খেলাধুলা
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের সক্ষমতা পর্যালোচনা
চলতি মাসে শুরু হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সপ্তম আসর। ২০২০ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল টুর্নামেন্টটি। কোভিড-১৯ এর ধাক্কায় টালমাটাল অর্থনৈতিক অবস্থা সামাল দিতে ব্যস্ত থাকা অস্ট্রেলীয় সরকার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে অনীহা প্রকাশ করলে আইসিসি কর্তারা পরিপূরক আয়োজক খুঁজতে নেমে পড়েন। অতঃপর বিসিসিআই আয়োজন করার ঘোষনা দিলে তাতে সায় দেয় আইসিসি। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি শুরু হয়। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রভাবে ভারত তথা উপমহাদেশের অবস্থা খুব শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। মাঝপথে থেমে যায় ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ টুর্নামেন্ট। অতঃপর ভারতও সরে দাঁড়ায় আয়োজকের ভূমিকা থেকে। 
আইসিসি ঠিকি নতুন আয়োজক দেশ খুঁজে পেয়েছে। তবে একটি নয়, বরঞ্চ দুটি দেশ মিলিয়ে হতে যাচ্ছে এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমান এবং আরব আমিরাত যৌথভাবে আয়োজকের ভূমিকায় থাকছে। বাংলাদেশ দল ইতোমধ্যেই পৌঁছে গেছে ওমানে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নিয়মানুযায়ী ইতোমধ্যেই ৮টি দল চলে গেছে মূল পর্বে। বাংলাদেশ বাছাই পর্বের বাধা পেরুতে পারলেই খেলবে মূল পর্বে। আর সেখানে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ স্বাগতিক ওমান, পাপুয়ানিউগিনি এবং স্কটল্যান্ড। 
ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ দল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ঘোষনা করেছে। ১৬ সদস্যের দলকে নেতৃত্ব দিবেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। যদিও নিউজিল্যান্ডের সাথে সিরিজ জয়ের পর নেতৃত্ব পরিবর্তন নিয়ে গুঞ্জন থাকলেও শেষপর্যন্ত রিয়াদই থেকে যান অধিনায়ক হিসেবে। দলের কাছ থেকে সমর্থক, ক্রিকেট বোর্ড এমনকি সতীর্থ্যদের চাওয়া অনেক বেশি। আর এই কারণেই এবারের টুর্নামেন্টে নজর থাকবে সবার। টাইগারদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যালোচনা থাকছে আমাদের আজকের লেখায়। 
কেমন হলো ১৬ সদস্যের দলটি?

বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দল: মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ (অধিনায়ক), লিটন দাস, নাঈম শেখ, সৌম্য সরকার, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, আফিফ হোসেন, নুরুল হাসান সোহান, শেখ মেহেদী হাসান, শামীম হোসেন পাটোয়ারি, নাসুম আহমেদ, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, মোস্তাফিজুর রহমান, শরিফুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ।
রিজার্ভ বেঞ্চ: রুবেল হোসেন, আমিনুল ইসলাম বিপ্লব।

সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান হিসেবে তামিম ইকবাল অবশ্যই থাকতে পারতেন এবারের বিশ্বকাপে। কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় নাম প্রত্যাহার করে নেয়ায় লিটন দাস, নাঈম শেখ, সৌম্য সরকারদের নিয়েই বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবেন কোচ রাসেল ডোমিঙ্গ। তামিমের অনুপস্থিতি স্বত্ত্বেও দলে রয়েছেন একাধিক বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। নতুন, প্রতিভাবান কিংবা তরুণ তারকাদের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের দিকে নয় বরঞ্চ এই তিন তারকার উপরেই সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব থাকবে বিশ্বকাপে। 
দল গঠনের ক্ষেত্রে কোচ বিগত কয়েক সিরিজে যাদের হাত ধরে সফলতা পেয়েছেন তাদেরকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। যদিও ইনজুরি থেকে ফেরা তাসকিনের ডাক পাওয়া নিয়ে কিছুটা কানাঘুষা হয়েছিল সংবাদমাধ্যমে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে উইকেট কিপিংয়ে দেখা যাবে নুরুল হাসান সোহানকে। কিপার হিসেবে ইতোমধ্যেই নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন তিনি। যদিও বাংলাদেশ 'সুপার ১২' বা মূল পর্বে কোয়ালিফাই করতে পারলে প্রেক্ষাপট বদলে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ বিবেচনায় কিপার হতে পারেন মুশফিক! 
বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ কতটুক আস্থাযোগ্য?

নিশ্চিতভাবে বলা যায় তামিম ইকবালের অনুপস্থিতি বাংলাদেশকে ভীষণভাবে ভোগাবে। কারণ ব্যাটিং লাইনআপে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা ছিল তার। অন্ততপক্ষে টপ অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স হিসেব করলে অনাস্থা তৈরি না হয়ে উপায় নেই। নাঈম, সৌম্য এবং লিটন কয়েক সিরিজেই নিষ্প্রভ! অথচ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে তাদের জ্বলে উঠা দলের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। চলতি বছর ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইনিংস খেলেছেন নাঈম। ১৬ ইনিংস খেলে ২৩.৪০ গড়ে মোট করেছেন ৩৫১ রান। এছাড়াও সেঞ্চুরির দেখা না পেলেও হাফ সেঞ্চুরি পেয়েছেন মাত্র ১টি।
ইনিংস এবং রানের হিসেবে সৌম্য সরকারের অবস্থান দেশীয় ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দ্বিতীয়ে। ১২ ইনিংস খেলে ১৮.৬৬ গড়ে মোট করেছেন ২২৪ রান। যদিও আশা করা হল তার নামের সঙ্গে ৩টি হাফসেঞ্চুরি রয়েছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা লিটন দাস খেলেছেন ৮ ইনিংস, করেছেন ৭৫ রান। এই তিনজনের মধ্যে শুধুমাত্র সৌম্য সরকারের স্ট্রাইক রেট ১১৩.৭০। এইতো গেলো টপ অর্ডারের অবস্থা। তবে মিডল-অর্ডারে আস্থাভাজন খেলোয়াড় থাকলেও নবাগতদের মধ্যে কেউই মারকুটে ব্যাটসম্যান নন।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে মারকুটে ব্যাটসম্যানরাই দলকে জেতাতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে। বাংলাদেশ দলের মারকুটে ব্যাটসম্যান ধরা হতো সাব্বির রহমানকে। যদিও জাতীয় দলের বাইরে থাকা এই তারকা আর কখনো এমন আসরে খেলতে পারবেন বলে মনে হয় না। বর্তমানে আফিফ হোসেন এবং শামীম পাটোয়ারি রয়েছেন স্পটলাইটে। সাম্প্রতিকালে দুজনের মারকুটে ব্যাটিং ডোমিঙ্গকে কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করেছে। শেষ ১৪ ম্যাচে ১২৪.৪০ স্ট্রাইক রেটে আফিফের সংগ্রহ ২৬০ রান। অন্যদিকে, ৬ ইনিংসে ১৪৪ স্ট্রাইক রেটে শামীমের সংগ্রহ ৭২! এই দুজনের পরেই আসে নুরুল হাসান সোহানের নাম! শেষ ১১ ম্যাচে ১১১.৭৬ স্ট্রাইক রেটে মাত্র ৯৫ রান সংগ্রহ করতে পেরেছেন এই উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান। 
মিডল অর্ডারে ব্যাটিংয়ে দলের হাল ধরতে পারেন এমন খেলোয়াড়দের মাঝে মেহেদী হাসান থাকবেন একেবারে শেষেদিকে। ১০ ম্যাচে ১০০ রান করা মেহেদী মূলত একজন বোলার। স্পিনার হয়েও মেহেদীর ব্যাটিংয়ে উন্নতি ছিল নজরকাড়া। অনভিজ্ঞদের মাঝে আস্থা রাখার মতো শেষ ব্যাটসম্যান বলা চলে মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনকে। পেস বোলার হলেও ব্যাট চালাতেও ওস্তাদ তিনি। শেষ ৫ ম্যাচে তার সংগ্রহ ৬৪ রান! আর এই তরুণ এবং অনভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানদের উপর ছায়ার মতো থাকবেন সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহরা। তাদের তিনজনের প্রত্যেকেই ম্যাচ জেতানোর সক্ষমতা রাখেন। 
বাংলাদেশ দলের বোলিং লাইনআপ

