Link copied.
ক্রিকেট রাজপুত্রদের মহাকাব্যিক টেস্ট ইনিংস
writer
অনুসরণকারী
cover
"সকল রেকর্ডই টেন্ডুলকারের অধীনে, কিন্তু ব্রায়ান লারা তার চেয়েও ভালো। তার বিপক্ষে বল করাই সবচেয়ে কঠিন।"
লারা সম্পর্কে এমনিই মন্তব্য করেছিলেন লঙ্কান কিংবদন্তি ক্রিকেটার মুত্তিয়া মুরালিধরন। ব্যাটিং প্রদর্শনীতে সেরা উপভোগ্য সময় উপহার দেওয়া বাঁহাতি লারার ১৭ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটে ২০০৭ সালে। ১৩১ টেস্ট ম্যাচে ৫২.৮৮ গড়ে তার সংগ্রহ ১১ হাজার ৯৫২ রান, টেস্টে সর্বোচ্চ স্কোরের রেকর্ডে যা ষষ্ঠ। টেস্ট ক্রিকেটে ৩৪টি শতক রয়েছে তার। ওয়ানডেতে ২৯৯ ম্যাচে মোট সংগ্রহ ১০,৪০৫ রান। শতক রয়েছে ১৯টি। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তার রয়েছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৫০১ রানের ব্যক্তিগত ইনিংস। টেস্ট ক্রিকেটে তার অনেক কালজয়ী ইনিংস আছে। এদের মধ্যে অনন্য কিছু ইনিংস বের করে সাজানোর চেষ্টা করবো আজকের প্রতিবেদনে।

চলুন জেনে নেওয়া যাক ক্রিকেটের বরপুত্রের সেরা কয়েকটি টেস্ট ইনিংস সম্পর্কে-
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অপরাজিত ১৫৩ রান; ব্রিজটাউন; ১৯৯৯

রান তাড়া করে জেতা ম্যাচ গুলোর অন্যতম একটি ম্যাচ ছিল এটি। সিরিজের তৃতীয় টেস্টে ৩০৮ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ২৪৮ রানেই ৮ উইকেট হারিয়ে বসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সেখান থেকে আবার ম্যাচে ফেরা, ১ উইকেট হাতে রেখে জয় তুলে নেওয়া সব যেনো সাজানো নাটকের মতো। তাও আবার শেন ওয়ার্ন, গ্লেন ম্যাকগ্রা, জেসন গিলেস্পি, স্ট্রুয়ার্ট ম্যাকগিলদের বিশ্বসেরা বোলিং লাইন আপের বিপক্ষে।

কোর্টনি এমব্রোস আর জয়ের খুব কাছে গিয়ে কোর্টনি ওয়ালসকে সাথে নিয়ে সব কিছুই করে দেখিয়েছেন ক্রিকেটের বরপুত্র খ্যাত ব্রায়ান লারা। ধৈর্য্যশীল ইনিংস খেলে ম্যাচ জিতিয়ে তবেই মাঠ ছেড়েছেন তিনি। চাপে থেকে খেলেছিলেন দে'ড়শত রানের ইনিংস। ২৫৬ বলে ১৯ চার আর ১ ছয়ে করেছিলেন ১৫৩ রান। শেষ দুই উইকেটে তাকে সঙ্গ দেওয়া এমব্রোস জয়ের ৯ রান দূরে থেকে আউট হওয়ার পর কোর্টনি ওয়ালস সঙ্গ দিয়েছিলেন ১৪ মিনিট। এই সময়ে ৫ বল মোকাবেলা করে কোন রান করেননি তিনি।

ম্যাচ শেষে সেই সময়কার ক্যারিবিয়ান দলের ম্যানেজার স্যার ক্লাইভ লয়েড, লারার ধ্রুপদী ইনিংস সম্পর্কে বলেছিলেন-
"সে আজ যা খেলেছে। যেভাবে সতীর্থদের আগলে রেখে দলকে জিতিয়েছে, সেটা গ্রেটনেসের স্বাক্ষর। কিন্তু অনেক দিন পর লারা এমন স্বাক্ষর রেখে গেল।"
cover
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২০২ রান; জোহানেসবার্গ; ২০০৩

