Link copied.
কোরি টেন বুম: ইহুদি নিধন থেকে ৮০০ ইহুদি বাঁচিয়েছিলেন যেই নারী!
writer
অনুসরণকারী
cover
ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেমন স্মরণীয় হয়ে আছে বিশ্বজুড়ে ঘটানো তার নারকীয় তান্ডবের জন্য। তেমনি স্মরণীয় হয়ে আছে সেই নরকের ভেতর কিছু মানুষের মানবিকতার আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। আমরা Hack saw Ridge মুভি খ্যাত ডেসমন্ড রস কে জানি, যিনি একজন মেডিক হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো অস্ত্র ছাড়া অংশগ্রহণ করেছিলেন। ব্যাটেল অফ ওকিনেওয়ায় তার বীরত্বের জন্য তাকে মেডেল অফ অনারে ভূষিত করা হয়। আজকে জানবো সেরকমই একজন মহিয়সী নারী এবং তার পরিবারের কথা। যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে নি, কিন্তু অনেক অনেক মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে ছিলেন তাদের আশ্রয় দিয়ে এবং পালাতে সাহায্য করে।  
cover
কোরি টেন বুম: শৈশব কাল
কোরি টেন বুমের পুরো নাম হচ্ছে কর্নেলিয়া আর্নোলডা জোয়ানা টেন বুম। কর্নেলিয়া নামটি তার মায়ের নাম থেকে রাখা হয়েছে। তার জন্মস্থান নেদারল্যান্ডের হার্লেম নামক স্থানে। সেখানে তাদের পৈতৃক ব্যবসা ছিলো। তারা চার ভাইবোন ছিলেন যার মধ্যে কোরি সবার ছোট ছিলেন। তার বোনের নাম যথাক্রমে বেটসি এবং নোলিই এবং ভাইয়ের নাম উইলিয়াম। তার পরিবার ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টান ছিলেন, তারা প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টান ধারার ক্যালভানিজমে বিশ্বাস করতেন। এই ধারার মানুষেরা পরোপকারীতার উপর বেশি জোর দিতো। যাইহোক তাদের বাবা ক্যাসপার টেন বুম ছিলেন একজন স্বর্ণকার এবং ঘড়ি নির্মাতা। তাদের দোকানের ওপরই তাদের সুন্দর সংসার ছিলো। 
cover
কোরির মা যখন মারা যায় এবং সমসাময়িক সময়েই তার প্রেমের বিচ্ছেদ ঘটে। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার জন্য তিনি মন দেন তাদের পারিবারিক ব্যবসার দিকে। তিনি প্রথমে দোকান সামলাতেন, এরপর তিনি তার বাবার কাজে মজা পেয়ে যান এবং সিদ্ধান্ত নেন তিনিও ঘড়ি নির্মাতা হবেন। এরপর তিনি তিনি ঘড়ি নির্মাণের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেয়ার জন্য স্কুলে ভর্তি হন। ১৯২২ সালে তিনি নেদারল্যান্ডের প্রথম নারী ঘড়ি নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তিনি ভেবেছিলেন এই ঘড়ি নির্মাণ শিল্পেই তাদের জীবন প্রতিষ্ঠা করবে কিন্তু ভাগ্যে তখন অন্য কিছুই লেখা ছিলো। 
হিটলারের আবির্ভাব এবং নেদারল্যান্ড আক্রমণ
cover
ত্রিশের দশক বিশ্ব রাজনীতি ঠাই পেয়ে আছে ওই এক হিটলারের উত্থানের সময়কাল হিসেবেই। নাৎসিবাদ তত্ত্বের প্রয়োগের আগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রচুর ইহুদী ছিলো। জার্মানীর কাছাকাছি রাষ্ট্র নেদারল্যান্ডেও তখন প্রচুর ইহুদী বসবাস করতো। প্রোটেস্ট্যান্ট পরিবার টেন বুম ইহুদিদের মনে করতেন “God’s ancient people” তারা খুব সম্মান করতেন তাদের। ১৯৪০ সালের মে মাসের ১০ তারিখ হিটলার নেদারল্যান্ড আক্রমণ করে ১৭ তারিখের ভিতর দখল করে ফেলেন। এরপর শুরু হয় তার ইহুদি নিধন। টেন বুম পরিবার যুদ্ধের ভয়াবহতা টের পায়। তখন তাদের দরজায় এসে হাজির হয় ক্লিরমেকার নামের এক ইহুদি মহিলা যাদেরকে তারা আপন করে নেয়। কোরি তার বই Hiding place এ বলেন “এই ঘরে, ঈশ্বরের সৃষ্ট সকল মানুষ আমন্ত্রিত”।

