কাতার বিশ্বকাপ: ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরোধপূর্ণ যেসব ম্যাচ
আন্তর্জাতিক
কাতার বিশ্বকাপ: ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরোধপূর্ণ যেসব ম্যাচ
চলছে ফুটবল বিশ্বকাপের ২২তম আসর। ৩২ দল নিয়ে এটিই শেষ বিশ্বকাপ। এরপর বড়সড় পরিবর্তন আসছে বিশ্বকাপের ফর্মেট। ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বাগতিক দেশ কাতার প্রথম ম্যাচ খেলেছে ইকুয়েডরের বিপক্ষে।
তবে ফুটবলের এই আমেজ এখন আর শুধুই মাঠের খেলোয়াড় এবং সমর্থকদের মধ্যে নেই। মাঠের বাইরে দেশে দেশে রয়েছে নানান বিরোধ, বিভিন্ন প্রতিবাদ। পর্দার আড়ালে থাকা ভূ-রাজনৈতিক গল্পগুলো আমরা খুব কমই জানি। মাঠের খেলার মতো রাজনীতির মঞ্চে রয়েছে ঐতিহাসিক স্নায়ুযুদ্ধ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিশ্ব রাজনীতিতে দেশে দেশে চলমান বিরোধের মধ্যে এমন কিছু ম্যাচ রয়েছে যেগুলো মাঠে গড়ালে হতে পারে আরও একটি বিশ্বযুদ্ধ কিংবা খুনাখুনি। চলুন জানা যাক এমন ৫টি ম্যাচ সম্পর্কে।
যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
নিজেদের হাজার বছরের সংস্কৃতি এবং দর্শনের ইতিহাস নিয়ে পারস্য এখনও গর্বিত একটি জাতি। বর্তমান নাম ইরান হলেও এটি এখনও পারস্য উপসাগরের দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছে দেশটি। কিন্তু ভূ-রাজনীতির মঞ্চে দেশটিকে একেবারেই একঘরে করে রাখার চেষ্টা করছে পশ্চিমা বিশ্ব। দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ সেই ১৯৫০-এর দশক থেকেই শুরু। সেকালে তেল সমৃদ্ধ দেশটিকে নিজেদের আয়ত্তে এনে পারস্য উপসাগরে নিজেদের বলয় সৃষ্টি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইরান এখন ওই সময় থেকে একেবারেই বেরিয়ে এসেছে। 
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
নতুন করে বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশটিতে ক্ষমতায় আসেন আয়াতুল্লাহ খোমেনি। ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নয়া সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে মানবাধিকার লঙ্ঘন, সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতা এবং গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ করে। এছাড়াও এবারের বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে শুরু থেকেই বিরোধিতা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ৩০ নভেম্বর বিশ্বকাপের ম্যাচে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি হবে। এই ম্যাচকে ঘিরে কড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চলেছে কাতার।
ইংল্যান্ড বনাম ওয়েলস
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
প্রিন্স উইলিয়ামস এখন প্রিন্স অব ওয়েলস। তিনি একাধারে ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধি। চলমান কাতার বিশ্বকাপকে ঘিরে ব্রিটেনে এখন রাজার সমর্থন নিয়ে চলছে বিতর্ক। দ্য টেলিগ্রাফ লিখেছে, প্রিন্স উইলিয়াম এখন কূটনীতিক টানাপড়েনে হাঁটছেন। এদিকে অভিনেতা মাইকেল শিন খোলাখুলিভাবে উইলিয়ামকে ইংল্যান্ডের প্রতি তার পূর্বের আবেগপূর্ণ এবং অতিরঞ্জিত সমর্থনের জন্য সমালোচনা করেছেন। উইলিয়াম যদি যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাহলে ওয়েলস এবং ইংল্যান্ডের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে তিনি কাকে সমর্থন করবেন? বিষটা এমন যে, একজন পিতামাতা কাকে জিততে চায় যখন তার সন্তানরা লড়াই করছে? 
