাগুলোর চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে মিশরীয়রা। কাগজ তৈরি, বর্ষগণনা এবং যন্ত্রপাতির আবিষ্কার মিশরীয় সভ্যতার গৌরব আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে এসব ছাপিয়ে গেছে তাদের তৈরি পিরামিডের কীর্তি। পিরামিডের ভেতরে থাকা মরদেহের মামিফিকেশনের পদ্ধতির আবিস্কারও সে কৃতিত্বের আরেক দাবিদার। মিশরীয়রা নিজেদের মেধা ও দক্ষতা দিয়ে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় রেখেছে অভাবনীয় অবদান। বর্তমান সময়েও প্রাচীন মিশরীয়দের এসব কীর্তি মানুষকে বিস্মিত হতে বাধ্য করে। প্রথম দিকে মিশরীয়রা পাথর ও কাঠ খোদাই করে লেখালেখি করলেও প্রয়োজনের তাগিদে তারা বিকল্প সহজলভ্য খোঁজা শুরু করে। তখন নীলনদের তীরে জলাভূমিতে "সাইপেরাস প্যপিরাস" নাম নলখাগড়া জাতীয় উদ্ভিদ অনেক জন্মাতো। এই গাছ থেকেই পরবর্তীতে তারা কাগজ তৈরি করেছিল। প্রচলিত পেপার শব্দটি এই প্যপিরাস থেকেই আগত। ছবি বা চিত্রের মাধ্যমে মিশরীয়রা যে লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার করে, তার নাম হায়ারোগ্লিফিক। "হায়ারোগ্লিফিক" এর অর্থ পবিত্র খোদাই কাজ। মিশরীয়রা মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য ২৪টি হায়ারোগ্লিফিক চিহ্ন ব্যবহার শুরু করে। এ ২৪টি চিহ্নের প্রত্যকটি মানুষের স্বরের এক একটি ব্যঞ্জনধ্বনি প্রকাশ করতো। 
প্যাপিরাস থেকে কাগজ তৈরি করতে জানতো প্রাচীন মিশরীয়রা; Dreams Time
প্যাপিরাস থেকে কাগজ তৈরি করতে জানতো প্রাচীন মিশরীয়রা; Dreams Time
তারা অংক শাস্ত্রের দুটি শাখা জ্যামিতি এবং পাটিগণিতের প্রচলন করে। মিশরীয় সভ্যতার মানুষ যোগ, বিয়োগ, ভাগ, দশমিকের ব্যবহার জানত তবে গুন ও ব্যবহার জানত না। জ্যামিতির ত্রিভূজ, চতুর্ভুজ, বহুভূজ, সিলিন্ডারের আয়তন, বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করতে জানতো। জমির চাষ, আয়তন নির্ণয়, কর আদায়, পিরামিড নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজের প্রয়োজনীয়তা থেকে মিশরে অঙ্কশাস্ত্রের অগ্রগতি হয় চোখে পড়ার মতো। প্রাচীন মিশরের বিজ্ঞানীরা সময় নির্ধারণের জন্য সূর্য ঘড়ি, ছায়াঘড়ি, জলঘড়ি আবিষ্কার করে। সূর্য ঘড়ি এবং ছায়াঘড়ি রাতের বেলায় অকার্যকর হওয়ায় তারা পরবর্তীতে জলঘড়ি আবিষ্কার করে। গ্ৰিকরা এই ঘড়ির নাম দিয়েছিল ক্লেপসিড্রা। তারা তাদের বিজ্ঞানচর্চাকে এক অন্য পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। তারা বর্ষপঞ্জিরও আবিষ্কার করে এবং ১২ মাসে এক বছর, ৩০ দিনে ১ মাস, ৩৬৫ দিনে এক বছরসহ প্রায় নিখুঁত এক সৌরপুঞ্জি তাদের ছিল। এমনকি তারা প্রতি চার বছর অন্তর ৩৬৬ দিনে বছর পালন করত। এ অর্থে বলতে গেলে বর্তমান যুগের "লিপ ইয়ারের "প্রচলনও সেই মিশরীয় যুগে শুরু হয়েছে।
মিশরীয় ক্যালেন্ডার; Historycaleve
মিশরীয় ক্যালেন্ডার; Historycaleve
