Link copied.
‘জায়নবাদ’ যে সুপরিকল্পিত কৌশলে আজকের ‘ইহুদিবাদ’কে প্রতিষ্ঠা করেছে!
writer
অনুসরণকারী
cover
এই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন দন্দ্ব হচ্ছে ধর্মীয় দন্দ্ব। যেই দন্দ্বের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। রক্তাক্ত ইতিহাসের ধারা বজায় রেখে এখনো মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। এই বিংশ শতাব্দির যুগে এসেও যখন সর্বত্র গণতন্ত্র , শান্তির বুলি আওড়ানো হচ্ছে। তখনও মৃত্যুর মিছিল থেমে নেই। ইসরাইল প্যালেস্টাইন ইস্যু মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে পুরোনো বিরাজমান দ্বন্দ যেটা সমাধানে কেউই কোনো কিছু করতে পারে নি। এই দন্দ্ব কেন হচ্ছে কবে থেকে শুরু সেই বিষয়ে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। তবে অনেকেই ইহুদীবাদ এবং জায়নবাদ এই দুই জিনিসকে এক করে ফেলছে, যেটা আসলে এক নয়। দুটি ক্ষেত্র একদম আকাশ পাতাল পার্থক্য রয়েছে। আজকে আমরা মূলত জায়নবাদ টা আসলে ঠিক কি, কোত্থেকে এই মতবাদ আসলো সেটা জানবো। 
cover
জায়নবাদ সম্পর্কে জানার আগে ইহুদিবাদ নিয়ে কিছু কথা বলতে হবে। ইহুদিবাদ এবং জায়নবাদের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো ইহুদীবাদ একটি বিশ্বাস বা ধর্ম, সেদিক থেকে জায়নবাদ একটি জাতীয়তাবাদী মতবাদ যার সাথে ইহুদিবাদের সম্পর্ক খুবই সুক্ষ্ণ। 

ইসলাম, খ্রিষ্টান এবং ইহুদীবাদ এই তিনটি ধর্মকে আব্রাহামিক ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। কারণ তিনটি ধর্মেই আব্রাহাম তথা ইব্রাহীম (আঃ) খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। এজন্য এই তিনটি ধর্মের বিভিন্ন বিষয়ে অনেক সাদৃশ্য পাওয়া যায়। ইহুদিবাদ এই তিনটি ধর্মের মধ্যে অন্যতম প্রাচীন একটি মতবাদ। সেই ধর্ম একটি একেশ্বরবাদী ধর্ম। যেখানে ঈশ্বরকে মানুষজাতির শিক্ষক হিসেবে বর্ণণা করা হয়ে থাকে। তিনি নির্দিষ্ট সময় পরপর অবাধ্য মানুষ জাতিকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনার জন্য নবীদের প্রেরণ করেছেন।

