Link copied.
অ্যাম্বারগ্রিস: তিমির অন্ত্রে থাকা এক মূল্যবান রত্নের রহস্য!
writer
অনুসরণকারী
cover
‘তিমি’ শব্দটি মাথায় আসলেই আমাদের চোখে ভাসে বিশাল দেহী এক প্রাণী যে কিনা এক গ্রাসেই মুখে তুলে নিতে পারে আপনার আমার মতো ২০০ মানুষের খাবার। এই তিমি তার বিশাল আকৃতি দ্বারা যেমন ভয়ের সঞ্চার করে সাগরে ভাসা মানুষের মধ্যে তেমনি তার জীবনাচরণ, বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে বিস্ময়ের শেষ নেই স্থলে থাকা মানুষের মনেও। বিশাল দেহী এই তিমিদের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে একটি হলো কালচে ধূসর রঙের অমসৃণ দেহের স্পার্ম তিমি। বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য এদের বেশ নাম ডাক রয়েছে। এই প্রজাতির তিমিরা খাবারের জন্য সবচেয়ে বেশি গভীরে (প্রায় ৩০০০ মিটার পর্যন্ত) যেতে পারে এবং প্রায় দেড় ঘন্টা বাতাস ছাড়াই সেখানে থাকতে সক্ষম।

তাছাড়া এরা দাঁতওয়ালা তিমি হিসেবে পরিচিত হলেও এদের কেবল নিচের চোয়ালে দাঁত থাকে। এদের মাথায় রয়েছে স্পার্মাসেটি থলি, যাতে থাকে স্পার্মাসেট নামক ফ্যাট। এসব বৈশিষ্ট্যের উর্ব্ধে গিয়ে যে দিকটা এদেরকে অন্যসব তিমি থেকে আলাদা করে মানুষের কাছে পরিচিতি দিয়েছে তা হলো এদের অন্ত্রে তৈরি হওয়া এক বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ ‘অ্যাম্বারগ্রিস’। অ্যাম্বারগ্রিস-কে প্রায়ই বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
cover
‘অ্যাম্বারগ্রিস’ শব্দটি আসে প্রাচীন ফরাসি শব্দ ‘অ্যাম্বের গ্রিস’ বা ‘ধূসর অ্যাম্বার’ থেকে। ‘অ্যাম্বার’ শব্দটির উৎস একই, ইউরোপে অ্যাম্বার শব্দটি দ্বারা মূলত জীবাশ্ম গাছের রেজিনকে বুঝানো হতো। বহু শতাব্দী যাবত মানুষ অ্যাম্বারগ্রিস ব্যবহার করে আসলেও এর উৎস বহু বছর ছিল মানুষের জানার বাইরে। একসময় আম্বারগ্রিস কে ধারনা করা হতো শক্ত হয়ে যাওয়া সমুদ্রের ফেনা কিংবা পাখির দেহ নিসৃত বর্জ্য হিসেবে। অবশেষে ১৮০০ শতকে অ্যাম্বারগ্রিসের প্রকৃত উৎপাদক হিসেবে স্পার্ম তিমিকে চিহ্নিত করা হয়। অ্যাম্বারগ্রিস এর জীবাশ্ম গুলো প্রায় ১.৭৫ মিলিয়ন বছরের পুরোনো এবং মানুষ প্রায় ১০০০ বছরের বেশি সময় ধরে এটি ব্যবহার করে আসছে। হাজার বছরের এক অনন্য ঘটনা এই অ্যাম্বারগ্রিস। একে ‘সমুদ্রের ধন’ (treasure of the sea) এবং ‘ভাসমান সোনা’ (floating gold) বলা হয়।
cover
অ্যাম্বারগ্রিস তিমির অন্ত্রে বিকশিত হয়। খাদ্য হিসেবে স্পার্ম তিমিগুলি প্রচুর পরিমাণে সেফালোপড যেমন স্কুইড এবং ক্যাটল ফিশ খায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যে অংশগুলো হজম হয় না (চঞ্চু এবং থাবা) সেগুলো পরিপাকের পূর্বে বমির মাধ্যমে বের করে দেয়। কিন্তু অনেক সময় এই অংশগুলো পরিপাকতন্ত্রে চলে যায় এবং একসাথে আবদ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে শক্ত ভরে পরিণত হয় যা আচ্ছাদিত থাকে একপ্রকার চিটচিটে পদার্থ দ্বারা যাতে তিমির ভিতরের অঙ্গগুলোর কোনো ক্ষতি সাধন না হয়। এই অ্যাম্বারগ্রিস, যা সারা জীবন তিমির অভ্যন্তরে থাকে। এগুলো দীর্ঘদিন তিমির অন্ত্রে থাকে এবং বৃদ্ধি পায় ফলে যখন তা মলদ্বার দিয়ে বের হয়ে আসে তখন অনেক সময় মলদ্বার ফেটে গিয়ে অনেক তিমি মৃত্যুবরণ করে। তিমি মারা যাওয়ার পর অ্যাম্বারগ্রিসের টুকরোগুলো সমুদ্রে ভেসে বেড়ায়। যেহেতু তিমি থেকে নিঃসৃত হওয়ার পরে সমুদ্রের মধ্যে থেকে যায় অনেকটা সময় তাই লবণাক্ত পানিতে জারণের কারণে একটি সাদা আবরণ তার চারপাশে তৈরি হয়। সাধারণত, প্রথমে অ্যাম্বারগ্রিসের রঙ হালকা, মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত হয়।