গ্রায়েম স্মিথ আর জ্যাক ক্যালিসের জোড়া শতকে জোহানেসবার্গ টেস্টের প্রথম ইনিংসে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা ৫৬১ রানের বিশাল স্কোর দাঁড় করায়। জবাবে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নামা সফরকারীদের দুঃস্বপ্ন হয় উঠে মাখায়া এনটিনির এক-একটি বল। সাথে আন্দ্রে নেল, শন পোলক আর জ্যাক ক্যালিসও সমান তালে ভয় দেখিয়ে যাচ্ছিলেন ক্যারিয়ানদের। একের পর এক ব্যাটসম্যানকে পথ দেখান প্যাভিলিয়নের। ব্যাটসম্যানদের যাওয়া আসার মিছিলে নিজেকে সামিল না করার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যান কাপ্তান ব্রায়ান লারা।

টেস্টকে ওডিআই বানিয়ে রানের পার্থক্যটা কমিয়ে আনাই ছিল তার লক্ষ্য। ১৪১ বলে তুলে নেন শতক, এরপর আরও ৮৯ বল খেলে স্পর্শ করেন ১৫০ রানের ইনিংস। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ তখন ৬ উইকেট হারিয়ে ৩৩৩ রান। এর ওভার খানেক পরেই রবিন পিটারনের ১ ওভারে তুলে নেন ২৮ রান(৪, ৬, ৬, ৪, ৪, ৪)। দুশো রানের গন্ডি স্পর্শ করতে পরবর্তী ৫০ রান তুলতে ব্যয় করেন ৪৩ বল। লারার ২৭৪ বলে ২০২ রানের সংগ্রামী ইনিংসের বৌদলতে ৪১০ রান তুলতে পারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। যদিও শেষ পর্যন্ত ম্যাচটিতে ১৮৯ রানের বিশাল ব্যবধানে হারতে হয়েছিল লারার দলকে। 
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২১৩ রান; কিংস্টন; ১৯৯৯

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হোয়াইট ওয়াশ হওয়ার পর অজিদের বিপক্ষে নামার আগে তার অধীনায়কত্ব নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে। সিরিজের প্রথম ম্যাচ হারের পর তা আরও জোড়ালো হয়ে উঠে। দ্বিতীয় ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ২৫৬ রানে অলআউট করে ব্যাটিংয়ে নামা ক্যারিয়ানরা। ৩৬ রানের মাথায় ৪ উইকেট হারিয়ে ফলঅনে পড়ার শঙ্কা জাগে উইন্ডিজ শিবিরে। তার মধ্যে পেড্রো কলিন্স আহত হয়ে মাঠ ছাড়লে আরও চাপে পড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

তখনই অধিনায়কত্বের ষোল আনাই পূরণ করেন ব্রায়ান লারা। জিমি অ্যাডামসের ৯৪ রানের ইনিংস ও লারার মাস্টারক্লাস ইনিংসে আলোর পথ দেখে ক্যারিবিয়ানরা। দুই জনে মিলে কররেন ৩২২ রানের জুটি। ১৭৫ রানের লিডে ব্যাট করতে নামা অজিরা ১৭৭ রানে অলআউট হয়ে যায়। ১০ উইকেটে ম্যাচ জিতে সিরিজ সমতায় ফিরে তারা। সে ম্যাচে ৩৪৪ বলে ২১৩ রানের এক অনবদ্য ইনিংস খেলেন লারা। যাতে ২৯ টি চার আর ৩টি ছয় ছিল।

