স্কোপোলামাইন: মুহূর্তেই মানুষকে নিঃস্ব করে দেয় যে ভয়ঙ্কর ড্রাগ!
আন্তর্জাতিক
স্কোপোলামাইন: মুহূর্তেই মানুষকে নিঃস্ব করে দেয় যে ভয়ঙ্কর ড্রাগ!
"আমি আয়কর অফিসের সামনে থেকে সিএনজিতে উঠেছি। সিএনজিতে আগে থেকেই পেছনের সিটে ২ জন লোক বসা ছিলো। আর সামনে ড্রাইভারের সাথে কেউ ছিলো না। অন্য যাত্রী উঠতে চাইলেও ড্রাইভার আর লোক তুলেন নি। আমার কিছুটা সন্দেহ হয়েছিলো। আমি মুখে মাস্ক পরে ব্যাগ আমার কোলের উপর রেখে বসে ছিলাম। যখন নাপিতের পুল এসে নেমে ভাড়া দিতে গেলাম তখন ড্রাইভার বললো আপনার ভাড়া দেয়া লাগবে না,আপনি চলে যান। এই বলে সিএনজি চলে গেছে। পরে ব্যাগে হাত দিয়ে দেখি আমার ব্যাগের সব চেইন খোলা। ব্যাগে আমার টিউশনের দশ হাজার টাকা ছিলো মোবাইল ছিলো আর কিছু কাগজপত্র ছিলো।" দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেসবুক গ্রুপ থেকে নেয়া একটি মেয়ের লেখা এটি। তার টাকা এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিস যখন ছিনতাই করা হচ্ছিল তখন মেয়েটিকে কিছু খাইয়ে দেয়া হয়নি, করা হয়নি অচেতনও। কিংবা সরাসরি হুমকি বা ভয় দেখিয়েও কাজটি করা হয়নি। তাহলে কীভাবে কী করলো অপরাধীরা? 
আপনি আর নেই আপনাতে!
আমেরিকান-কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং প্রতিষ্ঠান ভাইস মিডিয়ার সাংবাদিক রায়ান ডাফি ২০১০ সালের এপ্রিলে মার্কিন প্রভাবশালী মিডিয়া সিএনএনে একটি নিবন্ধ লিখেন। নিবন্ধটিতে মূলত সে বছর কলম্বিয়ায় ড্রাগ বিষয়ক খবরের খোঁজে একটি সফরের গল্প বলছিলেন তিনি। তবে ডাফি যে ড্রাগটির খবর সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন সেটি সাধারণ ড্রাগগুলো থেকে কিছুটা ভিন্ন ছিল। স্কোপোলামাইন নামের ড্রাগটি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাকে দূর করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। ড্রাগটির এই বৈশিষ্ট্যই ডাফিকে আগ্রহী করে তোলে এটির ব্যাপারে অনুসন্ধানে নামতে। ব্যস, এরপর তিনি চড়ে বসেন কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটাগামী ফ্লাইটে। বোগোটার স্থানীয় মানুষেরা যে এই ড্রাগ নিয়ে বেশ আতঙ্কেই দিন কাটাচ্ছিলেন, সেটি ডাফি বুঝতে পেরেছিলেন প্লেন থেকে নেমেই। তিনি ড্রাগ এর ব্যাপারে খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে অসংখ্য ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার নিলেন। তিনি শিহরিত হয়েছেন একেকজনের কাছে ড্রাগটির অপব্যবহারের ভয়াবহতা শুনে। এভাবে এক সপ্তাহ কেটে গেল। ডাফি একজন স্থানীয় ড্রাগ ডিলারের সাথে দেখা করেন। ডেমেনসিয়া ব্ল্যাক নামের লোকটি সাথে করে এক গ্রাম স্কোপোলামাইন নিয়ে এসেছিলেন। ডাফি এটি স্বচক্ষে পরীক্ষা করে দেখার সাহস করেন নি। টয়লেটে ফ্ল্যাশ করে দিয়েছিলেন। তবে ডেমেনসিয়ার মুখে সেদিন তিনি যা শুনেছিলেন তা রীতিমতো কাঁপিয়ে দিয়েছিল