Link copied.
যেসব জটিলতায় ‘অলিম্পিক গেমস’ বয়কটের দীর্ঘ ইতিহাস সৃষ্টি
writer
অনুসরণকারী
cover
দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ বলা না গেলেও অলিম্পিককে বলা হয় সবথেকে বড় ক্রীড়া মিলন মেলা। কারণ এটি সবসময় শান্তি এবং সাম্যের বার্তা দিয়েই ক্রীড়া বিশ্বকে একত্র করার ডাক দিয়ে আসছে। অন্ততপক্ষে আধুনিক অলিম্পিকের ১২৫ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এমন বার্তাই পাওয়া যায়। কিন্তু তাই বলে পৃথিবীতে চলমান যুদ্ধ, নৈরাজ্য, দুর্ভিক্ষ কিংবা ভূ-রাজনৈতিক কারণ যে এটিতে প্রভাব পড়েনি সে কথা জোর দিয়ে বলা সম্ভব নয়। কারণ গত ১০০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে শুধু দুই দুটি বিশ্বযুদ্ধের কারণে ৩ বার বাতিল করা হয়েছিল অলিম্পিকের আয়োজন। ১৯১৬, ১৯৪০ এবং ১৯৪৪ সালের আসরগুলো বাতিল না করেও উপায় ছিল না। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কবলে পড়ে পৃথিবীর অবস্থা ছিল অস্থিতিশীল। 
cover
এরই মাঝে রাজনৈতিক কারণেও বিভিন্ন দেশ একে অপরকে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার উদাহরণও রয়েছে ইতিহাসে। ১৯৩৬ সালে নাৎসি জার্মানিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল অলিম্পিক গেমস। সেবার শুধু রাজনৈতিক কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল প্রতিযোগিতা থেকে। আবার ১৯৪৮ সালের আয়োজন থেকে জার্মানি এবং জাপানকে বাদ দিয়েছিল অলিম্পিক কমিটি। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দেশ দুটির ভূমিকা তাদেরকে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন করে। তবে এত এত ঘটনার মাঝেও অনেকবার অলিম্পিক বয়কটের ঘটনাও ঘটেছে। অবাক হলেও সত্য যে বয়কটের পেছনে রয়েছে ব্যক্তি, জাতি কিংবা ভূখণ্ডের করুণ চিত্র। চলুন জানা যাক সে সম্পর্কে। 
১৯৫৬, মেলবোর্ন

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে প্রথমবারের মতো ১৯৫৬ সালে আয়োজন করা হয় অলিম্পিক গেমস। সদ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হলেও বিভিন্ন দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছিল। মেলবোর্নে অলিম্পিক শুরু হওয়ার মাসখানেক পূর্বে হাঙ্গেরিয়ান বিদ্রোহ চলাকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করে। মূলত হাঙ্গেরি বিদ্রোহ চলছিল কম্যুনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে। এটিকে কেন্দ্র করে নেদারল্যান্ডস, স্পেন এবং সুইজারল্যান্ড অলিম্পিক বয়কটের ডাক দেয়। একই সময় চীনও অলিম্পিক থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয় তাইওয়ানের কারণে। কারণ তারা তখন তাইওয়ানকে স্বীকৃতি না দিয়ে আলাদাভাবে অলিম্পিকে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে রাজি হয়নি। অতঃপর বয়কটের তালিকা দীর্ঘায়ত করে মিশর, ইরাক এবং লেবানন। সুয়েজ খাল নিয়ে চলা ঝামেলার মধ্যে অলিম্পিক বয়কট করে বিশ্বকে তারা প্রতিবাদী বার্তা জানিয়েছিল। মূলত ব্রিটিশ, ফ্রান্স, এবং ইসরায়েল মিলে সুয়েজ খালের কর্তৃত্ব নিয়ে তখন বিরোধ তৈরি করেছিল।
cover
সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন দেশ মেলবোর্ন অলিম্পিক বয়কট করলেও হাঙ্গেরি ঠিকই অংশগ্রহণ করে। তবে ওয়াটার পলো ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল সোভিয়েত এবং হাঙ্গেরি। ঐ ম্যাচে হাঙ্গেরির হয়ে ২ গোল করা খেলোয়াড় এরভিন জেদোরের মাথায় আঘাত করে সোভিয়েত প্লেয়াররা। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ নিয়ে মাঠ ছাড়েন এরভিন। যদিও ম্যাচটি ৪-০ গোলের ব্যবধানে জিতে স্বর্ণপদক ঘরে তোলে হাঙ্গেরি। সোভিয়েত প্রতিযোগিদের দর্শকেরা নিন্দা জানালেও হাঙ্গেরিয়ানদের পূর্ণ সমর্থণ জানিয়েছিল তারা। তবে সেবার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অলিম্পিক আসরে সর্বোচ্চ পদক জয়ের রেকর্ড গড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন।
১৯৬৪, টোকিও

