Link copied.
হারিয়ে যাওয়া মসলিনের সুদিন কীভাবে ফিরে এলো?
writer
১৬ অনুসরণকারী
cover
সতেরো শতকে একটি মসলিন তৈরিতে একজন তাঁতি ও তার সহকারীর ছয় মাস সময়ের প্রয়োজন হতো। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী তাতে নকশা, ফুল কিংবা অন্যান্য অনুষঙ্গ জুড়ে দিতে আরো বেশি সময়ের দরকার ছিল। আভিজাত্যের প্রতীক, বিশেষ করে মোঘল সম্রাট এবং তার পরিবার পরিজনদের বিশেষভাবে সে কাপড় তৈরি করার রেওয়াজ ছিল। একটা সময় বিলুপ্তই হয়ে গিয়ে ছিল সে কাপড়। ১৭০ বছর পর আবার ফিরছে সে কাপড়ের সুদিন। 

মসলিনের তৈরি প্রক্রিয়া ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও নাম এসেছে মসুল শব্দ থেকে। এই মসুল আবার ইরাকের অন্তর্গত বিখ্যাত এক ব্যবসা কেন্দ্র। ঢাকাই মসলিনের উল্লেখ মোঘল আমলের আগে পাওয়া যায় না। তাই বলে এর আগে যে মসলিন তৈরি হতো না, এমন নয়। প্রাক মুসলমান যুগ থেকেই এ অঞ্চলে অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং মিহিবস্ত্র তৈরি হতো। এর পর নানান সময়ে ইতিহাসের নানান বিবরণে এমন বস্ত্র তৈরি এবং এর প্রশংসার কথা পাওয়া যায়। সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থাপিত হয়। এরপর থেকেই ইউরোপীয় বণিকদের আগমণ ঘটতে থাকে ঢাকায়। তাদের প্রশংসা পেতে শুরু করে ঢাকাই মসলিন।

cover
১৮০০ সালে জন টেলর নামে একজন ঢাকায় ইংরেজ বাণিজ্য বিষয়ক কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। তার বর্ণনায় প্রথমবারের মত ঢাকাই মসলিন সম্পর্কে বিশদ তথ্য পাওয়া যায়। তাঁর বর্ণনায় এসেছে, তখনকার সময়ে ঢাকার আশেপাশের প্রত্যেক গ্রামেই কম-বেশি তাঁতের কাজ চলত, তবে উৎকৃষ্ট ধরণের মসলিন তৈরির জন্য নির্দিষ্ট কিছু স্হান বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল। এর মধ্যে ঢাকার কেন্দ্র, সোনারগাঁ, ধামরাই, তিতাবাদি, জঙ্গলবাড়ি ও বাজিতপুরের কথা আলাদা করে বলেছেন টেলর। 

সে সময় মসলিন সংগ্রহের জন্য মোগল সম্রাট থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী মহলের অনেকেই ঢাকায় তাদের এজেন্ট নিয়োগ করতেন। তবে টেলর যে সময় কর্মরত ছিলেন, সে সময়টা ঢাকার মসলিন শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথেই ছিল। তবু তখনও সাড়ে সাতশো ঘর তাঁতি পরিবার যুক্ত ছিল মসলিন তৈরিতে, এর মধ্যে ৩০০ পরিবারই সোনারগাঁয়ে ছিল। সোনারগাঁয়ে মসলিন তৈরির কাজ মূলত করতো মুসলমান তাঁতিরাই। এর উল্টো চিত্র ছিল ধামরাইতে, সেখানে মসলিন তৈরি করতো হিন্দু কারিগররা। 
cover
মসলিন শিল্প রাজা-বাদশাহ ও আমীর ওমরাহদের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এত উন্নতি লাভ করতে পারতো না। একইসাথে মসলিনের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পেছনেও মোগল বাদশাহদের মুখ ফিরিয়ে নেয়াকে দায়ী করা হয়ে থাকে। তাই এ কথা মেনে নেয়াই যায় যে, যেসব স্থানে রাজশক্তির শাসন কেন্দ্র ছিল, সে সব স্থানে মসলিন শিল্প উন্নতি লাভ করেছিল। 
 
