Link copied.
অং সান সুচি: কতটা হতে পেরেছেন মানবাধিকারের বাতিঘর?
writer
১৪ অনুসরণকারী
cover
১৫ বছরের গৃহবন্দিত্বের অবসানের পর ২০১০ সালে মুক্তি পেয়েছিলেন অং সান সু চি। তার ১০ বছর কাটতে না কাটতেই আবারও বন্দি করা হল মানবাধিকারের বাতিঘর খ্যাত এই রাজনীতিবিদকে। গৃহবন্দিত্ব, গণতন্ত্রের জন্য লড়াই, মিয়ানমারের শাসন ক্ষমতায় থাকার মত ঘটনাবলি ছাড়াও সু চি বেশ ক'বারই বিতর্কের মুখে পড়েছেন। প্রশ্নও উঠেছে তাই তার মানবাধিকারের বাতিঘর নামটি নিয়েও। 

৭৫ বছর বয়সী সু চির জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৯ জুন। উত্তরাধিকার সূত্রেই রাজনীতিতে আসা তার। সু চির বাবা ছিলেন মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সান; দেশটির জাতির জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয় অং সানকে। সু চির যখন দুই বছর বয়স তখন তার বাবাকে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র দুই বছর পর এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। 

cover
প্রথম জীবনের একটি অংশ ভারতে কাটানোর পর যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান সু চি। সেখানে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়েন দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে। ১৯৭২ সালে বিয়েও করেন মাইকেল অ্যারিস নামের একজন ব্রিটিশকে। তাদের দুই সন্তান কিম ও আলেক্সান্ডার। অ্যারিস ১৯৯৯ সালে মারা যান, তখন সু চি দেশে বন্দি দশা কাটাচ্ছেন।  

১৯৬৯ থেকে পরের দুই বছর সু চি নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সহকারী সচিব হিসেবে কাজ করেন। পেশাজীবনের শুরুও হয় তখনই। এরপর ভিজিটিং স্কলার হিসেবে তিনি কাজ করেছেন জাপানের কিয়োতো ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সাউথইস্ট এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগে। সু চি ১৯৮৭ সালে ভারতের শিমলায় ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজে কাজ করেন। পরের বছরই মায়ের গুরুতর অসুস্থতার পর দেশে ফিরে আসেন। 
cover
তখন মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাপক উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৬২ সালে জেনারেল ইউ নে উইন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন এবং তৎকালীন বার্মায় শুরু হয় সামরিক শাসন। তারপর থেকেই গণতন্ত্রের দাবীতে আন্দোলন চললেও ১৯৮৮ সালে হাজার হাজার ছাত্র, চাকরিজীবী, পেশাজীবী, জনতা, বৌদ্ধ সন্যাসী রাস্তায় নেমে গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিতে একজোট হয়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই গণবিক্ষোভের মুখে সেই বছর আগস্টে নে উইন পদত্যাগ করে ক্ষমতা সামরিক জান্তার কাছে হস্তান্তর করেন। ৮-৮-৮৮ নামে সেই আন্দোলন আজও পরিচিত। 

সু চি মায়ের দেখাশোনা করতে দেশে ফিরলেও তিনি সেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। নে উইন পদত্যাগ করলেও পরবর্তী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে তিনি প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। বিভিন্ন জনসভায় জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আর মানবাধিকার নিয়ে কড়া বক্তব্য রাখেন সু চি। এর ফলে শীঘ্রই তিনি সামরিক সরকারের রোষানলে পড়েন।

cover
সে বছরের (১৯৮৮) আগস্টে দেশে জনসমক্ষে প্রথম বারের মত ভাষণ দেন সু চি। বলেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা। এর মাসখানেক পরই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)।  সেনাবাহিনীতে বিভেদ ছড়ানোর চেষ্টার অভিযোগে ১৯৮৯ সালে গৃহবন্দী করা হয় সু চিকে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

সু চিকে একসময় মানবাধিকারের বাতিঘর বলা হত- যিনি একজন নীতিবান অধিকারকর্মী হিসেবে দশকের পর দশক ধরে মিয়ানমারের শাসন ক্ষমতায় থাকা নির্দয় সামরিক জেনারেলদের চ্যালেঞ্জ করতে নিজের স্বাধীনতাকে জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন। গণতন্ত্রের সংগ্রামে লড়াই করে যাওয়া এই নেত্রীকে ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরষ্কার দেয়া হয়। তখনও তিনি গৃহবন্দীই ছিলেন।  গৃহবন্দি দশা থেকে তার মুক্তি মেলে ১৯৯৫ সালে। তবে রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নিয়ন্ত্রিত রাখার নির্দেশ ছিল তার প্রতি। বছর পাঁচেক পর, ২০০০ সালে আবারও গৃহবন্দি হন সু চি। সে বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সু চিকে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম পুরষ্কারে ভূষিত করেন।

