নালন্দা: পতন থেকে যেভাবে পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর্নজন্ম
আন্তর্জাতিক
নালন্দা: পতন থেকে যেভাবে পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর্নজন্ম
যারা মনে করেন, বাঙালি তথা ভারতীয়রা চিরকাল অশিক্ষিতই ছিলো, আর ইংরেজরা এসে আমদের শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়ে গেছে তাদের এই ভুল ধারণা ভাঙ্গার জন্য নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় একটি বড় উদাহরণ।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
পৃথিবীর প্রথম আবাসিক ও দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের উপমহাদেশের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। এর প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক থাকলেও অনেক ইতিহাসবিদ বলছেন ৪২৭ খ্রিস্টাব্দে নালন্দা বিহার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক উত্থানপতন, ধর্ম নিয়ে যুদ্ধবিগ্রহের মাঝেও প্রায় ৭০০ বছর টিকে ছিল এটি। গুপ্ত রাজবংশ কর্তৃক নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। তবে প্রথম চন্দ্রগুপ্ত অথবা সমুদ্রগুপ্ত এর প্রতিষ্ঠাতার কৃতিত্ব পেয়ে থাকেন। গত দুই শতাব্দী ধরে ইয়েল, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ডসহ অনেক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কৃতিত্বের জন্য সারাবিশ্বে সুখ্যাতি অর্জন করেছে। কিন্তু ইউরোপিয়ানদের উপনিবেশেরও এক হাজার বছর আগে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতো। তবে এর নির্মাণশৈলী বৌদ্ধদের স্থাপত্যের সঙ্গে একেবারে মিলে যায় বলে প্রাথমিকভাবে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে শ্রেফ একটি বৌদ্ধ বিহার হিসেবেই চিনতো সবাই।
ইউরোপিয়ানদের উপনিবেশেরও এক হাজার বছর আগে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতো।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান বর্তমান ভারতের বিহার প্রদেশের রাজগিরে। নালন্দা ছিল মূলত একটি গ্রামের নাম এবং নামকরণের অনেকগুলো প্রচলিত ধারণার মধ্যে একটি ধারণা হলো, নালন্দা গ্রামের নাম অনুসারেই এর নামকরণ করা হয় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা শব্দের অর্থ 'দানে অকৃপণ'। বিদ্যাদান ও বিস্তরণে নালন্দা সত্যিই অকৃপণ ছিল। প্রতিষ্ঠার পর নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বৌদ্ধ সম্রাটদের অধীনে এবং শেষে পাল রাজাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। জানা যায়, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো কমপ্লেক্সটি লাল ইটের চওড়া এবং উঁচু দেয়াল দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসটি ছিলো ১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং এর মধ্যে কেবল ১০ শতাংশ খনন করা হয়েছে আর বাকি ধ্বংসাবশেষ এখনও মাটির নিচে রয়েছে। তাহলে কল্পনা করা যায় তর্কাতীতভাবে পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়টি ঠিক কতোটা বড় ছিল!
