Link copied.
বায়ু দূষণে বাংলাদেশ: প্রতিবছর গড়ে প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ বায়ু দূষণ!
writer
১৮ অনুসরণকারী
cover
আপনি কি জানেন যে শহরটাকে আমরা প্রাণের শহর বলে জানি সেই প্রিয় ঢাকা শহর বসবাসের এক অযোগ্য শহর হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে? ২০১৮ সালে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে বসবাস অযোগ্য ঘোষণা করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠার পেছনে অন্যতম এক প্রধান কারণ বায়ু দূষণ। একটি স্থানে বায়ুর গুণগত মান কেমন, সেখানকার বাতাস শ্বাস নেয়ার জন্য কতটা স্বাস্থ্য উপযোগী এবং দূষণ কতটা গ্রাস করে নিয়েছে স্থানটির বায়ুকে সেটি বুঝতে বায়ুমান যন্ত্রের মাধ্যমে বায়ুর মান নির্ণয় করা হয়ে থাকে। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স নামের এই পদ্ধতির সাহায্যে কোনো একটি স্থানের বায়ুর রিয়েল টাইম মান পাওয়া সম্ভব।  

cover
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার বায়ুর মান কখনোই ভালো ছিল না। এই ভালো না থাকার মিছিলে দেশের অন্যান্য শহরও আছে। এর প্রভাবে যে মূল্য দিতে হচ্ছে নগরবাসীকে সেটি যে ভয়াবহই তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসেবে বায়ু দূষণকে দায়ী করা হয়। সর্বোচ্চ এই ক্ষতির সাথে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ বায়ু দূষণজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। 

cover
দুই ধরণের দূষণে ভয়াবহতা

বায়ু দূষণ সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমটি অভ্যন্তরীণ দূষণ, অপরটি আন্তঃসীমানা দূষণ। বাতাসে বিভিন্ন ধূলিকণা মিশে বায়ুকে দূষিত করে তুলছে। এই দূষিত বায়ু বেশ অনেকটা সময় বায়ুমন্ডলে টিকে থাকার কারণে পরিবেশ এবং প্রাণীর ক্ষেত্রে ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতির দেশে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে৷ কারণ বাংলাদেশের আশেপাশের দেশগুলোও জনবসতি পূর্ণ। তাই দেশের আকাশে নানান পথেই আসছে দূষিত বায়ু। 

একেকটি বায়ু দূষক কণা ২০০-৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। কয়লা খনি থেকে নির্গত বিষাক্ত কণা আন্তঃসীমানা বিশেষ করে ভারত থেকে বাংলাদেশের আকাশে এসে পৌঁছায়। এই কণা অন্যান্য বায়ু দূষকের তুলনায় শতগুণ বেশি বিপজ্জনক। এই কণাই দেশের ৪০ শতাংশ বায়ু দূষণের জন্য দায়ী বলে গবেষণায় এসেছে। ঢাকার সড়কে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন লাখ যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করে। এসব যানবাহনের মধ্যে যেগুলো পুরোনো বা ফিটনেসবিহীন তাদের বিরাট একটি অংশ বায়ু দূষণের জন্য দায়ী। এসব মোটরযান থেকে ক্ষতিকর যে বস্তুকণা নির্গত হয় তার মধ্যে অন্যতম কার্বন মনো-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং ওজোন।  
cover
বাংলাদেশে বায়ু দূষণের আরেকটি প্রাথমিক কারণ হিসেবে দেখা হয় অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণকাজকে। রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি এবং কন্সট্রাকশনের জন্য রাস্তার পাশে রাখা ধুলোবালি, ইটের ভাটা, শিল্প কারখানার দূষিত বাতাস, আবর্জনা পোড়ানোকে বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রশাসনের তদারকির অভাবে এসব দিনে দিনে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। 

cover
মৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মিছিল

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান লরেন্স বের্কলি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এক গবেষণায় পেয়েছে , রাসায়নিক মিশ্রণ আছে, এমন দুষিত বায়ুর সংস্পর্শে থাকলে চোখ, নাক বা গলার সংক্রমণ বা ক্ষতির কারণ হতে পারে। সেই সঙ্গে ফুসফুসের নানা জটিলতা, যেমন ব্রঙ্কাইটিস বা নিউমোনিয়া, মাথাব্যথা, অ্যাজমা এবং নানাবিধ অ্যালার্জির সমস্যাও দেখা দিতে পারে। বায়ু দূষণের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্কও খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের শহরাঞ্চলে শুধু বায়ু দূষণ জনিত কারণেই বছরে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। জাতিসংঘ অন্য এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪৯ হাজার মানুষের অকালে মৃত্যু হয় গৃহস্থালি বায়ু দূষণে, যার প্রধান উৎস মাটির চুলার ধোঁয়া। কী মনে হয়, বায়ু দূষণ শুধু কি মৃত্যু কিংবা অসুস্থতাতেই প্রভাব রাখছে? 

