Link copied.
ডিজিটাল মুদ্রার অনুমোদন নিয়ে যা ভাবছে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো
cover
ডিজিটাল মুদ্রা (ইলেক্ট্রনিক কারেন্সি) হচ্ছে সেসব মুদ্রা যা শুধু ভার্চুয়ালী লেনদেন হয়, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই, বিনিময়ের বা লেনদেনের সব তথ্য গোপনীয় করে রাখা হয়ে থাকে। এ ধরণের ডিজিটাল মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি নামেও পরিচিত। অর্থাৎ ডিজিটাল মুদ্রা একধরনের মুদ্রা, যা শুধু ডিজিটাল রূপে পাওয়া যায়, ভৌতভাবে নয় (যেমন ব্যাংক নোট বা পয়সা)। এটি ভৌত মুদ্রার অনুরূপ বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে, তবে এটি তাৎক্ষণিক লেনদেন এবং সীমান্তহীন মালিকানা হস্তান্তর এর সুযোগ করে দেয়। এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রায় ৬০০০ এর উপর ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রচলিত হয়েছে। এদের মধ্যে বিটকয়েন সবচেয়ে জনপ্রিয়। বিটকয়েন হলো ওপেন সোর্স ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রোটোকলের মাধ্যমে লেনদেন হওয়া এক ধরনের সাঙ্কেতিক মুদ্রা। ধারণা করা হয় আগামি দিনে বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এই ডিজিটাল মুদ্রা ব্যাপক প্রভাব রাখবে। এই মুদ্রা দিয়ে লেনদেনে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বা নিকাশ ঘর লাগে না।

২০০৮ সালে সাতোশি নাকামোতো নামের এক বিজ্ঞানী এ মুদ্রাব্যবস্থার প্রচলন করেন। তিনি এ মুদ্রাব্যবস্থাকে ‘পিয়ার-টু-পিয়ার লেনদেন’ নাম দেন। ২০০৯ সালে বিশ্বে প্রথম ডিজিটাল মুদ্রা হিসেবে বিটকয়েনের উৎপত্তি ঘটে। আজকাল এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকও "ডিজিটাল ভিত্তিক মুদ্রা" জারি করে থাকে। প্রথাগত মুদ্রার মত এই মুদ্রাগুলোও ভৌত পণ্য বা সেবা ক্রয় করতে ব্যবহার করা যায়। তবে কিছু মাধ্যমে এর ব্যবহার সীমিত করা হয়, যেমন অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বিটকয়েন কি বিশ্বটাকে পাল্টে দিতে যাচ্ছে- এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয়ার সময় হয়তো এখনও আসেনি। তবে চালু হওয়ার পাঁচ বছরের মাথায় এটিকে নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবা হয়েছে। অবশ্য তার আগে এর ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে, সেটাও বোঝার চেষ্টা চলছে। অনেকে একে ‘ডিজিটাল গোল্ড’ আখ্যা দিচ্ছেন। মাদক অথবা অস্ত্রসহ যে কোনো দামি জিনিস কিনতে পশ্চিমা বিশ্বে নগদ ডলার বা ইউরোর চেয়ে বিটকয়েনই এখন বেশি নিরাপদ বলে বিবেচিত হচ্ছে। তারপরও বিনিময়ের নতুন মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত ডলারের এ ভার্চুয়াল প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে বিশ্বের শীর্ষ ব্যাংকসহ সরকারগুলোকে। 
cover
ছবিসূত্র: বিবিসি
২০১২ সালে ভার্চুয়াল মুদ্রাকে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংজ্ঞায়িত করে এভাবে, "এটি এক প্রকার অনিয়মিত, ডিজিটাল মুদ্রা, যা জারি করে এবং নিয়ন্ত্রণ করে এর ডেভেলপাররা এবং একটি নির্দিষ্ট ভার্চুয়াল সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে ব্যবহৃত এবং গৃহীত হয়"। ২০১৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট এটিকে আরও সংক্ষিপ্তভাবে সংজ্ঞায়িত করে এভাবে, "একটি বিনিময় মাধ্যম যা কিছু ক্ষেত্রে একটি মুদ্রার মত কাজ করে, কিন্তু প্রকৃত মুদ্রার সব বৈশিষ্ট্য নেই"।

