Link copied.
আর্নেস্ট হেমিংওয়ে: একজন নোবেল জয়ীর আত্মহত্যার পেছনের অজানা গল্প!
writer
১৮ অনুসরণকারী
cover
‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ উপন্যাসের জন্য ১৯৫৪ সালে নোবেল পেয়েছিলেন। লেখালেখি ছিল তাঁর অন্তপ্রাণ এক নেশা। ছিল যুদ্ধের প্রতি অসম্ভব টান। যুদ্ধক্ষেত্রই হয়ে উঠেছিল তাঁর আমরণ প্রেমিকা। ব্যক্তিগত জীবনে প্রেম যেমন তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নি (চার বার বিয়ে করেছেন), তেমনই তাঁকে স্থিতি দেয়নি যুদ্ধও। সে জন্য তাঁকে বিতর্কের মুখেও পড়তে হয়েছিল। এক জন যুদ্ধ সংবাদদাতা সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নিতে পারবেন না, জেনিভা কনভেনশনের এই নীতি লঙ্ঘন করেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কীভাবে তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্যারিস গিয়েছিলেন ও প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তা নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল প্রবল। বলছি আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কথা। সমৃদ্ধ এক জীবন ছেড়ে হুট করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে যিনি অবাক করে দিয়েছিলেন সকলকে। আজকের লেখায় আত্মহত্যার রহস্য উন্মোচন করার চেষ্টা করবো। 

১৮৯৯ সালের কথা। ডাক্তার ক্লারেন্স হেমিংওয়ে আর গায়িকা গ্রেস হেমিংওয়ের শিকাগোর ওক পার্কের বাড়িতে জন্ম নিয়েছিলেন আর্নেস্ট। ওক পার্ক এন্ড রিভার ফরেস্ট হাইস্কুলে পড়াশোনায় হাতেখড়ি হয় তার। ইংরেজী সাহিত্যের প্রতি তার অনুরাগ জন্মাতে থাকে স্কুলে পড়ার সময় থেকেই।

cover
তার লেখালেখির যাত্রা শুরু হয় সাংবাদিক হিসেবে। হাই স্কুলে পড়াকালীনই স্কুলের সংবাদপত্র ‘ট্রাপিজি এন্ড টাবুলা’ (Trapeze and Tabula) তে খেলাধুলা নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। পড়ালেখা শেষ করে ‘ক্যানসাস সিটি স্টার’ পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন হেমিংওয়ে।

১৯১৮ সাল। আমেরিকা ততদিনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধাহতদের সেবা দেওয়ার ছোট শহর ক্যানসাসে স্বেচ্ছাসেবীর খোঁজে আসা রেডক্রসের দলে যোগ দিলেন হেমিংওয়ে ইতালিতে। যুদ্ধাক্রান্ত ইতালির রাস্তাধরে রেডক্রসের অ্যাম্বুলেন্স চালাতে শুরু করেন হেমিংওয়ে। মর্টারে আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়েও অ্যাম্বুলেন্সে করে মরণাপন্ন যাত্রীদের পৌঁছে দিয়েছেন গন্তব্যে। আহত হেমিংওয়ে ছয় মাস হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ১৯১৯ সালের জানুয়ারী মাসে হেমিংওয়ে ফিরে এলেন আমেরিকায়।

লেখালেখির পাশাপাশি পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকেই বেছে নিয়েছিলেন হেমিংওয়ে। টরেন্টো স্টার নামক পত্রিকায় চাকরি নিলেন তিনি। টরেন্টো স্টারের ফ্রান্স প্রতিনিধি হিসেবে হেমিংওয়ে চলে এলেন প্যারিসে। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয় হেমিংওয়ের রচিত অন্যতম সেরা উপন্যাস ‘The Sun Also Rises’। পরের বছর লেখা শুরু করেন তার ছোট গল্প সংকলন ‘Men Without Women’। 

cover
১৯২৮ সালে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের বাবা ক্লারেন্স হেমিংওয়ে আত্মহত্যা করেন। বাবার মৃত্যুর খবরে অনেকটাই গুটিয়ে যান হেমিংওয়ে। বলেছিলেন, আমিও হয়তো এভাবেই চলে যাবো। বাবার মৃত্যুর পরে হেমিংওয়ের জীবনে বিশাল পরিবর্তন আসে। মদ্যপানের মাত্রা বাড়িয়ে দেন তিনি। বেশ কয়েকবার গুরুতর প্লেন ক্র্যাশ আর সড়ক দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেলেও মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন বয়ে বেড়িয়েছেন আজীবন। নিজের মনের সবটুকু শক্তি সঞ্চয় করে লেখালেখি চালিয়ে যান হেমিংওয়ে। সামনে থেকে দেখা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে তার লেখা উপন্যাস ‘এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে। বেস্টসেলার এই উপন্যাসের মধ্য দিয়েই আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করেন।