বিজ্ঞানর্চায় এতো সাফল্যের পেছনেও অনেক ঐতিহাসিক নীল নদকে কৃতিত্ব দিয়েছেন। যেখানে অন্যান্য সভ্যতা খাবার খোঁজার জন্যই তাদের বেশির ভাগ সময় ব্যয় করতো কিন্তু মিশরীয়রা নীল নদের বদৌলতে এটা থেকে পরিত্রাণ পেয়েছিল। তাদের অর্থনীতিও কৃষি নির্ভর ছিল। তারা ড্যাম বানানো শিখেছিল এবং এই পানি কাজে লাগিয়ে তাদের কৃষির আমূল সম্প্রসারণ করতে সক্ষম হয়। সেচ ব্যবস্থা আসার দরুন কৃষি জমির পরিমাণ বাড়তে থাকে, সেই সাথে কৃষি যন্ত্রপাতি ও কাজের সুযোগও সৃষ্টি হতে থাকে । পরবর্তীতে নীল নদের তীর ঘেঁষে তৈরি হয় যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানা। ফলে নানাবিধ কাজে রমরমা হয়ে ওঠে নীলনদের তীর। যদিও সেসময় মুদ্রা চালু ছিল না তবে বিনিময় প্রথার প্রচলন ছিল। উৎপাদিত ফসলের মধ্য উল্লেখযোগ্য ছিল গম, বার্লি, তুলা, পেঁয়াজ, পিচ ইত্যাদি। পশু পালনের পাশাপাশি নীল নদেও প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। ব্যবসা- বাণিজ্যেও মিশর ছিল অগ্রগামী। মিশরে উৎপাদিত গম, লিলেন কাপড় ও মাটির পাত্র ক্রিট দ্বীপ, ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায় রপ্তানি করতো।বিভিন্ন দেশ থেকে মিশরীয়রা স্বর্ণ, রৌপ্য, হাতির দাঁত,কাঠ ইত্যাদি আমদানি করত। বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবেও প্রাচীন নীলনদের তীরের জনপদ ছিল বেশ আকর্ষণীয়।
মিশরীয় হায়ারোগ্লাফিক্স লিপি; কালের কণ্ঠ
মিশরীয় হায়ারোগ্লাফিক্স লিপি; কালের কণ্ঠ
মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ নির্মাতা ধরা হয় মিশরীয়দের। প্রাচীন মিসরীয় ভাষ্কর্যগুলোর বেশিরভাগ পাওয়া গেছে পিরামিডের ভেতরে এবং মন্দিরের দেয়ালে । প্রথম দিকে দেয়ালের গায়ে খােদাই করে এবং পরে পাথর কেটে ভাষ্কর্যগুলো তৈরি হতাে। মিশরীয় ভাষ্কর্যগুলোর মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় হচ্ছে স্ফিংস। স্ফিংসের দেহ ছিল সিংহের এবং মাথা আর মুখ ছিল মানুষের।
গিজার পিরামিড; Discovery
গিজার পিরামিড; Discovery
মিশরীয়রা ফারাওদের দেবতা মনে করতো। এমনকি তারা এও মনে করতো যে ফারাওরা ঈশ্বরের বার্তাবাহক, তারা সাধারণ মানুষের সাথে ঈশ্বরের যোগসূত্র স্থাপন করতে সক্ষম। তারা বিশ্বাস করতেন যে, ফারাওরা মৃত্যুর পর দেবতায় পরিণত হয়। তারা এই মানুষ থেকে দেবতায় পরিণত হওয়ার জন্য কিছু ভাস্কর্য নির্মাণ করতেন, সেই ভাস্কর্যগুলোই আজ পিরামিড হিসেবে পরিচিত। মূলত, ফারাওদের মৃত্যু সমাধি হিসেবেই নির্মিত হতো বিরাট আকারের এসব পিরামিড। একেকটি পিরামিড হতো কয়েক'শ মিটার পর্যন্ত উচুঁ। মিশরের পিরামিড এখনও পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি। খ্রিস্টের জন্মেরও হাজার হাজার বছর পূর্বে এতো বিশালাকৃতির অবকাঠামো নির্মাণ কিভাবে সম্ভব হয়েছিল তা পৃথিবীবাসীর কাছে আজও এক বিস্ময়ের প্রশ্ন। পিরামিডগুলোর বাইরের দেয়াল নির্মিত হয়েছিল চুনাপাথরের ব্লক দিয়ে। ভেতরের অংশে ছিল মূল্যবান গ্রানাইট পাথরের দেয়াল। যে পাথরের ব্লকগুলো দিয়ে পিরামিড হতো সেসব ব্লকও ছিল বিশালাকার। একেকটি ব্লকের ওজন প্রায় কয়েকটি প্রাইভেট কারের সমান। এসব ব্লককে একটির উপর আরেকটি এমনভাবে বসানো হয়েছে যেন দুই পাথরের মাঝে কোনো ফাঁকা স্থান না থাকে। এভাবেই পাথরের উপর পাথর বসিয়ে তৈরি করা হয়েছে গগনচুম্বী ফারাও সমাধি। মিশরের সবচেয়ে বড় পিরামিডটির নাম গিজার পিরামিড। এটি রাজা খুফু' র সমাধিস্থল। এটি ১৩ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত এবং এর উচ্চতা ৪৮১ ফুট! 