ইহুদিবাদের সবচেয়ে প্রাচীন ধর্ম গ্রন্থ “হিব্রু বাইবেল” যেটাকে ওল্ড টেস্টামেন্ট বলা হয়ে থাকে। এই হিব্রু বাইবেলের প্রথম পাঁচটা খন্ডকে তারা “Torah” অর্থাৎ “The book of Moses” বলে থাকে। ইসলাম ধর্ম মতে যেটাকে “তাওরাত” বলে চিহ্নিত করা হয় যা Moses তথা মুসা (আঃ) এর উপর নাজিল হয়। Torah কে ইহুদিবাদে আইন হিসেবে ধরা হয়, যেখানে তাদের জীবনযাপন করার সব নির্দেশনা দেয়া আছে । Moses , Abraham, Issac , Jacob, joseph তারা আব্রাহামিক তিনটি ধর্মেরই গুরুত্বপূর্ণ নবী। তবে Jacob তথা ইয়াকুব (আঃ) এর বংশধরদেরকেই আজকের ইসরাইলী বলা হয়। 
cover
ওল্ড টেস্টামেন্টের মতে, আইজ্যাক এবং রেবেকার ঘরে যমজ সন্তান জন্ম নেয়। রেবেকা জন্ম দেয়ার সময় জানতে পারেন যে তার ছোট ছেলে বিশাল সম্পত্তির অধিপতি হবে এবং বড় ছেলে ছোট ছেলের আনুগত্যে থাকবে। জ্যাকবের বড় ভাই ঈসাউস একজন দক্ষ শিকারি ছিলো অন্যদিকে জ্যাকব ছিলো এখন মেষপালক। তাদের পিতার মৃত্যশয্যায় জ্যাকব তার ভাইকে প্রতারিত করে পিতার কাছ থেকে বার্থরাইট তথা উত্তরাধিকার মনোনীত হয়। তার ভাই এতে তার উপর ক্ষেপে গেলে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে তাদের পূর্বপুরুষদের জায়গা মেসোপটেমিয়ায় চলে যায়। সেখানে যাওয়ার পথে এক জায়গায় তিনি ঈশ্বর কতৃক বাণী প্রাপ্ত হন, যে জায়গার নাম তিনি দেন Bethel (The house of god) যেটাকে এখন আমরা বেথেলহাম বলে জানি, যা খ্রিষ্টান ধর্মের খুবই পবিত্র একটি জায়গা। তিনি “হারান” নামক জায়গায় পৌছান যেখানে তার চাচা থাকত। সেখানে তিনি অনেকবছর কাজ করে, বিশাল সম্পত্তি তৈরী করেন এবং পরিবার নিয়ে প্যালেস্টাইনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সেখানে যাওয়ার পথে এক রহস্যময় লোকের সাথে তার সাক্ষাত হয় যিনি তার নাম দেন “ইসরাঈল”।
cover
জায়নবাদ
উপরের জ্যাকবের ঘটনা শুনেই বুঝতে পারছেন যে এই প্যালেস্টাইন জায়গাটা তাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। তবে জ্যাকবের বংশধরেরা পরবর্তীতে কিন্তু সেই জায়গায় থাকে নি। তারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পরে। ১৮ শতকের দিকে দেখা যায়, ইহুদীরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বেশি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিশেষ করে রাশিয়া, অস্ট্রিয়া, জার্মানী, সুইজারল্যান্ড। সেখানে ধর্ম নিরপেক্ষ মনোভাব গড়ে উঠছে কেবল যেটা ধর্মীয় গোড়ামীতে পূর্ণ ইহুদীদের প্রচন্ড আঘাত করে। এছাড়া রাশিয়ায় অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের সাথে তাদের সংঘাত বেধে যায়। তখন থেকেই অনেক ইহুদী জ্ঞানী দার্শনিকরা একটি ইহুদী রাষ্টের কল্পনা করেন যেটি তাদের পূর্বপুরুষদের স্থানে হবে। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যেই আন্দোলন সেটাকে জায়নিস্ট আন্দোলন বলা হয়। Zion মূলত জেরুজালেমের একটি প্রাচীন পাহাড়।
cover
জায়নবাদের উত্থান
আমরা সবাই জানি যে ১৯১৭ সালে বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ইসরাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায়। তবে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আরেকটু পেছনে। বর্তমান প্যালেস্টাইনে তখন ইহুদীদের সংখ্যা অনেক কম। বেশীর ভাগ ইহুদিই তখন পশ্চিম ইউরোপ এবং রাশিয়ায়। প্যালেস্টাইন তখন অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে, যা পরে ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। ১৮ এবং ১৯ শতকে ইহুদীদের মধ্যে “Haskala” আন্দোলন যেটি একটি বুদ্ধিভিত্তিক আন্দোলন সেটা শুরু হয়। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিলো পশ্চিমা ধর্মীয় নিরপেক্ষ শিক্ষা এবং সংস্কৃতির সাথে হিব্রু ধর্মীয় শিক্ষার একটা মেলবন্ধন করে। এই আন্দোলনের কেন্দ্র ছিলো বার্লিন। তৎকালীন সময়ে ইহুদাইরা বেশীরভাগই ব্যবসা বাণিজ্যের কারণে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বিচরণ করতো। সেই সময়েই তারা মনে করে যে তাদের একসাথে থাকা উচিত, নিজেদের একটা সংস্কৃতি তৈরী করে ,আইন কানুন মেনে একটি জনপদ সৃষ্টি করা উচিত। সেই ধরাণারই একটি রাজনৈতিক ধারণা দেন অস্ত্রিয়ান সাংবাদিক থিওডর হেজেল। 
cover
তিনি anti semistim তথা ইহুদীদের উপর বৈষ্যমের কথা তুলে ধরে ইহুদি রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। পরবর্তীতে ১৮৯৭ সালে বাসেল, সুইজারল্যান্ড প্রথম জায়োনিস্ট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নেতারা বলেন- “জায়োনিজম এর উদ্দেশ্য হচ্ছে ইহুদিদের জন্য প্যালেস্টাইনে একটা নিরাপদ আবাস নির্মাণ করা যেটি আইন দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে।” 
“জায়োনিজম এর উদ্দেশ্য হচ্ছে ইহুদিদের জন্য প্যালেস্টাইনে একটা নিরাপদ আবাস নির্মাণ করা যেটি আইন দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে।“
এভাবে প্রতি দুই বছর অন্তর জায়োনিস্ট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু করে। তারা প্যালেস্টাইনের স্বায়ত্তশাসন দাবী করলে সেটা অটোমানরা নাকচ করে দেয়। এরপর তারা ব্রিটিশদের কাছে যায়, ব্রিটিশরা সেটেলমেন্টের জন্য বর্তমান আফ্রিকার উগান্ডাকে প্রস্তাব করে, কিন্তু তারা প্যালেস্টাইনের জন্যই গো ধরে বসে থাকে। এইটা বলছি ১৯০২-০৪ সময়ের কথা। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এর দামামা বেজে ওঠার আভাস তৈরী হয়। প্রেক্ষাপট দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। জায়নবাদীরা কিন্তু খুব সামান্য অংশ ইহুদিদেরই প্রতিনিধিত্ব করতো। যাদের মধ্যে বেশীর ভাগই ছিলো রাশিয়ান ইহুদি, এবং আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলো অস্ট্রিয়ান, জার্মান ইহুদি। কিন্তু তারা সু সংগঠিত ছিলো। তাদের নিজস্ব পত্রিকা ছিলো, তারা নিজেদের কার্যক্রমকে ইহুদি রেনেসাঁ বলে প্রচারণা শুরু করে।