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
স্কটল্যান্ডের সাথে তুলনা করলে, ওয়েলস কখনোই স্বাধীনতার স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী ছিল না। যদিও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পায় এবং তাদের হাতে সংসদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ওয়েলশ জাতীয়তাবাদীরা মাত্র ২০ শতাংশ ভোট পায় এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে। ওয়েলস এবং ইংল্যান্ডের মধ্যে আলোচনা বেশিরভাগই বিতর্কিত। কিন্তু, রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে, যতটা চোখ থাকবে উত্তরাধিকারী উইলিয়ামের দিকে, যতটা ফুটবল খেলার দিকে। সব আলোচনার এখন ৩০ নভেম্বরের ওয়েলসের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ম্যাচের দিকে। আর ব্রিটিশ মিডিয়া তাকিয়ে প্রিন্স উইলিয়ামের সমর্থনের দিকে। 
তিউনিসিয়া বনাম ফ্রান্স
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
আফ্রিকা অঞ্চলে ফ্রান্সের উপনিবেশ সম্পর্কে সবাই কমবেশি জানেন। আজকের ফ্রান্সের যতো সম্পদ, যতো উন্নতি তার পুরোটাই আফ্রিকানদের সম্পদের কল্যাণে। ভূমধ্যসাগরের কোল ঘেঁষা তিউনিসিয়াও ফ্রান্সের একটি প্রাক্তন উপনিবেশ। ১৯৫০ থেকে ৬০-এর দশকে রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্যদিয়ে আফ্রিকার অনেক দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। তিউনিসিয়াও হাজার নাগরিককে হারিয়েছে, রক্তাক্ত হয়েছে দেশের রাজপথ। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ফরাসী কর্তাদের হত্যা করে তিউনিসিয়ান জনতা। 
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
এরপর কেটে গেছে অনেক বছর। ফ্রান্সে এখন আর আগের মতো ফরাসী প্রভাব নেই। দেশটির অস্ত্রের বাজার একচেটিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে। আগামী ৩০ নভেম্বর মুখোমুখি হবে ফ্রান্স এবং তিউনিসিয়া। ম্যাচটি শুধুই বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ নয়, এতে রয়েছে অতীতের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের বদলা নেয়ার সুযোগ। দর্শক সারিতে ফরাসী সমর্থকদের কীভাবে বার্তা দেবে তিউনিসিয়ানরা সেটি এখন আলোচনার কেন্দ্রে। 
নেদারল্যান্ডস বনাম কাতার
নেদারল্যান্ডস তার উদারতাবাদ এবং স্বাধীনতার জন্য বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত। সেখানে সারা বিশ্বের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জাতিগত বিরোধের বিচার হয়ে থাকে। বিশ্বকাপের আয়োজক কাতারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সেই শুরু থেকেই। একাধিক পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমের দাবি বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম নির্মাণ করতে গিয়ে প্রায় ১৬ হাজার বিদেশী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে দেশটিতে।
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
এমনকি ঠিকমতো বেতনভাতাও নাকি পরিশোধ করেনি কাতার। এছাড়াও বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য ফিফাকে ঘুষ দেয়ার পুরনো অভিযোগ রয়েছে কাতারের বিরুদ্ধে। আগামী ২৯ নভেম্বর নেদারল্যান্ডস এবং কাতার মুখোমুখি হবে। সেখানে কাতারের বিরোধিতা করে সমর্থকরা স্লোগান দেবেন বলেও আশঙ্কা করছে মধ্যপ্রাচ্যের মিডিয়া। 
ইরান বনাম সৌদি আরব
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
অনেকেই বলেন, আজকের মধ্যপ্রাচ্য কেন বিভক্ত? সিরিয়া কেন যুদ্ধক্ষেত্র? এর সহজ উত্তর, সৌদি এবং ইরানের মধ্যকার মতাদর্শগত পার্থক্য। দেশ দুটি মুসলিম প্রধান হলেও তাদের মধ্যে ধর্মীয় আদর্শ ভিন্ন। যে বিরোধের ব্যাপ্তি ধর্ম থেকে সেটিকে শুধু রাজনীতি দিয়ে বিচার করা যায় না। অদূর ভবিষ্যতে দুই কোরিয়া, ভারত-পাকিস্তান কখনও এক হলেও ইরান-সৌদিকে এক করার সাধ্য কোনো কূটনীতিকের নেই।
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ইসলাম মূলত দুটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত: শিয়া এবং সুন্নী। সুন্নী বিশ্বের মুসলমানদের প্রায় ৮৫ শতাংশ, যেখানে শিয়ারা ১৫ শতাংশ। কারণ ইরানে শিয়া ইসলামের আধিপত্য এবং সৌদি আরব সুন্নী ইসলাম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। উভয়ই তেল রপ্তানিকারক হওয়ায় তারা অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীও। দুই দেশই বিরোধী ভূ-রাজনৈতিক পক্ষ বেছে নিয়েছে। সৌদি আরব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এবং ইরান রাশিয়ার সাথে একত্রিত হয়েছে। যদি এই দুই দেশ কোনো কারণে মুখোমুখি হয় তাহলে কাতারের সাধ্য নেই সমর্থকদের সামলানোর।
তথ্যসূত্র: বিগ থিংক
আন্তর্জাতিকখেলাধুলাযুক্তরাষ্ট্রফ্রান্সইরানসৌদি আরবকাতারইউএস-ইরান যুদ্ধ
আরো পড়ুন