Link copied.
১৯৯৩ সালেই নাইন ইলেভেন হামলার পূর্বাভাস পেয়েছিল পেন্টাগন
writer
অনুসরণকারী
cover
১৯৯০ এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধে জয়লাভকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাজত্ব করছিল একেবারেই ফুরফুরে মেজাজে। সাম্রাজ্যবাদের আধুনিক রূপ দেখা শুরু করেছিল বিশ্ব। মধ্যপ্রাচ্য সহ এশিয়ার কয়েকটি অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কখনোই ভাবেনি তাদের বিরুদ্ধেও কেউ প্রতিশোধ নিতে চাইবে। ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৬ তারিখ ঘটেছিল অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনা। সেদিন দুপুরের পরেই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর বিল্ডিংয়ের গ্যারেজে বোমা বিষ্ফোরণ ঘটে। ঘটনাস্থলে নিহত হয় ৬ জন মার্কিন নাগরিক, অন্যদিকে আহত হয় এক হাজারেরও বেশি মানুষ। চারদিকে ধোঁয়া দেখে এবং বিষ্ফোরণের বিকট আওয়াজ শোনামাত্র নিস্তব্ধতা নেমে আসে নিউ ইয়র্কের প্রাণকেন্দ্রে। 
কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয় ৫০,০০০ কর্মরত নাগরিককে। এই হামলার পর মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগ সরাসরি ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠীকে দায়ী করে। মূলত এই বোমা হামলা সন্ত্রাসবাদের চমকপ্রদ নতুন বাস্তবতাকে একটি বৈশ্বিক ঘটনা হিসেবে তুলে এনেছে যা সরাসরি মার্কিনিদের প্রভাবিত করে। যদিও হামলার মূল পরিকল্পনাকারী রামজি ইউসুফ এফবিআইকে জানিয়েছেন তার উদ্দেশ্যের বিষয়ে। তাদের পরিকল্পনা ছিল কৌশলগতভাবে দুটো বিল্ডিংকে একেবারে আলাদা করে ফেলা এবং ২৫০,০০০ মানুষকে হত্যা করা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ১৯৯৩ সালের এই বোমা হামলা ছিল ওয়ান ইলাভেন বা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার বড়সড় ইঙ্গিত। 
বোমা হামলায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ভেতরকার অনেককিছু জানা যায় 

সে সময় জাতীয় নিরাপত্তায় এখনকার মতো এত এত অর্থ ব্যয় করেনি মার্কিন সরকার। হয়তো তারা কখনোই ভাবেনি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এত এত স্থাপনা বাদ দিয়ে নজর দিবে ট্রেড সেন্টারের দিকে। মার্কিন সরকারের প্রদান করা তথ্যমতে বিষ্ফোরণের স্থানে ১৩০০ পাউন্ড পরিমাণে ইউরিয়া নাইট্রেট পাওয়া গেছে। এছাড়াও ছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হাইড্রোজেন গ্যাসের সিলিন্ডার এবং সায়নাইড। বিজ্ঞানীরা এই ধরণের বিষ্ফোরককে সারের মাধ্যমে উৎপাদিত বোমা বলে থাকেন। 
cover
সকল বিষ্ফোরক উপাদান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তরের বিল্ডিংয়ের পার্কিং গ্যারেজের বি-ব্লকে থাকা একটি হলুদ রাইডার ভ্যানে সংরক্ষিত ছিল। আর সেখানেই ঘটে ভয়াবহ বিষ্ফোরণ! হামলার কয়েক মিনিট পরেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে নিউ ইয়র্ক জয়েন্ট টেরোরিজম টাস্ক ফোর্স। তারা ভেবেছিল একইভাবে আরো কয়েকটি বিষ্ফোরণ ঘটতে পারে। ট্রেড সেন্টারের কর্মীদের সরিয়ে দিয়ে আশেপাশের এলাকা খালি করে ফেলে জেটিটিএফ'র কর্মকর্তারা। জেটিটিএফ এবং এফবিআই হামলার কয়েক মাস আগে থেকেই সন্ত্রাসীদের উপর তদন্ত করছিল বলে দাবি করে পেন্টাগন। 
এই হামলার ঘটনাকে এফবিআই মৌলবাদী ইসলামি গোষ্ঠির হামলা আখ্যায়িত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেয়। হামলার পরেরদিন মার্কিন এজেন্টরা ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি গাড়ির বিভিন্ন অংশ খুঁজে পেয়েছিল যা গ্যারেজের বি-ব্লক থেকেই এসেছিল। এছাড়াও তারা গাড়িটির শনাক্তকরণ নম্বরও পেয়েছিল সেখান থেকে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা পরবর্তীতে জানতে পারেন গাড়িটি নিউ জার্সির নম্বর প্লেট ব্যবহার করে চলছিল। এফবিআই বুঝতে পারে সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তাই তারা তদন্ত জোরদার করে। 
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার পুনরায় চালু 

