বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু: যেভাবে পাল্টে দেবে দক্ষিণবঙ্গের চেহারা!
জাতীয়
বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু: যেভাবে পাল্টে দেবে দক্ষিণবঙ্গের চেহারা!
পদ্মা সেতু
পদ্মা সেতু
পদ্মা সেতু নিয়ে সংবাদমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজারও তথ্য পেয়ে থাকে দেশের মানুষ। এমন পরিস্থিতি হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের সবচেয়ে আলোচিত এবং বহুল প্রতীক্ষিত এই সেতুটি নিয়ে মানুষের নতুন করে জানার কিছু নেই বললেই চলে। কিন্তু আমাদের আজকের এই প্রতিবেদনটিতে তুলে আনা হয়েছে ভিন্ন কিছু বিষয়। এখানে পদ্মা সেতুর কিছু পেছনের কিছু ঘটনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও এতে পাওয়া যাবে পদ্মা সেতু নিয়ে দেশজুড়ে মানুষের মনে তৈরি হওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর। সেতুটির নির্মাণকাজে কেন এতো টাকা খরচ হয়েছে? এই প্রতিবেদনটিতে সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। সাথে এখানে জানা যাবে পদ্মা সেতুর কাজের বর্তমান আপডেট, রেলসেতু তৈরির সর্বশেষ অবস্থা, গ্যাস এবং বিদ্যুৎ প্রকল্প কী অবস্থায় আছে এবং সর্বোপরি পদ্মা সেতুর মাধ্যমে কীভাবে দক্ষিণবঙ্গের চেহারা বদলে যেতে পারে-সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। 
এক্সপ্রেসওয়ে
এক্সপ্রেসওয়ে
চলতি বছরের জুন মাসের শেষ নাগাদ খুলে দেয়া হবে কাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতু। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুর কাজ এখন প্রায় শেষের দিকে। মূলত সেতুটির পিচ ধালাইয়ের কাজ এখন শেষ হয়েছে। সেতুটি এখন যানবাহন চলাচলের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। এখানে রেলসেতুর কাজও এগিয়ে চলছে দ্রুত গতিতে। জানা গেছে, ডিসেম্বরেই খুলে দেয়া হবে সেতুটির রেল অংশ। এই পদ্মা সেতু দিয়েই দক্ষিণবঙ্গে যাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ। আর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইন বসানোর কাজও প্রায় শেষ। সেতুতে বাতি বসানোর কাজ শেষ হলেও সেগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার কাজ মে মাস নাগাদ শেষ হবে বলে জানা গেছে। সর্বশেষ তথ্য মতে, ঈদের আগ পর্যন্ত সেতুর কাজ সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ৯৮ শতাংশ। 
নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু
নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু
পদ্মা সেতু তৈরির পর থেকেই দেশের মানুষের মনে একটা প্রশ্ন বারবার উঠেছে- কেন এই সেতু নির্মাণে ব্যয় এতো বেশি? বিশ্বের অসংখ্য দেশে এর থেকে বেশি দৈর্ঘ্যের নদীতে আরও কম ব্যয়ে সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। তাহলে এই সেতুতে কেন ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হলো? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের পদ্মা নদী নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা করতে হবে। পদ্মা হলো বিশ্বের সবচেয়ে স্রোতস্বিনী নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই নদীর গভীরতা প্রায় ৪০ মিটার। পদ্মা নদীর তলদেশ থেকে পানিপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ১৩ তলা ভবনের সমান। তার উপর পদ্মার স্রোতে এর তলদেশের বালি এবং মাটি ধুয়ে যাওয়ার পরিমাণ হলো বিশ্বে সর্বোচ্চ। পানির স্রোতে তলদেশ থেকে ৬৫ মিটার বালি এবং মাটি সরে যাওয়ার রেকর্ডও আছে সর্বনাশা পদ্মার। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদ্মা নদীতে সেতু তৈরিতে প্রতিটি পিলারের উচ্চতা করা হয়েছে ৪০ তলা ভবনের সমান! অন্যদিকে, অন্যান্য দেশগুলোতে এমন সেতুতে তৈরিতে সাধারণত ২০ তলা ভবনের সমান উচ্চতার পিলার তৈরি করা হয়। অবিশ্বাস্য হলেও এই তথ্য পুরোপুরি সত্য।
পাইল নির্মাণ
পাইল নির্মাণ
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
পদ্মা সেতুর পাইলিংয়েও প্রচুর অর্থ খরচ হয়েছে। ৪০ তলা সমান লম্বা পাইলগুলোকে ছোট ছোট টুকরা থেকে সংযোগ করে বড় করা হয়েছে। শুধু এই পাইলগুলোকে সংযোগ করতেই জার্মানি থেকে অত্যাধুনিক হ্যামার বা হাতুরি আনা হয়েছে। পিলারগুলোর একেকটা কলামের নিচে ৬টি করে পাইল রাখা হয়েছে, যাতে তলদেশের মাটি ধুয়ে গেলেও কলাম অক্ষত থাকে। অন্যদিকে, পদ্মা সেতু কিন্তু দোতলা সেতু। এর নিচে রয়েছে দোতলা কন্টেইনার যাতায়াত করার মতো রেলসেতু আছে। যদিও বাংলাদেশে এখনও দোতলা কন্টেইনার সমৃদ্ধ রেলগাড়ি আনা হয়নি, তবে আজ থেকে ১০ কিংবা ২০ বছর পরে যদি দেশে দোতলা কন্টেইনার সমৃদ্ধ রেলগাড়ি আনা হয়, তবে পদ্মার নিচ দিয়ে সেই ট্রেন নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারবে। এই সেতু দিয়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ, অপটিক্যাল ফাইবার ও টেলিফোনের লাইনও নেয়া হবে। এতোসব সুবিধা যুক্ত করতে গিয়েই মূলত এই সেতুর ব্যয় বেড়েছে। যেহেতু এই সেতুর মেয়াদকাল ১০০ বছর বলা হয়েছে, তাই মান ঠিক রাখতে গিয়ে সেতুর পেছনে ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ।
গ্যাসের পাইপ
গ্যাসের পাইপ
এছাড়াও খরচ বাড়ার আরও কিছু কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ৩.৬৮ কিলোমিটার সংযোগ সেতুসহ পদ্মা সেতুর মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ৯.৮৩ কিলোমিটার। সংযোগ সেতুর দৈর্ঘ্য মাওয়া প্রান্তে ১.৪৭ কিলোমিটার এবং জাজিরা প্রান্তে ১.৬৭ কিলোমিটার। এছাড়া, পদ্মা সেতু নির্মাণের আগে তাতে প্রবেশ মুখের রাস্তার কাজের পেছনেও প্রচুর অর্থ খরচ হয়েছে। পদ্মা সেতুতে প্রবেশের রাস্তাটিকে মূলত এপ্রোচ রোড বলা হয়। এই এপ্রোচ রোডের দৈর্ঘ্য পদ্মা সেতুর প্রায় দ্বিগুণ (১২ কিলোমিটার)। দুই প্রান্তের এপ্রোচ রোডে বাড়তি পাঁচটি সেতু নির্মাণ করতে হয়েছে। সেগুলোর দৈর্ঘ্যও প্রায় ১ কিলোমিটার। এছাড়া সেতুটি নির্মাণের কাজে বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সেতুটি বানাতে প্রায় ১৩ হাজার বাড়ি অপসারণ করতে হয়েছে, ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৭৪ হাজার মানুষ। আর এই বিশাল সংখ্যক মানুষকে ক্ষতিপূরণ দিতেও বাংলাদেশ সরকারকে বড় অংকের অর্থ গুনতে হয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
এতো টাকা এলো কোথা থেকে?