যে কোনো বস্ত্র বয়নের তিনটি স্তর আছে। কার্পাস সংগ্রহ, সুতা কাটা এবং কাপড় বয়ন। ঢাকাই মসলিনের অনন্য এক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, কার্পাস উৎপাদন থেকে শুরু করে কাপড় তৈরি হওয়া পর্যন্ত সকল স্তরেই ঢাকা স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল, মসলিন তৈরি সংশ্লিষ্ট কোনো কাজেই বিদেশের উপর নির্ভরশীল হতে হয় নি এদেশের কারিগরদের।  

cover
কার্পাস উৎপাদনের পরের স্তর সুতা কাটা। এর জন্য বীজসহ কার্পাসকে প্রথমে পরিষ্কার করে পরে তুলা বের করে নেয়া হতো। কার্পাস পরিষ্কারেও বেশ নিপুণতার পরিচয় দিতেন কারিগররা। জেনে হয়ত অবাকই হবেন, বোয়াল মাছ ব্যবহার করা হতো কার্পাস পরিষ্কারে। কার্পাসের উপর বোয়াল মাছের চোয়ালের দাঁত খুব ধীরে ধীরে চালিয়ে এমন ভাবে পরিষ্কার করা হতো যাতে তুলা নষ্ট না হয়, আবার সঙ্গে সঙ্গে তুলার সাথে মিশে থাকা পাতা, ডাঁটা কিংবা নানান আবর্জনা বের করে ফেলাও সম্ভব হয়। এই কাজে মুগ্ধ হয়েছিলেন সে সময়ের ইংরেজ লেখকরা। 

এরপর সুতা তৈরি করা হতো। এই কাজ সাধারণত আধাবয়সী মেয়েরাই করতো। কারণ সূক্ষ্মতম সুতা কাটার জন্য দুইটি বিশেষ গুণের দরকার ছিল। এক, প্রখর দৃষ্টিশক্তি। দুই, হাতের আঙুলের প্রখর চেতনা শক্তি। কারণ, সে সময় সুতার সূক্ষ্মতা মাপার বৈজ্ঞানিক কোনো উপায় জানা ছিল না কারিগরদের। তাই এই ব্যবস্হাতেই অভ্যস্ত ছিল তারা। 
cover
তবে এই সূক্ষ্মতায় মাঝে মাঝে ইচ্ছে করেও ফাঁকি দিতেন কারিগররা। উপযুক্ত পারিশ্রমিক না পাওয়ায় ঢাকার মসলিন শিল্পীরা মাঝে মাঝে কম সূক্ষ্ম সুতা ব্যবহার করে ক্রেতাকে ফাঁকি দিয়ে কিছুটা মুনাফা হাসিল করে নিত। একমাত্র মোগল সম্রাট ও বাংলার নওয়াবের জন্য প্রস্তুত মসলিন ছাড়া আর সকল ক্ষেত্রেই তাঁতিরা কম-বেশি ফাঁকি দিত। এই ব্যাপারটা অন্য কারো পক্ষে ধরে ফেলাটা সহজও ছিল না সে সময়। 

এরপর আরও কয়েকটি স্তর আছে মসলিন প্রস্তুতের। যেমন, সুতা নাটান, টানা হোতান, সানা বাঁধা, নারদ বাঁধা, বু-বাঁধা এবং কাপড় বুনা। এরপরও যে মসলিন তৈরির কাজ শেষ হয়ে যেতো, এমনটা নয়। মসলিন রপ্তানি হওয়া পর্যন্ত আরও কয়েক স্তরের কাজ ছিল। যেমন, ধোওয়া, সুতা সুবিন্যস্ত করা, রিপু করা, ইস্ত্রি করা, রং করা, সূঁচের কাজ করা এবং গাইট বাঁধা। এই স্তরগুলোর কাজ সম্পাদনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কারিগর নিযুক্ত থাকতো। রপ্তানি উপযোগী হলে পরে কাপড়সমূহ কলকাতা হয়ে ইংল্যান্ডে রপ্তানি করা হতো। 
cover
সাধারণত একখানি মসলিন ২০ গজ লম্বা ও এক গজ চওড়া ছিল। মসলিনের মূল্য নির্ধারণের সময় তার ওজন, দৈর্ঘ্য ও সুতার সংখ্যা বিচার করা হতো। যে কাপড় যত বেশি দীর্ঘ এবং যত বেশি সংখ্যক সুতা বিশিষ্ট হয় অথচ ওজনে কম হয়, সেই কাপড়ই সূক্ষ্মতম এবং উৎকৃষ্টতম বিবেচিত হতো এবং তার মূল্যও সর্বোচ্চ নির্ধারিত হতো। 