ডিজিটাল মুদ্রা বা বিটকয়েনের লেনাদেনা

বিটকয়েন ব্যবহার করে যে কোনো ধরণের অনলাইন পেমেন্ট এবং ট্রান্সজেকশন করা যায়। সাধারণত বিটকয়েনের মাধ্যমে পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্ক বেসিস লেনদেন হয়ে থাকে। অর্থাৎ কোন ধরণের ব্যাংক, কোম্পানী এবং ক্রেডিট কার্ড ছাড়াই সরাসরি বিটকয়েন লেনদেন করা যায়। বিটকয়েনের সবচাইতে বড় সুবিধা হচ্ছে এটি দিয়ে খুব সহজে এবং দ্রুত লেনদেন করা সম্ভব।  
cover
ছবিসূত্র: Quora
বর্তমানে অধিকাংশ অনলাইন ডেভেলপাররা কোন কাজ করার ক্ষেত্রে বিটকয়েন পেমেন্ট করার জন্য দাবী করেন। যার কারণে বিটকয়েন বিশ্বের অন্যান্য পেমেন্ট সিস্টেমকে পিছনে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা যখন কোন ধরণের পেমেন্ট করে থাকি তখন কোন না কোন একটি ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে আমাদের পেমেন্ট সরাসরি হাতে পেয়ে থাকি যার কারণে ব্যাংক সমূহ বা কোন দেশের সরকার লেনদেনের উপর নজরদারী করতে পারে। কিন্তু বিটকয়েন এর বড় সুবিধা হচ্ছে বিটকয়েন এর লেনদেন তৃতীয় কোন ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠান জানতে পারে না। কেবলমাত্র লেনদেনকারী দুইপক্ষ লেনদেন এবং লেনদেনের পরিমাণ জানতে পারে।

বিটকয়েনের লেনদেন ‘বিটকয়েন মাইনার’ নামে একটি সার্ভারে সুরক্ষিত থাকে। পিয়ার-টু-পিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুক্ত থাকা একাধিক কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মধ্যে বিটকয়েন লেনদেন হলে এর কেন্দ্রীয় সার্ভার ব্যবহারকারীর লেজার হালনাগাদ করে দেয়। একটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন বিটকয়েন উৎপন্ন হয়। ২১৪০ সাল পর্যন্ত নতুন সৃষ্ট বিটকয়েনগুলো চার বছর পর পর অর্ধেকে নেমে আসবে। ২১৪০ সালের পর ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন তৈরি হয়ে গেলে আর কোনো নতুন বিটকয়েন তৈরি করা হবে না।

বিটকয়েনের সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অনলাইনে একটি ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে। বিটকয়েন মাইনিং এর মাধ্যমে যে কেউ বিটকয়েন উৎপন্ন করতে পারে। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় অনুমানযোগ্য এবং সীমিত। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার সাথে সাথে এটি গ্রাহকের ডিজিটাল ওয়ালেটে সংরক্ষিত থাকে। এই সংরক্ষিত বিটকয়েন যদি গ্রাহক কর্তৃক অন্য কারও একাউন্টে পাঠানো হয় তাহলে এই লেনদেনের জন্য একটি স্বতন্ত্র ইলেক্ট্রনিক সিগনেচার তৈরি হয়ে যায়-যা অন্যান্য মাইনার কর্তৃক নিরীক্ষিত হয় এবং নেটওয়ার্কের মধ্যে গোপন অথচ সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত হয়। একই সাথে গ্রাহকদের বর্তমান লেজার কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে হালনাগাদ হয়। বিটকয়েন দিয়ে কোন পণ্য কেনা হলে তা বিক্রেতার একাউন্টে পাঠানো হয় এবং বিক্রেতা পরবর্তীতে সেই বিটকয়েন দিয়ে পুনরায় পণ্য কিনতে পারেন।

বিটকয়েনের বাজার দর ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির ভাবনা