তাকে। ডেমেনসিয়া বলছিলেন, "স্কোপোলামাইন এমন একটি ড্রাগ যার সাথে অন্য কিছুর তুলনা চলে না। যেমন, আপনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, আপনার সামনে এসে ফুঁ দিয়ে দিলাম। ব্যস, এতেই আপনি পুরোপুরি মাদকাসক্ত হয়ে পড়বেন। আপনি পেছনে ফিরে তাকাবেন, কিন্তু আপনার মনে হবে আমি আপনার চেনা কেউ। আমি আপনাকে যা বলবো, আপনি তখন তা-ই করবেন, একটি শিশুর মতো। আমি বলবো, আপনার বাসায় নিয়ে যান আমাকে, আপনার চেক বই দিন, আপনার জমানো টাকা দিন, ক্রেডিট কার্ড নাম্বার দিন ইত্যাদি ইত্যাদি। এমনই হয়। " ডেমেনসিয়ার ভাষ্যমতে, এক গ্রাম স্কোপোলামাইন ১০ থেকে ১৫ জন মানুষের মৃত্যু ডেকে আনতে সক্ষম।
পথে পথে আতঙ্ক?
ডাফিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা নামের এক ভুক্তভোগী বলছিলেন, " আপনি একজন জোম্বির ন্যায় আচরণ করতে শুরু করবেন। আপনি হ্যালো বলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলবেন। অনুভূতি প্রকাশের ক্ষমতাও থাকবে না আপনার। " তার সাথে ঠিক কী ঘটেছিল এমন প্রশ্নে ক্যারোলিনা জানালেন , "আমি বাস ধরার জন্য হাঁটছিলাম। এক লোক আমাকে থামালো এবং এক টুকরো কাগজ আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো এই ঠিকানাটা কোন দিকে জানাতে। ঠিকানাটা কাছেই ছিল। তাই আমি তাকে সেখানে পৌঁছে দিলাম। আমরা একসাথে জুস খেলাম। আমার মনে হলো, জুসের মধ্যে তিনি স্কোপোলামাইন মিশিয়ে দিয়েছিলেন। আমাকে আমার বাসায় নিয়ে যাওয়া হলো। আমি পুরো বাড়ি লুটপাট শুরু করলাম, বেশ খুশি লাগছিলো। আমার বন্ধুর ডলার আর ইউরোতে ভরা কিছু জমানো টাকা ছিল খামে। লোকটার হাতে তুলে দিলাম সেটা। আমার বন্ধুর ক্যামেরাও দিলাম তাকে। আমি এভাবে খুঁজে খুঁজে বের করছিলাম আর দিয়ে দিচ্ছিলাম সব। " ক্যারোলিনা যখন বুঝতে পারেন তার মহা ভুল হয়ে গেছে, তখনই তিনি পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন। তবে তিনি এটা ভেবে স্বস্তি পান যে, টাকার উপর দিয়েই বিপদ গিয়েছিল, তাকে ধর্ষণের মতো ঘটনার স্বীকার হতে হয় নি। ইভান গোমেজ নামে আরেক ভুক্তভোগীও প্রায় একই অভিজ্ঞতার বর্ণনা  দিয়েছিলেন রায়ান ডাফির কাছে। একটি পার্টিতে ড্রিংকসের সাথে তাকে স্কোপোলামাইনের ডোজ মিশিয়ে দিয়েছিলেন দুইজন নারী। ইভানের প্রায় ৩১০০ ডলার খোয়া গিয়েছিল এই ঘটনার স্বীকার হয়ে।
শেকড়ের খোঁজে
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় গাছপালার ঝোপে জন্মাতে দেখা যায় বোরাচেরো নামের এক ধরনের ফুল। বোরাচেরো শত শত বছর ধরে স্থানীয় দক্ষিণ আমেরিকানরা আধ্যাত্মিক আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহার করে আসছে। এটির বীজ যখন রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গুঁড়া এবং নিষ্কাশন করা হয়, তখন "বুরানডাঙ্গা" নামক স্কোপোলামিনের মতো একটি রাসায়নিকের অস্তিত্ব মেলে এতে। যৌগটি হ্যালুসিনেশন, ভীতিকর চিত্র এবং স্বাধীন ইচ্ছার বিরুদ্ধে পরিচালিত করে। এটি স্মৃতিভ্রংশ ঘটাতে পারে, যা শিকারকে ঘটনাগুলি স্মরণ করতে বা অপরাধীদের শনাক্ত করতে বাধা দেয়। ১৮৮০ সালে জার্মান বিজ্ঞানী আলবার্ট ল্যাডেনবার্গ প্রথম স্কোপোলামাইন আলাদা করেন বোরাচেরো উদ্ভিদ থেকে। এরপর থেকে এটি ট্রুথ সিরাম হিসেবে তদন্তের কাজে ব্যবহার করা শুরু করে ডাক্তার ও সরকারি সংস্থাগুলো। 
