বাটারফ্লাই ইফেক্ট: দৈনন্দিন জীবনে এর কী প্রভাব?
প্রযুক্তি
বাটারফ্লাই ইফেক্ট: দৈনন্দিন জীবনে এর কী প্রভাব?
“আমাজন জঙলে একটি প্রজাপতির ডানার ঝাপটায় তৈরী বাতাস কি টেক্সাসে একটা ঘুর্ণিঝড় তৈরী করতে পারে?” এই প্রশ্নকে সামনে রেখেই ১৯৭২ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর পরিমাপ বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড লরেঞ্জ তার বিখ্যাত “ক্যাওস থিওরী” (chaos theory) প্রবর্তন করেন। বাটারফ্লাই ইফেক্ট কী এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কিভাবে এটা জড়িত সেটা নিয়েই আজকের এই আয়োজন।
“আমাজন জঙলে একটি প্রজাপতির ডানার ঝাপটায় তৈরী বাতাস কি টেক্সাসে একটা ঘুর্ণিঝড় তৈরী করতে পারে?”
ক্যাওস থিওরী
একটু পেছনে যাওয়া যাক, নিউটনিয়ান বলবিদ্যা অনুসারে কোনো বস্তুর উপর প্রযুক্ত বল তার ভর এবং ত্বরণের গুণ ফলের সমান। এই তত্ত্ব ব্যবহার করে বিখ্যাত গণিতবিদ ল্যাপলাস বলেন যে, এই পৃথিবীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশের উপর যদি বল প্রয়োগ হয়ে থাকে তাহলে সেটা বিশ্লেষণ করে, সেই গতিশীল অণু পরমাণুর ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নির্ণয় করা সম্ভব। ল্যাপলাস তার এই মতবাদ “ফিলোসফিক্যাল এসে অফ প্রবাবিলিটিস” বইতে প্রকাশ করেন ১৮১৪ সালে। তিনি এও দাবী করেন যে আবহাওয়ার পূর্বাভাস একদম নিখুঁত দেয়া সম্ভব, কারণ প্রাথমিক অবস্থায় পৃথিবীর উপাদানের উপর যে গতিশক্তি দেয়া হয়েছে সেটা নির্দিষ্ট এবং সেই শক্তির সম্পর্কে জানতে পারা গেলেই ভবিষ্যতের উত্তর গুলো পাওয়া যাবে। পরিমাপণবিদ এডওয়ার্ড লরেঞ্জ সেই মতবাদ মেনেই কাজ করছিলেন যে কিভাবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এর ক্ষেত্রে আবহাওয়া পূর্বাভাস একদম নিখুঁত পাওয়া যায়। 
“কোন ঘটনা স্বতন্ত্রতা, ধারাবাহিক এবং সীমাবদ্ধতার শর্ত সাপেক্ষে , একটি কেন্দ্রিয় ঘূর্ণায়মান গতিপথ (ট্রাজেক্টরি) যা ক্ষণস্থায়ী বৈশিষ্ট মুক্ত যদি পর্যায়ক্রমিক না হয় তাহলে সেই ঘটনা অস্থিতিশীল তথা বিশৃঙ্খল। আবার একটি বি কেন্দ্রিক ট্র্যাজেক্টরি যদি পর্যায়ক্রমিক না হয় সেটাও অস্থিতিশীল হবে। ঘটনা তখনই স্থিতিশীল হবে যখন সেটি ক্ষণস্থায়ীত্ব বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হয়, কিন্তু সেটি ঘটলে সময়ের সাথে সাথে ঘটনা শেষ হয়ে যাবে। এখন প্রাথমিক অবস্থা পরিমাপ করতে গেলে দেখা যায় যে প্রত্যেক সকল নন পেরিওডিক ঘটনা গুলো অস্থিতিশীল বিধায় সেগুলো পরিমাপ করা যায় না, এজন্য সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার গতি প্রকৃতি পূর্বাভাস দেয়া অসম্ভব।“
 তিনি একদিন আবহাওয়া পূর্বাভাস এর জন্য অনেকগুলো তথ্য নিয়ে হিসাব করছিলেন, তিনি হিসাব নেয়ার সময় দশমিকের পর প্রথমে তিন ঘর এবং পরে ছয় ঘর নিয়ে হিসাব করলেন। তারপর তিনি দেখলেন যে দুইটা হিসাবের উত্তর একদম ভিন্ন। অর্থাৎ দশমিকের পর মাত্র তিন ঘর অংকের পার্থক্য পুরো আবহাওয়ার পূর্বাভাস পরিবর্তন করে ফেলতে সক্ষম। এই ঘটনা ছিলো ১৯৬৩ সালে, পরবর্তীতে আরো গবেষণা করে ১৯৭২ সালে তিনি তার “ ডিটারমিনেস্টিক নন পেরিওডিক ফ্লো” গবেষণা প্রবন্ধে ক্যাওস থিওরী তথা বিশৃঙ্খলতার তত্ত্ব এবং বাটারফ্লাই ইফেক্ট এর কথা বলেন। তিনি সেখানে বলেন “কোন ঘটনা স্বতন্ত্রতা, ধারাবাহিক এবং সীমাবদ্ধতার শর্ত সাপেক্ষে , একটি কেন্দ্রিয় ঘূর্ণায়মান গতিপথ (ট্রাজেক্টরি) যা ক্ষণস্থায়ী বৈশিষ্ট মুক্ত যদি পর্যায়ক্রমিক না হয় তাহলে সেই ঘটনা অস্থিতিশীল তথা বিশৃঙ্খল। আবার একটি বি কেন্দ্রিক ট্র্যাজেক্টরি যদি পর্যায়ক্রমিক না হয় সেটাও অস্থিতিশীল হবে।