তাদের এই মহানুভবতার কথা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মানুষ তাদের বাসায় সাহায্যের জন্য ছুটে আসতে থাকে। টেন বুম পরিবারও কাউকে ফিরাতো না। ওদিকে জার্মান বাহিনীও ট্রেন ভরে ভরে ইহুদীদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো শুরু করে। হিটলারে আস্থাভাজন এডলফ ইচম্যান যেটাকে বলেছিলেন “নেদারল্যান্ড থেকে ট্রেন আসছে, যেটি দেখতে বেশ প্রশান্তিদায়ক
cover
অতপর...
চার বছর তারা এই কাজ চালিয়ে যান , একদিন হিটলারের কুখ্যাত পুলিশ বাহিনী গেস্টাপো তাদের বাসার দরজায় এসে উপস্থিত হয়। দিনটা হচ্ছে ফেব্রুয়ারীর ২৮, ১৯৪৪। একজন ডাচ ইনফরম্যান্ট তাদের কথা গেস্টাপোদের জানিয়ে দেয়। গেস্টাপো তাদের বাসা তল্লাশী চালায় কিন্তু কোনো ইহুদি খুঁজে পায় না। পরবর্তীতে তারা ক্যাসপার, বেটসি এবং কোরিকে আটক করে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠায়। 
কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফেরা
আটক করার কিছুদিনের মাথায় তাদের বাবা ক্যাসপার অসুস্থ হয়ে কারাগারে মারা যায়। ওদিকে বেটসি এবং কোরিকে জুন মাসে কারাগার থেকে কুখ্যাত ভ্যুগট কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়। সেখান থেকে আবার তাদের আরেক কুখ্যাত র‍্যাভেনসবার্গ ক্যাম্পে পাঠানো হয়। যেটি শুধুমাত্র নারীদের জন্য ব্যবহার হতো। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে অবর্ণীয় নির্যাতন চালানো হত বন্দিদের উপর। মানুষের শরীরের উপর যেই পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হয়েছে, সেগুলো ভাষায় প্রকাশ করার মত না। তারপর যারা বাকি থাকতো তাদের ঠিকানা হতো গ্যাস চেম্বার। কোরি টেন বুমের বর্ণনা থেকে জানা যায়, যে তাদের সেই ক্যাম্পে প্রায় এক লক্ষ নারী হত্যা করা হয়েছে। যার মধ্যে কোরির বোন বেটসিও রয়েছে। 
cover
বেটসি মারা যায় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৪৪। তার মৃত্যুর ১২ দিন পর কোরি ভাগ্যের চরম সাহায্যে এবং নাৎসিদের একটা ভুলে কোরি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে মুক্তি পায়। তার মুক্তির পর পরই তার সমবয়সী সকল নারীদের গ্যাস চেম্বারে পাঠানো হয়। 
পরবর্তী নতুন জীবন
“ পৃথিবীতে এমন কোনো গভিরতম কুয়া নেই যেখানে ঈশ্বরের ভালোবাসা পৌছায় না। ঈশ্বর আমাদের ভালোবাসা দান করুক এবনহ ক্ষমা করতে পারার শক্তি দিক।
কোরি টেন বুম
মুক্তি পাওয়ার পর, তিনি যুদ্ধ বিধ্বস্ত তার শহরে ফিরে যান। সেখানে গিয়ে তিনি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফেরাদের জন্য একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র চালু করেন। তখন থেকেই তিনি নিজেকে উৎসর্গ করে দেন মানবতার সেবায়। তিনি ক্ষমা করাকেই সবচেয়ে মহৎ কাজ বলে প্রচারণা চালান, তিনি বলেন “পৃথিবীতে এমন কোনো গভিরতম কুয়া নেই যেখানে ঈশ্বরের ভালোবাসা পৌছায় না। ঈশ্বর আমাদের ভালোবাসা দান করুক এবং ক্ষমা করতে পারার শক্তি দিক।” 
cover
পরবর্তী ৩০ বছর তিনি বিশ্বভ্রমণ করেন তার এই বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। তিনি প্রায় ৬০ টি দেশ ভ্রমণ করেন। ১৯৪৭ সালে তিনি বার্লিনের এক চার্চে তার সাথে সেই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের একজন রক্ষীর সাথে দেখা হয়। কোরি তাকে চিনতে পেরেছিলেন, যখন তিনি সেই গার্ডকে জানালেন যে তিনি তাকে চিনতে পেরেছেন, গার্ড তখন তার কৃতকর্মের জন্য তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন।

এতো মহৎ কাজের স্বীকৃতি তিনি পেয়ে গেছেন সারাজীবন। তিনি এবং তার পরিবার, ইসরাইল সরকার কতৃক বিদেশী বন্ধুদের জন্য প্রবর্তিত “ইয়াদ ভাশেম” উপাধীতে ভূষিত করা হয়। কোরি টেন বুম ৯১ বছর বয়সে, ১৯৮৩ সালের ১৫ এপ্রিল মৃতুবরণ করেন। তার জন্মদিন এবং মৃত্যদিন একই দিনে। জুডাইজমে বিশ্বাস করা হয় একই দিনে জন্ম মৃত্যুবরণ করা লোকের ঈশ্বর কতৃক প্রদত্ত মিশন সম্পন্ন করতে পেরেছে।  
কোরি টেন বুমে এবং তার পরিবার এই পৃথিবীতে মানবিকতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে দিয়ে গেছেন। হিংসা হানাহানির থেকে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমা করে দেয়া কত মহৎ সেটা তারা দেখিয়ে গিয়েছেন। সেজন্য তাদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে, কিন্তু পৃথিবীতে তারা স্মরণীয় হয়ে আছে। আসুন আমরা সেখান থেকে শিক্ষা নেই, জাতি ধর্ম বর্ণ দিয়ে বিভেদ না করে, সবার সেবা করি, কারণ সবাই মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। 
তথ্যসূত্র
  • https://allthatsinteresting.com/corrie-ten-boom?fbclid=IwAR2RwlciPbCmmglLUvQZ5D6U9dx8e-_3eLHem22oFmL2Mz55sIM8JL0J_S0
  • https://www.britannica.com/topic/Calvinism
  • https://www.biography.com/activist/corrie-ten-boom

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021