দে লস টেয়োস: স্বর্ণের খোঁজে ঐতিহাসিক যে গুহায় পাড়ি জমান হাজারো অভিযাত্রী
আন্তর্জাতিক
দে লস টেয়োস: স্বর্ণের খোঁজে ঐতিহাসিক যে গুহায় পাড়ি জমান হাজারো অভিযাত্রী
ইকুয়েডরের কুয়েভা দে লস টেয়োস গুহা। ১৯৭৬ সালে সেখানে কৃত্রিম সুড়ঙ্গ, হারিয়ে যাওয়া সোনা, ভাস্কর্য এবং একটি ধাতব গ্রন্থাগারের সন্ধানে একটি বড় অভিযানের অংশ হিসেবে গুহায় প্রবেশ করেছিল অভিযাত্রীদের একটি দল। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
অভিযাত্রীদের ওই দলের মধ্যে ছিলেন চাঁদে প্রথম পা রাখা নীল আর্মস্ট্রংও। মনে করা হয় এই গুহাগুলোর আশেপাশে এক সময় কোনো এক সভ্যতা তৈরি টিকে ছিল। উল্কাপাতের ফলে সভ্যতাটি ধ্বংস হয়ে যায়। গুহাগুলোর ভেতরেই রয়েগেছে সেই সভ্যতার অমূল্য ধাতব ভাণ্ডার। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
দক্ষিণ-পূর্ব ইকুয়েডরের সান্তিয়াগো ডি মেন্ডেজ শহর থেকে প্রায় ২৩ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে একটি রেইন ফরেস্টে কুয়েভা দে লস টেয়োস গুহাগুলো রয়েছে। পেরুর সীমান্ত থেকে এই গুহাগুলোর দূরত্ব খুব বেশি নয়। গুহাগুলোর কাছাকাছি শুয়ের উপজাতির বাস। প্রথমে নৌকায় চেপে ও পরে পায়ে হেঁটে সেখানে পৌঁছনো যায়। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
ম্যাকাস শহর থেকে হেলিকপ্টারে করেও এই গুহাগুলোতে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আগে এই গুহা কোনো বিলুপ্ত সভ্যতার অংশ বলে মনে করা হলেও, বর্তমানে এই গুহা শুয়ের উপজাতির আধ্যাত্মিক এবং আনুষ্ঠানিক অনুশীলনের কেন্দ্র। দীর্ঘদিন ধরেই শুয়েররা এখানে পূজা করছেন। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
এই গুহায় রয়েছে বহু বিষাক্ত পোকামাকড়। বিষাক্ত ট্যারেন্টুলা মাকড়সাদেরও এই গুহায় দেখা যায়। এই গুহাগুলোতে টেয়োস নামের এক নিশাচর পাখিও বাস করে। এই পাখির নামেই গুহাগুলোর নাম দেয়া হয়েছে কুয়েভা দে লস টেয়োস। শুয়ের উপজাতির মানুষদের অন্যতম পছন্দের খাবার টেয়োস। কয়েল দশক ধরে শুয়েররাই এই গুহাগুলোর মালিক।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
১৯৫০ এবং ৬০-এর দশক থেকে সোনা পাওয়ার লোভে এই গুহাগুলোর আশেপাশে মানুষের আনাগোনা বাড়তে থাকে। সুইস লেখক এরিক ভন ডেনিকেন ১৯৬৮ সালে ‘চ্যারিয়টস অফ দ্য গডস’ নামে একটি বই লেখেন। ওই বইতে তিনি মহাকাশ নিয়ে বিভিন্ন মনগড়া তত্ত্ব লিখেছিলেন। এই লেখা নিয়ে অনেক বিতর্কও তৈরি হয়। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
এর ঠিক তিন বছর পর অর্থাৎ ১৯৭১ সালে এরিক ‘দ্য গোল্ড অফ দ্য গডস’ নামে আরও একটি বই লেখেন। ওই বইতে তিনি কুয়েভা দে লস টেয়োস সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য লেখেন যা রাতারাতি বহু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘দ্য গোল্ড অফ দ্য গডস’-এ, জ্যানোস জুয়ান মরিকজ নামে এক অভিযাত্রীর অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছিলেন এরিক। এই বইয়ে তিনি লেখেন, জ্যানোস ১৯৬৯ সালে এই গুহাগুলোতে প্রবেশ করেন। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