নালন্দা গ্রামের নাম অনুসারেই এর নামকরণ করা হয় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা শব্দের অর্থ ‘দানে অকৃপণ’।
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন
১৯১৭ সালে রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি ফর গ্রেট ব্রিটেনের এক বিবরণে বিহারের বালাদিত্য মন্দিরের চারপাশে ঐতিহাসিক স্থাপনা ও কিছু দ্রব্যসামগ্রী আবিষ্কারের বিষয়টি উঠে আসে। সংস্থাটির প্রত্নতাত্ত্বিক ডেভিড স্পুনারের দেয়া তথ্যানুযায়ী ওই মন্দিরের পাশে ২৪ ফুট উঁচু প্রাচীর, ৬০০টি মাটির টেবিল এবং খোদাই করা ২১১টি পাথরের প্যানেল উদঘাটন করা হয়। সেখানকার মাত্র এক বর্গকিলোমিটার খননের পরেই এমন বিস্ময়কর জিনিসপত্র আবিষ্কার করে সংস্থাটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের খনন সাইটে পাওয়া প্রাচীন নিদর্শনগুলোকে দুইভাগে ভাগ করেন গবেষকরা। 
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
মাটির সিল, পোড়ামাটির অলঙ্কার এবং হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধ দেবদেবীদের অনেকগুলো ধাতব মূর্তি পাওয়া যায়।
১৯২০ এর দশকে নালন্দার আশেপাশে আরও কয়েক’শো জায়গায় খনন করেছিল দলটি। সেখান থেকে মাটির সিল, পোড়ামাটির অলঙ্কার এবং হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধ দেবদেবীদের অনেকগুলো ধাতব মূর্তি পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক ডেভিড স্পুনারের আবিষ্কৃত অধিকাংশ নিদর্শন নালন্দা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। খননকালে কয়েকটি পাণ্ডুলিপি ছাড়াও বেশ কয়েকটি শিলালিপি পাওয়া গেছে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইটে। সন্ন্যাসীরা নিজেদের সঙ্গে বিভিন্ন রকম পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করতেন।
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎপত্তি
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
পাঁচশত জন বণিক ১০ কোটি স্বর্ণমুদ্রা পরিশোধ করে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি ক্রয় করেন।
কথিত আছে যে সর্বমোট ৫০০ জন বণিক ১০ কোটি স্বর্ণমুদ্রা পরিশোধ করে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি ক্রয় করেন। মূলত তারা তাদের ভগবানকে জমিটি উপহার দিয়ে খুঁশি করতে চেয়েছিলেন। আবার কোনো কোনো পণ্ডিত লিখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি ৪১৫ থেকে ৪৫৫ খ্রিস্টাব্দের মাঝে প্রথম চন্দ্রগুপ্ত দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় বা প্রতিষ্ঠা কাজ শুরু হয়। তার হাত ধরে শুরু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ধাপে ধাপে বড় ও সমৃদ্ধ করেছেন তার উত্তরসূরি অন্য গুপ্ত রাজারা। শুধু গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে নালন্দায় ৮টি মঠ, ১১,০০০ কক্ষ, ৩টি বিশাল গ্রন্থাগার এবং প্রায় ২০০০ ছাত্রের উপস্থিতি ছিলো সেখানে। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ন্যাসী ও ছাত্ররা তাদের সমসাময়িক শাসকদের অনুগ্রহে বিদ্যার্জন করতেন। তবে ৬০৬ থেকে ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বিহারের ২০০টি গ্রামের মালিকানা ছিল পাল রাজাদের।
শিক্ষা ও শিক্ষণের পবিত্রতা
গুপ্ত রাজাদের হাতে গড়া নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ব এশিয়ার দেশ কোরিয়া, জাপান, চীন, ইন্দোনেশিয়া থেকে এসে ছাত্ররা অধ্যয়ন করতেন। শুধু তাই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান, গ্রিস ও মঙ্গোলিয়ার মতো দেশ থেকেও ছাত্ররা আসতেন। এখানে চিকিৎসা, কলা, দর্শন ও ধর্মীয় বিষয়ে অধ্যায়নের সুযোগ ছিল। তবে কয়েকশো বছর পর জ্যোতিষশাস্ত্র, মনোবিজ্ঞান, আইন, জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাস, গণিত ও অর্থনীতি বিভাগ চালু করা হয় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে। গবেষকরা মনে করেন বর্তমান সময়ের আমেরিকান আইভি লিগ কলেজের তুলনায় ওই যুগে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান ভালো ছিল। সেখানে জ্ঞানের পবিত্রতার সঙ্গে কোনো বাণিজ্যিক লেনদেন জড়িত ছিল না।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
কয়েকশো বছর পর জ্যোতিষশাস্ত্র, মনোবিজ্ঞান, আইন, জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাস, গণিত ও অর্থনীতি বিভাগ চালু করা হয় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বৌদ্ধ শিক্ষার্থীরা নালন্দায় শিক্ষাগ্রহণ করে নির্বাণ বা পরিত্রাণ অর্জন করতেন, অন্যদিকে অন্য ধর্মের অনুসারি ছাত্ররা যেতেন অজানাকে জানার জন্য। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক নিয়ম ছিল, প্রতিটি শিক্ষার্থী অবশ্যই তার গুরুদেব বা শিক্ষকের কাছ থেকে ৮ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। সেখানে ছাত্রশিক্ষকের মধ্যে বন্ধন ছিল বেশ পবিত্র। মহৎ সাধনা অনুসরণকারী ছাত্ররা সেখানে সেবকের ভূমিকায় ছিলেন। আর শিক্ষকরা ছিলেন সেখানে পিতৃতুল্য!
