Link copied.
জুতোয় মদ্যপান: পতিতালয় থেকে আসা সংস্কৃতি এখন অজিদের ঐতিহ্য!
writer
অনুসরণকারী
cover
মাইটি অস্ট্রেলিয়া! তাদের ক্ষেত্রে কথাটি বেশ মানায়ও। ওডিআই বিশ্বকাপের পাঁচটা, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির দুইটা শিরোপা জয়ের পর অধরা ছিল টি-২০ বিশ্বকাপের একটা টাইটেল। অবশেষে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ষষ্ঠ আসরে এসে নিজের প্রথম শিরোপা জয়ের আক্ষেপ ঘুচিয়েছে তারা। সেটাও যুক্ত হয়ে গেলো তাদের ঝুলিতে। আইসিসির সাদা বলের তিন মেগা ইভেন্ট- ওডিআই বিশ্বকাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শিরোপা জয়ের কোনটাই আর বাকি রইলো না অজিদের! তাদের কক্ষপথে ট্রফি সংখ্যা এখন আটটি!

আসরের হট ফেভারিট পাকিস্তানকে সেমিফাইনালে হারিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে অস্ট্রেলিয়া। এই সুযোগ হাতছাড়া করেনি অ্যারন ফিঞ্চের দল। ফাইনালে দুবাইতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ডেভিড ওয়ার্নার ও মিচেল মার্শের ব্যাটিং তাণ্ডবে ৮ উইকেটের ব্যবধানে জয় তুলে নেয় তারা।
এমন জয়ে বাধভাঙ্গা উল্লাসে মেতে উঠে অজি শিবির। উদযাপনে তাদের কমতি ছিল না কোন দিকেই। মাঠ থেকে ড্রেসিংরুম সব জায়গায় তারা স্মরণীয় করে রেখেছে শিরোপা জয়ের স্মৃতিতে। তবে সব কিছু ছাপিয়ে অজিদের জয় উদযাপনের দৃষ্টিকাড়ে এক ভিন্ন দিক, উদযাপনের ভিন্ন ধরন।

ড্রেসিংরুমে ফিরে অজিরা শিরোপা জয়ের উল্লাসে মত্ত হয়ে পড়ে। উদযাপনের এক পর্যায়ে জুতোয় মদ ঢেলে পান করার মতো বিশ্রী এক কান্ড ঘটিয়ে বসেন সেমিতে ৩ ছক্কা হাঁকিয়ে দলকে ফাইনালে তোলা উইকেটরক্ষক ম্যাথু ওয়েড। তিনিই প্রথম নিজের পা থেকে জুতো খুলে সেটায় মদ নিয়ে পান করা শুরু করেন। তার দেখাদেখি সতীর্থ মার্কাস স্টয়নিসও সামিল হন তাতে।

ওয়েডের হাত থেকে জুতো কেড়ে নিয়ে স্টয়নিসও এতে মদ ঢেলে পান করতে শুরু করেন। আইসিসি টুইট করা এক ভিডিওতে এমন দৃশ্য ফুটে উঠে। ভিডিওটি সোস্যাইল মিডিয়ায় মূহুর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। টুর্নামেন্ট জিতলে বা বড় কোনো ম্যাচ জয়ের পর মাঠের মধ্যে অনেক দলকেই বিয়ার বা শ্যাম্পেইন পান করতে বা ছিটিয়ে উদযাপন করতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু সরাসরি জুতা থেকে বিয়ার পানের ঘটনা ক্রিকেট দুনিয়ায় এইটাই প্রথম।
cover
অজিদের এমন উদযাপনে অনেকে বিষ্ময় প্রকাশ করেন এবং একে অস্বাস্থ্যকর বলে আখ্যায়িত করেন। অনেকে বলেন এটি উন্মাদনার চরম পর্যায়! কিন্তু তারা জানে কি? এটি কোন উন্মাদনা কিংবা পাগলামি নয়, অজিদের কাছে ঐতিহ্যেরই একটি অংশ! তবে কি সে ঐতিহ্যর রহস্য, যা অন্যদের কাছে বাড়াবাড়ি? আর তাদের কাছে রীতি? চলুন জেনে আসি এই ধরনের উদযাপনের রহস্য-