আমরা আবার মসলিনের ইতিহাসে ফিরতে চাই। মসলিন সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলেই প্রথমে মলবুস খাস্ বা মোগল বাদশাহদের জন্য তৈরি খাস মসলিনের কথা এসে পড়ে। বাংলার সুবেদাররা মোগল বাদশাহদের কাছে উপঢৌকন হিসেবে মসলিন পাঠাতেন। 

ঢাকাই মসলিনের রপ্তানি বাণিজ্যে বিদেশি বণিকদের বিশেষ প্রাধান্য ছিল। সতেরো শতকের প্রথম দিকে পর্তুগিজেরা মসলিনের ব্যবসায় লিপ্ত ছিল এবং পরবর্তীতে আর্মেনিয়ান, ইরানি, তুরানি, মোঘল এবং পাঠান বণিকেরাও যুক্ত হয় মসলিনের ব্যবসায়। আঠারো শতকে ওলন্দাজ কোম্পানি দেশি এজেন্টদের সাহায্যে ঢাকার মসলিন সংগ্রহ করে বিদেশে চালান দিত। ১৭৪৭ সালের এক হিসেব বলছে, দিল্লীর বাদশাহ থেকে শুরু করে বিদেশি বণিক - এদের সকলে মিলে প্রায় সাড়ে আটাশ লক্ষ টাকার মসলিন সংগ্রহ ও রপ্তানি করেছিল সে সময়, টাকার বর্তমান বাজারমূল্যে যা অবিশ্বাস্য একটা পরিমাণ। এটা শুধু এক বছরের হিসেব। 
cover
মসলিনের ব্যবসাতে মধ্যস্বত্ব ভোগীদের কথাও আলাদা করে এসেছে ইতিহাসের নানান সূত্রে। দালাল কিংবা পাইকাররা মসলিনের ব্যবসা থেকে ভালোই মুনাফা পেত। রামনারায়ণ নামে একজনের কথা বলি। তিনি সে সময় ২৪ হাজার টাকা পর্যন্ত মসলিনের দালালী নিতেন, এটাই ছিল সমসাময়িক সময়ের সবচেয়ে বেশি টাকার দালালী। দালালদের শতকরা ১৫ টাকা করে লাভ ছিল। বুঝে নিন তাহলে কী পরিমাণ মুনাফা করতো তারা। মাসে ৪০ টাকা কিংবা বছরে ৭-৮ হাজার টাকা আয় দেখে নিশ্চয়ই ভাবছেন অনেক কম আয়? ইতিহাস বলছে, সে সময় মাসে ৪০ টাকা আয় যাদের ছিল, তাদের আয় জীবিকা নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত না হলেও সন্তোষজনক ছিল। আর যাদের ৬০০-৬৫০ টাকা আয় ছিল তাদের তো রীতিমতো উচ্চ শ্রেণীভুক্ত করা হতো।  

