অনার্স পড়ুয়া ২২ বছরের তানিয়া দেখতে কেন শিশুদের মতো?
এক্সক্লুসিভ
অনার্স পড়ুয়া ২২ বছরের তানিয়া দেখতে কেন শিশুদের মতো?
শারীরিক গঠন ও কণ্ঠস্বর শিশুর মতোই। দেখে মনে হবে চতুর্থ কিংবা পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তবে তানিয়া নামের পাবনার ব্যতিক্রমী শারীরিক গঠনের মেয়েটির বয়স ২২ বছর। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হয়েছেন আটঘরিয়া সরকারি কলেজের অনার্স বর্ষের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, দরিদ্রতা আর সামাজিক নানা কটূক্তি এড়িয়ে তানিয়ার জীবন সংগ্রামের সাফল্য এখন মানুষের মুখে মুখে। এমনকি ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। পাবনার আটঘরিয়ার চাঁদভা ইউনিয়নের হাপানিয়া গ্রামের দিনমজুর তাজুল ইসলামের মেয়ে তানিয়া। জন্মের পর থেকে ঠিকঠাকই বেড়ে উঠছিল সে। পঞ্চম শ্রেণি পড়ার সময় হঠাৎই তার শারীরিক বৃদ্ধি থেমে যায়। ঠাণ্ডা, জ্বর ও ক্ষুধামন্দাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে শিশুটি। এরপর থেকেই তার শারীরিক গঠন বৃদ্ধি না পেয়ে কমে যায়। দরিদ্র বাবা সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেও তানিয়ার সুচিকিৎসা করাতে পারেননি। ফলে সময়ের সঙ্গে তানিয়ার সমবয়সীরা বড় হলেও সে দেখতে রয়ে গেছে সেই ছোট্ট শিশুর মতোই। কণ্ঠেও আসেনি কোনো পরিবর্তন। ব্যতিক্রমী এই শারীরিক গঠনের কারণে তানিয়া শিকার হন সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতার। বন্ধু, স্বজন ও প্রতিবেশীরা করতে থাকে নানা ধরনের কটূক্তি। নিজ স্কুল-কলেজেও অবহেলা, অপমান, ব্যঙ্গ বিদ্রূপের শিকার হয়েছেন তানিয়া। তবে, এক মুহূর্তের জন্যও থেমে যাননি তিনি। সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে সেই তানিয়াই এখন আটঘরিয়া সরকারি মহাবিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
তানিয়ার বাবা তাজুল ইসলাম জানান, ছোট থেকে ঠিকঠাকই বড় হচ্ছিল তানিয়া। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় মাঝে মাঝে দেখা দিতে থাকে ঠাণ্ডা, জ্বর ও ক্ষুধামন্দাসহ নানা ধরনের ছোটখাটো রোগ। এরপর দেখা যায় তার শারীরিক বৃদ্ধি হচ্ছে না। তখন এলাকার লোকদের পরামর্শে চিকিৎসা করাতে যাই। কিন্তু রিকশাচালক দিনমজুর হিসেবে আর্থিক দৈন্যতায় দুই মাস চিকিৎসা চালাতে পারলেও পরে আর তা পারিনি। তারপর থেকে তার শারীরিক গঠন আরও অবনতি হয়। এখন সবাই অটিজম বলে তামাশা করে। বিয়ে দিতে পারব না, বোঝা হয়ে দাঁড়াবে বলে করুণা করে। কিন্তু আমি হতাশ হইনি। লেখাপড়ায় অনুপ্রেরণা দিয়েছি। সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের কাছে আমার আবেদন উন্নত চিকিৎসা যদি ওকে করানো যেত তাহলে অনেকটা স্বাভাবিক হতে পারতো। ভবিষ্যৎ একটা ব্যবস্থা যদি কেউ করে দেয় তাহলে সে আর বোঝা হয়ে থাকবে না।
আটঘরিয়া কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রজব আলী জানান, আর দশটা শিক্ষার্থীর মতই আমরা ওকে দেখছি। বরং লেখাপড়ার প্রতি দারুণ স্পৃহা সম্পন্ন ওর মত একজন শিক্ষার্থী পেয়ে আমরা গর্বিত। আটঘরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ (চলতি দায়িত্ব) মো. শরীফুল আলম জানান, কলেজ কর্তৃপক্ষ তানিয়ার লেখাপড়ায় সার্বিক সহায়তা দেবে। সব শিক্ষার্থীদেরও বলে দিয়েছি যেন ওকে কেউ ভিন্ন নজরে না দেখে। আমরা ওর পাশে আছি।
পাবনা স্বাস্থ্যসেবা হাসপাতালের মেডিসিন, হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ মো. শাহিনুর রহমান জানান, মূলত তানিয়ার শারীরিক বৃদ্ধি হরমোন জনিত জটিলতায় আটকে গেছে। বয়ঃসন্ধিকালে তার সঠিক চিকিৎসা হলে তাকে অনেকটাই স্বাভাবিক করা সম্ভব ছিল। তার হাড়ের গঠন, হরমোনসহ শারীরিক পরীক্ষার পর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত বলা যাবে। তবে উন্নত চিকিৎসা দেয়া হলে পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও শারীরিক অবস্থার উন্নতি হবে। আটঘরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তানভীর ইসলাম বলেন, সরকার অটিস্টিকদের প্রতি বিশেষ নজর রাখছেন। আমরাও তানিয়ার প্রতি বিশেষ নজর রাখবো। এতো বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে তানিয়ার আজকের অবস্থান অন্যান্য বিশেষ শিশুদের জন্য অনুপ্রেরণা। এক্ষেত্রে তানিয়া আমাদের আটঘরিয়া তথা পাবনার গর্ব।
এক্সক্লুসিভসারাদেশপাবনা
আরো পড়ুন