ব্যাটিং লাইনআপ যতটুক ভাঙ্গাচোরা, বোলিং লাইনআপের শক্তিমত্তা ঠিক তার উল্টো। বাংলাদেশ দলের বোলিং লাইনআপ আসরের অন্যতম সেরা। এর সাথে দ্বিমত করার উপায় নেই। প্রতিভাবান তরুণদের সঙ্গে বোলিংয়ে যুক্ত হবেন আইপিল মাতানো মুস্তাফিজ, সাকিবরা। যদি স্পিন এবং পেস বোলিংয়ে শক্তিশালী ও ভিন্নতা যোগ করার মতো বোলার রয়েছে। নিউজিল্যান্ড সিরিজে ৫ ম্যাচে ৮ উইকেট নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রথম পাতায় জায়গা করে নেন নাসুম আহমেদ। নতুনদের মধ্যে আলো ছড়ানো আরেক তারকা মেহেদী হাসান। অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অসাধারণ বোলিং পারফরম্যান্স উপহার দেন। সাকিব আল হাসানের অভিজ্ঞতা এবং এই দুজনের ফর্ম ঠিকঠাক থাকলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে স্পিন আক্রমণে এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশ দল।
এবার আসা যাক পেস আক্রমণের প্রসঙ্গে। দেশসেরা পেসার মুস্তাফিজ রয়েছেন ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে। গত কয়েকবছরে অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারী করেছেন তিনি। রান খরচার হার কিছুটা বাড়লেও গুরুত্বপূর্ণ ওভারে দলকে জয় এনে দেয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছেন মুস্তাফিজ। পেস আক্রমণে তার পরেই আসবে সাইফউদ্দীন, শরিফুল এবং তাসকিনের নাম। শরিফুল ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছেন কেন তিনি বিশ্বকাপে ডাক পাওয়ার যোগ্য। অন্যদিকে, অভিজ্ঞতার বিচারে সাইফউদ্দীন থেকেও এগিয়ে থাকবেন তাসকিন আহমেদ। যদিও তার একাদশে থাকা অনেকটাই অনিশ্চিত। 
সবথেকে ইতিবাচক দিক হলো বাংলাদেশ দলে একই পজিশনে খেলার মতো একাধিক প্লেয়ার রয়েছে। এক্ষেত্রে অলরাউন্ডারদের আধিক্য বলা যায়। তাই বলা যায় কোনো প্লেয়ার পর পর দুটি ম্যাচে আশানুরূপ পারফরম্যান্স উপহার দিতে না পারলে অবশ্যই দল থেকে ছিঁটকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্পিন বোলিংয়ে আশার আলো দেখানো নাসুম, মেহেদী কিংবা সাকিবের সঙ্গে পার্থক্য পড়তে কাপ্তান মাহমুদউল্লাহ থাকলেও কোচ রাসেল ডোমিঙ্গ পেস নির্ভর খেলায় বেশি মনোযোগী হবেন এমনটাই প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা। তবে এখন অবধি যা বোঝা যাচ্ছে তাতে নিশ্চিতভাবে বলা চলে আরব আমিরাতের পিচগুলো মোটামুটি স্পিন নির্ভরশীল। যদিও একই ম্যাচে স্পিন এবং পেসার উভয় দিক থেকে সমান ফলাফল পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। সেক্ষেত্রে বোলারদের দায়িত্ব যেমন বেশি নিতে হবে তেমনি যে কোনো কঠিন মুহূর্ত মোকাবেলায় মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। 
উইসডেন ক্রিকেট সাময়িকীর মতে এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আসরটি হতে পারে সাকিব আল হাসানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ রান করা সাকিব এখনও বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। ইতিহাসের অন্যতম সেরাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাকে। কিন্তু একটি বিশ্বকাপের অপূর্ণতা ক্যারিয়ারকে পুরোপুরি রাঙ্গাতে পারেননি তিনি। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে লাসিথ মালিঙ্গার সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের রেকর্ড ভাঙ্গার দ্বারপ্রান্তে থাকা সাকিব ঠিক নিজের জন্য লড়বেন নাকি দেশের জন্য লড়বেন সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ নিজের ক্যারিয়ারকে পূর্ণতা দিতে তার দরকার একটি শীর্ষ পর্যায়ের শিরোপা। অন্যদিকে, বাংলাদেশকেও জেতানো দরকার নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা। এখন দেখার বিষয় ওমানে বাছাই পর্বের বাধা টপকে আরব আমিরাতে লাল সবুজের জয়োৎসবের কারিগর হতে পারেন কিনা মাহমুদউল্লাহর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ দল। 
খেলাধুলা
আরো পড়ুন