৩০ বছর আগে মায়ের ধর্ষণের প্রতিশোধ নিতে ছেলের নজিরবিহীন কাণ্ড!
আন্তর্জাতিক
৩০ বছর আগে মায়ের ধর্ষণের প্রতিশোধ নিতে ছেলের নজিরবিহীন কাণ্ড!
ভারতে প্রায়শই ভয়াবহ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, যা আন্তর্জাতিকভাবে খবরের শিরোনাম হয়ে ওঠে। জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দেশটিতে এমন সব ভয়াবহ ধর্ষণ ও মামলা রয়েছে যার সুরাহা কখনো হয়নি।
ছবি: বিবিসি
ছবি: বিবিসি
৩০ বছর আগের এমনি এক ঘটনা নিয়ে সম্প্রতি আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে ভারতের উত্তর প্রদেশে! ৩ দশক আগেকার ওই ঘটনায় অভিযুক্ত করা হয়েছে ধর্ষক দুই ভাইকে। তাদের নামে মামলা করেন ওই নারীর সন্তান যাকে জন্মের পরেই দত্তক দেয়া হয়েছিল। বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, মাত্র ১২ বছর বয়সে নারীকে ওই দুই ব্যক্তি ধর্ষণ করে। আর মামলার বাদী তারই দত্তক দেয়া ছেলে নিজে। ১৩ বছর পর মায়ের কাছে ফিরে মামলা করেছিলেন ওই কিশোর। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ১০ দিন আগে একজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে গত বুধবার (১০ আগস্ট) দ্বিতীয় অভিযুক্তকেও পুলিশি হেফাজতে নেয়া হয়। দুই যুবককে গ্রেফতারের পর বিবিসিকে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান ওই নারী। তিনি বলেন, ঘটনাটি অনেক পুরনো কিন্তু এর ফলে আমার যে ক্ষত হয়েছে তা এখনও সারেনি। এটি আমার জীবনকে স্থবির করে দিয়েছে এবং আমি সেই মুহূর্তটি বারবার মনে করি।' 
ঘটনাটি অনেক পুরনো কিন্তু এর ফলে আমার যে ক্ষত হয়েছে তা এখনও সারেনি। এটি আমার জীবনকে স্থবির করে দিয়েছে এবং আমি সেই মুহূর্তটি বারবার মনে করি।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
শুধু ওই নারীর উদাহরণ দিয়েই ভারতের ধর্ষণ সহিংসতার হিসাব করা যাবে না। ২০২০ সালের এক সমীক্ষা অনুসারে, এক বছরে দেশটিতে ৪৭,০০০ শিশু-কিশোর ধর্ষণের মামলা হয়েছে। তবে এগুলোই আনুষ্ঠানিক ঘটনা নয়। অনেক শিশু বুঝতেই পারে না সে নিজে কীভাবে সহিংসতার স্বীকার হয়েছে। আবার অনেক পরিবার সমাজ ও সম্মানের ভয়ে এসব ঘটনায় মুখ খুলতে অস্বীকৃতি জানায়। পরিবার পরিজনের নিকট কলঙ্কিত হওয়ার ভয়ে বেশিভাগ পরিবারই এমন ইস্যুগুলো এড়িয়ে চলেন। যাইহোক, আজ আমরা উত্তর প্রদেশের ওই নারীর সঙ্গে যা যা ঘটেছিল তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো। 
ঘটনার নেপথ্য কাহিনী
উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুর শহরে ১৯৯৪ সালে ধর্ষণের ওই ঘটনা ঘটে। ভারতের আইন অনুযায়ী ওই নারীর নাম প্রকাশ করতে পারবে না কোনো সংবাদমাধ্যম। এই ঘটনায় অভিযুক্ত দুজনই সম্পর্কে আপন ভাই। ওই নারী জানান, তিনি যখন ঘরে একা থাকতেন তখনই দুই ভাই বাড়ির সীমানা প্রাচীর টপকে তার বাড়িতে পৌঁছে লাঞ্ছিত করতো। এভাবে দীর্ঘদিন চলার পর তার শরীর খারাপ হতে থাকে। কারণ তখনও শিশু বয়স পার করেননি তিনি। দিন দিন তার স্বাস্থ্যহানি বাড়তে থাকায় পরিবারের সদস্যরা তাকে ডাক্তার দেখালে জানতে পারেন তিনি গর্ভবতী। এমন অবস্থায় তার বোন ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ করলে ডাক্তার তাকে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেন। পরিবারের লোকজনও তার সন্তান জন্মের পর দত্তক দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে। এতে করে একপ্রকার বাধ্য হয়েই সন্তানকে দত্তক দেন তিনি। 
ধর্ষণের কথা কাউকে বললে তারা আমারকে ও পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলার এবং আমাদের বাড়িতে আগুন দেয়ার হুমকি দিতো। আমার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে পুলিশে যোগদান করার, কিন্তু ওই দু’জনের কারণেই আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। আমি স্কুলে যেতে পারিনি। আমি পড়াশোনাও করতে পারিনি।
ছবি: বিবিসি
ছবি: বিবিসি