গুহার ভেতরে জ্যানোস সোনার ভাণ্ডার, অদ্ভুত শিল্পকর্ম, ভাস্কর্য এবং ধাতব পাতে সংরক্ষিত বিভিন্ন তথ্য লেখা একটি ‘ধাতব গ্রন্থাগার’ খুঁজে পান বলেও এরিক দাবি করেন। এরিক এই বইটিতে জ্যানোসের অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে এ ও দাবি করেন যে, এই গুহাগুলো কৃত্রিম উপায়ে তৈরি এবং উন্নত সভ্যতার মানুষেরা এগুলো তৈরি করেছিলেন।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
তবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায় প্রাচীন সভ্যতা। এরিকের বই পড়ে সোনা এবং ধাতব গ্রন্থাগার খুঁজে পেতে কুয়েভা দে লস টেয়োস গুহাগুলোতে যাওয়ার হিড়িক বেড়ে যায়। এরিকের লেখা বই কুয়েভা দে লস টেয়োসের প্রথম বড় অভিযানকেও অনুপ্রাণিত করেছিল। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
১৯৭৬ সালের অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন স্কটিশ স্থপতি স্ট্যান হল। খুব দ্রুত এই অভিযান পৃথিবীর অন্যতম বড় গুহা অভিযানে পরিণত হয়। এই অভিযানে গিয়েছিলেন শতাধিক মানুষ। এর মধ্যে রয়েছেম ব্রিটিশ এবং ইকুয়েডরের সরকারি আধিকারিক, স্থানীয় বিজ্ঞানী, ব্রিটেনের বিশেষ বাহিনী এবং মহাকাশচারী নীল আর্মস্ট্রং। হাতে তৈরি ম্যাপ এবং স্থানীয়দের সাহায্যে গুহাগুলোতে পৌঁছায় অভিযাত্রীরা।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
প্রাণী এবং উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা ওই গুহায় গিয়ে বহু নতুন জিনিসের সন্ধান পেয়েছেন। বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারও হয়েছে সেখানে। তবে ধাতব গ্রন্থাগার তো দূরের বিষয়, এক টুকরো সোনাও তারা খুঁজে পাননি। এই গুহাগুলো পরীক্ষা করে অভিযাত্রী এবং বিজ্ঞানীদের দল এমন কোনো তথ্য পাননি যার সাহায্যে এটা প্রমাণ করা যায় যে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃত্রিম ভাবে এই গুহাগুলো তৈরি করা হয়েছিল। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
বিজ্ঞানীদের মতে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়েই এই গুহা তৈরি হয়েছিল। এই অভিযানের পর থেকে এই গুহাগুলোতে আরও অনেক অভিযান চালানো হয়েছিল। কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের তরফে এই গুহাগুলোকে নিয়ে বেশ কিছু তথ্যচিত্রও তৈরি করা হয়। কিন্তু কোনো বারই সোনা বা অন্যান্য ধাতব পদার্থ খুঁজে পাওয়া যায়নি। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
বহু ব্যর্থ অভিযানের পর বেশির ভাগ মানুষই এরিকের লেখাগুলোকে কল্পনা বলেই ধরে নেন। যদিও এক অংশের মতে গুহার এমন কিছু বিশেষ দরজা রয়েছে যা এখনও মানুষের নাগালের বাইরে। আর এই সব দরজা পার হলেই সেই ধাতব ভাণ্ডারে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু এই সব দরজার নাগাল আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
বর্তমানে এই গুহাগুলোকে ঘিরে অভিযানের পরিমাণ কমে এলেও শুয়ের উপজাতির মানুষ এখনও এই গুহাগুলোকে ব্যবহার করেন। গুহায় প্রবেশের জন্য এই উপজাতি লতাপাতা দিয়ে তৈরি মই ব্যবহার করে।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার 
আন্তর্জাতিকবিশেষ প্রতিবেদনইতিহাস
আরো পড়ুন