১৯০৫ সালে রাশিয়ার বিপ্লবের পর অনেক ইহুদি দেশ ছেড়ে প্যালেস্টাইনের দিকে চলে আসে। এরপর যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে ১৯১৭ সালে জায়োনিস্ট আন্দোলন রাশিয়ান ইহুদির হাতে চলে যায়। ইংল্যান্ডে অবস্থিত দুই জায়োনিস্ট নেতা চেইম ওয়াইজম্যান এবং ন্যাহুম সকোলোও এর উদ্যোগে ব্রিটেন বেলফোর ঘোষণা দেয় যেখানে তারা প্যালেস্টাইনে ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা দেয়। সেটি পরে ১৯২২ সালে জাতিসংঘের ম্যাণ্ডেটে অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর প্যালেস্টাইনে ইহুদি স্যাটেলারদের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। মার্চ ১৯২৫ সালে প্যালেস্টাইনে ইহুদির সংখ্যা ছিলো ১০ লাখ, সেটি ১৯৩৩ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ২৩ লাখ।
cover
এরপরের ইতিহাস আমরা সবাই জানি, হিটলারের উত্থান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, হলোকাস্টে ইহুদিদের উপর চালানো ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ। এইসব কারণে ইহুদিদের প্রতি একটি সহমর্মিতা জায়গা তৈরী হয় বিশ্ববাসীর কাছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইহুদিরা দলে দলে প্যালেস্টাইনে এসে আবাস গড়ে। তবে জায়নবাদীরা সেটুকুতে সন্তুষ্ট হয় নি। প্রচন্ড বুদ্ধিমান এই জাতি খুব দ্রুতই নিজেদের গুছিয়ে ফেলে, শক্তিশালী হয়ে প্যালেস্টাইনের অধিবাসীদের উপর দখলদার আচরণ শুরু করে। এরপর “ছয়দিনের যুদ্ধে” তারা জানান দেয় যে তারা নিজেরাই এখন শাসন করবে।

উপরের লেখা থেকে পাঠকেরা আশা করি বুঝতে পেরেছেন যে, জায়নবাদ মূলত একটি উগ্র জাতীয়তাবাদ। যেখানে তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। অন্যদিকে ইহুদিবাদ একটি ধর্মীয় মতবাদ, আর বিশ্বের কোনো ধর্মেই দুর্বলের উপর অত্যাচার করার অধিকার দেয়া হয় নি। এজন্য ইসরাইলিদের ফিলিস্তিনের উপর এই অত্যাচারের প্রতিবাদে প্রচুর ইহুদি শামিল হয়েছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চারদিকে মুসলিম দেশগুলোর মাঝে একটি ইসরাইলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়া, মুসলমানদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, নিজেদের ঐক্যে কতবড় ফাটল রয়েছে এখনো।   
তথ্যসূত্র
  • https://www.britannica.com/topic/Zionism
  • https://www.britannica.com/topic/Haskala
  • https://www.britannica.com/topic/Judaism/The-Judaic-tradition#ref35229
  • https://www.youtube.com/watch?v=2sOzmBAaCHA&t=310s
  • https://www.britannica.com/biography/Jacob-Hebrew-patriarch
  • https://www.britannica.com/place/Israel/Establishment-of-Israel

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021