১৯১০ সালে আমেরিকান হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ডাঃ হাউলে হার্ভে ক্রিপনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি তার স্ত্রীকে উচ্চ মাত্রার স্কোপোলামাইন দিয়ে হত্যা করেছিলেন। এটির মাধ্যমে যে মৃত্যুও হতে পারে সেবারই প্রথম জানা গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এর তথ্যমতে, এই "ট্রুথ সিরাম" প্রথম ১৯২২ সালে লস এঞ্জেলেস টেক্সাসের একজন প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডক্টর রবার্ট হাউসের অনুসন্ধানে ব্যবহৃত হয়েছে বলে মনে করা হয়। যিনি বন্দীদের জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য স্কোপোলামাইন ব্যবহার শুরু করেছিলেন। হাউসের প্রাথমিক পরীক্ষাগুলি অভিযুক্ত বন্দীদের কাছ থেকে তথ্য আহরণে সফল প্রমাণিত হওয়ার পরে, তিনি এই বিষয়ে দশটিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং একটি আধা-জাদুকরী ট্রুথ সিরামের ধারণা জনসাধারণের চেতনায় প্রবেশ করতে শুরু করে। সিআইএ বলছে, হাউসের গবেষণার পরে কিছু পুলিশ বাহিনী ব্যাপকভাবে এটি ব্যবহার করতে পারে বলে ধারণা ছিল তাদের। হাউস তার গবেষণায় দেখেছেন, কেউ স্কোপোলামাইন ব্যবহার করে "মিথ্যা তৈরি করতে পারে না"। তবে তার "চিন্তা বা যুক্তি দেওয়ার ক্ষমতাও থাকে না।" বন্দীদের কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য বের করার জন্য ড্রাগটির ক্ষমতা সন্দেহজনক প্রমাণিত হয়েছে। সিআইএ  এবং সোভিয়েতরা তাদের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধে স্কোপোলামাইনের ব্যবহার করেছিল বলে মনে করা হয়। তবে এটির অসাধু ব্যবহার তখনও বিস্তৃত হয় নি।

স্কোপোলামাইন থেকে ডেভিলস ব্রেথ হয়ে উঠা
১৯৯৫ সালের ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের নিবন্ধ অনুসারে, কলম্বিয়ার বোগোটার হাসপাতালগুলোয় সে সময় সব জরুরি কক্ষেই ভর্তির প্রায় অর্ধেক রোগীই ছিল বুরানডাঙ্গা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত। অন্য এক গবেষণা বলছে, এই হার ২০ শতাংশের বেশি ছিল না। স্কোপোলামাইন জিমসন উইড নামে আরেক উদ্ভিদেও পাওয়া যায়। এটির দেখা মেলে উত্তর আমেরিকা মহাদেশে বিভিন্ন দেশে। এই ওষুধ ডাক্তাররা তাদের প্রেসক্রিপশন ফর্মেও লিখে থাকেন। আপনি যদি সামুদ্রিক অসুস্থতায় ভুগে থাকেন, তাহলে হয়ত আপনি আপনার শেষ সমুদ্র অভিযানে স্কোপোলামাইন ব্যবহার করেছেন। সক্রিয় উপাদানটি ১ মিলিগ্রাম