ফেব্রুয়ারিতে ভয়াবহ এই বোমা হামলার পর বেশকিছু দিন কার্যক্রম বন্ধ ছিল সেখানে। মূলত মার্কিন গোয়েন্দারা ভেবেছিলেন ভবনের অন্য কোথাও আরো বিষ্ফোরক থাকতে পারে। এই কারণে তদন্ত, পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে কয়েকদিন সময় অতিবাহিত হয়। এর মাঝে হামলায় সম্পৃক্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠির উপর তদন্ত জোরদার করে পেন্টাগন। তাদের গ্রেফতারের জন্য সাড়াশি অভিযানে নামে এফবিআই সহ সকল মার্কিন নিরাপত্তা বাহিনী। তদন্তে দেখা যায় নিউ জার্সির একটি এজেন্সি থেকে ভ্যানটি ভাড়া করেছিলেন মোহাম্মেদ সালামেহ নামক এক ব্যক্তি। তিনি মার্চের ৪ তারিখ তার জামানতের ৪০০ ডলার ফেরত নিতে সেখানে গেলে তাকে গ্রেফতার করে এফবিআই। 
cover
হামলায় ব্যবহৃত রাসায়নিকের নমুনা পরীক্ষা করে নিউ জার্সির একটি রাসায়নিক সংরক্ষণাগারে থাকা রাসায়নিকের নমুনার সঙ্গে মিল পায় গোয়েন্দারা। এরই মাঝে একটি চিঠি পৌঁছায় নিউ ইয়র্ক টাইমসের সদরদপ্তরে। চিঠিতে দেখা যায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার দায় স্বীকার করে লিবারেশন আর্মির পঞ্চম ব্যাটালিয়ন। এফবিআই সালামেহকে গ্রেফতারের পর তার এপার্টমেন্টে তল্লাশি চালায়। সেখান থেকে নিদাল আয়াদ, মাহমুদ আবুদালিমা, আহমেদ আজাজ নামক তিন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে নিদাল আয়াদের থুথুর ডিএনএ পাওয়ে গিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমসে পাঠানো চিঠির খামে। মার্কিন গোয়েন্দারা আবদুল ইয়াসিম নামক একজন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দিলে তিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পালিয়ে যান। মূলত তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রমাণ দাঁড় করাতে পারেনি গোয়েন্দারা। কয়েকজনকে গ্রেফতার এবং জিজ্ঞাসাবাদের পর মার্চের শেষেদিন পুনরায় ট্রেড সেন্টারের কার্যক্রম শুরুর অনুমতি দেয় মার্কিন সরকার। 
হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের ধরতে গোয়েন্দাদের দীর্ঘ অভিযান 