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং ছিল। বিশেষভাবে গঠিত শিক্ষকদের ভিন্ন ভিন্ন কমিটির মাধ্যমে ছাত্ররা ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতেন। চীনা দার্শনিক জুয়ানজাং বলেছেন, ভর্তির পূর্বে একজন শিক্ষার্থীর জন্য কয়েক দাপে কাজ নির্ধারণ করা হতো। ধর্মীয়, দর্শন ও বৌদ্ধ গ্রন্থে ভালোভাবে পারদর্শী হলেই সেখানে ভর্তির আবেদন করা যেতো। পরীক্ষায় বিতর্ক, কথোপকথনসহ বেশকিছু কার্যক্রম যুক্ত করা হয়। চূড়ান্ত পরীক্ষাগুলোও ছিল বেশ সৃজনশীল। শিক্ষার্থীদেরকে দ্বাররক্ষীদের সঙ্গেও বিতর্কে অংশগ্রহণ করতে হতো। সবশেষে শিক্ষকরা যাদের যোগ্য মনে করে অনুমোদন দিতেন তারাই ভর্তি হতে পারতেন নালন্দায়।
ধর্মীয়, দর্শন ও বৌদ্ধ গ্রন্থে ভালোভাবে পারদর্শী হলেই সেখানে ভর্তির আবেদন করা যেতো।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
মূলত সবার জন্য শিক্ষা এমন কোনো লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হতো না। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য ছিল ওই সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেতাব অর্জন করার। আর এই লক্ষ্য পূরণের জন্য তারা ছাত্রদের আধ্যাত্মিক পাঠদান ও নৈতিক কোডের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতেন। সেখানে পিতৃতান্ত্রিক ও ধর্মভিত্তিক পাঠদান করা হতো যাতে করে সবসময় গুরুজনে শ্রদ্ধা নিশ্চিত করা যায়। 
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য
পশ্চিমা বিশ্বের অনেক বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নালন্দার কয়েকশত বছর পরে। মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ৯৭২ খ্রিস্টাব্দে, অক্সফোর্ড ১০৯৬ খ্রিস্টাব্দে এবং কেমব্রিজ জন্ম নেয় ১২৩১ সালে। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর বিবরণে জানা যায়, নালন্দায় শিক্ষাগ্রহণ, থাকা-খাওয়া এবং চিকিৎসা সবকিছুই ছিল বিনামূল্যে। ওই অঞ্চলের জনসাধারণ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ছাত্রদের জন্য খাদ্যদ্রব্য ও বস্ত্র সরবরাহ করতেন। ইতিহাসবিদ নিহার রঞ্জন রায় তার গ্রন্থের লিখেছেন, 'নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের বাংলার জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষাদীক্ষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাচার্য বিশ্রুতকীর্তি শীলভদ্র ছিলেন সমতটের ব্রাহ্মণ্য রাজবংশের অন্যতম সন্তান এবং তিনিই ছিলেন হিউয়েন সাং-এর গুরু।'
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের বাংলার জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষাদীক্ষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাচার্য বিশ্রুতকীর্তি শীলভদ্র ছিলেন সমতটের ব্রাহ্মণ্য রাজবংশের অন্যতম সন্তান এবং তিনিই ছিলেন হিউয়েন সাং-এর গুরু।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান কেমন তা বোঝা যায় সেখান থেকে কী মানের ছাত্র বের হন এবং পরবর্তী জীবনে তারা দেশ ও জাতির জীবনে কতোটা ছাপ রাখতে পারেন তা দিয়ে। মহাচার্য শীলভদ্র ছাড়াও রাজা ধর্মপাল, হিউয়েন সাং, আর্যভট্ট, অতীশ দীপঙ্করের মতো অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তি হাজার বছর আগেই নালন্দা থেকে পাশ করে সমাজে আলো ছড়ান। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বহির্বিশ্বে ঠিক কতোটা বিখ্যাত ছিল তার প্রমাণ মেলে ইতিহাসবিদ রাধা কুমুদ মুখোপাধ্যায়ের প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষা গ্রন্থে। সেখানে তিনি লিখেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নালন্দার সাফল্য এককভাবে ভারতীয় পণ্ডিতদের বিদেশে খ্যাতনামা করে তোলে। বিদেশের অনেক আগ্রহী ব্যক্তিরা সন্তানদের এখানে পাঠানোর আগ্রহ দেখাতো।'