ট্রান্সডার্মাল প্যাচের মধ্যে পাওয়া যায় যা বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়া বন্ধ করতে সহায়তা করে। প্যাচটিতে পাওয়া একটি বিশেষ হার-নিয়ন্ত্রক ঝিল্লি থেকে ওষুধটি ধীরে ধীরে ত্বকের মাধ্যমে শোষণ করে। কম ডোজ এবং ধীর শোষণ বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। নিয়ন্ত্রিত উপায়ে হোক কিংবা না হোক, এটি সত্য যে এই ওষুধটির অপব্যবহারের খবর মিলছে বহু আগে থেকেই। উচ্চ মাত্রায় স্বাদ ও গন্ধহীন এই ড্রাগ ব্যবহার করলে শারীরিক নানান সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বলছে, স্কোপোলামাইন একজন মানুষকে সর্বোচ্চ ২৪ ঘন্টা বা তারও বেশি সময় ধরে অজ্ঞান করে রাখতে পারে। কলম্বিয়াতে, যেখানে এটির ব্যবহার সবচেয়ে ব্যাপক বলে মনে হয়, সেখানে স্কোপোলামিনের ব্যবহার প্রতি বছর গড়ে প্রায় অর্ধলক্ষ বার হয় বলে বেসরকারি অনুমান করা হয়। উচ্চ মাত্রায় এটি "শ্বাসযন্ত্রের ব্যর্থতা এবং মৃত্যুর" কারণ হতে পারে। সে দেশে এটি এখন ডেভিলস ব্রেথ নামে অধিক পরিচিতি পেয়েছে।
অপব্যবহার দেশে দেশে
শুধু কলম্বিয়াতেই নয়, প্রতিবেশী দেশ ইকুয়েডর এবং পেরুতেও ছড়িয়েছে স্কোপোলামাইনের অপব্যবহার। স্পেনিশ পত্রিকা এল পাইস ২০১৬ সালে জানায়  , তাদের দেশেও ভয়াবহতা আকারে ছড়াচ্ছে স্কোপোলামাইনের অপব্যবহার। সহজলভ্য এবং সস্তা হওয়ার কারণে জনসাধারণের হাতের মুঠোয় চলে গিয়েছে এই ড্রাগ। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এই ড্রাগ নিয়ে আতঙ্কে থাকলেও একপ্রকার নির্ভারই রয়েছে ইউরোপের  দেশগুলো। সেখানে এখনও এই ড্রাগের অপব্যবহারের তথ্য নেই। লেখার শুরুতে যে ঘটনা বলেছিলাম আপনাদের, সেটির সাথে নিশ্চয়ই মিল খুঁজে পাচ্ছেন স্কোপোলামাইনের! এই ধরনের বেশ কয়েকটি ঘটনাই বাংলাদেশে প্রায়ই ঘটছে বলে পত্রিকা  ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে। তবে এটির সাথে স্কোপোলামাইনের যোগসূত্র আছে কি না সেরকম কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। তবু সতর্ক থাকাই বাঁচাতে পারে মূল্যবান প্রাণ ও সম্পদ। বাংলাদেশেও এই ভয়ংকর মাদকটি প্রবেশ করেছে বলে জানিয়ে বাংলাদেশি গোয়েন্দা সংস্থা র‍্যাব-এর মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সম্প্রতি সময়ে ডিওবি (DOB) নামের একটি মাদক খুলনা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এই মাদকটি যারা সেবন করেন বা যারা বিদেশ থেকে দেশে আনছেন এমন অনেককেই আমরা গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে রেখেছি। দেশবাসীকে আমরা অনুরোধ জানাবো, আপনারা একইভাবে নতুন কোনো ড্রাগের সন্ধান পেলে আপনারা অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাবেন। আপনাদের তথ্যের ভিত্তিতেই আমরা অবশ্যই এর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেবো।
আন্তর্জাতিকস্বাস্থ্য
আরো পড়ুন