ওই নারী জানান, সন্তান জন্মের পর তার মুখ দেখারও সুযোগ পাননি তিনি। অন্যদিকে, দুই যুবকের পরিবারের ভয়ে ধর্ষণের কোনো মামলা করেননি তারা। তিনি বলেন, 'ধর্ষণের কথা কাউকে বললে তারা আমাকে ও পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলার এবং আমাদের বাড়িতে আগুন দেয়ার হুমকি দিতো। আমার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে পুলিশে যোগদান করার, কিন্তু ওই দু’জনের কারণেই আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। আমি স্কুলে যেতে পারিনি। আমি পড়াশোনাও করতে পারিনি।' এদিকে সন্তান জন্ম দেয়ায় প্রতিবেশীদের রসাতলে পড়েন তারা। পরে ওই মর্মান্তিক স্মৃতি থেকে বাঁচতে রামপুর জেলায় পাড়ি জমায় পুরো পরিবার। ২০০০ সালে তিনি বিয়ে করেন এবং ফের সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু বিয়ের ৬ বছর পর তার স্বামী ধর্ষণের কারণ জানতে পেরে তাকে তালাক দেয়। আরও একবার জীবনযুদ্ধে পতিত হয়ে ঘরছাড়া হন তিনি। এরপর ছেলেকে নিয়ে তিনি বোনের বাড়িতে উঠেন।
ছেলের সন্ধান
তিনি তার প্রথম সন্তানের পরিচয় নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েন। ওই ছেলে যেখানে বড় হয়েছিল সেখানকার প্রতিবেশীরা ছেলেটিকে জানায় যে, সে তাদের আসল সন্তান নন। এভাবে চলার পর ছেলেটি একসময় সেখান থেকে সরে আসার চিন্তা করে। তাকে দত্তক নেয়া বাবা-মাও তাকে ফেরত পাঠাতে সম্মত হয়। ছেলেটি আসল মায়ের কাছে ফিরেই জানতে চান তার বাবা কে। কিন্তু তার বাবার কোনো নাম না থাকায় বন্ধুবান্ধবের নিকট উপহাসের শিকার হতেন ছেলেটি। যদিও ভারতীয় সমাজে এমনটা প্রায়শই ঘটে। 
তাহলে হয়তো আরও মানুষও তা করবে। এতে আমাদের অভিযোগ শক্তিশালী হবে এবং অভিযুক্তরা শাস্তি পাবে। সমাজে একটি বার্তা যাবে, অপরাধের কারণে সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবেই।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
এই যুদ্ধে লড়তে হবে এবং অভিযুক্তকে একটি শিক্ষা দিতে হবে। আপনি যদি ঘটনাটি নিয়ে কথা বলেন, তাহলে হয়তো আরও মানুষও তা করবে। এতে আমাদের অভিযোগ শক্তিশালী হবে এবং অভিযুক্তরা শাস্তি পাবে। সমাজে একটি বার্তা যাবে, অপরাধের কারণে সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবেই।
বাইরে বন্ধুবান্ধবদের কাছে ক্রমাগত অপমানিত হতে হতে ছেলেটি তার মায়ের সঙ্গে জোর খাটাতে শুরু করেন। কয়েক বছর জোরাজুরির পর তার মা তাকে সামলাতে না পেরে সব ঘটনা খুলে বলেন। ওই নারী ভেবেছিলেন ছেলে হয়তো শোনার পর মাকে কলঙ্কিত করবে কিংবা ছেড়ে যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলেটি তার মাকে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ার অনুরোধ জানায়। ছেলেটি তার মাকে বলেন, ‘এই যুদ্ধে লড়তে হবে এবং অভিযুক্তকে একটি শিক্ষা দিতে হবে। আপনি যদি ঘটনাটি নিয়ে কথা বলেন, তাহলে হয়তো আরও মানুষও তা করবে। এতে আমাদের অভিযোগ শক্তিশালী হবে এবং অভিযুক্তরা শাস্তি পাবে। সমাজে একটি বার্তা যাবে, অপরাধের কারণে সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবেই।' 
ন্যায়ের জন্য লড়াই
ছেলের অনুপ্রেণায় ওই নারী ২০২০ সালে ফের শাহজাহানপুর ফিরে যান। সেখানে গেলে তিনি মামলার প্রস্তুতিকালে বেশ বিপাকে পড়েন। অনেক আগের ঘটনা হওয়ায় পুলিশ তার অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। আইনজীবীরাও তিন দশক আগেকার ধর্ষণের মামলা নিয়ে কাজ করতে চাননি। এমনকি তিনি যে বাড়িতে বসবাস করতেন সেটিও খুঁজে পাননি। সবাই যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন তিনি একজন আইনজীবীর সন্ধান পান। প্রাথমিকভাবে তার আইনজীবীর প্রশ্ন ছিল, 'আপনি কীভাবে প্রমাণ করবেন যে আপনি তিন দশক আগে যেখানে থাকতেন এবং সেখানেই আপনাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল?' তার এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই নারী তাকে বলেন, 'আমরা আপনার কাছে প্রমাণ আনব, আপনি আমাদের মামলাটি নিন।'
