Link copied.
জাতীয় সংসদ ভবন: ঐতিহাসিক যে তথ্যগুলো আপনার কাছে অজানা
writer
১৪ অনুসরণকারী
cover
পঞ্চাশের দশকের শেষদিকের কথা। সে সময় পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মূল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে। পশ্চিম পাকিস্তান সরকার প্রশাসনিক কাজের বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে করাচির পর পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় আরেকটি রাজধানী স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে ঢাকার শেরে বাংলা নগরে পাকিস্তানের দ্বিতীয় সংসদ ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। পরের দুই বছর চলে যায় জমি অধিগ্রহণের কাজে। বর্তমান মানিক মিয়া এভিনিউ-এর উত্তর পার্শ্বে ২০৮ একর জমি সংসদ ভবন কমপ্লেক্স প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়। ভবনটির মূল পরিকল্পনা পাশ করা হয় ১৯৬২ সালে। 

তখনকার পাকিস্তান সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে দায়িত্ব দেন। তিনি বৃহৎ এই প্রকল্পে বিদেশী অভিজ্ঞ স্থপতির সাহায্য কামনা করেন। খ্যাতনামা কয়েকজনকে প্রস্তাবও দেয়া হয়। তবে সময় কিংবা ব্যস্ততার কারণে তারা আগ্রহ দেখান নি। পরে মাজহারুল প্রস্তাব করেন আরেক বিখ্যাত এস্তোনিয়ান স্থপতি লুই কানকে। কান মাজহারুলের প্রস্তাবে রাজি হলেন। শুরু হল খসড়া নকশা প্রণয়নের কাজ। ১৯৬২ সালের মার্চে কানকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব দেয়া হয়। সে বছরই চূড়ান্ত নকশা তৈরি হয়। 

cover
আচ্ছা, লুই কানকে চেনেন তো? কানের জন্ম এস্তোনিয়ায়, ১৯০১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী। দরিদ্র ইহুদি পরিবারের সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই অভাব ছিল কানের নিত্য সঙ্গী। উপার্জনোর নানা পথও তাই বেছে নিতে হয়েছিল তাঁকে। পুড়ে যাওয়া কয়লার কাঠি দিয়ে ছবি এঁকে সেটি বিক্রি করতেন তিনি। শিশু বয়সেই কানের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসে। তাঁর পড়াশোনার সিংহভাগ তাই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই। ১৯২৪ সালে কান ফিলাডেলফিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ প্যানস্যালভানিয়া থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। পরে তিনি ইউরোপ পাড়ি দিয়ে আর্কিটেকচারাল মনুমেন্টের উপর পড়াশোনা করেছেন।

১৯৪৭ সালে তিনি অধ্যাপনা পেশায় নিযুক্ত হন, যোগ দেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেকচার বিভাগে। প্রথমবারের মত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রজেক্টে হাত দিন এরপরই। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট গ্যালারি নকশা করার দায়িত্ব পড়ে তাঁর কাঁধে। ১৯৫৭ সালে কান অধ্যাপক পদেই যোগ দেন তাঁর নিজের পড়াশোনা করা বিদ্যাপীঠ ইউনিভার্সিটি অফ প্যানস্যালভানিয়ায়। ১৯৭৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই পদেই ছিলেন তিনি। পাশাপাশি নিয়মিত বিভিন্ন স্থাপনার নকশা করতে থাকেন কান। ফিলাডেলফিয়ার রিচার্ড মেডিক্যাল ল্যাবরেটরি নকশার মাধ্যমে তিনি প্রথম খ্যাতি অর্জন করেন। 
cover
প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কান স্থাপত্য নকশায় এমন একটি স্টাইল তৈরি করেছিলেন যা স্মৃতিচিহ্ন তৈরির ক্ষেত্রে নতুন একটি ধারা প্রবর্তন করে। লুই কানের নকশায় সৃষ্ট স্থাপনারগুলো আধুনিকতার বাইরেও স্মারক হিসাবে বিবেচিত হয়। নিখুঁতভাবে নির্মিত কাজের জন্য, স্থাপনার নতুন এক ধারা নিয়ে আসার জন্য এবং শিক্ষকতায় পেশায় তাঁর অনবদ্য একাগ্রতার কারণে কান হয়ে উঠেছিলেন বিংশ শতাব্দীর এক অন্যতম প্রভাবশালী স্থপতি।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপনার নকশা করা ছিল লুই আই কানের জীবনের শেষ কাজ। ১৯৬৪ সালে কানের নকশায় ২১৫ একর জায়গার উপর সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সংসদ ভবনটির নকশায় কান প্রাধান্য দিয়েছেন দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে। আধুনিক স্থাপত্য বিদ্যার প্রায় সকল সংযোজনই ছিল ভবনটিতে।  
cover
জাতীয় সংসদ ভবন স্থাপনার বিশালত্ব যে কাউকে মুগ্ধ করবে। মার্বেল পাথর সংযুক্ত কংক্রিটের বাইরের দেয়ালের মাঝে মাঝে রয়েছে নিখুঁত জ্যামিতিক আকৃতির প্রবেশদ্বার। বৃত্তাকার ও আয়তাকার আকৃতির কংক্রিটের ডিজাইন ভবনটিকে করে তুলেছে স্হাপনার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। ভবনের একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে ৩৫৪ আসন বিশিষ্ট সংসদের অধিবেশন কক্ষ, যেখানে সংসদ সদস্যগণ পার্লামেন্টে বসেন। সমকেন্দ্রিক নকশার মূল হলরুমকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অংশগুলো গড়ে উঠেছে। ছাদ দিয়ে প্রবেশ করা সূর্যের আলো সাত তলা উঁচু গোলাকার মূল হলরুমটিকে আলোকিত করে রেখেছে।

