Link copied.
সমুদ্র দূষণ : সমুদ্রের মিলিয়ন টন দূষিত বর্জ্য অপসারণ করে ইতিহাস সৃষ্টি করছে যারা!
writer
অনুসরণকারী
cover
আমরা ছোটবেলা থেকেই পড়ে আসছি এই পৃথিবীর ৭০ ভাগ পানি, ৩০ ভাগ স্থল। আদিমকালে মানুষ নদীর পাড়েই তাদের সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু সাগর কেন্দ্রিক সভ্যতার গল্প খুব কম। কারণ এই সাগর বা সমুদ্র তাদের কাছে খুব অজানার বিষয় ছিলো। মানুষ অজানা জিনিসকে ভয় পায়, সেইভাবে মানুষ সাগরকেও ভয় পেতো শ্রদ্ধা করতো। নর্ডিক পুরাণে আমরা দেখতে পাই যে সাগরকে তারা ঈশ্বরও ভাবতো। ভাইকিংসরা তাদের অভিযানের আগে সাগরের দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলিদান করতো যাতে সাগর শান্ত থাকে। বিজ্ঞান যত এগিয়েছে মানুষের সেই ভয় কমেছে। ভয় কমতে কমতে এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যে, সাগর এখন একটি ময়লার ভাগাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাগরের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহোরণ করতে করতে মানুষ প্রকৃতির চেক এন্ড ব্যালেন্স নষ্ট করে ফেলেছে। যেটা মানবজাতির অস্বিত্ব সংকটে ফেলে দিয়েছে।

cover
সেই দূষণগুলো সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছে মানুষ এখন। তবে সেটিও বেশি আগের নয়, ৭০ এর দশকে বিশ্বে দেশগুলো বুঝতে পারে যে সমুদ্রে কেমিক্যাল, তেজস্ক্রিয়, শিল্পকারখানা, ঘরোয়া বর্জ্য যেভাবে মুক্ত হচ্ছে সেটার একটা লাগামটানা দরকার। সেজন্য ১৯৭৫ সালে লন্ডন কনভেনশনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আরো দেশগুলো বৈঠকে বসে। তারা একমত হয় যে, সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণ করা উচিত এবং পরবর্তিতে লন্ডন প্রটোকলে সেই বিষয়ে আরো বিস্তারিত সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় যে, সমুদ্রে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় নি।

সমুদ্রে এখনো প্রতিবছর ৮০ লক্ষ টন বর্জ্য ফেলা হয়। এবং এই দিকদিয়ে সবারচেয়ে এগিয়ে আছে চীন। শুধুমাত্র বর্জ্য দুষণ সমুদ্রের বারোটা বাজাচ্ছে তাই নয়, কেমিক্যাল, আলো, শব্দ এই দূষণগুলোও বাস্তুসংস্থানের উপর প্রচন্ড প্রভাব ফেলছে। এই বিষয়ে ছোট করে একটু আলোচোনা করতে হবে।
cover
আমরা কৃষি ক্ষেত্রে রাসায়নিক সার ব্যবহার করি, যা অনেক সময় খাল নদীর মাধ্যমে গিয়ে সাগরে মিশে। এই রাসায়নিক সারের ক্ষুদ্রতম অংশগুলো পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দেয়, যার জন্য সামুদ্রিক জীবগুলোর অস্তিত্ব বিলীন হয়। এমনও দেখা গেছে রাসায়নিক সার DDT এর অংশ, আমেরিকান বাল্ড ঈগলের পেটে পাওয়া গেছে, যার কারণে তাদের সংখ্যা বিলুপ্তের পথে চলে গিয়েছে। এছাড়াও প্রতিবছর সাগরে তেলের ট্যাংকার ডুবি হয়। সেই তেল সাগরে ছড়িয়ে পড়লে, সামুদ্রিক মাছ, পাখির উপর মারাত্নক প্রভাব ফেলে। সাগরের আশপাশে গড়ে ওঠা শহরের আলো, মাছেদের বংশ বৃদ্ধিতে বিরুপ পরভাব ফেলে, এজন্য উপকূল অঞ্চলে মাছের সংখ্যা দ্রুত কমছে।