রাসায়নিকভাবে অ্যাম্বারগ্রিস এসিডের সাথে বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে না। কেননা এতে রয়েছে অ্যালকালয়েড এসিড এবং একটি নির্দিষ্ট কোলেস্টেরল জাতীয় যৌগ যা ‘অ্যামব্রিন’ নামে পরিচিত। ১৯৪৬ সালে রুইসকা এবং ফার্নান্দ লারডন অ্যাম্বারগ্রিসে থাকা এই বিশেষ উপাদান ‘অ্যামব্রিন’ আবিষ্কার করেন। অপরিশোধিত অ্যাম্বারগ্রিস কে অ্যালকোহল মিশ্রণের সাথে গরম করে অ্যামবারগ্রিস আলাদা করা হয়। জারণের মাধ্যমে অ্যামব্রিনের ভাঙ্গনে অ্যামব্রিক্সান এবং অ্যামব্রিনল তৈরি করে যা মূলত অ্যামবারগ্রিসের সুগন্ধের জন্য দায়ী। অ্যামবারগ্রিস বিভিন্ন আকারে পাওয়া যায়, সাধারণত ১৫ গ্রাম (১-২ আউন্স) থেকে ৫০ কেজি (১১০ পাউন্ড) বা তারও বেশি ওজনের হয়ে থাকে।
অ্যাম্বারগ্রিস মূলত কস্তুরীর মতো সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহারের জন্য পরিচিত। এতে থাকা অ্যামব্রিন নামক গন্ধহীন উপাদান অ্যালকোহল-কে পারফিউম শিল্পে সুগন্ধ দীর্ঘস্থায়ীকরণে ব্যবহার করা হয়। হারমান মেলভিল তার ‘মবি ডিক’ উপন্যাসে একটি মৃত তিমির থেকে আসা গন্ধকে “সুগন্ধের এক ম্লান ধারা” হিসেবে উল্লেখ করেন। ঐতিহাসিকভাবে খাবার ও পানীয়তে অ্যাম্বারগ্রিসের ব্যবহার ছিল বলে জানা যায়। ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস এর প্রিয় খাবার হিসেবে ডিম এবং অ্যাম্বারগ্রিস পরিবেশনের তথ্য পাওয়া যায়। ১৮ শতকের দিকে ইউরোপে হট চকোলেট এবং তুরস্কে কফিতে ফ্লেভার হিসেবে এটি ব্যবহার করা হতো।
cover
অনেক সংস্কৃতিতে এটিকে এফ্রোডিসিয়াক বা যৌন উত্তেজক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমান মিশরে অ্যাম্বারগ্রিসকে সিগারেটে ঘ্রাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয় যেখানে প্রাচীন মিশরীয়রাই এর নাম দিয়েছিলেন অ্যাম্বার এবং একে ধুপ হিসেবে ব্যবহার শুরু করলেও পরবর্তীতে তা অ্যাফ্রোডিসিয়াক এবং ব্রেইন, হার্ট এবং ইন্দ্রিয়ের রোগ নিরাময়ের জন্য ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করেন।এমনকি মধ্যযোগে ইউরোপেও মাথাব্যথা, সর্দি, মৃগী এবং অন্যান্য রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হতো অ্যাম্বারগ্রিস। প্রাচীন চীনাদের কাছে এটি ‘ড্রাগনের স্পিটল সুগন্ধ’ বলে অভিহিত ছিল। ইউরোপে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারি চলাকালীন সময়ে একে বায়ূ ‘স্যানিটাইজার’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো যদিও জনমনে ভুল ধারণা ছিল যে মহামারির মূলে রয়েছে এই অ্যাম্বারগ্রিস।
