দ্য উইশিং ট্রি: জর্জীয় পুরুষতন্ত্রের কাব্যিক আফিম!
বিনোদন
দ্য উইশিং ট্রি: জর্জীয় পুরুষতন্ত্রের কাব্যিক আফিম!
Oh, GodHelp my father to find the magic tree. I'm begging you.
বেশ কিছু রুশ ভাষার শব্দ ব্যবহৃত হলেও দ্যা উইশিং ট্রি মূলত জর্জিয়ান চলচ্চিত্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের খ্যাতনামা চলচ্চিত্রকার তেঙ্গিজ আবুলাদজের এটি ষষ্ঠ ফিচার ফিকশন। জর্জিয়ার কবি ও গদ্য লেখক জর্জি লিওনিদজের ২২ টি গল্পের উপর ভিত্তি করে স্ক্রিপ্টিং হয় কাব্যিক এ ফিল্মের। ফিল্মটি প্রাক-বিপ্লবী সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, নির্দোষতা, লিঙ্গ বৈষম্য, প্রচলিত কুসংস্কার, ধর্মবিশ্বাস, অপরাধবোধ এবং আকাঙ্ক্ষার দার্শনিক ও সামাজিক ধারণার আলোক-প্রক্ষেপণ। ইতালিয়ান নিওরিয়েলিজমের দারুণ প্রভাব রয়েছে সিনেমাটিতে। 
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
সত্যি বলতে, দৃশ্যগুলি দেখার পর তা ভুলে যাওয়া অত সহজ কথা নয়। কেননা পুরো ছবিতে অবলোকনের নিমিত্তে চমৎকার সব প্রতীকী চিত্রায়ণ বিদ্যমান। আফিমের ক্ষেতে অর্ধমৃত ঘোড়া দেখিয়ে ছবির সূচনা। যেখানে মৃতপ্রায় ঘোড়াকে জবাই করে হত্যার দৃশ্যে আফিমের রক্তলাল বর্ণের শেডে ক্যামেরার অন্তর্নিহিত সুচারুতা পরিলক্ষিত হয়। সর্বোপরি চলচ্চিত্রটি শক্তিশালী রূপক হয়ে উঠে এরূপ সব নিখুঁত কারুকার্যে। লেলিন প্রাইজ পাওয়া দ্যা উইশিং ট্রির প্রধান আলোচ্য বিষয় গ্রামীণ জীবনযাপন। গ্রামবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, পেশা ও জীবিকা এখানে স্থান পায়। সংলাপ নির্ভরতা রয়েছে প্রতি সিকুয়েন্সে। বড় গাছের ছায়ায় গ্রামের মহিলারা সবাই মিলেমিশে পরনিন্দা-পরচর্চায় সময় অতিবাহিত করে। গৃহপালিত পশুপাখি যেমন মুরগি, গরু, ভেড়া, ঘোড়ার উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায় অনেক ফ্রেমে। উল্লেখ্য যে, পশুপাখির ব্যবহারে নির্মাতা বেশ বিচক্ষণতা দেখিয়েছেন। 
রোগমুক্তির পুরস্কার হিসেবে মুরগিকে বানানো হয়েছে সাধক পুরুষের হাদিয়া। মা তার ছেলেকে সুস্থ করার জন্য একজন সৎ ব্যক্তির সন্ধানে ব্যতিব্যাস্ত হয়ে পড়েন। উদ্দেশ্য সে ব্যক্তি তার সন্তানকে সজোরে কষে চড় মারলেই আরোগ্য লাভ করে দ্রুত বড় হবে তার প্রিয়তম ছেলে। তবে এই চড় মারার মূল্যমান রয়েছে। যা পরিশোধ করা হবে সাথে করে আনা মুরগি হস্তান্তরের মাধ্যমে। কী অদ্ভুত অন্ধবিশ্বাস! কী অদ্ভুত এর হাদিয়া! কিন্তু কে চায় অকারণে চড়ের বিনিময়ে চড় খেতে!! অনুরূপ চড়ুই পাখিকে বানানো হয়েছে রাগ ও উত্তেজনার অসহায় শিকার হিসেবে। যাকে হত্যা করার অজুহাতে পুরো ঘরে তাণ্ডব চালানো হয়। মুভিতে অনাথ চরিত্র মেরিটা দুর্দান্ত কাজ করেছেন। তার করুণ পরিণতিতে কেউ কেউ শোকে মূর্ছা গেলেও প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি আর ধর্মীয় কুসংস্কারের দরুণ সংখ্যাগরিষ্ঠের বিরুদ্ধে তারা রুখে দাড়াতে পারেননি। এছাড়া নারগিজা চরিত্রটি আকর্ষণীয় দেহসৌষ্ঠবে উজ্জ্বলতা ছড়িয়েছে সিনেমায়। তার দেহচলন, ভাবভঙ্গিতে বিশেষ মুগ্ধতা ছিল। "The fortuneteller can't help the boy. His medicine is Nargiza."