বিটকয়েন এর মূল্য এতটাই বেশি যে, একজন সাধারণ ব্যক্তি কোনভাবে বিশ্বাস করতে চাইবে না, বর্তমানে একটি বিটকয়েন এর মূল্য হচ্ছে প্রায় $49926 ডলার যা বাংলাদেশে প্রায় ৪২,৫০,০৮৮ টাকা। তাছাড়া বিটকয়েনের মূল্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। তবে বিটকয়েনের একটি অসুবিধা হচ্ছে যে বিটকয়েন এর মূল্য অনেকসময় খুব বেশি বৃদ্ধি পায় আবার কখনো মাত্রাতিরিক্ত হ্রাস পায়। বিটকয়েনের মূল্য মূলত মার্কেট ডিমান্ডের উপর নির্ভর করে। 
cover
ছবিসূত্র: Google Finance
২০২০ সালে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে যখন অচল হয়ে পড়ে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি তখনো ঊর্ধ্বমুখী ছিলো অনলাইন কারেন্সির এই বিটকয়েনের বাজার। গত বছরের শুরুর দিকে একটি বিট কয়েনের বাজার দর ছিলো ৭২০০ ইউএস ডলার যা চলতি বছরের একই সময়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে যায় ৩৬ থেকে ৪০ হাজার ইউএস ডলারে। তবে গত দুই মাসে ৯০ পারসেন্ট বেড়ে গেছে এই ডিজিটাল মুদ্রা অর্থাৎ অনলাইন কারেন্সি বিটকয়েনের দাম। সম্প্রতি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কোম্পানি ইলন মাক্স ১৫০ কোটি ডলারের বিটকয়েন কিনার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই ডিজিটাল কারেন্সি অর্থাৎ অনলাইন কারেন্সি বিটকয়েন এর উপর অনেক আগ্রহ বেড়েছে বিশ্বের অনেক বড় বড় কোম্পানি যেমন মাইক্রোসফট, আমাজন, উইকিপিডিয়া, স্টারবাকস সমূহের। বর্তমানে অনলাইন কারেন্সি অর্থাৎ এই ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে কেনাকাটা অথবা লেনদেন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্য, জার্মানি,ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ,যার মধ্যে রয়েছে কানাডা। ফিলিপাইন মালয়েশিয়া সহ বিশ্বের প্রায় ৫০ টিরও বেশি দেশে অনলাইন কারেন্সি বিটকয়েনের ব্যবসা চলছে অর্থাৎ বিটকয়েনের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে।

বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি এর অনুমোদন নিয়ে কাজ করছে যাতে করে এর লেনদেন তাদের তত্বাবধানে আনতে পারে। ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ৮০ শতাংশই এ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, জাপান অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ এবং এমআইটি যৌথভাবে সিবিডিসি (সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি) নিয়ে গবেষণা করছে হ্যামিলটন প্রকল্পের মাধ্যমে। এ প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ডিজিটাল মুদ্রা কিভাবে কাজ করবে এবং এ ক্ষেত্রে কোন ধরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন তা নিরুপণ করা। বিশ্বের ৬৫ টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক়র উপর জরিপ চালিয়ে ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটলমেন্টসং জানায়, ৮৫ শতাংশ ব্যাংকই সিবিডিসি নিয়ে কোনো না কোনোভাবে ভাবে কাজ করছে। ১৫ শতাংশ এ নিয়ে গবেষণায় পাইলট প্রকল্পে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, কেন্দ্রীয়ব্যাংকগুলি বোঝার চেষ্টা করছে সিবিডিসির মাধ্যমে জনগণ কতটা লাভবান হবে, মূল্য স্থিতিশীলতা ও লেনদেনের নিরাপত্তা ইত্যাদি কতটা নিশ্চিত করা যাবে।

ধারণা করা হচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এভাবে ধীরে ধীরে ক্রিপ্টোকারেন্সির মূলধারায় নেমে আসবে, সেই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। বিশ্বের ৫০টি মুদ্রানীতি প্রণয়নকারী সংস্থা এখন ডিজিটাল মুদ্রা প্রবর্তনের চিন্তা করছে। বাহামা দ্বীপপুঞ্জ ইতিমধ্যে ডিজিটাল মুদ্রা ছেড়েছে। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ই-ইউয়ানের পাইলটিং শুরু করেছে—পাঁচ লাখ মানুষের মধ্যে এই মুদ্রা ছেড়েছে তারা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৫ সালের মধ্যে ভার্চ্যুয়াল ইউরো নিয়ে আসতে চায়। ব্রিটেন টাস্কফোর্স গঠন করেছে। আর বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থার শিরোমণি হাইপোথেটিক্যাল ই-ডলার ছেড়েছে।