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যকলা
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি মঠ এবং মন্দিরকে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতারা। সেখানে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত মিশ্র ধর্মীয় অনুষঙ্গ বজায় রাখে। নির্মাতারা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে টাওয়ার, প্যানেল দ্বারা স্থাপন করেন। বুরুজগুলোতে থাকা আলংকারিক শিল্প মূলত বৌদ্ধধর্ম এবং জাতক কাহিনীর চরিত্রগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। আবার কিছু কিছু মন্দিরের প্যানেলে হিন্দু দেবদেবীর নিদর্শন দেখা যায়।
বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত মিশ্র ধর্মীয় অনুষঙ্গ বজায় রাখে।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক খ্যাত অশোক নালন্দার সারিপুত্তকে সম্মান জানাতে একটি স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন ওই এলাকায়। এছাড়াও গুপ্ত রাজবংশের একজন সম্রাট একটি ছয় স্তরের স্থাপন নির্মাণ করেন যাতে ছিল ২৪ মিটার উঁচু বুদ্ধের মূর্তি। গুপ্তদের দ্বাদশ বংশধর নরসিংহ গুপ্ত বালাদিত্য ওই মূর্তির চারপাশে একটি বিহার নির্মাণ করেন। সপ্তম শতকে কনৌজের সম্রাট হর্ষবর্ধন এই স্থাপনার ভেতর একটি পিতলের মঠ তৈরি করেন। 
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পতন
উপনিবেশিক শাসনামলের ভারতীয় ইতিহাসবিদদের দেয়া তথ্যানুযায়ী, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পতন ঘটে ভয়াবহ যুদ্ধের মাধ্যমে। মূলত মুসলিম শাসকদের এই অঞ্চলে অভিযানের কারণেই নালন্দা এই অঞ্চলে নিজের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। কথিত আছে যে, বখতিয়ার খলজি একাধিকবার নালন্দায় হামলা চালান। সেখানকার গ্রাম থেকে সোনা, খাদ্যদ্রব্য ও ঘোড়া লুট করতেন তিনি। এমন লুটপাটে তার লক্ষ্যবস্তু ছিল বৌদ্ধ বিহারগুলো। তার বাহিনী কর্তৃক দফায় দফায় হামলার ফলে সন্ন্যাসীরা সেখান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। শুধু তাই নয়, সেখানে চালানো বর্বর হামলার বর্ণনা রয়েছে তবাকাত-ই-নাসিরি গ্রন্থে।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
তার সমর্থকরা প্রায় পোনে এক কোটি পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলে। এসব পাণ্ডুলিপি পুড়তে সর্বসাকুল্যে ৩ মাস সময় লেগেছিল।
কথিত আছে, বখতিয়ার খলজি বাহিনী নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে পুরোপুরি জনশূন্য করে দেন। তার ধ্বংসযজ্ঞে শুধু সীমানা প্রাচীরগুলো অক্ষত ছিল। এছাড়াও তার সমর্থকরা প্রায় পৌনে এক কোটি পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলে। এসব পাণ্ডুলিপি পুড়তে সর্বসাকুল্যে ৩ মাস সময় লেগেছিল। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে হাজার হাজার বৌদ্ধভিক্ষুকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার অভিযোগ রয়েছে। যাইহোক, এসব শুধু উপনিবেশিক ভারতীয় উপমহাদেশের কতিপয় লেখকদের বর্ণনা। বাস্তব এর থেকেও ভিন্ন ছিল। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মনে করেন, শুধু ভারতে মুসলিম শাসকদের সময়কে কলুষিত করার জন্য নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পতনের কারণ হিসেবে বখতিয়ার খলজিকে দায়ী করা হয়। তিনি যদি হামলা করেও থাকেন তবে সেটাকে খুব বড় করে দেখানো হচ্ছে। উপমহাদেশ ভাগ হওয়ার পর ইতিহাস বিভিন্ন সময় পাল্টেছে। বর্তমান সময়ে ভারতের ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই ওই অঞ্চলে বৌদ্ধ, হিন্দুদের পতনের জন্য মুসলিমদের দায়ী করেন। মুসলিমরা জয় করেছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ভারতীয়রা যেভাবে ইতিহাস বিকৃত করে তা অযৌক্তিক। নালন্দায় লুটপাটে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করার অভিযোগ রয়েছে পাল রাজা মহীপালের বিরুদ্ধে। এরপর অনেক হিন্দু রাজা নালন্দার হারানো জৌলুস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
বর্তমান সময়ের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়
২০১০ সালে ভারতের সংসদে একটি বিল পাসের মধ্য দিয়ে দেড় হাজার বছরের পুরনো নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব দেয়। ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তারিখে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠদান শুরু হয়। তখন প্রাচীন ভর্তি প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান জানাতে বিশ্বের প্রায় ১ হাজার আবেদনকারীর মধ্য থেকে মাত্র ১৫ জনকে ভর্তি করানো হয়। নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সমন্বয়কারী হিসেবে যুক্ত রয়েছে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, চাইনিজ পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়ান ফিল্ড স্টাডির ইউরোপিয়ান কনসোর্টিয়াম এবং ভারতের প্রত্নতত্ত্ব জরিপ বিভাগ।
উপমহাদেশ ভাগ হওয়ার পর ইতিহাস বিভিন্ন সময় পাল্টেছে। বর্তমান সময়ে ভারতের ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই ওই অঞ্চলে বৌদ্ধ, হিন্দুদের পতনের জন্য মুসলিমদের দায়ী করেন। মুসলিমরা জয় করেছিল ঠিকি, কিন্তু তাদের অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ভারতীয়রা যেভাবে ইতিহাস বিকৃত করে তা অযৌক্তিক।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
নালন্দার পুনরুজ্জীবন এখন পর্যন্ত ব্যর্থ বলা যায়। ২০২০ সাল অবধি সেখানে ৭টি স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ও বিশ্বমানের গবেষণার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পাটনা থেকে দুই ঘণ্টা দূরত্বে এর অবস্থান হওয়ায় অনেক শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কয়েক বছর আগে ভারতের স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ এবং নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব আমর্ত্য সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তখন প্রশ্ন উঠে, যদি এমন একজন ব্যক্তির নেতৃত্বই মেনে নিতে না পারে তাহলে নালন্দা কি নিজের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে?
তথ্যসূত্র: দ্য কলেক্টর, সিমরান সুদ, সুদেব কুমার
আন্তর্জাতিকভারতইতিহাস
আরো পড়ুন