মূল ভবনের চারবাহু বরাবর চার কোণে অন্যান্য কাজের জন্য রয়েছে চারটি একই ধরনের অফিস ব্লক। যোগাযোগের জন্য রয়েছে বিভিন্ন প্রকার সিড়ির ব্যবস্থা। বর্গাকার নকশার হলেও এটি নিপুণ ভাবে অষ্টভুজাকৃতির মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। নয়তলা বিশিষ্ট হলেও অনুভূমিক যোগাযোগ রয়েছে মাত্র তিনটি তলায়।  

cover
ভবনের কোথাও কোনো কলাম রাখা হয় নি। নকশায় ভারসাম্য রাখতে কিছু ফাঁপা কলাম অবশ্য চোখে পড়বে। নির্মাণ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে কংক্রিট এবং ভেতরে ও বাইরের অংশে ব্যবহূত হয়েছে ঢালাই কংক্রিট। বিশাল ভবনের অসুবিধা এড়াতে মূল দেওয়ালে ফাঁক সৃষ্টি করা হয়েছে। ভবনের বাইরের দিকে জানালার ব্যবস্হাও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে তার জন্য অন্ধকার থাকে না ভবন।

ছাদ দিয়ে প্রবেশকৃত আলো বিভিন্ন জায়গাকে আলোকিত করেছে। ভবনটির নকশার কাজ কান কতটা একাগ্রতার সাথে করেছিলেন প্রমাণ পাওয়া যায় অ্যাসেম্বলি হলের মাঝখানে ছাতাসদৃশ অষ্টভুজাকৃতি ছাদের মাঝে। শুধু এই ছাদের নকশার জন্যই সুদীর্ঘ দশ বছর সময় ব্যয় করেন তিনি। প্রাকৃতিক আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এটি নিয়ে তিনি দীর্ঘ গবেষণা করেছেন।
cover
মূল ভবন কমপ্লেক্সটির নয়টি স্বতন্ত্র বিভাগে বিভক্ত। দক্ষিণ প্লাজার মূল প্রবেশ পথটি একটি প্রশস্ত সিঁড়ির আকারে ধীরে ধীরে ৬.২৫ মিটার উচ্চতায় উঠে গেছে। এর বেসমেন্টে রয়েছে পার্কিং এলাকা, তত্ত্বাবধায়ক এজেন্সির অফিস ও মূল ভবনের সুবিধাদি প্রদানের জন্য স্থাপিত বিভিন্ন ব্যবস্থা। একটি কৃত্রিম লেক ভবনের চার পাশের প্রাচীর ঘিরে আছে এবং এটি উত্তর ও দক্ষিণ প্লাজাকেও সংযুক্ত করেছে। সমস্ত ভবনটাকে মনে হয় যেন পানির উপরে ভেসে উঠেছে। এ এক অনন্য সৌন্দর্যের নজির।

সংসদ ভবনে প্রবেশের জন্য রয়েছে দক্ষিণের গ্র্যান্ড প্লাজা ও উত্তরে সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত বাগান ও ইউক্যালিপটাসের সারি শোভিত প্রেসিডেন্সিয়াল স্কয়ার। উত্তর প্রবেশ পথের দিকে রয়েছে একটি এ্যাম্পি থিয়েটার যেখানে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। উত্তর প্লাজা পেরিয়ে ক্রিসেন্ট লেকের পাশে রয়েছে একটি রাস্তা। 
cover
কমপ্লেক্সটির মধ্যে মূল সংসদ ভবনের সাথে অন্যান্য ভবনের সাথে রয়েছে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও সচিবদের হোস্টেল, অতিথি ভবন ও কমিউনিটি বিল্ডিং। প্রাথমিক নকশায় অবশ্য সুপ্রিম কোর্ট, প্রেসিডেন্টের বাসভবন ও মসজিদ অন্তর্ভুক্ত থাকলেও এক্ষেত্রে মূল ভবনের আকর্ষণ যাতে না কমে যায় সেদিকে দৃষ্টি দিয়ে নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। এতে এসব ভবনকে সরিয়ে সংসদ ভবন এলাকা থেকে দূরে নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত হয়।


১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নির্মাণাধীন প্রধান অবকাঠামোটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার ভবনের মূল নকশায় কোনো রকম পরিবর্তন না এনে ফের নির্মাণকাজ শুরু করে। শুরুতে কমপ্লেক্স নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ১৫ মিলিয়ন ডলার কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি যখন নির্মাণকাজ শেষ হয়, তখন সেই ব্যয় গিয়ে দাঁড়ায় ৩২ মিলিয়ন ডলারে। প্রতি বছর পুরো কমপ্লেক্সের রক্ষণাবেক্ষণে খরচ হয় পাঁচ কোটি টাকা। 

নবনির্মিত সংসদ ভবনে সংসদের অধিবেশন শুরু হয় ১৯৮২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। সংসদ ভবনকে আধুনিকীরণে সম্প্রতি উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা হয়েছে মূল নকশার কপি। লুই কানের নকশা অনুযায়ী সংসদ ভবন এলাকাকে সাজানোর লক্ষ্যে ২৩৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর আওতায় ভবনের ভেতর আধুনিকীকরণ ও বৈদ্যুতিক কাজও করা হবে। এ ছাড়া গণপূর্ত কর্মচারী ও সংসদ ভবনের নিরাপত্তারক্ষীদের জন্য মনিপুরীপাড়ায় খেজুরবাগানসংলগ্ন এলাকায় ৯ তলার দুটি ভবন নির্মাণ করা হবে। জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক দৃষ্টান্ত স্হাপনকারী নিদর্শন হয়ে থাকুক।  

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021