ইলহা দা কুইমাদা গ্রান্ডে: স্বর্গীয় যে দ্বীপে শুধুই বাস করে পৃথিবীর সব বিষাক্ত সাপ!
আন্তর্জাতিক
ইলহা দা কুইমাদা গ্রান্ডে: স্বর্গীয় যে দ্বীপে শুধুই বাস করে পৃথিবীর সব বিষাক্ত সাপ!
মনোরম সৌন্দর্যে ভরপুর অসংখ্য দ্বীপ উপদ্বীপ ছড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। 'দ্বীপ' শব্দটি শুনলে আমাদের চোখের সামনে প্রথমেই ভেসে উঠে অপূর্ব এক স্বর্গীয় দৃশ্যের ছবি। অধিকাংশ দ্বীপ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। তবে বিশ্বে এমন কিছু অদ্ভুত দ্বীপ রয়েছে যেখানে অপার্থিব সৌন্দর্যের পাশাপাশি লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর মৃত্যুফাঁদ। আজ পাঠকদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে তেমনি এক দ্বীপের অজানা কিছু কাহিনী-
ইলহা দা কুইমাদা গ্রান্ডে
ব্রাজিলে অবস্থিত ইলহা দা কুইমাদা গ্রান্ডে দ্বীপটি পৃথিবীর অন্যতম এক রহস্যময় দ্বীপ। অ্যাটল্যান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত জন-মানবহীন এই দ্বীপে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিষধর সাপের বাস। দ্বীপটি এতটাই প্রাণঘাতী যে পৃথিবীর সাধারণ পর্যটকদের জন্য এই দ্বীপটি নিষিদ্ধ। সাও পাওলোর সমুদ্র ঘেঁষা অপরূপ নৈসর্গিক এই দ্বীপে কোনো মানুষের বসতি নেই। দ্বীপের একপাশ থেকে অন্যপাশ পর্যন্ত রয়েছে শুধু সাপের বিচরণ। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৪ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটারের এই দ্বীপে রয়েছে কমপক্ষে ৪ লাখ ৩০ হাজার বিষধর সাপ। অর্থাৎ, দ্বীপটির প্রতি বর্গমিটারে বাস করে একটি করে প্রাণঘাতী বিষধর সাপ। 
ইলহা দা কুইমাদা গ্রান্ডে দ্বীপ
ইলহা দা কুইমাদা গ্রান্ডে দ্বীপ
দ্বীপটিতে সাপের অবাধ বিচরনের কারণে ব্রাজিলের সাও পাওলোবাসীদের কাছে এটি সাপের দ্বীপ বা আইল্যান্ড অব স্ন্যাক নামেই বেশি পরিচিত। ধারণা করা হয়, প্রায় ৫৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে দ্বীপটি মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত ছিল। ব্রাজিলের সাও পাওলো থেকে প্রায় ৯০ মাইল দূরে অবস্থিত এই দ্বীপ। একসময় এই দ্বীপে কলাচাষের পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু মাঝপথেই সাপের উপদ্রবে বন্ধ হয়ে যায় কলাচাষ। পরবর্তীতে এই কলা দ্বীপ পরিণত হয় সাপের দ্বীপে। ইলহা দা কুইমাদা গ্রান্ডে দ্বীপে সাপ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া বেশ দুষ্কর। বোথরোপস ইনসুলারিস (Bothrops Insularis) নামের সাপগুলো অন্য ৮/১০টা বিষধর সাপের চেয়ে ৫ গুণ বেশি বিষধর। 
বোথরোপস ইনসুলারিস সাপ
বোথরোপস ইনসুলারিস সাপ
বোথরোপস সাপের বিষের প্রতিক্রিয়ায় মানুষের মাংস কয়েক মিনিটের মধ্যে গলে যায়। তাতে মৃত্যু অবধারিত। এরা লম্বায় ২৮ ইঞ্চি থেকে ৪৬ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। উজ্জ্বল হলুদাভাব ও বাদামী গায়ের রঙের সাপগুলোর মাথা প্রচণ্ড তীক্ষ্ণ। বিধায় এদেরকে ল্যান্স হেড ভাইপার বলে। এরা উড়ন্ত পাখিকে লাফ দিয়ে ধরে এরা সহজেই নিজের শিকারে পরিণত করতে পারে। তাই স্থানীয়দের মাঝে এই দ্বীপ সত্যিকারের এক আতঙ্কের নাম। তাই খুব সহজে এই দ্বীপে কেউ পা ফেলার কথা চিন্তাও করেনা। 
জাহাজ চলাচলে দিক নির্দেশনার জন্য এই দ্বীপটিতে ১৯০৯ সালে একটি লাইটহাউজ নির্মাণ করা হয়। কথিত আছে, এই লাইটহাউজের বাতি পরিবর্তনের জন্য একটু পরিবারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। পরিবারটি সাপের হাত থেকে বাঁচতে বেশকিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা নিলেও শেষ পর্যন্ত সাপের কামড়েই প্রাণ হারায় সেই পরিবারের সকল সদস্য। এরপর ব্রাজিল সরকার সেই লাইটহাউজে স্বয়ংক্রিয় বাতির ব্যবস্থা করেন। সাপের এই রাজ্যে জন-মানবের বাস না থাকলেও প্রতি বছর কিছু বিজ্ঞানীকে সাপের উপর গবেষণা করতে সেখানে পাঠানো হয়। গবেষক ও নৌবাহিনীর সদস্যরা ছাড়াও সাপের এই রাজ্যে নিয়মিত বন্যপ্রাণী শিকারিদেরও আগমন ঘটে। 
লাইটহাউজ
লাইটহাউজ
লিচেনহেড (Lichen head) নামক সাপের বিষ মহামূল্যবান। কালোবাজারে এর দাম প্রায় ১৭ হাজার পাউন্ড। ধীরে ধীরে দ্বীপটিতে সাপের সংখ্যা কমে যাচ্ছে বলে যে খবর পাওয়া যায় তার নেপথ্যে এটাই অন্যতম কারণ। অনেকে বীরত্ব দেখাতে গিয়ে সেই দ্বীপ থেকে আর ফিরে আসেনি।
লিচেনহেড সাপ
লিচেনহেড সাপ
এছাড়া একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে গাছপালা ও তৃণ কমে যাওয়ায় এবং রোগের কারণে গত ১৫ বছরে এই দ্বীপের বাসিন্দাদের সংখ্যা অন্তত ১৫ ভাগ কমে গেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচু হওয়ার কারণে এবং আশেপাশে কোনো দ্বীপ না থাকায়, এই দ্বীপটিতে একপ্রকার নির্বাসিত অবস্থায় আছে সাপগুলি। সেটাও এই প্রাণীদের জন্য বেশ চিন্তার বিষয়। তবে ব্রাজিল সরকার বিস্তৃত এই প্রাণীরাজ্য রক্ষা করতে বদ্ধ পরিকর। 
আন্তর্জাতিকএক্সক্লুসিভব্রাজিল
আরো পড়ুন