মিশরীয় সভ্যতা: পৃথিবীর প্রাচীন শাসনব্যবস্থা ও ধর্মীয় বিশ্বাস ।। পর্ব-১
আন্তর্জাতিক
মিশরীয় সভ্যতা: পৃথিবীর প্রাচীন শাসনব্যবস্থা ও ধর্মীয় বিশ্বাস ।। পর্ব-১
Fearure Image; Shop LC
Fearure Image; Shop LC
মিশরীয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলোর একটি। অর্থবিত্ত, জাকজমক, সম্পদ, শিল্প উৎপাদন, সেনাবাহিনী, প্রযুক্তি সব দিক থেকেই প্রাচীন মিশর ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রগামী সভ্যতা। পিরামিড আর মমি'র মত বিজ্ঞান তারা জেনেছিল খ্রিস্টের জন্মেরও কয়েক হাজার বছর পূর্বে। সেইসাথে নীল নদের উর্বর পলিমাটি তাদের বাসভূমিকে করে তুলেছিল কৃষিকাজের উপযুক্ত। ফলে, সভ্যতা হিসেবে তারা একদিকে যেমন ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ অন্যদিকে তেমনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।প্রাচীন মিশরীয়রা তাদের দেশের নামকরণ করে 'কেমেট' যার অর্থ কালোমাটি। মূলত, নীলনদের আশপাশের এলাকায় কালো পলিমাটির উপস্থিতির জন্যই এরূপ নামকরণ করা হয়। কালের বিবর্তনে কেমেট মিশর নাম ধারণ করে। মজার ব্যাপার, মিশরের আরবী অর্থ হলো দেশ। অর্থাৎ, মিশর মানেই হলো দেশ! পরবর্তীতে, গ্রিকদের মাধ্যমে মিশর বৈশ্বিকভাবে ইজিপ্ট নামে পরিচিত হয়। এমনকি এখনও তাদের রাষ্ট্রীয় নামে ইজিপ্ট শব্দই ব্যবহার করা হয়।
মিশরের রাষ্ট্রীয় নামে এখনও ব্যবহৃত হয় ইজিপ্ট শব্দটি ; Alamy
মিশরের রাষ্ট্রীয় নামে এখনও ব্যবহৃত হয় ইজিপ্ট শব্দটি ; Alamy
নীল নদের জলরাশিকে কেন্দ্র করেই মিশরীয় সভ্যতা গড়ে ওঠে। নীলের বয়ে আনা পলি মাটিই মূলত এখানকার কৃষি সম্প্রসারণ করতে মূল ভূমিকা পালন করেছে। সেজন্যই হয়তো গ্ৰিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস (যিনি ইতিহাসের জনক নামেও খ্যাত) বলেছেন,"মিশর নীলনদের দান"। মিশরের নীল নদের উৎপত্তি আফ্রিকার লেক ভিক্টোরিয়া থেকে। সেখান থেকে বিভিন্ন অঞ্চল পাড়ি দিয়ে মিশরের মধ্যে দিয়ে ভূমধ্যসাগরে পতিত হয়েছে। মিশর এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ মহাদেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অবস্থিত। এর উত্তরে ভূমধ্যসাগর, পূর্বে লোহিত সাগর, পশ্চিমে সাহারা মরুভূমি, দক্ষিণে সুদান ও অন্যান্য আফ্রিকার দেশ। 

প্রাচীন মিশরীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাস
প্রাচীন মিশরীয়রা দেব-দেবীতে বিশ্বাসী ছিল। তারা বিশ্বাস করতো দুনিয়াবি জীবন অনন্ত জীবনেরই অংশ। বেচেঁ থাকা জীবনে তাই তারা সৃষ্টিজগতের ভারসাম্য বুঝে জীবন অতিবাহিত করার চেষ্টা করতো। শৃঙ্খলাপূর্ণ ধর্মীয় বিশ্বাসের এই জীবনব্যবস্থাকে মিশরীয়দের ভাষায় বলে- মাত। মাত হলো সত্য, সুন্দর ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন। প্রাচীন মিশরীয় পুরাণ মতে, একসময় অনন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন পানি (নু) ছাড়া কিছুই ছিল না। সেই পানি থেকে জন্মলাভ করে মাটি যার নাম বেনবেন। সেই মাটির উপর ছিলেন পরম দেবতা আমুন-রা। দেবতা এই সীমাহীন শূন্যতার মাঝে একাকী অনুভব করতে শুরু করলেন। এরপরই পরম দেবতার থুথু থেকে জন্ম নেয় বাতাসের দেবতা শু, আর বমি থেকে জন্ম নেয় আর্দ্রতার দেবী তেফনুত। একবার শু এবং তেফনুত হারিয়ে যায়। তাদের খুঁজে আনার জন্য দেবতা নিজের একটি চোখ খুলে পাঠালেন। কিছুকাল পরেই তাদের খুঁজে পাওয়া গেলো। নিজের সন্তান খুঁজে পেয়ে দেবতা এতই আনন্দিত হলেন যে তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। দেবতার গড়িয়ে পড়া এই অশ্রু থেকেই জন্ম নিল মানুষ- অর্থাৎ নারী পুরুষ! মানুষ তো এলো কিন্তু তারা এখন থাকবে কোথায়? শু আর তেফনুত মিলিত হয়ে দুই সন্তানের জন্ম দিল। একজন পৃথিবীর দেবতা গেব এবং অন্যজন আকাশের দেবী নুত। এভাবেই, মিশরীয় পুরাণে অন্ধকারাচ্ছন্ন, বিশৃঙ্খল পানি থেকে পৃথিবী ও মানুবজাতির উদ্ভব ঘটে। 
মিশরীয় দেব- দেবী; wikimedia comonns
মিশরীয় দেব- দেবী; wikimedia comonns
প্রাচীন মিশর অনেকগুলো ছোট ছোট নগরে বিভক্ত ছিল, এদের "নোম" বলা হতো। আবার উত্তর মিশরকে নিম্ন মিশর এবং দক্ষিণকে উচ্চ মিশরও বলা হতো। ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ৩১৫০ অব্দ নাগাদ প্রথম ফারাও মেনেসের অধীনে উচ্চ মিশর ও নিম্ন মিশরের প্রায় ৪০ টি নগরকে রাজনৈতিক একীভূতকরণের মধ্য দিয়ে এই সভ্যতা আক্ষরিক রুপ লাভ করে। এর রাজধানীর নাম ছিল মেম্ফিস। মিশরে ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র ও রাজবংশের সূচনা মূলত এখান থেকেই। এরপর ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রাজবংশ নীলনদের দেশটিতে নিজের শাসন কায়েম করেছে। প্রাচীন মিশরের রাজাদের ফারাও বলা হতো। ফারাও শব্দটি "পার-ও" শব্দ থেকে আগত। এর অর্থ বাড়ি বা দালান। ধারণা করা হয়, ফারাওরা বিশাল প্রাসাদে বসবাস করতেন তাই তাদের এমন নামকরণ করা হয়েছে। মিশরীয়দের রাজবংশের তালিকা বেশ দীর্ঘই বলতে হয়। ৩১ টি রাজবংশ, ৩০০ এর বেশি ফারাও মিলে প্রায় ৩০০০ বছর এই সভ্যতা সমহিমায় উজ্জ্বল ছিল। 
প্রাচীন মিশরের রাজাদের ফারাও বলা হতো। ফারাও শব্দটি "পার-ও" শব্দ থেকে আগত। এর অর্থ বাড়ি বা দালান। ধারণা করা হয়, ফারাওরা বিশাল প্রাসাদে বসবাস করতেন তাই তাদের এমন নামকরণ করা হয়েছে। মিশরীয়দের রাজবংশের তালিকা বেশ দীর্ঘই বলতে হয়। ৩১ টি রাজবংশ, ৩০০ এর বেশি ফারাও মিলে প্রায় ৩০০০ বছর এই সভ্যতা সমহিমায় উজ্জ্বল ছিল।