১৯৩৭ সালে হেমিংওয়ে স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারের রিপোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করেন। হেমিংওয়ে রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা শুরু করেন তার আরেকটি বিখ্যাত উপন্যাস ‘For Whom the Bell Tolls’, যেটি পরবর্তীতে পুলিৎজার পুরষ্কারের জন্যে মনোনীত হয়। ১৯৪০ সালে তিনি চলে আসেন কিউবা। 
cover
রাজধানী হাভানা থেকে খানিকটা দূরেই একটা বাগানবাড়ি কিনেছিলেন হেমিংওয়ে। উত্তাল সমুদ্রে মাছ শিকার করতে দারুণ পছন্দ করতেন হেমিংওয়ে। উত্তাল সমুদ্রে মাছ শিকারে যাওয়া জেলেদের নিত্যদিনের কাজের সাথে একটু একটু করে পরিচিত হচ্ছিলেন তিনি। কালজয়ী উপন্যাস ‘The old man and the sea’ এর উপাদানগুলোও সংগ্রহ করে চলছিলেন তিনি। তবে হেমিংওয়ে সাংবাদিকতার সাথে তখনও যুক্ত ছিলেন। ১৯৪১ সালে যখন চীন-জাপান যুদ্ধ চলছে, তখন মার্থা আর হেমিংওয়ে পাড়ি জমান চীনে যুদ্ধের খবর সংগ্রহের জন্য।

১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কালজয়ী সাহিত্যকর্ম ‘The Old Man and the Sea’। এই উপন্যাস দিয়েই পাঠকদের মনে স্থান করে নেন হেমিংওয়ে।
১৯৫৩ সালে এই বইয়ের জন্যই পুলিৎজার পুরষ্কার জিতে নেন হেমিংওয়ে। ১৯৫৪ সালে তাকে সাহিত্য নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। বেশ কয়েকবার দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে স্টকহোমে নোবেল পুরষ্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি হেমিংওয়ে। ১৯৬০ সালের ২৫ জুলাই হেমিংওয়ে কিউবা থেকে স্থায়ীভাবে আমেরিকায় ফিরে আসেন তিনি। আজীবন ওই দুর্দান্ত অ্যাডভেঞ্চারিজমের মধ্যেও কোথাও একটা ‘বিপন্ন বিস্ময়’ কাজ করত হেমিংওয়ের। তাই ১৯৬১ সালে নিজের শিকার করার বন্দুকের গুলিতে আত্মহত্যা করেছিলেন। উত্তরাধিকারসূত্রেই তিনি এই আত্মহত্যাপ্রবণ মানসিকতা পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়েও জল্পনা, বিতর্ক রয়েছে। 

হেমিংওয়েরই দীর্ঘদিনের বন্ধু অ্যারন এডওয়ার্ড হোচনার। পেশায় সম্পাদক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা হোচনার মনে করেন, মূলত দুটি কারণে হেমিংওয়ে আত্মহত্যা করেন। প্রথমত, তিনি মনে করেছিলেন যে তাঁর সৃষ্টিশীলতার সোনালি দিন আর নেই। সেইভাবে তিনি আর ফর হুম দ্য বেল টোলস অথবা দ্য সান অলসো রাইজেস–এর মতো উপন্যাস আর লিখতে পারছেন না বা পারবেন না। হোচনারের কাছেই হেমিংওয়ে তীব্র মনোবেদনা নিয়ে বলেছেন, লেখক হিসেবে তাঁর যে মিশন ছিল, সেটা তিনি আর পূর্ণ করতে পারবেন না। অথচ একজন লেখক লেখালেখি থেকে অবসর নেবেন অথবা লেখালেখি করবেন না, তা–ও তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। একজন লেখক লেখালেখিতে বিরতি দেবেন বা রিটায়ার করবেন, এটা হেমিংওয়ে ভাবতেই পারতেন না।