কিন্তু মসলিনের মূল কারিগর যারা তাদের অবস্হা ছিল বেশ নাজুক। ১৭৬০ সালে একজন সাধারণ তাঁতির মাসিক বেতন ছিল এক থেকে দেড় টাকা। ১৮০০ সালে কিছুটা বেড়ে হয় ২-৩ টাকা। সে সময় টাকায় প্রায় সোয়া মণ চাউল পাওয়া যেত। তবে পরিবারগুলো একান্নবর্তী হওয়ায় তাদের বেশ কষ্টেই চলতো এত কম আয়ে। তাই বলা যায়, বিদেশি বণিক, দালাল বা পাইকাররা মসলিন শিল্প থেকে বেশ লাভবান হয়েছিল সে সময়। কিন্তু যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এই শিল্পকে উন্নতির পথে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের ভাগ্যে বিশেষ কিছুই জুটত না। আঠারো শতকের শেষ দিকে এসে মসলিনের রপ্তানি কমতে শুরু করে। ইংরেজ পরাক্রমশালীদের অত্যাচারে অনেক বিদেশি ব্যবসায়ী ঢাকার ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়। ১৮১৩ সালে মাত্র সাড়ে তিন লক্ষ টাকার মসলিন রপ্তানি হয় বিদেশে। চার বছর পর সেটি এক প্রকার বন্ধই হয়ে যায়। এরপরও ব্যক্তি পর্যায়ে মসলিন যেত বিদেশে। মসলিন শিল্পের ধ্বংস ঢেকে আনার পেছনে ইংরেজ কর্তৃক তাঁতিদের আঙুল কেটে নেওয়াকে দায়ী করা হয়। সোনারগাঁওয়ে এমন একটি পুকুরের কথা এসেছে, যেখানে মসলিন শিল্পীদের কাটা আঙুল নিক্ষেপিত হতো। তবে এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ মেলে নি। 


মসলিন শিল্পের পুর্নজাগরণ নিয়ে এরপর আর কাউকেই উদ্যোগ নিতে দেখা যায় নি। ঢাকাই মসলিনের শেষ প্রদর্শনী হয়েছিল লন্ডনে ১৮৫০ সালে। এর ১৭০ বছর পরে বাংলাদেশে আবার বোনা হলো সেই ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন কাপড়ের শাড়ি।  গেল বছরের শেষদিকে ঢাকাই মসলিনের জিআই স্বত্বের অনুমোদন পাওয়া গেছে। মসলিনের পুনর্জন্ম ঘটাতে গত ছয় বছর ধরে লেগে ছিলেন একদল গবেষক।  ২০১৪ সালের অক্টোবরে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মসলিনের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার কথা বলেন। এর পরই মসলিন নিয়ে কাজ শুরু হয়, গঠিত হয় বিশেষজ্ঞ গবেষণা কমিটি, নেয়া হয় বিশেষ প্রকল্প।  
উৎকৃষ্টতম মসলিনের জন্য কারিগররা সাধারণত ফুটী কার্পাসেই আস্থা রাখতেন। এই ফুটী কার্পাস গাছের খোঁজে হন্যে হয়ে দেশের নানান প্রান্তে যেতে হয়েছে গবেষক দলকে। গাজিপুরের এক গ্রামে মেলে সেই গাছ। 

এরপর শুরু হয় আসল মসলিনের নমুনা সংগ্রহের কাজ। সেটিও হয়ে উঠেছিল দুঃসাধ্য এক কাজ। দেশের ভিতর কিংবা পাশ্ববর্তী দেশ ভারতেও খুঁজে মিলছিল না ঢাকাই মসলিনের এক টুকরো কাপড়। শেষমেশ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে লন্ডনে ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে গিয়ে মসলিনের দেখা পায় গবেষক দলটি। সেটি ছিল মসলিনের তৈরি একটি পাগড়ি। এরপর গাজীপুরে পাওয়া গাছটির সাথে মিলিয়ে দেখা হয় মসলিনের পাগড়িটি। প্রমাণ হয় এটিই সেই আসল ফুটী কার্পাস। 


cover
এরপরও বাঁধার দেয়াল এসেছে বার বার। তৈরি করতে হয়েছে সুতা কাটার জন্য চরকা। দুইজন তাঁতিকে দিতে হয়েছে বিশেষ প্রশিক্ষণ। অবশেষে তৈরি হয় মোট ছয়টি শাড়ি।এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। ছয় বছরে ব্যাপক ঘোরাঘুরি, কলকাতা–লন্ডন করেও খরচ হয়েছে সোয়া ৪ কোটি টাকার মতো। বরাদ্দের অবশিষ্ট প্রায় ৭০ শতাংশ টাকা সরকারের খাতে ফেরত দেওয়া হয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এই শাড়ি সর্বসাধারণের জন্য বাজারে আনা সম্ভব হতে পারে।  আমাদের ঢাকাই এই ঐতিহ্য আবার ফিরুক স্বমহিমায়, এমনটাই প্রত্যাশা।



Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021