সুপার-এজার: সময় প্রবাহকে প্রতিহত করে যাদের মস্তিষ্ক অবিশ্বাস্যভাবে তারুণ্যের স্মৃতি ধরে রাখে!
বিজ্ঞান
সুপার-এজার: সময় প্রবাহকে প্রতিহত করে যাদের মস্তিষ্ক অবিশ্বাস্যভাবে তারুণ্যের স্মৃতি ধরে রাখে!
সুপার-এজার নামে পরিচিত বিরল একদল লোক আছেন যাদের সময়ের সাথে বয়স ও বৃদ্ধি ঘটলেও তাদের মন থেকে যায় চিরযৌবন। এমনকি তাদের বয়স ৫০,৬০ কিংবা ৭০, ৮০ বছর পেরোলেও এমন অনেক ভাগ্যবান আছেন যাদের মস্তিষ্ক অবিশ্বাস্যরকমভাবে তারুণ্যের স্মৃতি বজায় রাখে, নতুন অভিজ্ঞতা, ঘটনা এবং পরিস্থিতি এবং সেইসাথে দশকের চেয়েও কম বয়সী লোকদের মতো স্মরণশক্তি ধরে রাখে। নতুন অনেক গবেষণা এখন পরামর্শ দেয় এরকমটা ঘটার কারণ তাদের মস্তিষ্ক সময়ের পদযাত্রাকে প্রতিহত করেছে। 
একটি চ্যালেঞ্জিং মেমোরি টাস্কের সময় মস্তিষ্কের চালচলন, কার্যগুলো স্ক্যান পরিচালনা করতে গিয়ে দেখা যায়, সুপার-এজারদের মাথার ক্রিয়াকলাপ, গড় হিসেবে তাদের ২০ বছর বয়সকালীন কিংবা বর্তমানের ২০ বছর বয়সীদের মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপের থেকে কোনোপ্রকারে পৃথক নয়। সুপারএজাররা তাদের বয়সের অন্যান্য লোকদের চেয়ে ভাল পারফর্ম করেছিলেন। আসলে, মেমরি টাস্কে তাদের পারফরম্যান্স অনেক কম বয়স্কদের সমান ছিল। 
এমআরআই ব্যবহার করে আমরা দেখতে পেলাম যে সুপারেজারদের মস্তিষ্কের গঠন এবং তাদের নিউরাল নেটওয়ার্কগুলির সংযোগ তরুণ বয়সীদের মস্তিষ্কের সাথে আরও সাদৃশ্যপূর্ণ; অন্যান্য বয়স্ক লোকদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে এবং স্মৃতিশক্তিতে যেমন ক্ষয়িষ্ণুতা দেখা যায়, সুপার এজারদের মস্তিষ্কে এরকমটা দেখা যায় নি।
ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট আলেকজান্দ্রা ট্যুরটোগ্লো
এই প্রথমবারের মতো আমরা সুপারএজারদের মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপের চিত্রগুলি ধারন করতে সক্ষম হয়েছি যখন তারা সক্রিয়ভাবে নতুন তথ্য শিখতে এবং স্মরণে রাখতে পারে।
আলেকজান্দ্রা ট্যুরটোগ্লো
এটি অতি সাম্প্রতিক যে সুপার-এজার বা অবিশ্বাস্য স্মৃতিশক্তিধর বয়স্ক লোক এবং তাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিজ্ঞানীদের নজরে এসেছে। এই গোষ্ঠীর লোকজন নিয়মিত বার্ধক্য প্রক্রিয়াটিকে এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করে যা আলঝাইমার রোগ এবং ডিমেনশিয়া নিয়ে কাজ করেন এমন অনেক গবেষককে আগ্রহী করে।সুপারএজার মানুষ কীভাবে তাদের স্মৃতি এত বয়সকালেও অক্ষত রাখে তা এখনও রহস্যজনক। কারও ডিমেনশিয়া না থাকলেও কিছু বয়স সম্পর্কিত স্মৃতিশক্তি বয়স বাড়ার সাথে সাথে হ্রাস পাওয়াটা প্রত্যাশিত। তবে অভিজাত এই সুপারএজাররা সেই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটিকে অস্বীকার করে বলে মনে হচ্ছে। কিছু প্রাথমিক গবেষণায় পাওয়া গেছে যে সুপারএজারদের মধ্যে কিছু বিশেষ ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে যা তাদের অবাক করা মনের ও স্মরণশক্তির রক্ষণাবেক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যান্য গবেষণায় বলা হয় যে এটি অনেকটাই জিনগত লটারির মতো, বিশেষত যেহেতু অনেক সুপারএজার ব্যক্তি স্বাস্থ্যকর জীবনধারণের প্রয়োজনীয়তা বুঝে সে অনুযায়ী জীবনব্যবস্থা অবলম্বন করেন না।