সরকারি ডিজিটাল মুদ্রার উপর সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ও কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতির প্রভাব বৃদ্ধিতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা কাজে লাগায়। পেমেন্ট, আমানত ও ঋণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বেসরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় চলে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে অর্থনৈতিক চক্র বজায় রাখা কঠিন হয়ে পরবে। সংকটের সময় তারা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টাকা ঢুকিয়ে যেভাবে তা মোকাবিলা করে, তা করা আরও কঠিন হবে।  
cover
গত ২০২০ সালে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে যখন অচল হয়ে পড়ে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি তখনো ঊর্ধ্বমুখী ছিলো অনলাইন কারেন্সির এই বিটকয়েনের বাজার। ২০২০ সালের শুরুর দিকে একটি বিট কয়েনের মূল্য ছিলো ৭২০০ ইউএস ডলার যা চলতি বছরের একই সময়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে যায় ৩৬ থেকে ৪০ হাজার ইউএস ডলারে। তবে গত দুই মাসে ৯০ পারসেন্ট বেড়ে গেছে এই ডিজিটাল মুদ্রা অর্থাৎ অনলাইন কারেন্সি বিটকয়েনের দাম। সম্প্রতি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কোম্পানি ইলন মাক্স ১৫০ কোটি ডলারের বিটকয়েন কিনার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই ডিজিটাল কারেন্সি অর্থাৎ অনলাইন কারেন্সি বিটকয়েন এর উপর অনেক আগ্রহ বেড়েছে বিশ্বের অনেক বড় বড় কোম্পানি যেমন মাইক্রোসফট, আমাজন, উইকিপিডিয়া, স্টারবাকস সমূহের। বর্তমানে অনলাইন কারেন্সি অর্থাৎ এই ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে কেনাকাটা অথবা লেনদেন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ, যার মধ্যে রয়েছে কানাডা। ফিলিপাইন মালয়েশিয়া সহ বিশ্বের প্রায় ৫০ টিরও বেশি দেশে অনলাইন কারেন্সি বিটকয়েনের ব্যবসা চলছে অর্থাৎ বিটকয়েনের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে।

বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি এর অনুমোদন নিয়ে কাজ করছে যাতে করে এর লেনদেন তাদের তত্ত্বাবধানে আনতে পারে। ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ৮০ শতাংশই এ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, জাপান অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ এবং এমআইটি যৌথভাবে সিবিডিসি (সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি) নিয়ে গবেষণা করছে হ্যামিলটন প্রকল্পের মাধ্যমে। এ প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ডিজিটাল মুদ্রা কিভাবে কাজ করবে এবং এ ক্ষেত্রে কোন ধরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন তা নিরুপণ করা। বিশ্বের ৬৫ টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক়র উপর জরিপ চালিয়ে ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটলমেন্টসং জানায়, ৮৫ শতাংশ ব্যাংকই সিবিডিসি নিয়ে কোনো না কোনোভাবে কাজ করছে। ১৫ শতাংশ এ নিয়ে গবেষণায় পাইলট প্রকল্পে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, কেন্দ্রীয়ব্যাংকগুলি বোঝার চেষ্টা করছে সিবিডিসির মাধ্যমে জনগণ কতটা লাভবান হবে, মূল্য স্থিতিশীলতা ও লেনদেনের নিরাপত্তা ইত্যাদি কতটা নিশ্চিত করা যাবে।

cover
ধারণা করা হচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এভাবে ধীরে ধীরে ক্রিপ্টোকারেন্সির মূলধারায় নেমে আসবে, সেই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। বিশ্বের ৫০টি মুদ্রানীতি প্রণয়নকারী সংস্থা এখন ডিজিটাল মুদ্রা প্রবর্তনের চিন্তা করছে। বাহামা দ্বীপপুঞ্জ ইতিমধ্যে ডিজিটাল মুদ্রা ছেড়েছে। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ই-ইউয়ানের পাইলটিং শুরু করেছে—পাঁচ লাখ মানুষের মধ্যে এই মুদ্রা ছেড়েছে তারা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৫ সালের মধ্যে ভার্চ্যুয়াল ইউরো নিয়ে আসতে চায়। ব্রিটেন টাস্কফোর্স গঠন করেছে। আর বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থার শিরোমণি হাইপোথেটিক্যাল ই-ডলার ছেড়েছে।