ঘটনা তখনই স্থিতিশীল হবে যখন সেটি ক্ষণস্থায়ীত্ব বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হয়, কিন্তু সেটি ঘটলে সময়ের সাথে সাথে ঘটনা শেষ হয়ে যাবে। এখন প্রাথমিক অবস্থা পরিমাপ করতে গেলে দেখা যায় যে প্রত্যেক সকল নন পেরিওডিক ঘটনা গুলো অস্থিতিশীল বিধায় সেগুলো পরিমাপ করা যায় না, এজন্য সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার গতি প্রকৃতি পূর্বাভাস দেয়া অসম্ভব।
“অনেক জটিল কথা বলে ফেলেছি চলুন একটি সহজ ভাষায় বলা যাক। তিনি বলছেন যে, নিখুঁত আবহাওয়ার পুর্বাভাস দেয়া একদম অসম্ভব কারণ আবহাওয়ার প্রাথমিক অবস্থা পরিমাপ করা সম্ভব না, একটা ছোট পরিবর্তন পুরো ফলাফল পরিবর্তন করে দিতে সক্ষম। তিনি সহজভাবে বুঝানোর জন্য বক্তৃতায় প্রজাপতির উদাহরণ দেন। তিনি বলেন যে একটা প্রজাপতির ডানার ঝাপটায় তৈরী হওয়া বাতাসের ঢেউ যদি বাতাসের চাপকে পরিবর্তিন করতে পারে এই চাপ পরিবর্তনের ফলে নিম্নচাপ তৈরী হতে পারে যেটা অনেকদূরে একটা ঘূর্ণিঝড় ঘটাতে পারে।
বাটারফ্লাই ইফেক্টের উদাহরণ
 বাণিজ্য ক্ষেত্রে এই ইফেক্টের উদাহরণ খুব ভালোমত দেখা যায়। আজকের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো একদিনে গড়ে উঠেনি তারা খুব ছোট পুঁজি দিয়ে শুরু করে আস্তে আস্তে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পরিকল্পনা করে এগিয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ আমাদের দেশের আকিজ গ্রুপ তাদের আদি প্রতিষ্ঠান যেটা দিয়েই তারা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সেই আকিজ টোব্যাকো বিক্রি করে দিয়েছে। এই বিক্রি করার কারণ হচ্ছে তারা ধারণ করছে যে টোব্যাকো ব্যবসায় ভবিষ্যতে ধস নামতে পারে এজন্য আগে থেকেই তারা সাবধানী । এই পরিকল্পনা গুলোই তাদের ব্যবসা আরো বড় করার সুযোগ দিচ্ছে, একটা ভুল বিনিয়োগ বা সিদ্ধান্ত তাদের পতন ঘটানোর জন্য যথেষ্ট।
স্টক মার্কেটেও বাটার ফ্লাই ইফেক্টের প্রতিফলন দেখা যায়। দিনের শুরুতে ভালো অবস্থায় থাকলেও হুট করে একটা কোম্পানীর শেয়ার ধস তৈরী হলে সেটা পুরো মার্কেটে বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরী করে যা পুরো মার্কেটেই ধস নামিয়ে দেয়।
ইতিহাসের কয়েকটা উদাহরণ
  1. পারমাণবিক বোমা হামলা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বিভীষিকাময় ঘটনা হচ্ছে হিরোশিমা নাগাসাকি বোমা হামলা। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধের একদম শেষের দিকে যখন জাপানে পারমাণবিক বোমা হামলার সিদ্ধান্ত নেয়ে হয় তখন হামলার জন্য পাচটি শহর নির্ধারণ করা হয়। সেই লিস্টে কিয়েটোর নাম ছিলো উপরের দিকেই। যুদ্ধ সচিব হেনরি লুইস স্টিমসন কিয়েটোর নাম দেখে তার চোখ কপালে উঠে গেলো। কারণ এই শহরেই তিনি তার মধুচন্দ্রিমা কাটিয়েছিলেন। এই সুন্দর শহরকে তিনি শেষ পর্যন্ত বাচাতে পেরেছিলেন এবং কিয়েটোর পরিবর্তে হিরোশিমায় বোমা ফেলা হয়। অর্থাৎ একটা সামান্য মধুচন্দ্রিমা একটা শহরকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