cover
২০০২ সালে সু চিকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি দেয়া হয়। পরের বছরই ফের গৃহবন্দী করা হয় তাকে। এবার অভিযোগ ছিল, রাস্তায় গাড়িবহরে জান্তা সরকারের সমর্থকদের হামলা। এবার তাকে গৃহবন্দীত্বের সাজা দেয়া হয় যা প্রতি বছর নবায়ন হতে থাকে।
২০০৮ সালে সু চি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল পান। তখনও তিনি গৃহবন্দী। ২০০৯ সালে মুক্তির প্রাক্কালে তিনি আবার বন্দী হন। এবার তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি তার বাড়িতে বহিরাগত প্রবেশ করতে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক জন ইয়েত্তাও নাকি তার বাড়িতে দুই রাত থেকেছেন। এই অভিযোগে সু চিকে ১৮ মাসের সাজা দেয়া হয়। যদিও জাতিসংঘ এটাকে মিয়ানমারের আইনেই অবৈধ বলে ঘোষণা দেয়। ২০১০ সালে ১৫ বছর বন্দি থাকার পর সু চির বন্দি দশা থেকে মুক্তি মিলল । ১৯৮৯ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে অন্তত ১৫ বছর বন্দী জীবন কাটিয়েছেন অং সান সু চি।

সু চি যাতে ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন তার জন্য সামরিক জান্তা নতুন নির্বাচনী আইন পাশ করে। এতে বলা হয়, বিদেশী নাগরিককে বিয়ে করা বা বিদেশী নাগরিকত্ব আছে এমন সন্তান যাদের আছে তারা প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। আবার আরেকটি আইন মতে, সাজাপ্রাপ্ত কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না- যার দুটোই সু চির ক্ষেত্রে খাটে, কারণ তার স্বামী এবং সন্তানেরা বিদেশী নাগরিক। এনএলডি এই আইনের অধীনে নিবন্ধন করতে রাজি হয়নি, তাই ২০১০ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ২০১১ সালে সু চি মুক্ত হন এবং দলটিকে ওই আইনের অধীনেই নিবন্ধন করতে রাজি হয়ে যান, যার মাধ্যমে ২০১২ সালে সু চি পার্লামেন্টের সদস্য হন। 

২০১৫ সালের নভেম্বরে ২৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার অনুষ্ঠিত অবাধ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি এনএলডি'র নেতৃত্ব দেন এবং যাতে বড় ধরণের জয় পান সু চি। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তার নেতৃত্বকে দেশটিতে মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি হওয়া আচরণ দিয়েই বর্ণনা করা হয়। ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে পুলিশ স্টেশনে প্রাণঘাতী হামলার পর রোহিঙ্গাদের উপর সেনাবাহিনীর নির্যাতন শুরু হলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়।



সু চির সাবেক আন্তর্জাতিক সমর্থকরা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে, তিনি ধর্ষণ, হত্যা এবং সম্ভাব্য গণহত্যা রুখতে কোন পদক্ষেপ নেননি এবং ক্ষমতাধর সামরিক বাহিনীর নিন্দা কিংবা তাদের নৃশংসতার মাত্রাও স্বীকার করেননি। বিশ্বের বহু নেতা, নোবেল বিজেতা, মানবাধিকার কর্মী, জাতিসংঘসহ বিশ্বের সমস্ত মানুষ এই গণহত্যার নিন্দা করলেও সু চি ছিলেন এই বিষয়ে নীরব। কখনও এ নিয়ে মুখ খুললেও শব্দচয়নে ছিলেন অতি সাবধানী অথবা ইঙ্গিতে সামরিক বাহিনীর কর্মকান্ডকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছেন।
প্রাথমিকভাবে অনেকেই তার পক্ষে যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করে বলেছেন যে, তিনি একজন বাস্তববাদী রাজনীতিবিদ যিনি বহু-জাতি বিশ্বাসের সম্প্রদায়ভুক্ত একটি দেশ শাসন করছেন যার জটিল ইতিহাস রয়েছে। তবে ২০১৯ সালে হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে অনুষ্ঠিত শুনানিতে সামরিক বাহিনীর পদক্ষেপের বিষয়ে তার নিজের স্বপক্ষে উপস্থাপিত যুক্তি মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এর পর তার আন্তর্জাতিক সুনাম বলতে তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকে না। দেশের ভেতরে "দ্য লেডি" নামে পরিচিত অং সান সু চি বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠদের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় যারা রোহিঙ্গাদের প্রতি তেমন সহানুভূতিশীল নয়। ২০২০ সালের নভেম্বরে নির্বাচনে আবারও এনএলডির জয় ঘোষণা, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সু চি ও তার দলকে ক্ষমতায় বসায়।

পরবর্তীতে সেনা সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) জানাল, ভোট সুষ্ঠু হয়নি, তাই আবার নির্বাচন দিতে হবে। এর প্রেক্ষিতে গেল ১ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা দখলে নেয় দেশটির সেনাবাহিনী। সু চিসহ এনএলডির শীর্ষনেতারা বন্দি হলো। এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে মিয়ানমারে। সামনের দিনগুলোয় সুচির ভাগ্যে কী আছে সেটিই এখন দেখার বিষয়।


Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021