সরকারি ডিজিটাল মুদ্রার উপর সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ও কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতির প্রভাব বৃদ্ধিতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা কাজে লাগায়। পেমেন্ট, আমানত ও ঋণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বেসরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় চলে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে অর্থনৈতিক চক্র বজায় রাখা কঠিন হয়ে পরবে। সংকটের সময় তারা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টাকা ঢুকিয়ে যেভাবে তা মোকাবিলা করে, তা করা আরও কঠিন হবে।  
cover
বিশ্বের অনেক দেশেই এখন বিটকয়েনের আইনি স্বীকৃতি আছে। তবে বাংলাদেশ, মিশর, আলজেরিয়া, মরক্কো প্রভৃতি দেশে বিটকয়েন এখনো নিষিদ্ধ। তারপরও থেমে নেই এর লেনদেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এর ব্যবসা বেআইনিভাবে বাংলাদেশেও প্রসারিত হচ্ছে। আবার প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে। বিদেশে কেনা পণ্যের দাম যেমন বিটকয়েনের পরিশোধ করা হচ্ছে, তেমনি এতে বিনিয়োগ হচ্ছে। বেআইনি এ মুদ্রা নিয়ে ব্যবসা করার দায়ে ইতোমধ্যে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে কয়েকটি মামলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, বাংলাদেশের পার্শবর্তী কোনো দেশ ডিজিটাল মুদ্রা এখনও চালু করেনি। উন্নত দেশগুলোর কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ মুদ্রার স্বীকৃতি দেয়নি। সে অবস্থায় বাংলাদেশে এ ধরনের মুদ্রা চালু বা লেনদেনের অনুমতি দেয়া হবে না। প্রতিযোগী দেশগুলো এ ধরনের মুদ্রা চালু করলে তার ফলাফল দেখে পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, "ক্রিপ্টোকারেন্সির’ ভেতরে বেশ জটিল কিছু বিষয় রয়েছে। যেমন এটার ব্যবসা এখন যেভাবে হচ্ছে, কেউ কিনে রেখে দিচ্ছেন, দাম বাড়লে আবার বিক্রি করছেন। কিন্তু আমাদের দেশে পুঁজিবাজারে যেমনটা হয়েছে, ভালোভাবে না বোঝার কারণে এখানেও কিন্তু প্রতারণার একটা সুযোগ রয়েছে।" বিটকয়েন বাংলাদেশে ব্যবহার করতে হলে আরও অনেক পরিবর্তন প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের জ্যেষ্ঠ গবেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, বাংলাদেশ এখনো এটির জন্য প্রস্তুত নয়। কারণ আমাদের মূল ধারার মুদ্রা ব্যবস্থাপনার বাইরে এটা হচ্ছে। শুধু জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও এটার ব্যবস্থাপনার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক যে নীতি দরকার, সেটার অভাব রয়েছে। এটি প্রতিষ্ঠা করার কোন ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক, আইনি প্রস্তুতি নেই, তথ্যের অস্বচ্ছতাও আছে।


cover
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিডিটাল লেনদেন জ্যামিতিক হারে বাড়ার কারণে বিহিত মুদ্রার (ব্যাংক নোট) ব্যবহার কমছে। ফলে সাধারণ জনগণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ডিজিটাল মুদ্রা সরবরাহের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

দেশে এখন মোট লেনদেনের প্রায় ৪০ শতাংশ ইলেকট্রনিক মানি পদ্ধতিতে হয়। একে আরও শক্তিশালী করতে গ্রাহক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের কার্ড, স্ক্যানিং মেশিন, অনলাইনে দেনা-পাওনা পরিশোধ পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করতে হবে। একই সঙ্গে আর্থিক খাতের ডিজিটাল প্ল্যাটফরমকে নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা জরুরী। তবে সিবিডিসি পদ্ধতিতে বৈধ ডিজিটাল মুদ্রায় কেনাকাটা, লেনদেন বা অর্থ পরিশোধ সবই হবে দ্রুত। আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর বা রেমিট্যান্স প্রেরণে ব্যয় কমবে, নগদ অর্থ বহন করতে হবে না, অ্যাকাউন্টের বাইরে বা ব্যাংক সুবিধাবঞ্চিত মানুষ সুবিধা পাবে। সরকারি কর বা ভ্যাট সংগ্রহ সহজ হবে আবার দরিদ্রদের ভাতা বা বৃত্তি পাওয়া সহজ হবে। অর্থ প্রেরণের সহজ সুবিধা পেয়ে মানুষ অবৈধ মুদ্রায় লেনদেন করবে না। বর্তমানে যেসব ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে সেগুলোর মূল্য দ্রুত পরিবর্তিত হয়। এতে ব্যবহারকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর বিপরীতে সিবিডিসি হবে অনেক বেশি স্থিতিশীল। আরেকটি বড় সুবিধা হচ্ছে ডিজিটাল মুদ্রা প্রচলনে কমে যাবে কাগুজে মুদ্রার প্রিন্টিং। এতে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব সাশ্রয় হবে।  

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021