আপনি কীভাবে প্রমাণ করবেন যে আপনি তিন দশক আগে যেখানে থাকতেন এবং সেখানেই আপনাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল?' তার এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই নারী তাকে বলেন, 'আমরা আপনার কাছে প্রমাণ আনব, আপনি আমাদের মামলাটি নিন।
ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
'তারা আমাকে চিনতে পেরেছিল এবং আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল কেন তুই এখনও মরিসনি? পরে আমি বললাম, এখন তোদের মরার পালা।
একপ্রকার সন্দিহান থেকেই মামলাটি নেন ওই আইনজীবী। তিনি একটি আপিল দায়ের করেন এবং শাহজাহানপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে ২০২১ সালে মার্চ মাসে দুই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা করা হয়। পুলিশ তাদের খুঁজে বের করতে ওই নারীর সাহায্য চান। এই কাজে তিনি সফলও হন! ওই দুই ভাইয়ের সন্ধান পেয়ে ফোন কল করেন তিনি। ফোনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'তারা আমাকে চিনতে পেরেছিল এবং আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল কেন তুই এখনও মরিসনি? পরে আমি বললাম, এখন তোদের মরার পালা।' 
প্রমাণ ও গ্রেফতার
প্রাথমিকভাবে অভিযুক্তদের খুঁজে পাওয়া গেলেও তাদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নিরুপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত ডিএনএ পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এটি জানা কথা যে, এখন ধর্ষণ প্রমাণের জন্য এটি শেষ ও সর্বোত্তম পন্থা। এই প্রসঙ্গে শাহজাহানপুরের সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ (এসএসপি) এস আনন্দ বিবিসিকে বলেন, 'এই মামলাটি ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। মহিলাটি এখানে এসে মামলা দায়ের করায় আমরা বেশ অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু আমরা তার ছেলের ডিএনএ নমুনা নিয়েছি।’ এক বছর ধরে মামলার তদন্তকারী পরিদর্শক ধর্মেন্দ্র কুমার গুপ্তা বলেন, 'আমরা অভিযুক্তদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করি এবং তা পরীক্ষা করি। এর মধ্যে, একজনের সঙ্গে ছেলের ডিএনএ নমুনার সাথে মিলে যায়।' 
আমরা অভিযুক্তদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করি এবং তা পরীক্ষা করি। এর মধ্যে, একজনের সঙ্গে ছেলের ডিএনএ নমুনার সাথে মিলে যায়।
ধর্মেন্দ্র কুমার গুপ্তা
ছবি: নিউজ ট্র্যাক
ছবি: নিউজ ট্র্যাক
মানুষ চুপ করে বসে থাকে। আমিও চুপচাপ বসে বসে ভাবতাম আমার ভাগ্যে এটাই লেখা ছিল হয়তো। কিন্তু এমন কিছু নেই। আমাদের অবশ্যই পুলিশের কাছে যেতে হবে যাতে অন্য কেউ যাতে এমনভাবে সহিংসতার শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। আমার ছেলে এই কাজে বেশ খুশি।
ডিএনএ রিপোর্ট পাওয়ার পর অভিযুক্ত দুই ভাইকে গ্রেফতারে নেমে পড়েন পুলিশ। শাহজাহানপুর থানার বরাত দিয়ে জানা যায়, গত ৩১ জুলাই একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে গত ১০ আগস্ট আরেকজনকে পুলিশি হেফাজতে নেয়ার কথা জানায় তারা। শিগগিরই তাদের বিচার কাজ শুরু করবে আপিল বিভাগ। লোমহর্ষক এই ধর্ষণের বিচার হলে ভারতের ইতিহাসে অনন্য এক নজির সৃষ্টি হবে। কারণ ৩ দশক আগে মাত্র ১২ বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণ করে বিচার পাওয়ার ইতিহাস এর আগে কখনও দেখা যায়নি। অভিযুক্তরা গ্রেফতার হওয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ওই নারী বিবিসিকে বলেন, 'মানুষ চুপ করে বসে থাকে। আমিও চুপচাপ বসে বসে ভাবতাম আমার ভাগ্যে এটাই লেখা ছিল হয়তো। কিন্তু এমন কিছু নেই। আমাদের অবশ্যই পুলিশের কাছে যেতে হবে যাতে অন্য কেউ যাতে এমনভাবে সহিংসতার শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। আমার ছেলে এই কাজে বেশ খুশি।'
তথ্যসূত্র: অনন্ত জাননে/বিবিসি

আন্তর্জাতিকবিশেষ প্রতিবেদনভারত
আরো পড়ুন