পিরামিড তৈরির পাথর টানা হচ্ছে; Contiki
পিরামিড তৈরির পাথর টানা হচ্ছে; Contiki
মজার বিষয় হলো, এখন পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্ষমতার ক্রেন ব্যবহার করেও মিশরের এই পিরামিড তৈরিতে বেগ পেতে হতো। অন্যদিকে, পিরামিড তৈরিতে ব্যবহৃত পাথরগুলো এতো নিখুঁতভাবে কাটা হয়েছে যা প্রাচীনকালে কোনো যন্ত্রের দ্বারা অসম্ভব। তাই, পিরামিড কিভাবে তৈরি হয়েছিল সে নিয়ে বিস্ময়ের সীমা নেই আধুনিক মানুষের। তবে, গিজার পিরামিডের ভেতরে প্রাপ্ত দেয়ালচিত্রে দেখা যায় কিছু মানুষ মরুভূমির মধ্য দিয়ে বিশালাকার পাথরের চাই টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যাদের সামনে আরো কিছু লোককে মরুভূমির বালিতে পানি ঢালতে দেখা যায়। এ থেকে ধারণা করা হয় যে পাথরের চাইগুলোকে দূরবর্তী কোনো অঞ্চল থেকে মরুভূমির উপর দিয়ে বিশেষ কায়দায় পিরামিডের স্থলে নিয়ে আসা হয়। তবে, পিরামিড তৈরির পুরো কৌশল এখনও অজানাই রয়ে গেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানেও অনেক এগিয়ে ছিল এই সভ্যতা। তারা চোখ, দাঁতসহ বিভিন্ন অপারেশন করতে পারতো এমনি নাড়ি পরিমাপের কৌশলও রপ্ত ছিল। মৃতদেহ যাতে না পচে যায় সে কারণে মিশরের চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বেরিয়ে আসে নতুন পদ্ধতি যাকে বলা হতো মামিফিকেশন। পিরামিড তৈরির অনেক আগেই মমি বানানো শিখেছিলো মিশরীয়রা। মৃতদেহের পচন ঠেকানোর জন্য শরীরের পচনশীল অংশ সরিয়ে ফেলা হতো। 

মৃতদেহের মমির বিভিন্ন ধাপ; Vector Stock
মৃতদেহের মমির বিভিন্ন ধাপ; Vector Stock
প্রথমে মাথার খুলির ভেতর থেকে মগজ বের করে আনা হতাে। একইভাবে পেট কেটে বের করা হতাে নাড়িভুড়ি তবে হৃৎপিণ্ড অথবা ফুসফুস রেখে দেয়া হতো। মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো, পরবর্তীতে যখন তারা পুনঃজীবিত হবে তখন এগুলো আবার সচল অবস্থায় ফিরে আসবে। পচনশীল অংশ সরিয়ে বাকি থাকতো হাড়, মাংস আর চামড়া পেঁচানাে দেহ। এর ভেতরে ভরে দেওয়া হতাে কাঠের গুঁড়াে বা পাতলা কাপড়। এরপরে মৃতদেহটি প্রায় ৪০ দিন বালিতে ডুবিয়ে রাখা হতো যাতে বালি মৃতদেহটির সব আদ্রর্তা শুষে নেয় তারপর এক ধরণের তরল ওষুধে ভিজিয়ে রাখা হতো। গাছগাছড়া দিয়ে তৈরি মলম শরীরে লাগিয়ে দেয়া হতো। পাতলা, নরম একগাদা লিলেন কাপড় দিয়ে খুব সাবধানে মৃতদেহের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পেঁচানো হতো। এই কাপড়ও এক ধরণের তরলে ভিজিয়ে নেওয়া হতো। এভাবে কয়েক পড়ত দেবার মাঝে তারা মাথার জায়গায় মৃত ব্যক্তির একটি ছবি দিয়ে আবার লিলেন কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে দিত। সর্বশেষ কাপড়ের উপর বিভিন্ন ধরনের ছবি ও ভাস্কর্য আঁকত এবং পায়ে মৃত ব্যক্তির নাম লিখে রাখতো। মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো যখন তারা পুনরায় বেঁচে উঠবে তখন তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দরকার হবে তাই তারা পিরামিডের ভিতর উক্ত ফারাওয়ের ব্যবহার্য জিনিসপত্র, সোনার বাসন-কোসন, বিভিন্ন ধরনের খাবার এমনকি তাদের নিজস্ব পরিচারিকাদেরও জীবন্ত কবর দেয়া হতো!
আন্তর্জাতিকমিশরইতিহাস
আরো পড়ুন