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট অবশ্য বায়ু দূষণের আরেক প্রভাবের কথা তুলে এনেছে তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে। গেল বিশ বছরে বায়ু দূষণ ৪৪ শতাংশ হারে বাড়তে থাকার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশের মানুষের গড় আয়ু প্রায় পাঁচ বছর কমে যেতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের সাথে সেই চার দেশের তালিকায় আছে বাংলাদেশও। প্রতিবেদনটিতে ২৩৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষণের দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট অবশ্য বায়ু দূষণের আরেক প্রভাবের কথা তুলে এনেছে তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে। গেল বিশ বছরে বায়ু দূষণ ৪৪ শতাংশ হারে বাড়তে থাকার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশের মানুষের গড় আয়ু প্রায় পাঁচ বছর কমে যেতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের সাথে সেই চার দেশের তালিকায় আছে বাংলাদেশও। প্রতিবেদনটিতে ২৩৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষণের দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট এর প্র্রতিবেদন
সরকারের এক গবেষণার তথ্য বলছে, বায়ু দূষণজনিত কারণে বছর সরকারের ক্ষতি প্রায় ৬৫০ কোটি ডলার। দূষণজনিত কারণে অসুস্থতার সম্মুখীন হয়ে বছরে গড়ে লক্ষাধিক মানুষের আয় কমছে। 

কী ভাবছে প্রশাসন ?
এতসব ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে রাজত্ব করা বায়ু দূষণের লাগাম টেনে ধরা জরুরি হয়ে পড়েছে। গেল বছরের শুরুতে বাংলাদেশের আদালত বায়ু দূষণ রোধে নয়টি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার আদেশ দিয়েছেন। নির্দেশনাগুলো হলো, 

  1. ঢাকা শহরের মধ্যে যেসব ট্রাক বা অন্যান্য যানবাহনে বালি বা মাটি পরিবহন করা হয়, সেগুলোয় কাভার্ড বা ঢাকনা যুক্ত করতে হবে।
  2. যেসব জায়গায় নির্মাণ কাজ চলে সেসব স্থানে ঠিকাদারদের ঢাকনা দিয়ে নির্মাণ কাজ পরিচালনা করতে হবে।
  3. ঢাকার সড়কগুলোতে পানি ছিটানোর যে নির্দেশ ছিল, সে নির্দেশ অনুযায়ী যেসব জায়গায় এখনও পানি ছিটানো হচ্ছে না, সেসব এলাকায় পানি ছিটানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
  4. সড়কের মেগা প্রজেক্টের নির্মাণ কাজ এবং কার্পেটিংয়ের যেসব কাজ চলছে, সেসব কাজ যেন আইন কানুন এবং চুক্তির শর্ত মেনে করা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
  5. যেসব গাড়ির কলো ধোঁয়া ছাড়ে সেগুলো জব্দ করতে বলা হয়েছে।
  6. সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির ইকোনোমিক লাইফ নির্ধারণ করতে হবে এবং যেসব গাড়ি পুরোনো হয়ে গেছে সেগুলো চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
  7. যেসব ইটভাটা লাইসেন্সবিহীনভাবে চলছে, সেগুলোর মধ্যে যেগুলো এখনও বন্ধ করা হয়নি, সেগুলো বন্ধ করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।
  8. পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া টায়ার পোড়ানো এবং ব্যাটারি রিসাইকিলিং বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
  9. মার্কেট এবং দোকানের বর্জ্য প্যাকেট করে রাখতে হবে এবং মার্কেট ও দোকান বন্ধের পরে সিটি করপোরেশনকে ওই বর্জ্য অপসারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার দাবি করেছেন, দূষণ মূলত ঢাকার আশেপাশে শিল্প এলাকাগুলোয় বেশি, অন্যান্য স্থানে দূষণের এতটা ভয়াবহতা নেই। তিনি জানিয়েছেন, তার সরকার বায়ু দূষণ রোধে বেশ কিছু মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে দূষণ অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা তাদের।
cover
একইসাথে গাছ লাগানোর উদ্যোগগুলোতেও জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, অবৈধভাবে দখল হওয়া প্রায় প্রায় ৫৬ হাজার হেক্টর সংরক্ষিত বনভূমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইতিমধ্যে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। দূষণরোধে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ এবং ইটভাটায় দূষণ রোধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথাও জানানো হয়েছে।  

সরকারী বা প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও যার যার জায়গা থেকে বায়ু দূষণের বিষয়ে সচেতনতা গড়ে উঠা জরুরি৷ পরবর্তী প্রজন্মকে বাসযোগ্য এক নির্মল বায়ুর দেশে পৃথিবীর আলো দেখাতে বায়ু দূষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এক হওয়ার সময় এখনই৷ 



Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021