  2. আর্চ ডিউক ফার্ডিন্যান্ড এর হত্যাঃ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হওয়ার পেছনের অন্যতম বড় প্রভাবক ছিলো আর্চ ডিউক ফার্ডিন্যান্ড এর হত্যা। ১৯১৪ সালের ২৮ জুন দুইজন বসনিয়ান-সার্ব হামলাকারী রাজধানী সারাজেভোতে আসে আর্চ ডিউককে হত্যা করার উদ্দেশ্যে। তাদের প্রথম আক্রমণ ব্যর্থ হয়, বোমাটি আর্চ ডিউকের গাড়ির বদলে অন্য গাড়িকে উড়িয়ে দেয়। এই হামলার খবর আর্চ ডিউকের ড্রাইভার জানতেন না, তিনি আবার সেই রুট দিয়েই গাড়ি চালিয়ে যান এবং আগে থেক ওত পেতে রাখা হামলাকারীরা এবার গুলি করে আর্চ ডিউক ফার্ডিন্যান্ড এবং তার স্ত্রীকে হত্যা করে। পরবর্তীতে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সূচনা করে।
  3. কিউবা মিসাইল সংকটঃ স্নায়ু যুদ্ধের সময় কিউবার উপকূলে রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সাবমেরিন মোতায়েন করে। আমেরিকার নাকের ডগায় পারমাণবিক সাবমেরিন থাকায় তারা বেশ অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে যায়, এরপর আমেরিকার বিমান বাহিনী এবং নৌবাহিনী ডেপথ চার্জ নিক্ষেপ করা শুরু করে যাতে সাবমেরিন টা সমুদ্র পৃষ্ঠে ভেসে ওঠে। পানির নিচে থাকে সাবমেরিন এর কর্মীরা এই ডেপথ চার্জের সিগন্যালকে মনে করে যে যুদ্ধের সংকেত বেজে গেছে। সেই অনুযায়ী তাদের উপর নির্দেশ ছিলো পারমাণবিক টর্পেডো নিক্ষেপ করা। নিক্ষেপের দায়িত্বে থাকা ভ্যাসিলি আরকিপভ সেটার বিরোধীতা করেন। এবং তার দৃঢ়তায় স যাত্রায় আর টর্পেডো নিক্ষেপ হয় নি। সেই টর্পেডো নিক্ষেপ হলে, ইউরোপের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বিলীন হয়ে যেত। এজন্য ভ্যাসিলি আরকিপভ কে “দ্যা ম্যান হু সেভস দ্যা ওয়ার্ল্ড” বলে ডাকা হয়।  
এছাড়াও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাটারফাই ইফেক্টের প্রভাব [রায়ই দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সামান্য একটা পোস্ট এর কারণে হামলা মামলা পর্যন্ত চলে যায়। সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছোট একটা ভুল বোঝাবুঝির কারণে সেটা ভেঙে যাওয়ার নজির ও দেখা যায়। আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একদম ভেস্তে দিতে পারে বর্তমান সময়ের একটি ভুল। পরিশেষে বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন এর চমৎকার একটি কবিতা দিয়ে শেষ করছি। যেখানে দেখা যায় যে একটা ঘোড়ার নালের জন্য একটা যুদ্ধ হেরে যাওয়া সম্ভব।
For want of a nail the shoe was lost,
For want of a shoe the horse was lost,
For want of a horse the rider was lost,
For want of a rider the battle was lost,
For want of a battle the kingdom was lost,
And all for the want of a horseshoe nail.  
  • তথ্যসূত্র
  • https://www.forbes.com/sites/startswithabang/2018/02/13/chaos-theory-the-butterfly-effect-and-the-computer-glitch-that-started-it-all/?sh=29ee299269f6
  • https://fs.blog/2017/08/the-butterfly-effect/#:~:text=The%20butterfly%20effect%20is%20the,wings%20and%20causing%20a%20typhoon.&text=He%20created%20a%20small%20system,a%20cubic%20millimeter%20of%20helium.
  • http://www.scholarpedia.org/article/Butterfly_effect
প্রযুক্তি
আরো পড়ুন