এছাড়া সাগরের তলদেশে ড্রেসিং, সোনার যন্ত্র, স্ক্যানার এগুলোর শব্দ , মাছেদের যোগাযোগের উপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ডলফিনসহ অনেক মাছ, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে খুবই কম কম্পাংকের শব্দ তরঙ্গ দিয়ে। তবে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি করে প্লাস্টিক বর্জ্য, কারণ এই বর্জ্য গুলো রোদে পুড়ে, এমন অবস্থায় দাঁড়ায় যে, সামুদ্রিক মাছ এবং পাখিরা একে প্রাকৃতিক খাদ্য মনে করে খেয়ে ফেলে, যেটা পরবর্তীতে তাদের হুমকির মুখে ফেলে দেয়। পরিবেশবাদী সংগঠন গুলো এখন উঠে পড়ে লেগেছে এই বর্জ্য অপসারণের জন্য। অনেক গুলো সংস্থান কাজ করছে। আজকে আমরা জানবো 4ocean নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাজ যারা এই পরিষ্কার করার কাজটাকে আরো উঁচু জায়গায় নিয়ে গিয়েছে।
4ocean কি?
শুরুতেই বলেছি তারা সমুদ্রের বর্জ্য পরিষ্কারের কাজ করে। কিন্তু তারা কোনো অলাভজন প্রতিষ্ঠান না। তারা যেটা করে সেটা হচ্ছে তারা যেই বর্জ্য পরিষ্কার করে সেখান থেকে রি সাইকেল করে অনেক পণ্য বানায় যেগুলো বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করে এবং সেই অর্থের একটি বড় অংশ সমুদ্র পরিষ্কারের কাজে ব্যয় করে। 
cover
২০১৫ সালে মার্কিন যুক্ত্রাষ্ট্রের ফ্লোরিডার দুইজন সার্ফার Andrew Cooper and Alex Schulze ইন্দোনেশিয়ার বালিতে যান সার্ফিং করতে। ইন্দোনেশিয়ার বালি হচ্ছে সার্ফিং এর পীঠস্থান। তারা গিয়ে দেখতে পান যে সৈকতের বিশাল অংশ জুড়ে শুধু বর্জ্য এবং বর্জ্য। তারা পরে খবর নিয়ে জানতে পারেন ইন্দোনেশিয়ার সরকার এই বর্জ্য অপসারণের উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। বালির সৈকতেই দিনে ১০ টন বর্জ্য ভেসে আসে প্রতিদিন। চিনের পর ইন্দোনেশিয়াই সবচেয়ে বেশী বর্জ্য নিঃসরণ করে সমুদ্রে। তখনই তাদের মাথায় চিন্তা সে কিভাবে বর্জ্য অপসারণের জন্য একটা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো যায়।


cover
যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে তারা এই বিষয়ে চিন্তা করতে থাকে। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো কিভাবে মানুষকে বর্জ্যের উপর আকৃষ্ট করা যায় এবং সেখান থেকে একটা মুনাফা অর্জন করা যায়। চ্যারিটি সংগঠন গুলোকে দাতব্য সংগঠন গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা জন্য। ক্যুপার এবং এলেক্স এই নির্ভরশীলতা থেকেই বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিলেন।  অনেক পরিকল্পনার পর ২০১৭ সালে তারা 4ocean প্রতিষ্ঠিত করেন। তাদের চ্যালেঞ্জ ছিলো বছরে যে ৮০ লক্ষ টন বর্জ্য নিঃসরণ হয় সেগুলো অপসারণ করা। প্রতিষ্ঠার ছয় মাসের মধ্যে তারা ১০ লক্ষ পাউন্ড প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ করে।  
cover
মানুষ এটা বুঝতে পারে না যে, এই প্লাস্টিক গুলো আসলে পুরো বিশ্ব ভ্রমণ করে এসে অন্য একটি উপকূলে জমা হয়। এবং সেগুলোর কোনো ধ্বংস হয় না।
আলেক্স
তাদের প্রতিষ্ঠানের মূলধন ছিলো মাত্র আড়াই হাজার ডলার। প্রথম দিন তারা ২০ টি ব্রেসলেট বিক্রি করতে পেরেছিলো। সেই অবস্থান থেকে এখন তার প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য তারা বিক্রি করেছে। যার মধ্যে রয়েছে ব্রেসলেট, ক্যাপ, টিশার্ট, ডিসপজেবল প্লাস্টিক সামগ্রী। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে তাদের আয় তাদের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে দিচ্ছে। তারাও তাদের ব্যয় বাড়াচ্ছে। বর্তমানে 4ocean ফ্লোরিডা, বালি, হাইতিতে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। তারা এখন সেখান থেকে শ্রীলংকা, ভারত, থাইল্যান্ড সেখানেও কার্যক্রম পরিচলানা করতে যাচ্ছে। তাদের আয়ের ৪০ শতাংশ তারা ব্যয় করে তাদের ক্লিন আপ অপারেশন্সে।