ফারাওরা একাধারে রাজা, দেবতা, বিচারক, প্রধান পুরোহিত এবং সৈন্যবাহিনীর প্রধান হিসেবে গুরুদায়িত্ব পালন করতেন। সাধারণত বংশ পরম্পরায় ফারাওরা সিংহাসন হাতবদল করলেও কিছু বিদেশি এবং মহিলাদেরও ফারাও হওয়ার প্রমাণ বিভিন্ন সময়ে পাওয়া যায়। "তাহারকা" বিদেশি নিগ্ৰো ফারাওদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এবং মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি সিংহাসনে বসেন। মহিলা ফারাওদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন "নেফারতিতি", ধারণা করা হয় তার স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি ফারাও পদে অভিষিক্ত হন। এছাড়াও, রানী ক্লিওপেট্রার (vi)i খ্যাতি ছিল জগৎজোড়া। রাজা টলেমি সিংহাসনে থাকলেও রাজকার্য তখন পরিচালিত হতো অন্দরমহল থেকেই। রাজবংশের তালিকা দীর্ঘ হওয়ায় মিশরের শাসনামলকে কয়েকভাগে ভাগ করা যায়।
মিশরীয় ফারাও; Wikipedia
মিশরীয় ফারাও; Wikipedia
প্রাগৈতিহাসিক মিশর (খ্রিস্টপূর্ব ৩১০০ অব্দ)
নীলনদের তীরে প্রায় দশ হাজার বছরের পুরোনো কিছু খোদাইচিত্র পাওয়া যায়। যেসব খোদাই চিত্রে কৃষিনির্ভর মিশরীয় সমাজের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। এসময় থেকেই মিশরীয় গুচ্ছ সমাজব্যবস্থার ইঙ্গিত পাওয়া যায় যা ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। অতিরিক্ত গ্রেজিংয়ের কারণে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ অব্দের দিকে নীলনদের তীরবর্তী কিছু অঞ্চল বিরানভূমিতে পরিণত হয় যা আজকের সাহারা মরুভূমি নামে পরিচিত। তবে, তার পূর্বেই মিশরের কৃষিজীবী উপজাতি সমাজ কৃষিভিত্তিক মিশর প্রতিষ্ঠা করে ফেলছিল। এসময়ই নীলের উপত্যকায় নব্যপ্রস্তর যুগের উত্থান ঘটে। সমসাময়িক সময়েই মিশরে প্রাক- রাজবংশীয় প্রথা গড়ে ওঠে।
প্রাচীন যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ৩১০০ থেকে ৩৩২ অব্দ)
প্রাচীন যুগের শাসকগণ ছিলেন মূলত মিশরীয় রক্ত। আর এই যুগ-ই মূলত মিশরের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ। এসময়ের মধ্যে তারা আন্তর্জাতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। প্রাচীন যুগের শুরুর দিকে উচ্চ ও নিম্ন মিশর একীভূতকরণের মধ্যে দিয়ে যে যাত্রার শুরু হয়। এইসময়ের মধ্যে মিশরের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ব্যাপক উন্নয়ন, পরিবর্ধন, পরিবর্তন এবং সংস্কার সাধিত হয়। মিশরের ধর্মীয় বিশ্বাসও এড়াতে পারেনি সে বদলের হাওয়া। কারণ, প্রাচীন যুগের শেষ ধাপে এসে বাইরের সংস্কৃতির আবহ ধীরে ধীরে মিশরের সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। বিশেষ করে গ্রীক ও রোমান সংস্কৃতির প্রভাব মিশরের জীবনে লক্ষণীয় হতে শুরু করে। এরপর আরবদের হাতে মিশরের শাসনভার চলে গেলে বহুঈশ্বরবাদী মিশরীয় ধর্ম বিশ্বাস পুরোপুরি বিলুপ্তির পথে হাঁটে।