স্পার্ম তিমি পৃথিবীর সমস্ত মহাসাগরে বাস করলেও অ্যাম্বারগ্রিস মূলত পাওয়া যায় আটলান্টিক মহাসাগর এবং দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূল, ব্রাজিল, মাদাগাস্কার, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, মালদ্বীপ, চীন, জাপান, ভার্‌ত, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, এবং মলুচ্চা দ্বীপপুঞ্জে। বেশিরভাগ বাণিজ্যিকভাবে সংগ্রহ করা অ্যাম্বারগ্রিস আটলান্টিকের বাহামা থেকে বিশেষত নিউ প্রোভিডেন্স থেকে আসে।
ক্রিসটোফার কেম্প তার বই ‘Floating Gold: A Natural (and Unnatural) History of Ambergris’-এ বলেন, অ্যাম্বারগ্রিস শুধু মাত্র স্পার্ম তিমিদের দ্বারা উৎপন্ন হয় এবং তাদের মধ্যে মাত্র ১% এটি উৎপাদন করে। তিমির শরীর থেকে নিসৃত হওয়ার পর মাটিতে পতিত হওয়ার আগে বছরের পর বছর এটি সাগরের পানিতে ভাসমান থাকে। প্রতি কয়েক বছর অন্তর সাগরের উপকূলে পাওয়া যায় অ্যাম্বারগ্রিস, এছাড়াও পাথরের সাথে সাদৃশ্য থাকায় একে খুঁজে পাওয়াও মুশকিল ।এসব অপ্রতুলতার কারণেই অ্যাম্বারগ্রিজ অত্যন্ত মূল্যবান পণ্য। সুগন্ধি উৎপাদনে অ্যাম্বারগ্রিজের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে আনতে রসায়নবীদরা এর কয়েকটি বৈশিষ্ট্যকে সিনথেটিকভাবে প্রতিলিপন করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে অনেক পারফিউম প্রস্তুতকারণ এখনো অ্যাম্বারগ্রিসের ব্যবহারকে ল্যাবে তৈরি উপাদানগুলোর থেকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।
cover
সম্প্রতি এমনি এক স্পার্ম তিমি বদলে দিয়েছে ইয়েমেনের কিছু দরিদ্র জেলের জীবন। সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে পাওয়া এক মৃত তিমিকে তারা পাড়ে নিয়ে আসেন। তারপর তার পেট কাটার পর বেরিয়ে আসে মহামূল্যবান অ্যাম্বারগ্রিস যার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৫ লাখ ডলারে। এই টাকা দিয়ে তারা বাড়ি, গাড়ি ও নৌকা কিনেন, কিছু টাকা বিতরণ করেন দরিদ্র মানুষের সাহায্যে। ভাবতে পারেন! একটি মৃত তিমি কেমন বদলে দিয়েছে দরিদ্র জেলেদের জীবন?
cover
প্রায় ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বে শুরু হওয়া তিমি শিকার একসময় বানিজ্যিক শিল্পের অংশ হয়ে উঠে। ১৮ শতক থেকে ১৯ শতকের মধ্যভাগে তিমি শিল্প বেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠে। কিছু প্রতিবেদন হতে দেখা যায় সেইসময় প্রতি বছর স্পার্ম তিমি সহ প্রায় ৫০,০০০ তিমি মারা হতো। ১৮০০ এর দশক জূড়ে, কয়েক মিলিয়ন তিমি তাদের তেল, হাড় এবং অ্যাম্বারগ্রিজের জন্য হত্যা করা হয়েছিল, যার ফলে বিপন্নতার মুখোমুখি হয় এই তিমি প্রজাতি। তিমির জনসংখ্যার ভয়াবহ হ্রাসের ফলে International Whaling Commission(IWC), ১৯৮৬ সালে বাণিজ্যিকভাবে তিমি নিধণ-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। যদিও এই নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে এখনো তিমি শিকার বা হোয়েলিং করে যাচ্ছে নরওয়ে, জাপান এবং আইসল্যান্ড।
কেউ হয়তো ভাবতে পারেন পারফিউম শিল্পে ব্যবহৃত উপাদান গুলোর সাথে জড়িয়ে আছে খুবই উপাদেয় এবং আন্দদায়ক সব স্মৃতি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সুগন্ধি তৈরির বাগানে শুধু ফুল নয় বরং কাটাও রয়েছে। যেমনটা স্পার্ম তিমির অন্ত্র চিরে আসে প্রাকৃতিক অ্যাম্বারগ্রিস যা সুগন্ধি তৈরির অন্যতম মূল্যবান উপাদান।

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021