যা কিছু চলছে, তাদের মস্তিষ্ক লক্ষণীয়ভাবে অল্প বয়স্ক দেখাচ্ছে। কিছু সাম্প্রতিক মস্তিষ্কের স্ক্যানে দেখা গেছে যে অন্যান্য বয়স্ক ব্যক্তিদের মতো সুপারএজারদের মস্তিষ্কের পরিমাণ বয়সের সাথে হ্রাস করে না, যাতে করে তাদের নিউরাল নেটওয়ার্কগুলিকে বার্ধক্যের জন্য অদ্ভুতভাবে প্রতিরোধী বলে মনে হয়। উদাহরণস্বরূপ, তাদের মধ্যে, সিংগুলেট কর্টেক্স, যা স্মৃতি এবং মনোযোগের সাথে জড়িত এবং হিপ্পোক্যাম্পাসের সাথে যুক্ত, যা আবার স্মৃতিশক্তির সাথেও জড়িত, বয়স-ভিত্তিক, মানে বয়স বাড়ার সাথে সাথে সঙ্কুচিত হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রতিরোধী হিসেবে দেখা যায়। অন্যান্য এমআরআই গবেষণায় দেখা গেছে যে বয়স বাড়ার সাথে সাথে অন্যান্য লোকের তুলনায় সুপারএজারদের অর্ধেক হারে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ও মস্তিষ্কের পরিমাণ হ্রাস পায়। 
এই অনুসন্ধানগুলি অনুসরণ করতে, গবেষকরা আবার এমআরআই স্ক্যান ব্যবহার করেন। এবার, এটি কেবল কারও মস্তিষ্কের আয়তন পরিমাপ করার জন্যই নয়, অংশগ্রহণকারীদের স্মৃতিশক্তিকে রিয়েল-টাইমে কাজ করতে দেখতেও ব্যবহৃত হয়। সমীক্ষাটি ৪০ জন বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে পরিচালিত হয়েছিল, যাদের গড় বয়স ৬৭ বছর, এবং ৪১ জন তরুণ বয়স্ককে নেওয়া হয়, যাদের গড় বয়স ২৫ বছর ছিল। বয়স্ক লোকদের গ্রুপে ১৭ জন ছিলেন সুপারএজার, যা পরিসংখ্যানে পুরো জনসংখ্যায় সুপারএজারদের পরিমাণের তুলনায় অনেক বেশী ছিল (কেননা মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ পর্যন্ত সুপারএজার পাওয়া যেতে পারে) তবে তারপরও গবেষোণার ক্ষেত্রে এটি ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট নমুনার আকার।
অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া মেমরি টাস্কগুলি পূর্ববর্তী গবেষণার তুলনায় বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং ছিল। এটি এপিসোডিক মেমোরির উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল, যা মানুষকে কয়েক ডজন শব্দের অবয়ব বা দৃশ্যের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয় এবং পরে সেই জোড়াগুলি স্মরণ করতে বলে। কার্যটি, এই ক্ষেত্রে, অংশগ্রহণকারীদের মোট ৮০ টি চিত্র-শব্দের জোড়া মুখস্থ করতে এবং পুনরায় স্মরণ করতে বলে। এই কাজটি করার সময় তাদের মস্তিষ্ক স্ক্যান করার সময়, গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে সুপারএজার ব্যক্তিরা অল্প বয়স্কদের সাথে মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপের অনুরূপ নিদর্শন দেখিয়েছেন। এটি মস্তিষ্কের দুটি অংশে স্পষ্ট ছিল:
  • ফিউসিফর্ম গাইরাস, যা বস্তু এবং মুখের স্বীকৃতিতে ভূমিকা রাখে এবং
  • প্যারাহীপোক্যাম্পাল গাইরাস, যা মেমরির এনকোডিং এবং পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখে।
এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের কেবলমাত্র দুটি অংশ যাচাই করা হয়েছিল, সুতরাং এটিও সম্ভব যে সুপারএজাররা মস্তিষ্কের অন্যান্য অঞ্চলের ক্ষেত্রেও সাধারণত বয়স্ক প্রাপ্ত বয়স্কদের থেকেও আলাদা হতে পারেন। তবুও, এই দুটি ক্ষেত্রই ছিল যা গবেষকরা দৃষ্টিভিত্তিক মেমরির কার্যক্রমে কার্যকলাপ দেখতে পাবে। সমস্ত ৮১ জন অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যারা ফিউসিফর্ম গাইরাস এবং প্যারাহিপোক্যাম্পাল গাইরাসে আরও বেশি যুবা বয়সের সক্রিয়করণের নিদর্শন দেখিয়েছিলেন তারা শেষ পর্যন্ত মেমরির কার্যটিতে আরও ভাল পারফর্ম করেছিলেন।
যখন প্রবীণ অংশগ্রহণকারীরা পরে একটি চিত্র-শব্দের জুটি দেখেছিল এবং এর আগে তারা এই জুটিটি দেখেছিল কিনা তা মনে করার জন্য জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যারা কার্যটিতে সেরা পারফর্ম করেছিলেন তাদের মস্তিষ্কের একই অংশগুলি সক্রিয় হয়েছিল যখন তারা প্রথম এই জুটি সম্পর্কে জানতে পেরেছিল। লেখকগণের মতে, সুপারএজাররা তাদের বয়সের অন্যান্য বেশিরভাগ মানুষের তুলনায় ভিজ্যুয়াল উদ্দীপনাগুলিকে শ্রেণিবদ্ধকরণে আরও ভাল এবং পারদর্শী।  
যুবক বয়সীদের মত সুপারএজাররা একই উচ্চ স্তরের নিউরাল ডিফারেনসিফিকেশন বা সিলেকটিভিটি বজায় রেখেছিল।
এমজিএইচ থেকে আসা মনোবিজ্ঞানী ইউটা কাটসুমী
তাদের মস্তিস্ক তাদের ভিজ্যুয়াল তথ্যের বিভিন্ন বিভাগের স্বতন্ত্র উপস্থাপনা তৈরি করতে সক্ষম করেছে যাতে তারা চিত্র-শব্দের জুটিকে পরে সঠিকভাবে মনে করতে সক্ষম হয়।
ইউটা কাটসুমী
এত ছোট একটি নমুনা নিয়ে গবেষণা করে এখানে সত্যিকার অর্থে কী চলছে তা নির্ধারণ করা কঠিন। গবেষক স্বীকার করেছেন যে তাদের অনুসন্ধানগুলি কার্যকরভাবে বেশ মাঝারি এবং কিছু দ্বারা এটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে না। তারা বলেন যে, অধ্যয়নটি একটি উদীয়মান ধারণাকে সমর্থন করে: সুপারএজারদের মস্তিষ্ক সম্পর্কে এমন কিছু আছে যার জন্য তাদের মস্তিষ্ক দেখতে অল্প বয়স্ক দেখায়। গবেষকরা এই গবেষণাগুলি আরও বেশি সংখ্যায় প্রতিলিপি করতে ভবিষ্যতের অধ্যয়নের জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
যদিও দেখে মনে হচ্ছে ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সে বৃহত্তর প্রক্রিয়াজাতকরণ সুপারএজারদের উচ্চতর স্মৃতিতে ভূমিকা রাখতে পারে, তারপরও মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশগুলিও বিবেচনা করা দরকার। যদি আমরা বুঝতে পারি যে, সুপারএজার ব্যক্তিরা কীভাবে তাদের মনকে এইরকম স্থিতিস্থাপক করে তোলে বা রাখতে সক্ষম হোন, তখন সম্ভবত আমরা স্মৃতিশক্তি হারিয়ে যাওয়া বা লক্ষণীয় স্মৃতিভ্রষ্টতা ধীর করার উপায় খুঁজে পেতে পারি। এরকমটাই মনে করেন মস্তিষ্ক, এর কার্যকলাপ এবং স্মৃতিশক্তি সম্পর্কিত রোগ নিয়ে অধ্যয়ন করা গবেষকরা।   
References:
https://www.sciencealert.com/superagers-with-incredible-memories-have-brains-like-25-year-olds
https://www.nm.org/healthbeat/healthy-tips/4-habits-super-agers. 
বিজ্ঞান
আরো পড়ুন