নীলের বুকে মরুর দেশ; Journey to Egypt
নীলের বুকে মরুর দেশ; Journey to Egypt
বহিরাগতদের শাসন
তৃতীয় রামসিসের পরে ফারাওদের সিংহাসন দুর্বল হতে শুরু করে। বারবার বিদেশি শক্তি আক্রমণ করতে থাকে মিশরে। ১০০০–৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘকাল ধরে লিবিয়া বারবার আক্রমণ করে। দীর্ঘকাল ধরে চলা এসব আক্রমণের একপর্যায়ে তাদের সামনে নতি শিকার করে মিশরীয়রা। লিবিয়রা দখল করে নেয় ফারাওদের সিংহাসন। ৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে মিশরীয়রা আবার স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করে, তবে সে সূর্য দ্রুতই অস্ত যায়। কার্যত পারসিকদের হাত ধরে মিশরীয় সভ্যতার পতন ঘটে। নীলনদের উর্বর মাটির কারণে মূলত মিশর অর্থনৈতিকভাবে ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। এই বিষয়টি একদিকে যেমন মিশরীয়দের জন্য ছিল আশীর্বাদ অন্যদিকে তেমনি ছিল আতঙ্কের কারণ। কেননা সম্পদে পরিপূর্ণ মিশরের উপর চোখ ছিল বেশকিছু বহির্শত্রুর। একেরপর এক আক্রমণ সামলে চলা মিশরে একসময় শাসকদের মধ্যে অবক্ষয় দেখা দেয়।

১০০০–৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘকাল ধরে লিবিয়া বারবার আক্রমণ করে। দীর্ঘকাল ধরে চলা এসব আক্রমণের একপর্যায়ে তাদের সামনে নতি শিকার করে মিশরীয়রা। লিবিয়রা দখল করে নেয় ফারাওদের সিংহাসন। ৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে মিশরীয়রা আবার স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করে, তবে সে সূর্য দ্রুতই অস্ত যায়।
ভোগবিলাস ও সম্পর্কের অন্তকোন্দলে মিশরীয় সিংহাসনের লড়াই বহির্শত্রুদের উস্কে দেয়। ফলস্বরূপ, মিশরের ইতিহাসে বারবার ঘটেছে ক্ষমতার হাতবদল। কখনো লিবীয়, কখনো এসিরীয়, আবার কখনো মেসিডোনিয় শাসকরা বসেছেন মিশরের মসনদে। এরপর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে রোমানদের আধিপত্যের কাছে অনেকদিন জিম্মি ছিলেন মিশরের ফারাওরা। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ৩১ অব্দে রোমানরা মিশরকে প্রদেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করলে কার্যত ইতি ঘটে ফারাও শাসনের। এরপর রোমান ও পারসিকদের হাত ঘুরে মিশরের ক্ষমতা সর্বশেষ থিতু হয় আরবদের হাতে। প্রায় ৯০০ বছরের শাসন শেষে মিশরের কর্তৃত্ব চলে যায় তুর্কির অটোম্যানদের হাতে। এরপর অটোম্যানদের শাসন হটিয়ে মিশরের ক্ষমতা দখল করে নেন নেপোলিয়ন। অল্প কিছুকাল পরেই তাদের পাট চুকিয়ে চলে যেতে হয় নীলনদের দেশ থেকে। এরপর, ব্রিটিশদের হাত ঘুরে ১৯৫৩ সালের ১৮ ই জুন গণপ্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে মিশর। পরিণত হয় আজকের মিশর বা Arab Republic of Egypt -এ। 
আন্তর্জাতিকমিশরইতিহাস
আরো পড়ুন