অস্ট্রেলিয়ায় এই ধরনের উল্লাস খুব জনপ্রিয়। একে তারা 'শুয়ি' (জুতোর ইংরেজি থেকে এই নামকরণ) বলে থাকে। তারা মনে করে এভাবে উদযাপন করলে তা সব খারাপ সময় দূর করে সৌভাগ্যের বার্তা বয়ে আনে। কোনও মহিলার জুতো থেকে শ্যাম্পেইন বা বিয়ার পান করতে পারলে তা আরও সৌভাগ্য নিয়ে আসে বলে মনে করেন তারা। এই ঐতিহ্যেরই একটা অংশ ছিল অধরা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের পর জুতোয় মদ পানের কারন।

এই ঐতিহ্যের ইতিহাস শতাব্দী পুরোনো। যদিও এটি অজিদের নিজস্ব সংস্কৃতির নয়, বাহির থেকে আগত। যার সুত্রপাত হয়েছিল আমেরিকায়৷ এই উদযাপনের রীতি প্রথম চালু হয় আমেরিকার শিকাগোতে, এভারলে ক্লাব নামে এক উচ্চ শ্রেণির পতিতালয়ে। ঘটনা ১৯০২ সালের। সেখানকার এক নৃত্যকর্মী হঠাৎই পাফস্কে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন এবং তার জুতো খুলে যায়। সেখানে উপস্থিত থাকা প্রিন্স হ্যানরি অব প্রুশিয়ার এক সদস্য জুতো কুড়িয়ে নিয়ে এতে মদ ঢেলে পান করা শুরু করে দেন৷ ব্যস! তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় এইরীতি। এখন যা ক্রীড়াঙ্গনেও দেখা যাচ্ছে। ফর্মুলা ওয়ান থেকে শুরু করে রাগবি, এখন ক্রিকেটেও এই উদাযাপনের দেখা মিললো।
cover
এই উদযাপনের জনপ্রিয়তার শীর্ষ দেশ যেনো অস্ট্রেলিয়া। ২০১৫ সালে 'দ্য সুপারকাপ চ্যাম্পিয়নশিপ' জেতার পর অজি রেসার ডেবিড রেনর্ল্ডসকে পুরষ্কার নেওয়ার মঞ্চে দাঁড়িয়ে জুতোয় বিয়ার ঢেলে পান করতে দেখা যায়। ২০১৫ সালে সিডনিতে নতুন বর্ষ বরণ উপলক্ষে 'দ্য ফিল্ড' শোতে মিউজিশিয়ান ডিজে ডিলোন ফ্রাঞ্চিসকেও কনসার্ট চলাকালীন সময় জুতোয় বিয়ার নিয়ে পান করতে দেখা যায়।

এছাড়া ২০১৬ সালের ২৬ জুনে অস্ট্রেলিয়ান মটোজিপি রেসার জ্যাক মিলার প্রিমিয়ার ক্লাস লিগে তার প্রথম জয়ের উল্লাসে নিজের জুতো থেকে শ্যাম্পেইন পান করে জয় উদযাপন করেছিলেন। মূলত তখনই এই ধরনের উদযাপন মিডিয়ার নজর কাড়ে। এরপরই ২০১৬ সালে ফর্মুলা ওয়ানের জার্মান গ্রাঁ প্রিতে আরেক অস্ট্রেলিয়ান রেনোঁর ড্যানিয়েল রিকার্ডোরকেও এমন উদযাপন করতে দেখা গিয়েছে। ফর্মুলা ওয়ানে এমন উদযাপনের সূত্রপাত ঘটে তার মাধ্যমেই। ওই বছরই মটোজিপির সান মারিনো গ্রাঁ প্রিতে অস্ট্রেলিয়ান ছাড়া প্রথম কোন রেসার হিসেবে ইতালিয়ান ভ্যালেন্টিনো রোসি এই শুয়ি উদযাপন করেছিলেন।