দুর্নীতির অজুহাত এনে পদ্মা সেতু তৈরিতে অর্থ দিতে অপারগতা প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। আর বিশ্বব্যাংকের এমন সিদ্ধান্তের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের নিজস্ব অর্থায়নেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। কারিগরি দিক দিয়ে চীন, জাপান, কোরিয়া, রাশিয়াসহ বেশকিছু দেশ পদ্মা সেতু নির্মাণে বাংলাদেশকে সাহায্য করেছে। চীনের বেশ কয়েকটি কন্সট্রাকশন কোম্পানির শত শত ইঞ্জিনিয়ার এবং শ্রমিক বিশাল এই প্রজেক্টে দিনরাত কাজ করেছেন। তবে সেতু নির্মাণে অর্থায়নের পুরোটাই এসেছে দেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকা, রেমিটেন্সের ঘাম ঝরানো টাকা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভের টাকা থেকে। এই সেতুর ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্থমন্ত্রণালয়ের সাথে ২৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকার ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সেতু বিভাগ। ১ শতাংশ সুদসহ ৩৫ বছরে ১৪০ কিস্তিতে এই ঋণ শোধ করতে হবে সেতু বিভাগকে। আর এই অর্থ সেতু বিভাগ আয় করবে পদ্মা সেতু থেকে পাওয়া টোলের টাকা থেকে। ইতিমধ্যেই কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে কর্পোরেশন এবং চায়না মেগাব্রীজ ইঞ্জিনিয়ারিং নামক দুটি প্রতিষ্ঠানের সাথে এই টোলের টাকা আদায়ের জন্য ৫ বছরের চুক্তি করা হয়েছে। 
পিলার
পিলার
কীভাবে দক্ষিণবঙ্গের চেহারা পাল্টে দিবে এই প্রজেক্ট?
দক্ষিনবঙ্গের সাথে ঢাকার দ্রুতগামী রেল সংযোগ হবে পদ্মা সেতুর মাধ্যমে। গ্যাস লাইন, বিদ্যুৎ, অপটিক্যাল ফাইবার ও টেলিফোনের লাইন দক্ষিণের ২১টি জেলায় যাবে এই পদ্মা সেতুর ওপর দিয়েই। সেতুকে কেন্দ্র করে সাত ভাগে ৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্যাসলাইনের পাইপ বসানো হয়েছে। পাইপগুলোতে এখন রঙ করার কাজ চলছে। ভবিশ্যতে বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের সহজলভ্যতার কারণে গড়ে উঠবে বিপুল শিল্পকারখানা। এই সেতুর মাধ্যমে মংলাবন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। দক্ষিণের ২১টি জেলার সাথে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ৪ ঘণ্টা কমে আসবে। 
বাড়বে ব্যবসা
বাড়বে ব্যবসা
রাজধানীর সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হওয়ায় এবং যাতায়াতের সুবিধা বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার, কাঁচামাল সরবরাহ সহজলভ্য হয়ে যাবে। এছাড়াও এলাকাগুলোতে শিল্পায়নের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। একইসাথে উন্নত হবে এই অঞ্চলের কৃষিখাত। যেখানে বর্তমানে ফেরি দিয়ে পদ্মা নদী পার হতে প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হয়, সেতু নির্মাণের পর এই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে ৪ থেকে ৫ মিনিট। পাশাপাশি এই সেতুকে ঘিরে এর আশেপাশের অঞ্চলে অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে, সাথে তৈরি হবে ব্যাপক কর্মসংস্থান। 
অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে দেশ
অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে দেশ
যাতায়াত সহজ হওয়ায় অনেকে পদ্মার আশেপাশের অঞ্চলে মানুষ বিনিয়োগ করা শুরু করবে। সেসব এলাকায় নতুন নতুন অসংখ্য কলকারখানার তৈরি হবে। ফলে বলা যায়, চলাচলের সুবিধার পাশাপাশি পদ্মা সেতু দেশের এবং দক্ষিণের অর্থনীতিতে আমুল এক পরিবর্তন এনে দেবে। হিসাব বলছে, পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের জিডিবি ১.২৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জিডিবি বাড়বে ২.৩ শতাংশ।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
এখানেই শেষ নয়। ২০৩০ সাল নাগাদ দিনে ৩০ হাজার যান পারাপার করবে এই সেতুর ওপর দিয়ে। এছাড়া পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দেশের দক্ষিণাঞ্চল ট্রান্স এশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সাথে যুক্ত হবে। ফলে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগ আরও সহজ হবে। সেতুর উভয় পার্শ্বে অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক ও বেসরকারি শিল্পনগরী গড়ে উঠবে। ফলে বিনিয়োগের সাথে আগাবে দেশের অর্থনীতির চাকা। ধারণা করা হচ্ছে, দেশের মোট এলাকার শতকরা ২৯ শতাংশ অঞ্চলজুড়ে ৩ কোটির বেশি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর মাধ্যমে লাভবান হবে।
জাতীয়বিশেষ প্রতিবেদনপদ্মা ব্রিজ
আরো পড়ুন