cover
আত্মহত্যার পেছনের দ্বিতীয় কারণটি আরও ভয়াবহ। কি বাড়িতে, কি গাড়িতে, সর্বক্ষণ হেমিংওয়ের পেছনে এফবিআইয়ের ফেউ লেগে থাকত। ফেউ মানে গোয়েন্দারা তাঁকে অনুসরণ করতেন। ফেউতাড়িত হেমিংওয়ের মনে ভয় ঢুকে গিয়েছিল যে এফবিআই গুপ্তহত্যা করে তাঁকে মেরে ফেলতে পারে।  গোয়েন্দাগিরির এ বিষয়টি হেমিংওয়ের জীবনযাপনকে অস্বাভাবিক করে তুলছিল। তিনি মানসিকভাবে ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। স্ত্রী মেরি নিজেই এই কথাগুলো হোচনারকে বলেছিলেন। হেমিংওয়ে, তাঁর স্বামী কেমন যেন হয়ে যাচ্ছেন আর স্ত্রী হিসেবে তিনি হেমিংওয়ের এই মানসিক বৈকল্যের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ওই ঘটনার এক মাসের মাথায় হেমিংওয়ে মিনেসোটার রচেস্টারের একটা হাসপাতালে মনোরোগের চিকিৎসা করানোর জন্য ভর্তি হন। এরপর দুবছরও যায়নি, মাথায় শটগান ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।  এফবিআইয়ের কাছ থেকে পাওয়া একটা ফাইল থেকে এ সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন চলছে। কিউবার রাজধানী হাভানায় হেমিংওয়ে। হাভানায় অবস্থিত মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্পারিলে বারডেনের সঙ্গে যুক্তি করে একটা পরিকল্পনা আঁটলেন। সেটা হলো কিউবাতে অবস্থিত যেসব স্প্যানিশ নাগরিক ফ্যাসিস্ট ফ্রাঙ্কো সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, তাঁদের ওপর নজরদারি করা। হেমিংওয়ে এই কাজের জন্য ‘দ্য ক্রুক ফ্যাক্টরি’ নামে একটা গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক স্থাপন করেন। সেখানে যেসব গুপ্তচরকে তিনি নিয়োগ দিয়েছিলেন, তাঁরা অন্য মার্কিন গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিয়ে হেমিংওয়ের কথামতো কাজ করতেন। হেমিংওয়ে প্রকৃতপক্ষে কার পক্ষে কী কাজ করছেন, সেটা অজানাই থেকে যেত। হেমিংওয়েকে মার্কিনরা মাসে এক হাজার ডলার বেতন দিত এবং তিনি বিপুল পরিমাণে জ্বালানি তেল পেতেন, যুদ্ধের সময় যা ছিল দুর্লভ।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেমিংওয়ের এই গুপ্তচরবৃত্তিকে অনেক গুরুত্ব দিতেন। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই মনে করত তিনি কমিউনিস্টদের প্রতি সহানুভূতিশীল একজন লেখক। ফলে তাঁর গুপ্তচরবৃত্তিকে সন্দেহের চোখে দেখত তারা। পাঠানো রিপোর্টকে গুরুত্ব দিত না। উল্টো এফবিআই ভেতরে ভেতরে হেমিংওয়ে সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করে। একবার তিনি একটা রিপোর্ট পাঠান যে কিউবার জলসীমায় শত্রুপক্ষের একটা সাবমেরিন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মার্কিন নৌবাহিনী থেকে যখন নিশ্চিত করা হলো এ রকম কিছু ঘটেনি, তখন হেমিংওয়ের গুপ্তচরবৃত্তির কাজটি তারা বন্ধ করে দেয়। 

স্প্যানিশ রিপাবলিকানদের সঙ্গে হেমিংওয়ের সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল, সে সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করে। হেমিংওয়ে আগাগোড়া ছিলেন ফ্যাসিস্টবিরোধী কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন একজন লেখক। কিউবার কার্যক্রমকে তিনি সমর্থন করতেন। কিউবার সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক আছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনী মনে করত। মার্কিন গোয়েন্দাদের ফাইল এবং অন্যান্য দলিলপত্র পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে হোচনারসহ হেমিংওয়ে গবেষকেরা এভাবে উপসংহার টেনেছেন যে তাঁর মানসিক বিকার তৈরিতে মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনীর ঘটনা বড় রকমের ভূমিকা রেখেছিল। এই ভূমিকা একজন সংবেদনশীল লেখকের জীবনকে শেষ করে দেওয়ার জন্য ছিল যথেষ্ট। ঘটেছেও তা–ই। জীবনঘনিষ্ঠ লেখক হিসেবে খ্যাতি পেলেও ব্যক্তিগত হতাশা থেকে আত্মহত্যা করেন। 






Ridmik News is the most used news app in Bangladesh. Always stay updated with our instant news and notification. Challenge yourself with our curated quizzes and participate on polls to know where you stand.

news@ridmik.news
support@ridmik.news
© Ridmik Labs, 2018-2021