লোমের আখভ্লেদিয়ানির আলোকচিত্র গ্রহণযন্ত্র এক্ষেত্রে বিশেষ তারিফের দাবী রাখে। পাথর হাতে ধরিয়ে দিয়ে থাপ্পর মারা কিংবা কয়েক লেয়ারে গায়ে কাপড় জড়িয়ে দেয়ার সিনগুলো যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পক্ষান্তরে ব্যতিক্রমী পুপালা হাস্যরস সঞ্চার করেও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন। ঘটনার নিগূঢ়তার কারণেই কিনা হাস্যরসাত্মক সংলাপগুলো বিরক্তিজনক হয়ে উঠে নাই। অবশ্য পরে যখন তাকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে খেতে বসার সময় বের করে দেয়া হয় তখন আফসোস জাগে। এছাড়াও পুরুষ চরিত্র এরতাওজিকে ঐশ্বরিক গাছের সন্ধানে মত্ত হতে দেখা যায়, যার পরিণতি হয় চরম ভয়াবহ।

I'm carrying Elioz. He looked for the magic tree and got frozen. He picked a beautiful tree and covered with hoarfrost.
I'm carrying Elioz. He looked for the magic tree and got frozen.
He picked a beautiful tree and covered with hoarfrost.
এই মুভির আলোচিত বিবাহ দৃশ্যটি মনে হয় শেষকৃত্যের মতো। নির্মাতা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে বিয়ে দিয়ে পুরুষতন্ত্রের স্বরূপই প্রকাশ পেয়েছে এখানে। তারপর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পালা শেষে কোন এক শীতের সময় মেরিটা জিডিয়ার সাথে পুনরায় দেখা করেছিল। সমাজের চোখে যা চিহ্নিত হয়েছিল অপরাধ ও ঘোরতর পাপ বলে। এ ঘটনায় গ্রামবাসী তাকে গাধার পিঠে উলটো করে বসিয়ে হত্যার জন্য নিয়ে যায়। এসময় বাসিন্দারা কাদা ও পাথর মেরিটার গায়ে ছুঁড়ে দিয়ে ধিক্কার জানাচ্ছিল। এ যে অন্যায় এবং পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের নামান্তর তা বলার জন্য মুষ্টিমেয় লোক সেখানে উপস্থিত হলেও মেয়েটিকে তারা ধর্মের দোহাই থেকে বাঁচাতে পারে না। পুরুষদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নারগিজা শত চেষ্টা করেও বিফল হয়। সিকুয়েন্সটির একটি শট দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, ক্যামেরায় তাকিয়ে কার উদ্দেশ্যে এই থুথু ছিটিয়ে দেয়া হল? পরিসমাপ্তিতে ফিল্মের এপিলোগ আমাদের জানিয়েছে— এতদিনে মেরিটার লাশের পাশে একটি ডালিম গাছ বড় হয়েছে যা কিনা পুরুষতন্ত্রের ধ্বংসস্তূপের পাশেই শাখাপ্রশাখার বিস্তার ঘটিয়েছে। মেটাফরে এই মুভি অসাধারণ সব বার্তা দিতে চায়। প্রকাশ করতে চায় সমাজের অন্ধকার।

সিনেমাটোগ্রাফি অনন্য অসাধারণ হলেও শব্দ ও সঙ্গীতে মুভিটি নিষ্প্রভ। প্রত্যাশিত আবশ্যকীয় আমেজের অনুপস্থিতিতে অনেক সিন উপযুক্ত শব্দহীনতায় ভোগে। একটি সিনে মেরিটাকে প্রদানকৃত উপহারের জুতো প্রবাহিত বাতাসে মিলিয়ে যেয়ে পাখির শটে ট্রানজিশন নিতে দেখা যায়। এডিটিং অদক্ষতায় যা খুবই দৃষ্টিকটু লাগে। এর বাইরেও অসংখ্য এমেচার কাট দেখা যায় দ্য উইশিং ট্রিতে। তবে দুর্দান্ত সংলাপের বদান্যতা আর সমকালীন সামাজিক বাস্তবতায় কারিগরি ত্রুটিবিচ্যুতি হয়তো পাশ কাটিয়ে যায়।
"The world is not blind
The fence here has ears
The walls have eyes."
চলচ্চিত্র — Древо желания (The Wishing Tree)
পরিচালক — তেঙ্গিজ আবুলাদজে
জনরা — ড্রামা
সাল — ১৯৭৬
Writer: ফরিদুল আহসান সৌরভ 
বিনোদন
আরো পড়ুন