শ্রীলঙ্কা: একটি পরিবারের হাতে একটি দেশ দেউলিয়া!
আন্তর্জাতিক
শ্রীলঙ্কা: একটি পরিবারের হাতে একটি দেশ দেউলিয়া!
শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে রাজাপাকসে পরিবারের ইতিহাস অনেক পুরনো। ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশটির ক্ষমতায় ছিলেন মাহিন্দা রাজাপাকসে। ২০১৯ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তার ভাই গোতাবায়া রাজাপাকসে। নির্বাচনে জিততে তেমন বেগ পেতে হয়নি তাকে। ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসের শাসনামলেই তিনি দ্রুত নিজের রাষ্ট্রপতি পদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে নিয়েছিলেন। নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী গোতাবায়া রাজাপাকসে ব্যাপক হারে কর হ্রাসের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখনকার সরকার ভেবেছিল এটি হয়ত তার নির্বাচনী কৌশল। ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে তার প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে অবিলম্বে কর হ্রাসের বিষয়টি চূড়ান্ত আনুমোদন করেন। এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করে শ্রীলঙ্কার সে সময়ের অর্থমন্ত্রী মঙ্গলা সামারাবিরা একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। মন্ত্রী সতর্ক করে বলেছিলেন, "এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশ (শ্রীলঙ্কা) শুধু দেউলিয়াই হবে না, আরেকটি ভেনিজুয়েলা বা গ্রিসে পরিণত হবে।" মূলত মূল্য সংযোজন কর ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ করা এবং অন্যান্য শুল্ক বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করে গোতাবায়া সরকার। মহামারি, যুদ্ধ, এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে অনেকটা নড়বড়ে অবস্থাতেই রয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। সে সময় নেতাদের অবিচক্ষণ পদক্ষেপ এখন হয়ে উঠেছে একটি সতর্কতামূলক গল্প। আজ শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। মন্ত্রীর সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হতে সময় লেগেছে মাত্র ৩০ মাস। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানি ও খাদ্য সংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, নগদ অর্থের অভাবে বিশৃঙ্খল এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়েছে শ্রীলঙ্কার বর্তমান সরকার। খাবার ও ওষুধের সংকটে বিক্ষুব্ধ জনতা ভাঙচুর চালিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে, রুটিতে আগুন দিয়ে জানিয়েছে অভিনব এক প্রতিবাদ। আন্দোলনের অংশ হিসেবে সোমবার (৯ মে) প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেয়া মাহিন্দা রাজাপাকসের পৈতৃক বাড়িতে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা।
শ্রীলঙ্কার মতো একটি দ্বীপরাষ্ট্রকে সামগ্রিকভাবে পঙ্গু করে দেয়া রাজাপাকসে পরিবারের ক্ষমতার নেশা অনেক পুরনো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম দাপট দেখিয়ে আসছে এই রাজাপাকসে পরিবার। দেশটিতে এখন রাজত্ব করছে রাজাপাকসে পরিবারের তৃতীয় পুরুষ। বাবার হাত ধরে ছেলে, ভাইয়ের পিছু পিছু ভাই, কাকার দেখাদেখি ভাতিজা- এভাবেই পুরো দেশের ক্ষমতা তাদের পারিবারিক চৌহদ্দিতে। ২০১৯ সাল থেকে দেশের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ দখল করে রেখেছেন এই পরিবারের সেজো ভাই গোতাবায়া রাজাপাকসে ও মেজো ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসে। রাজপাকসে পরিবারের রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয় মাহিন্দা-গোতাবায়ার দাদা ডন ডেভিড রাজাপাকসের হাত ধরে। ১৮৮০এর দশকে প্রাচীন ব্রিটিশ শাসনের গুচ্ছগ্রামের গ্রামপ্রধান ছিলেন তিনি। মাহিন্দা-গোতাবায়ার বাবার নাম ছিল ডন অলউইন (ডিএ) রাজাপাকসে। জীবদ্দশায় তিনি শ্রীলঙ্কার কৃষিমন্ত্রী ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল শ্রীলঙ্কান ফ্রিডম পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। তার বড় ভাই ডন ম্যাথিউ রাজাপাকসে রাজনীতি করেছেন ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে। তিনি শিলংয়ের আইনসভার সদস্য ছিলেন। ম্যাথিউয়ের মৃত্যুর দুই বছর পর হাম্বানটোটার এমপি হন তার বড় ছেলে লাক্সম্যান রাজাপাকসে। তার ছোট ভাই জর্জ রাজাপাকসে একসময় শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। হিসাব অনুযায়ী, পরিবারের তৃতীয় পুরুষ বর্তমানে লংকায় রাজত্ব করছে। ২০১৯ সালে বড় ভাই চামালকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদে বসান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া। যদিও দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা নিষিদ্ধ হওয়ায় আইনের বেড়াজালে আর প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি মাহিন্দা রাজাপাকসে। মাহিন্দার এক দশকের (২০০৫-১৫) দীর্ঘ শাসনামলে নির্লজ্জ স্বজনপ্রীতি ছিল উল্লেখ করার মত। চার ভাই মিলে সরকারের বেশিরভাগ মন্ত্রণালয় ও সরকারি অর্থের প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতেন। মাহিন্দার পুরো শাসনামলে প্রতিরক্ষা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন গোতাবায়া। রাজাপাকসে পরিবারের রক্তে মিশে রয়েছে রাজনীতি। তবে চতুর্থ পুরুষ রাজনীতিতে কেমন ভূমিকা রাখতে পারবে তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। আশঙ্কা করা হচ্ছে দেশটির পরিস্থিতি ঠিক হতে আরও অনেক সময় লাগবে। দেশটির সাধারণ নাগরিকেরা চায় না আবার রাজাপাকসে পরিবারের কেউ ক্ষমতায় বসুক।
শ্রীলঙ্কার মতো একটি দ্বীপরাষ্ট্রকে সামগ্রিকভাবে পঙ্গু করে দেয়া রাজাপাকসে পরিবারের ক্ষমতার নেশা অনেক পুরনো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম দাপট দেখিয়ে আসছে এই রাজাপাকসে পরিবার। দেশটিতে এখন রাজত্ব করছে রাজাপাকসে পরিবারের তৃতীয় পুরুষ। বাবার হাত ধরে ছেলে, ভাইয়ের পিছু পিছু ভাই, কাকার দেখাদেখি ভাতিজা- এভাবেই পুরো দেশের ক্ষমতা তাদের পারিবারিক চৌহদ্দিতে।
নামাল রাজাপাকসে(বামে)
নামাল রাজাপাকসে(বামে)
মাহিন্দা রাজাপাকসের শাসনামলে শ্রীলঙ্কা আরও বেশি চীন-ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। চীনের কাছ থেকে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য এখন পর্যন্ত ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি ঋণ নিয়েছে দেশটি। যদিও সেসব তেমন একটা কাজে লাগেনি দেশের মানুষের। অধিকাংশ কাজ দুর্নীতির কারণে অকার্যকর সম্পদে রূপান্তরিত হয়েছে। মাহিন্দার সময়ে তার আরেক ভাই বাসিল রাজাপাকসে ছিলেন দেশটির অর্থমন্ত্রী।  বিভিন্ন সরকারি চুক্তি থেকে ১০ শতাংশ কমিশন নেয়ার অভিযোগ মত গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আর এই কারণে তাকে বলা হতো ‘মিস্টার টেন পারসেন্ট’। আর এভাবেই দেশটির অর্থনীতি পুরোপুরি শেষ করে দিয়েছে মাহিন্দা। আর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে। দেশের এমন পরিস্থিতে রাজাপাকসে পরিবারের অবস্থান নিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, মাহিন্দা রাজাপাকসের বড় ছেলে নামাল রাজাপাকসে। তার পরিবার এখন শুধু একটা খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। নামালকে ভাবা হয় শ্রীলঙ্কার ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট। তার বিরুদ্ধেও বিদেশে অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিকবিশেষ প্রতিবেদনশ্রীলঙ্কা
আরো পড়ুন