গ্রেফতরাকৃত ৪ জনকে আদালতে প্রেরণ করা হলে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় মার্কিন আদালত। যদিও তাদের দেয়া জবানবন্দী অনুযায়ী হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হামলার দিনই পাকিস্তান পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপরের ২ বছর পালিয়ে থাকা রামজি ইউসুফ একাধিক পরীক্ষামূলক সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনা করেন। ফিলিপাইনের একটি বাণিজ্যিক বিমানে হামলার পেছনেও তার সক্রিয় মদদ ছিল বলে বিশ্বাস করে মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগ। এফবিআই মনে করে রামজির লক্ষ্য ছিল বৃহত্তরভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক বিমানে হামলা করা। 
cover
অতঃপর ১৯৯৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে গ্রেফতার করা হয় রামজি ইউসুফকে। ইরাকে জন্মগ্রহণকারী এই সন্ত্রাসী নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল পাকিস্তানের ইসলামাবাদ থেকে। এই কাজে মার্কিনিদের সাহায্য করে পাকিস্তানি গোয়েন্দা বিভাগ। গ্রেফতারের পর তাকে ইউ ইয়র্কে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়। এরই মাঝে তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনা শুরু করে মার্কিন আদালত। ট্রেড সেন্টারে হামলা, ম্যানিলায় বিমান হামলা সহ বেশকিছু ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করে ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে ২৪০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। আদালতে সত্যতা স্বীকার করে ইউসুফ বলেছিলেন, ইসরায়েলকে সহায়তা করায় যুক্তরাষ্ট্রকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি সন্ত্রাসী হিসেবে গর্বিত বলে দাবি করেন। বর্তমানে ইউসুফ কলোরাডোর একটি জেলখানায় বন্দী রয়েছেন। 
সন্ত্রাসীদের যোগসূত্র 

আকটকৃত সালামেহ, আবুহালিমা এবং আয়াদকে দিয়ে বেশকিছু তথ্যসূত্র বের করতে পেরেছিলেন এফবিআই কর্তারা। তাদের দেয়া তথ্যমতে ব্রুকলিনের একটি মসজিদে নজরদারি চালায় গোয়েন্দারা। সেখানে তারা খোঁজ পায় ১৯৮০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে এসে বসবাস শুরু করা অন্ধ শেখ ওমর আব্দেল রহমানের। ছোটবেলা থেকে দৃষ্টিশক্তি হারানো ওমর আব্দেল ছিলেন মিশরের নাগরিক। পূর্বে তিনি মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত হত্যায় প্ররোচিত করার অপরাধে সাব্যস্ত হন এবং দেশ থেকে বিতাড়িত হন। তিনি পরিচিত ছিলেন একজন উগ্র মৌলবাদী হিসেবে যিনি তখনকার ধর্মনিরপেক্ষ যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং মিশরীয় সরকারের বিরোধীতা করেছিলেন। 
cover
১৯৯৩ সালের জুনে চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে চলমান কাজ করতে গিয়ে এফবিআইয়ের ক্যামেরায় ধরা পড়ে নতুন আরেকটি হামলার পরিকল্পনা। নিউ ইয়র্কের কুইন্সে অবস্থিত একটি গ্যারেজে বোমা স্থাপন করছিল কয়েকজন সন্ত্রাসী। তদন্তে জানা যায় সম্পৃক্ত ৯ জনের সবাই ছিলেন আব্দেল রহমানের অনুগামী। তাদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সদরদপ্তর, জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজ, হল্যান্ড, লিনকন টানেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করার অভিযোগ আনা হয়। ১৯৯৫ সালে তাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। পিটার বার্গেন রচিত ওসামা বিন লাদেনের বায়োগ্রাফিতে দেখা যায় জেলে বসেও মৌলবাদী ইসলামি সন্ত্রাসবাদ কায়েম করার চেষ্টা করে যান আব্দেল রহমান। 
cover
১৯৯৬ সালের গোড়ার দিকে মার্কিন গোয়েন্দারা ট্রেড সেন্টারে হামলার অর্থদাতার সন্ধান পায়। রামজি ইউসুফের চাচা খালিদ শেইখ মোহাম্মদ বোমা হামলার পূর্বে ভাতিজাকে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠান তিনি। ফিলিপিনীয় বিমান হামলাতেও তার অর্থায়নের প্রমাণ মিলেছে সে সময়। কিন্তু তখনও তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি এফবিআই। কারণ ততদিনে তিনি আল কায়েদা তথা বিন লাদেনের অনুগত লেফটেনেন্ট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। টুইন টাওয়ারে হামলায় তার যোগসাজশ রয়েছে বলে ধারণা করেন মার্কিন গোয়েন্দারা। কারণ তার ভাতিজা যে কাজটি সম্পন্ন করতে পারেনি তিনি সেটি করে দেখিয়েছেন ২০০১ সালে। প্রতিশোধ নিয়ে মার্কিন মুলুকের উদ্বেগের সৃষ্টি করে জয়োল্লাস করেছিলেন তিনি। 

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021