১০% তারা অন্যান্য পরিবেশবাদী সংগঠন গুলোকে দেয়, যারা সামুদ্রিক সংস্কারের সাথে যুক্ত, যেমন Coral Restoration Foundation এবং Project Aware । মুনাফার বাকি অংশ তারা বিনিয়োগ করে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য। এলেক্স বলেন ,‘মানুষ এটা বুঝতে পারে না যে, এই প্লাস্টিক গুলো আসলে পুরো বিশ্ব ভ্রমণ করে এসে অন্য একটি উপকূলে জমা হয়। এবং সেগুলোর কোনো ধ্বংস হয় না।’
4ocean এর পরবর্তী লক্ষ্য হচ্ছে ১০ মিলিয়ন টন বর্জ্য অপসারণের। তারা দেখেছে এই পৃথিবীর ৯১ শতাংশ প্লাস্টিক পুর্নব্যবহার হয় না। এই রিসাইকেলিং প্রক্রিয়াকে আরো উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাদের মতো আরোও অনেক সংগঠন আছে যারা আরোও আগে থেকে এই কাজ করে আসছে, কিন্তু তারাই সর্বপ্রথম এই বিষয়টাকে একটি ব্যবসায়িক রূপ দিতে পেরেছে। যার জন্য ইতিহাস তাদের নাম সারাজীবন মনে রাখবে। 
cover
আজ ৮ ই জুন বিশ্ব সমুদ্র দিবস। কয়েকদিন আগেও সমুদ্রের প্রলয়ঙ্কারী রূপ আমরা দেখেছি। জলবায়ু পরিবর্তন, সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান এর ধ্বংসের মূল্য আমাদেরই চুকাতে হবে, বিশেষ করে এই উপকূলীয় ব দ্বীপ বাংলাদেশ নিমজ্জিত হয়ে যাওয়ার উপক্রম তৈরী হয়েছে। ব্লু ইকোনমির উপকার পেতে গিয়ে সমুদ্রর যেনো খুব বেশী ক্ষতি না করি সেটা দেখার দায়িত্ব আমাদের সকলের। আমরা যদি সরাসরি সাহয্য না করতে পারি, এই দেশেও 4ocean এর মতো সংগঠন রয়েছে তাদেরকে যেনো সাহয্য করি। 
তথ্যসূত্রঃ

  • https://www.cnbc.com/2018/09/07/4oceans-cleaned-up-1-million-pounds-of-ocean-garbage.html
  • https://www.nationalgeographic.com/environment/article/critical-issues-marine-pollution?fbclid=IwAR3j
  • https://www.4ocean.com/pages/our-story?fbclid=IwAR2SYyrrlsdp75bhotKUFutNxPI4Y9fwMOfI_FUIoBVX-qHvWHArmUBdveI
  • https://www.nature.com/articles/s41467-018-03104-3?fbclid=IwAR03ZQhDzPb7aJNBLiy9clMTQpoU5_MdrJoKZinv5V1KGGn8OR4KSuTm4gY

Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021