বছরখানেক পর ইনিংসটি সম্পর্কে লারা বলেন-
"প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে এই ইনিংসটি খেলে আমি প্রমাণ করতে পেরেছি যে আমি কী করতে সক্ষম। হয়তো এইটি সবচেয়ে সুন্দরতম ইনিংস নাও হতে পারে, কিন্তু এটি ছিল আমার পুরো জীবনে সবচেয়ে সেরা ব্যাটিং।"
cover
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২২৬ রান; অ্যাডিলেড; ২০০৫

অজি বোলারদের হাতের নাগালে পেলেই যেনো নিজের প্রতিভার স্ফূরণ ঘটতো লারার উইলোতে। দলের অন্যান্য ব্যাটসম্যানরা যেখানে আসা যাওয়া মিছিলে থাকতেন সেখানে ব্যাট হাতে লারা দাঁড়িয়ে থাকতেন কাকতাড়ুয়ার মতো। ২০০৫ সালে অ্যাডিলেড টেস্টেও সে চেনা রুপে অজিদের মোকাবেলা করেছিলেন লারা। ম্যাচের প্রথম ইনিংসে যেখানে অন্য কোন ব্যাটসম্যান অন্তত পঞ্চাশ রানের ইনিংস খেলতে ব্যর্থ হন সেখানে লারা খেলেন দুইশো রানের এক অনবদ্য ইনিংস। সে ইনিংসে অ্যালন বর্ডারকে পেছনে পেলে সর্বোচ্চ টেস্ট রানের মালিক বনে গিয়েছিলেন লারা। এ সিরিজের মতো আগের সিরিজেও অজিদের নাস্তানাবুদ করে ছেড়ে ছিলেন এই ক্যারিয়ান ব্যাটসম্যান। যদিও এই রেকর্ডময় ম্যাচটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারতে হয়েছিল ৭ উইকেটের ব্যবধানে। 
cover
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৭৫ রান; অ্যান্টিগুয়া; ১৯৯৪

১৯৫৮ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ৩৬ বছর গ্যারি সোবার্সের ৩৬৫ রানের অপরাজিত ইনিংসটি ছিল টেস্টের সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রানের ইনিংস। গ্যারি তার ক্যারিয়ারের ১৭তম টেস্টেই ৩৬৫ রানের ইনিংস খেলে রেকর্ড গড়েন। লারা তার ১৬তম টেস্টেই স্বদেশী কিংবদন্তিকে ছাড়িয়ে টেস্টে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের নতুন রেকর্ড গড়েন। লারার ইনিংসটি ছিল ১২ ঘন্টারও বেশি সময়ের। এই সময়ে ৫৮৮ বল মোকাবেলা করেন তিনি। বাউন্ডারি হাঁকিয়েছিলেন ৪৫টি। 
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২২১ রান; কলোম্বো; ২০০১

চামিন্দা ভাস, মুত্তিয়া মুরালিধরনের বোলিং আক্রমণে দিশেহারা ক্যারিয়ানদের মাত্র তিন জন ব্যাটসম্যান দুই অঙ্কের ঘরে রান তুলতে পেরেছেন। তার মধ্যে দুইজন অর্ধশত রানের গন্ডি পেরিয়ে ফিরে যান প্যাভিলিয়নে। এই দুই জনের সাথে জুটি গড়ে দলের রানের পাল্লা ভারি করার জোর চেষ্টা চালান ব্রায়ান লারা। প্রথমে তৃতীয় উইকেট জুটিতে রামনরেশ শেরওয়ানের সাথে ১৯৪ রান ও চতুর্থ উইকেট জুটিতে কার্ল হুপারের সাথে ১৩৬ রানের জুটি গড়েন। সতীর্থদের আসার যাওয়ার মাঝে এক প্রান্ত আগলে ৩৩৪ বলে ২৩ বাউন্ডারি আর ২ ওভার বাউন্ডারিতে সাজান ২২১ রানের ইনিংস। কিন্তু তার এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত বিফলে যায়।

নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসেও ব্যাটিং ব্যর্থতার শিকার হয় ক্যারিয়ানরা। আবারও লারার ব্যাটেই চলতে থাকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মান বাঁচানোর লড়াই। শেরওয়ানের অর্ধশতকের সাথে দুই ইনিংসেই শতক হাঁকান ব্রায়ান লারা। শেষ ইনিংস খেলেন ১৩০ রানের। শেষমেশ ইনিংস ব্যবধানে হার এড়াতে পারলেও ১০ উইকেটে বিশাল ব্যবধানে হারতে হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। বিফলে যায় লারার দুই ইনিংসেই শতক হাঁকানোর রেকর্ড।
cover
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪০০ রানে অপরাজিত; সেন্ট জন্স; ২০০৪

১৯৯৪ সালে গ্যারি সোবার্সের রেকর্ড ভাঙ্গার ১০ বছর পর ম্যাথু হেইডেন লারার ৩৭৫ রানের রেকর্ড ভাঙেন। করেন ৩৮০ রান। কিন্তু সে রেকর্ডের ৬ মাস না যেতেই নিজের শ্রেষ্ঠত্বে ফিরে আসেন লারা। টেস্ট সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটি আবার নিজের দখলে নিয়ে নেন তিনি। ৩৭৫ রানের অপূর্ণ ইনিংসকে নিয়ে যান ৪০০ রানে। ছিলেন অপরাজিত। খেলেন ৫৮২ বলে ৪৩ চার আর ৪ ছক্কার ইনিংস। যা এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সেরা ইনিংস। 

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২৭৭ রান; সিডনি; ১৯৯৩

এটা ছিল ক্রিকেট রাজপুত্রের প্রথম শতকের গন্ডি পেরুনোর ম্যাচ ও অন্যরকম এক পথচলার শুরুর ইঙ্গিত। ক্যারিয়ারের পঞ্চম ম্যাচ খেলতে নামা লারা এর আগের ৮ ইনিংসে ৩ বার অর্ধশত রানের স্কোর করতে সক্ষম হলেও সেঞ্চুরি এসেছিল ১৯৯৩ এর সিডিনি ম্যাচে। শুধু সেঞ্চুরি নয়, সেটাকে টেনে নিয়ে পূর্ণ করেন ডাবল সেঞ্চুরিও। তখনও তার ব্যাটিং শেষ হয়নি। ততক্ষণে আড়াইশ রানের মাইলফলকও স্পর্শ করে ফেলেন। রেকর্ড করলেন অভিষেক সেঞ্চুরির ম্যাচে চতুর্থ সর্বোচ্চ ইনিংস খেলার। এই দূর্দান্ত ইনিংসের সমাপ্তি হয়েছিল রানআউটের ফাঁদে পড়ে।

লারার ইনিংসটি সম্পর্কে শেন ওয়ার্ন বলেন,
"তাকে যদি রান আউটের ফাঁদে না ফেলা যেত, তাহলে সে এখনো ব্যাটিং চালিয়ে যেতো। সে দেখেশুনে গ্যাপশট খেলছিল।"
সিরিজের তৃতীয় টেস্টটিতে লারা যখন ব্যাট করতে নামেন দলের সংগ্রহ তখন ছিল ২ উইকেটে ৩২ রান। এর আগে প্রথমে ব্যাট করে ৯ উইকেটে ৫০৩ রানে ইনিংস ঘোষনা করে অস্ট্রেলিয়া। লারার এই মারকুটে ইনিংস ওয়েস্টকে ৬০৬ রানের সংগ্রহ এনে দেয়। ইনিংসটি ছিল লারার ব্যাটিং কৌশল প্রদর্শনীর অনন্য উদাহরণ। ক্যারিবিয়না কিংবদন্তী রোহান কানহাই বলেন,
"স্পিনার ও পেসারদের বিপক্ষে তার ব্যাকফুট, ফ্রন্টফুট, টাইমিং ও প্লেসমেন্ট ছিল অসাধারণ। এক কথায়, নান্দনিক ও অপূর্ব ব্যাটিং।"

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021