১৯৫৬ সালে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দেশ অলিম্পিক বয়কট করার পর অনেকটাই নড়েচড়ে বসে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি। তারা প্রতিটি স্বাধীন দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য তৎপরতা বৃদ্ধি করে। যদিও সবক্ষেত্রে তারা সফল হতে পারেনি। ১৯৬৪ সালে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক বয়কট করে চীন, উত্তর কোরিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া। অন্যদিকে, এটি ছিল এশিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রথম অলিম্পিক আসর। কিন্তু এর আগের বছর জাকার্তায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল নিউ ইমার্জিং ফোর্সেস নামের একটি প্রতিযোগিতা।
cover
অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও সেখানকার আয়োজকরা চেয়েছিলেন অলিম্পিকের পরিপূরক হিসেবে একটি এশিয়ান প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠিত করতে। মূলত ১৯৬২ সালে চতুর্থ এশিয়ান গেমস আয়োজনের কারণে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয় ইন্দোনেশিয়ার। সেবার ইমাজিং ফোর্বসেসে ৫০টি দেশের ৩০০০ অ্যাথলেট অংশগ্রহণ করেছিল। অন্যদিকে, জাকার্তার এই প্রতিযোগিতায় কোনো অ্যাথলেট পাঠালে টোকিওতে নিষিদ্ধ করা হবে কলে ঘোষণা দেয় আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি। জেনে বুঝেই চীন, কোরিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া সেখানে অ্যাথলেটিক পাঠিয়েছিল। ফলস্বরূপ তারা টোকিও অলিম্পিক থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৫৬ সালের অলিম্পিকে দক্ষিণ আফ্রিকা নিষিদ্ধ হয়েছিল। বর্ণবাদের কারণে তাদের অলিম্পিকে তাদের এই নিষেধাজ্ঞা ছিল ১৯৯৯ সাল অবধি। 
১৯৭৬, মন্ট্রিয়েল

কানাডার মন্ট্রিয়েলে অনুষ্ঠিত ১৯৭৬ সালের অলিম্পিকে বলতে গেলে পুরো আফ্রিকার অধিকাংশ দেশই অংশগ্রহণ করেনি। যদিও এর পেছনে উপযুক্ত কারণ ছিল। নিউজিল্যান্ড জাতীয় রাগবি দল তৎকালীন সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বর্ণবাদের অভিযোগ তোলে নিষেধাজ্ঞার জন্য আন্তর্জাতিক ঐক্যের ডাক দেয়। সেকালে ভূ-রাজনৈতিক কারণে আফ্রিকার ২০টিরও বেশি দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষ নেয় এবং মন্ট্রিয়েল অলিম্পিক বয়কট করে।
cover
যদিও সে সময়ের পত্রপত্রিকায় দেখা যায় মন্ট্রিয়েল অলিম্পিক বয়কটের নেতৃত্ব দেয় তানজানিয়া। সর্বমোট ৪০০ অ্যাথলেটের অনুপস্থিতি ছিল সেখানে। বয়কট করা অন্য আরেকটি দেশ ছিল তাইওয়ান। কারণ আয়োজক কানাডা সরকার তাইওয়ানকে চীনের প্রজাতন্ত্র হিসেবে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়নি। সেবারের বয়কটের কারণে সর্বমোট ১ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের টিকিট এবং হোটেল বুকিং মানি ফেরত দিতে হয়েছিল দেশটির সরকার। অন্যদিকে, দৌড় সহ বেশকিছু প্রতিযোগিতা রূপরেখা পাল্টে যায়। কারণ কয়েক দশক যাবত কেনিয়া, তানজানিয়ার মতো দেশের অ্যাথলেটরা সেখানে রাজত্ব করছিল। 
১৯৮০, মস্কো