বেলজিয়াম গ্রাঁ প্রিতে রিকার্ডো এর পুনরাবৃত্তি ঘটান, তবে সেবার আর একা একা উদযাপন করেননি। তার সঙ্গি হিসেবে বেচে নিয়েছিলেন মার্ক ওয়েবারকে। রিকার্ডো যে তার এই শুয়ি উদযাপনে বেশ আগ্রহী ছিলেন তার আবারও প্রমান মিলে মালেশিয়া গ্রাঁ প্রিতে। সেবার তিনি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর, দ্বিতীয় স্থান অধিকারী ম্যাক্স ভারেস্টাফেন, তৃতীয় স্থান অধিকারী নিকো রসবের্ক ও টিম লিডার ক্রিস্টিয়ান হর্নকে সাথে নিয়ে পুরষ্কার নেওয়ার মঞ্চে জুতোয় করে বিয়ার পান করেন। 
cover
ইউএস গ্রাঁ প্রিতে স্কটিশ অভিনেতা জেরার্ড বাটলারও রিকোর্ডর সাথে জুতো থেকে রেড বুল খেয়েছিলেন। ২০১৭ সালে কানাডিয়ান গ্রাঁ প্রিতে পেট্রিক স্টুয়ার্ডও একই পদ্ধতিতে বিয়ার পান করেন। ২০১৭ সালে আজারবাইজান গ্রাঁ প্রির পর ২০২০ এমিলিয়া রোমানিয়া গ্রাঁ প্রিতে আবারও শুয়ি উদযাপন করেন রিকার্ডো। সেবার তিনি তৃতীয় হলেও চ্যাম্পিয়ন লুইস হ্যামিল্টনকে সাথে নিয়ে জুতো থেকে বিয়া পানে মেতে উঠেন। দু'জনই রিকার্ডোর জুতো থেকে পান করেছিলেন।

রিকার্ডো যেনো উদযাপনের শ্রেষ্ঠ উপায় হিসেবে শুয়ি'কে বাঁচাই করে নিয়েছিলেন। তার এই পাগলাটে উদযাপনের লাগাম টেনেই ধরা যাচ্ছিল না। ধারাবাহিকতা তিনি বজায় রাখছেনই। ২০২১ সালে ইতালিয়ান গ্রাঁ প্রিতেও বাদ দেনই এই বুনো উল্লাস। ৯ বছর পর গ্রাঁ প্রি জয়ের স্বাদ পাওয়া টিম ম্যাকলারেন পোডিয়ামের ১ম এবং ২য় দুইটি জায়গাই দখল করে নিয়েছিল। ম্যাকলারেনের দুই ড্রাইভারের একজন ছিলেন ড্যানিয়েল রিকার্ডো এবং অন্যজন ল্যান্ডো নরি। জয়ের পর রিকার্ডো সে পুরোনো পদ্ধতিতে বিয়ার পান করতে ভুলেন নি। সাথে ম্যাকলারেনের সিইও জেক ব্রাউনও যোগ দেন।
cover
২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়া ন্যাশানাল রাগবি লিগের ফাইনালে ক্রোনুলা সাদারল্যান্ড হাঙ্গর ক্লাবের দর্শকরা শিরোপা জয়ের প্রত্যাশায় গ্যালারিতে শুয়ি উদযাপন করতে থাকে। আশ্চর্যজনক ভাবে, ফাইনালে দলটি জিতে যায় এবং নিজেদের প্রথম প্রিমিয়ারশিপ অর্জন করে। খেলা শেষে জেমস ম্যানুলিও দর্শকদের সাথে এই উদযাপনে শামিল হন। ২০১৮ সালে বোস্টন ম্যারাথন জয়ের পর আমেরিকান দৌড়বিদ ডেসিরি লিন্ডেনও শুয়ি উদযাপন করেন। ২০১৯ সালের আইপিএলে কিংস ইলাভেন পাঞ্জারের হয়ে খেলা অজি ক্রিকেটার অ্যান্ড্রু টাইতো বলেই পেলেছিলেন যদি তার দল শিরোপা জিততে পারে তবে তিনি নিজের জুতো দিয়ে বিয়ার পান করে তা উদযাপন করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার ইচ্ছে আর পূরন হয়নি।

শুধু খেলাধুলার ক্ষেত্রেই না, কোন কোন দেশের মিলিটারি ফোর্সেও এমন উদযাপনের নজির রয়েছে। জার্মান সেনারা একটা সময় যুদ্ধ জয়ের পর তাদের জেনারেলের জুতোয় মদ রেখে স্বাচ্ছন্দে তা পান করতেন। এমনি সহযোদ্ধাদের জুতো থেকেও কখনো কখনো বিয়া পান করতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘটনা, জার্মান সৈন্যদের নজরে পড়ে বিয়ারবাহী এক নৌযান। তারা সেটাকে জব্দ করে মঙ্গলের আশায় জুতোয় বিয়ার ঢেলে খাওয়া শুরু করেন। 

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021