১৯৫৬ সালের পর সবথেকে কম দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিক। মূলত ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার মস্কো অলিম্পিক বয়কটের ডাক দেন। স্নায়ুযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৬০টি দেশকে পাশেও পেয়ে যায়। যদিও যাদের নিয়ে এই বয়কট সে আফগানিস্তানও মস্কোতে অ্যাথলেট পাঠিয়েছিল। ঐতিহাসিক এই বয়কটে মার্কিনিদের সঙ্গ দিয়েছিল চীন, জাপান, কানাডা, ইসরায়েল, পশ্চিম জার্মানি সহ মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশ। মূলত কম্যুনিস্টদের মুসলমান নিধনের বিষয়টি সামনে এনে বয়কটের ডাক জোরালোভাবে আহ্বান করা হয়।
cover
তবে মার্কিন সরকারের বয়কট মেনে নিতে চায়নি অধিকাংশ মার্কিন অ্যাথলেট। যারা বিরোধীতা করেছিল তাদের পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে জিমি কার্টার প্রশাসন। শেষপর্যন্ত আদালতে মামলা করেন অ্যাথলেটরা। কিন্তু শেষপর্যন্ত প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের পক্ষেই রায় যায়। অন্যদিকে, আফ্রিকান দেশগুলোকে প্ররোচিত করতে বক্সার মোহাম্মদ আলীকে আফ্রিকায় পাঠান প্রেসিডেন্ট কার্টার। সেখানে ব্যাপক সমালোচিত হন ইতিহাসের সেরা এই বক্সার। সেবার ১৯৫টি মেডেল জিতেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন যা এখন অবধি রেকর্ড হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। 
১৯৮৪, লস অ্যাঞ্জেলস

মাত্র ৪ বছর পর মস্কো ঘুরে অলিম্পিকের মশাল গিয়েছিল মার্কিন মুলুকে। আগেরবার মার্কিন নেতৃত্বে ৬৫টি দেশ মস্কো অলিম্পিক বয়কট করলেও লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকে বয়কটকারী দেশের সংখ্যা ছিল খুবই অল্প। প্রথমবার সোভিয়েত ইউনিয়ন বয়কটের ঘোষনা দিলে সাড়া দেয় পূর্ব জার্মানি। বয়কটের কারণ হিসেবে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনিরাপদ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। ১৪টি বলকান দেশ সহ সর্বমোট ১৪টি দেশ ১৯৮৪ সালের অলিম্পিক বয়কট করে।
cover
সোভিয়েত ইউনিয়ন বয়কট করলেও ১৪০টি দেশের অ্যাথলেট সেবারের অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করেন যা সে সময়ের ইতিহাসে রেকর্ড গড়ে। ১৯৮৪ সালের আগে অলিম্পিকের এক আসরে এত সংখ্যক অ্যাথলেট কখনোই অংশগ্রহণ করেনি। সোভিয়েত অনুপস্থিতির কারণে সেবার ৮৩টি স্বর্ণপদক জিতে রেকর্ড গড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, ১৯৫২ সালের পর প্রথমবারের মতো অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করে ৩১টি পদক ঘরে তোলে চীন। অর্থনৈতিকভাবেও লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিক মার্কিন সরকারের সফলতা প্রকাশ করে। এক হিসেবে দেখা যায় আগের যে কোনো অলিম্পিকের চেয়েও দ্বিগুণ পরিমাণ টিকিট বিক্রি হয়েছিল সেখানে। এছাড়াও তৎকালীন সময়ে টেলিভিশনে সবচেয়ে বেশি দর্শক উপভোগ করা প্রতিযোগিতার স্বীকৃতি পায় ১৯৮৪ সালের অলিম্পিক। সোভিয়েত অ্যাথলেটদের অনুপস্থিততে বেশ কয়েকটি ইভেন্টে একক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ লুপে নিয়েছিল মার্কিনিরা। 

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021